কেউ একজন বলেছিলো কবিতা বিষয়ে আমি যেনো দু'কলম লিখি। অনেক দিন চিন্তা করে দেখলাম, হাতি ঘোড়া গেলো তল মশা বলে কত জল ধাঁচের অবস্থা হবে। প্রতিষ্ঠিত একজন কবি আছে যার স্বাধীনচেতা মনোভাবে ,আমার মতো অখ্যাত এবং অপরিচিত মানুষ কবিতার বিষয়ে দু লাইন লিখলে , অহেতুক বিছুটিজ্বলন শুরু হতে পারে, ক্ষিপ্ত হওয়ার সমুহ সম্ভবনা। তাই কবিতার প্রথাগত আলোচনা বাদ দিয়ে কবি জীবন নিয়ে কয়েক কথা বলি, এর সাথেই কবিতা বিষয়ে আমার অনুভবের বদল কবিতার সংজ্ঞায়ন ইত্যকার বিষয় স্পষ্ট হবে এটাই আমার অনুমান।
কবিতা কিংবা অকবিতা লেখার সূচনা কৈশোরের সূচনায়। বেশ উদ্দিপ্ত হয়ে বেশ কিছু লিখে ফেলা। তবে তেমন ভালো কিছু না, সমস্যা ছিলো একটাই সমাপ্ত করতে না পারা, সস্তার 5 টাকার নোট খাতা ফুড়িয়ে যায় তবু হায় কবিতা না ফুড়ায়, সেসব অফুরান কবিতা শেষ হতো কলমের কালি শেষ হলে।
তবে আমার মায়ের ধারনা ছিলো আমি মহান কিছু করে ফেলছি, তার ছেলে মহাকবি কালিদাসের সাগরেদ হয়ে গেছে, তাই আমার কবিতার খেয়াল শেষ হলে সেই সব নোটখাতার গোপন সিন্দুক হয় তার টিনের সুটকেস।
মাঝে অদলবদল, জীবন বদল, তাই দ্্বিতীয় দফায় কবিতা শুরু হয় নাটকিয় ভাবে। অবশ্যই বাঙালি জীবনের অমোঘ চিত্রনাট্য মেপে, প্রেমে পড়ার পর,
মায়ের টিনের সুটকেস থেকে অতীত কবিতার সংকলন চুরি করে সে খাতা পুড়িয়ে, সে ছাই হাতে মেখে নতুন কবিতার মাছ ধরার চেষ্টা।
অনুপ্রেরনা, শঙ্খ ঘোষ, এবং শক্তি চাটুজ্যে। আমি কখনই পাঠ্যপুস্তকের কবিতার মহা অনুরাগি ছিলাম, পাঠ্য পুস্তকের কবিতা মানেই বছর শেষের পরীক্ষায় প্রথম 8 লাইন , শেষ 8 লাইন দাড়ি কমা সমেত লিখে আসা, আমার অল্পমেধায় কুলাতো না, তাই কবিতাপ্রেমে অবশ্যই প্রথম ও প্রধান নাম শক্তি। তার কবিতা পড়েই মনে হলো আসলেই কবিতা লেখা তেমন জটিল কিছু নয়, ইচ্ছা করলেই এমন 2/300 কবিতা নামিয়ে দেওয়া যায়।
যাই হোক কবিতা লেখা আসলেও এত সহজ নয়।
এটা যারা লেখা শুরু করেছে তারা বুঝবে ভালো, ছন্দের পায়ে বেড়ী পড়ানো, ছন্দবিমুখতা, আঙ্গিক, এত সব মিলেও কবিতা ঠিক হয়ে উঠে না। কবিতার জন্য আবশ্যক এসব শর্ত পালন করেও কেনো ছোটোছোটো অসংখ্য সংলগ্ন বাক্য কেনো কবিতা হয়ে উঠলো না এটা কবি হাত পা ছড়িয়ে ভাবতে বসে।
কোনো কোনো কবিতা একেবারে ফরমায়েশি আসবাবের মতো সুন্দর বসে যায় কবিতার খাতায়। কোনোটা কোষ্টকাঠিন্যের মতো আটকে থাকে কলমের ডগায় কিংবা ভাবনার গ্রন্থিল ভুবনে। এসব বুঝার মতো মানসিকতা তৈরি হয় নি বিধায় আমার নতুন কাজ হয় কবিতা সম্পাদনা করা।
সে সময় আমার মতো অনেক বন্ধুরই দাড়ি গোঁফ হয়েছে বা হচ্ছে, সবাই রাস্তায় একটু ুন্মনা হয়ে ঘুরে, সবাই কলেজের কোনায় দাড়িয়ে সুন্দরিদের দেখে হৃদয়ের দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সবাই সাহস করে মেয়ের সামনে দাড়ায়, থতমত ফিরে আসে বা বাক্যরহিত সং দাড়িয়ে থাকে । এবং এসব তুমুল আবেগ লিখে ড়াখে খাতার শেষ পাতায়। তেমন কিছু কবিতা হাতের কাছে পেয়ে মহা উৎসাহে সম্পাদনা শুরু হয়ে যায়। এভাবে বুঝতে শিখি কবিতার ধরন, কবিতার ভেতরে একটা ছোটো অনুভব থাকে। এসব কিভাবে কিভাবে শব্দের সাথে ভোকাট্টা মারপঁ্যাচ খেলে খাতার পাতায় নেমে আসছে, কিভাবে জিনিষগুলোকে আরও একটু বোধগম্যতা দেওয়া যায়, এসব চিন্তা থেকে কবিতায় অহেতুক কাটাকাটি, মন খচাখচি। বিরোধ, আপোষ, এবং এটা বুঝে নেওয়া, কেউ কেউ শুধু ছড়াকার হিসেবেই জন্মায়, তাদের কবিতা লেখার অক্ষমতা যাবে না।
এমন এক সময়ে কলেজের টেষ্ট পরীক্ষার আগ কোনো এক রাত জেগে একটা কবিতা লিখে সেটা স্থানীয় পেপারে জমা দিয়ে আসা, এবং ফিরে আসার পথে মৃদু উপহাস শোনা যে আজকালের ছেলেরা শুধু প্রেমের কবিতা লিখে, এর উত্তরে একটা সেমি বিপ্লবি কবিতা লিখে পরের দিন ফিরে যাওয়া, এবং প্রথম প্রেমের প্রস্তাব এবং প্রথম প্রত্যাখ্যান, এবং সেই সাথে সেমি বিপ্লবি কবিতার প্রকাশনা, সব মিলিয়ে বেশ জটিল একটা অবস্থা তৈরি করে। আমার প্রকাশিত সেই 2টি কবিতা হয়তো সেই মেয়ে গোপনে সংগ্রহ করে রেখেছে, তার গোপন ধারনা ছিলো তার কথা ভেবেই সেদুটো লেখা। তবে আমার কাছে নেই।
এর পর নিয়মিত কবিতা পঠন শুরু, এবং কবিতা বিষয়ক পুস্তক পাঠ শুরু, তবে কবিতা বিষয়ে সবচেয়ে ভালো লেখাটা মনে হয় পুর্নেন্দু পত্রির সুবাদে পড়া হয়েছে। যারা কবিতার সংজ্ঞা গতিবিধি, আনাচ কানাচ অন্দর এবং কবিভাবনা জানতে চায় তাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য হতে পারে এটা,
এর সাথে শক্তির উপদেশ, কেউ কবি হতে চাইলে প্রথম কাজ হিসেবে তাকে 100 সনেট লিখতে হবে, 100 সনেট লেখার পর সে কবিতাঙ্গনে পদার্পনের সাহস দেখাতে পারে। আমি এখন পর্যন্ত 5টা লিখেছি, এখনও 95টা সনেট বাকি আমার কবিজন্মের।
এবং আমাদের বয়েস বাড়ে। কোনো এক সময় সিদ্ধান্ত নেই এখন থেকে বিরহ বা দুঃখের কবিতা লিখবো না, এখন থেকে অন্ধকারের কবিতা লিখবো না, শুধু আশাবাদি এবং প্রেমের কবিতা লিখবো, কঠিন একটা সিদ্ধান্ত। প্রেমের কবিতা বিশুদ্ধ প্রেমের কবিতা লেখার চেয়ে বিরহের কবিতা লেখা সহজ।
কবিতা বিষয়ে শেষ ধাককা খেয়েছি পোলিশ নোবেল পাওয়া কবির কবিতা শুনে। বি বিসির সাক্ষাৎকারে তার কবিতার অনুবাদ শুনলাম, তার কবিতার বই নাকি সর্বসাকুল্যে 1টা, এবং সেখানে নাকি কবিতার সংখ্যা 24টা কিংবা তারও কম, শুনে বুঝলাম কবিতার মতো কবিতা হলে 12টাি যথেষ্ট, 1000 লেখার কোনো মানে নেই।
কবিতা লেখা কঠিন, আরও কঠিন কবিতার অনুবাদ, এ প্রসঙ্গে কেউ একজন বলেছিলো, অনুবাদের পর যা অবশিষ্ট থাকে সেটাই কবিতা, কবিতার নির্যাস বলা যেতে পারে তাকে। ভাষার বেরাজাল পেরিয়ে ভিন্ন একটা ভাষায় যা চলে আসে সেটাকে কবিতা বলা হলে বুঝতে হবে সেই কবির কবিতা এক কথায় চমৎকার।
তার কবিতা শুনার পর কবিতা সম্পর্কে আমার উপলব্ধি,
কবিতা একটা সংক্ষিপ্ত দীর্ঘশ্বাসের মতো, পাঠক পড়বে, এবং পড়ার পর আশ্চর্য হয়ে ভাববে আরে এটাতো আমার কথা, আমিতো এ কথাটাই বলতে চেয়েছিলাম, কবিতা হবে বাহুল্যবর্জিত, আন্তরিক, আঙ্গিক কোনো সমস্যা নয়, ছন্দ তেমন গুরুত্বপুর্ন কিছু নয়, শুধু পাঠকের ভেতরমহলে একটা আলোড়ন, কবিতা সফল।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



