somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মামা কাহিনী!! :D B-)

১৫ ই জুলাই, ২০১০ রাত ১০:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বেশ অনেকদিন পর ট্রেনে উঠলাম। গন্তব্য সম্পূর্ণ অচেনা অজানা শহর নরসিংদী। আগে কখনোই যাওয়া হয় নি। ভেতরে এক অন্যরকম চাঞ্চল্য কাজ করছিল। ট্রেনের জানালা দিয়ে প্লাটফরমের ভীড় দেখছি আর দেখছি ফেরিওয়ালাদের ব্যস্ত ছোটাছুটি। হঠাৎই বখাটে ছেলের ধরণে বিকট শিষ্‌ দিয়ে নড়ে ওঠে ট্রেন। প্রথমে কিছুটা দুলকি চালে চলে পরে ছুটতে থাকে তেজী ঘোড়ার মত। রাতের অন্ধকারে পিছিয়ে যেতে থাকে আমার বহুকালের চেনা পরিচিত শহর।

কেমন এক অদ্ভুত অনুভুতি তখন হৃদয় জুড়ে। মনে হয় চেনা জানা আপন জায়গা ছেড়ে কুয়াশায় ভেসে ভেসে মায়াবী ট্রেন ছুটে চলছে কল্পনার ধূসর জগতে। জানালা দিয়ে চাঁদের অস্পষ্ট আলোয় পেরিয়ে যায় নাম না জানা কত নদী। নরম জ্যোস্নায় সে নদীর কালচে জল চিকচিক করে উঠে। সেই দৃশ্যে মাথার ভিতর ঘাই দেয় সুদূর অতীতের অস্পষ্ট কোন স্মৃতি। কী যেন... কবে যেন... আমি জানালায় মাথা ঠেকিয়ে চেয়ে থাকি অন্যমনে। ট্রেনের একটানা ছন্দময় ঝিকঝিক শব্দে হঠাৎই রোমহর্ষের মতো মনে পড়ে যায় সেই কবেকার কোন ছোট বেলার কথা। ছোট্ট আমি মায়ের পাশে বসে ট্রেনের জানালা দিয়ে বিস্ময় ভরা চোখে দেখছি এমনি কোন ভয়ঙ্কর সুন্দর বিমুগ্ধ শীতের রাত!

মনে পড়ে যায় মামা বাড়ী, দুরন্ত ডিসেম্বর মাস। মুখ গুঁজে বার্ষীক পরীক্ষা দিতাম কিন্তু মন পড়ে থাকতো মামা বাড়ীতে। দিন গুনতাম পরীক্ষা কোনদিন শেষ হবে আর আমরা চেপে বসব মেঘনায়। ছোটবেলায় সেই মেঘনা ট্রেনের ঝিক ঝিক শব্দে হারিয়ে যেতাম মামার বিশাল পুকুরে, উঠোন জুড়ে সব কাজিনদের ক্রিকেট খেলা, মামানির আমসত্ত্ব চুরি আরও কত শত ঘটনায়।

আর ঐ একটা মাস ছিল আমাদের পূর্ণ স্বাধীনতা। ভুলু'র মার বড়ই গাছে দিনরাত ঢিল মারা, ওর জাতি আম গাছ ফাঁকা করে দেওয়া, হোসেন মামার ক্ষিরা ক্ষেত ভর দুপুরে সাফা খিরখিরা করে দেওয়া, হিন্দু বাড়ীর পেয়ারা, চালতা, কামরাঙা, লেবু চুরি কি করিনি! আর আমাদের এই সমস্ত অপকর্মের উৎসাহদাতা আমাদের বড়মামা। উনি উনার ছোটবেলার অপকর্মের গল্প বলে আমাদের নিয়মিত উৎসাহ দিয়ে যেতেন। প্রতিদিন মামার মস্ত উঠোনে সকাল বিকাল ক্রিকেট খেলা আর সেই খেলায় মামা আর মামার একমাত্র ছেলে আমাদের কাজিন নিপুর ঝগড়াটা ছিল এক নিয়মিত ঘটনা। মামাকে আউট করা খুব কঠিন ছিল। আউট হলেই বলত, আমি রেডি ছিলাম না। সব ষড়যন্ত্র। :| তাই নিয়ে কত ঝগড়া ঝাটি। মামানি এসে হুন্কার ছাড়লে তবেই ঝগড়া মিটত। সবাই আবার সুবোধ বালকের মতো খেলা শুরু করে দিতাম।

একবার মামা ছক্কা মারতে গিয়ে বাড়ীর সামনের দিককার গ্লাস ভেঙ্গে ফেলল। আমরা সব কাজিনেরা তো ভয়েই অস্থির। কোথায় পালাব সেই পথ খুজঁছি। মামানি হুন্কার ছাড়তে ছাড়তে এসে দেখলেন মামা ব্যাট হাতে দাড়িঁয়ে আছে। মামা কোনরকমে কাষ্ঠ হাসি হাসতে হাসতে বললেন, আমি যে এত ভাল ব্যাট করি জানা ছিল না। চার মারতে গিয়ে ছয় হয়ে গেল। :P আর যায় কোথায়! মামানির হুঙ্কারে আমরা ততক্ষণে পাগারপাড়। শেষ পর্যন্ত মামার কী দশা হয়েছিল জানি নে!

আমরা সব কাজিনেরা তখন হক মামার দোকানের সামনে হাজির হয়েছি। কিছুক্ষণ পর দেখি মামা ধুঁকতে ধুঁকতে এদিকেই আসছেন। আমরা উৎকন্ঠার সাথে জিজ্ঞেস করি, মামা মামানি কিছু বলল! মামা হাসি দিয়ে হাত নাড়িয়ে বলল, আরে না! কি বলবে আবার। দেখিয়ে দিলাম না কপিল দেব কাকে বলে। B-) তয় আজকে মনে হয় আর খেলা ঠিক হবে না। :| সেই কথা শুনে আমাদের কিছুটা মন খারাপ হয়ে গেল। আমাদের মন খারাপ দেখে মামা বললেন, আরে ধুর মন খারাপ করিস না। আয় চা খাই। তারপর দোকানদার হক মামাকে বললেন, হক আমার ভাগিনাগোরে চা বিস্কিট দাও। কি বিস্কিট খাবি তোরা? আমরা সবাই বলে উঠলাম, লাঠি (টোষ্ট) বিস্কিট।

লাঠি বিস্কিট চায়ে ডুবিয়ে খেতে খেতে ভাবছি কি করা যায়। একজন বলল, মামা গোসল দিব। যেই ক্থা সেই কাজ। চা বিস্কিট শেষ করেই সবাই লাফ দিয়ে গিয়ে পড়লাম দোকানের পাশেই বিরাট পুকুরে। মামার পুকুরে যাওয়ার উপায় নেই। মামানি আজ দেখতে পেলেই ছ্যাঁচবে। গোসল শেষে সবাই চোরের মতো ঘরে ফিরলাম। মামানি চুপচাপ। পরিস্হিতি সুবিধার না। আমরা চুপচাপ দুপুরের খাবার খেয়ে যাচ্ছি। অন্য সময় হলে মামা মামানিকে রাগানোর জন্য সুর করে বলতো, মামা ভাগিনা যেখানে... আমরা সাথে সাথে সুর মেলাতাম, বিপদ নাই সেখানে। মামা আবার বলতো আমার ভাগিনারা সব কার দলে? আমরা বলতাম, মামার দলে। কিন্তু আজ মামা সেসব কিছুই বলল না।

খাওয়া শেষ হতেই মামানি দুষ্টামির হাসি হেসে বলল, আজ যেহেতু খেলা বন্ধ তাইলে আমরা এখন সবাই কি করব? আমরা কাজিনরা সবাই যেন মেঘলাদিনে একটু সূর্যের উঁকিঝুঁকি দেখতে পেলাম। :D আমি অন্য কাজিনেরা দখলের আগেই মামানির কোলে গিয়ে বসলাম। সবাই একসাথে খুশিতে চিৎকার দিয়ে বললাম, গল্প, আজ গল্প শুনব! মামানি এবার আড়চোখে মামার দিকে তাকিয়ে আমাদের উদ্দেশ্যে সুর করে বলল, মামা ভাগিনা যেখানে... আমরা মামানির পক্ষ নিয়ে সুর করে বললাম, বিপদ আছে সেখানে।B-) :P

হঠাৎই সবাই মামানির পক্ষ নেয়াতে মামা তো রেগে কাই। ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, তোদের যদি আর বাবুরহাট বাজারে নিয়ে মিষ্টি খাওয়াই। তোরা কেউ আমার ভাগিনা না। তোরা তোদের মামানিরে নিয়া থাক। আমি আর তোদের সাথে নাই।

আমাদের তখন মিষ্টি চমচমের লোভ দেখিয়ে লাভ নেই। মামানির গল্পের কাছে সব পানসা। আমাদের সবার তখন একই আবদার, মামানি চোরের গল্প বল। চোরের গল্প শুনব। মামানি শুরু করল তাঁর বিখ্যাত চোরের গল্প। সেই গল্প শুনে আমরা কখনো হেসে উঠছি। কখনো অভাগা চোরটার জন্য আমাদের বুকের ভিতরটা টনটন করে উঠছে। গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠছে একটা কষ্ট। আমি শক্ত করে মামানিকে জড়িয়ে ধরে থাকি। দুঃখী চোরটার জন্য আমার চোখের কোন একটা অজানা কষ্টে ভিজে উঠে...

হঠৎই ট্রেনের বিকট হুইসালে আমি সুদুর অতীতের গল্পের জগত ছেড়ে বাস্তবে ফিরে আসি। কখন আমার মামাবাড়ীকে বহুদূর পিছনে ফেলে চলে এসেছি সম্পূর্ণ নতুন এক শহরে। নরসিংদী! যেখানে আমি কখনো আসিনি। কিন্তু জানি এই শহরের আনাচে কানাচে এমনি করেই ছড়িয়ে আছে কত মামা কাহিনী! আমি ব্যাগ কাঁধে ফেলে নেমে গেলাম সেই অচেনা শহরের পথে।





মামা কাহিনী শুরু করেছিলাম ব্লগ জীবনের একেবারে প্রথম দিকে। এরপর বহুদিন আর কেন যেন লেখা হয় নি। ইচ্ছে ছিল কিন্তু হয়ে উঠে নি। আজ বহুদিন পর আবার মামা কাহিনী লিখলাম।

মামা কাহিনী! ১

৫৭টি মন্তব্য ৫৬টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নান্দাইলের ইউনুস ও স্বপ্নভঙ্গের বাংলাদেশ

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০


নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে প্রচারিত হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় একটি নাটকে একজন ভাড়াটে খুনীর চরিত্র ছিল। খুনীর নাম ইউনুস - নান্দাইলের ইউনুস। গ্রামের চেয়ারম্যান তার প্রতিদ্বন্দ্বী একজন ভালো মানুষ স্কুল শিক্ষককে হত্যার... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বনির্ভর অর্থনীতি থেকে ঋণনির্ভর, আমদানিনির্ভর, পরনির্ভর রাষ্ট্রে পরিনত হতে যাচ্ছি।

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৩ রা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৪




মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে নতজানু হয়ে যে রাষ্ট্রগুলো নিজের অর্থনীতি, কৃষি আর ভবিষ্যৎ বিক্রি করে দেয়- তার পরিণতি কী, তার জীবন্ত উদাহরণ পাকিস্তান। কোটি কোটি মানুষকে ভিক্ষুক বানানোর সেই পথেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

এরা খুবই বিপদজনক

লিখেছেন শ্রাবণ আহমেদ, ০৩ রা মে, ২০২৬ রাত ১১:০১

যে তোমার সাফল্য দেখে হিংসে করে,
যে তোমার বিপদ দেখে খুশি হয়,
যে তোমার সামনে এক আর পেছনে আরেক।
তাকে তোমার গোপন কথা কিংবা তোমার কোনো পরিকল্পনার কথা বলতে যেও না।
সবসময় তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

গ্রেট প্রেমানন্দ মহারাজ

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৪ ঠা মে, ২০২৬ সকাল ১১:৪৮



'প্রেমানন্দ' একজন ভারতীয় হিন্দু তপস্বী ও গুরু।
১৯৭১ সালে কানপুরের কাছে 'আখরি' গ্রামে তার জন্ম। দরিদ্র পরিবারে জন্ম। ১৩ বছর বয়সে প্রেমানন্দ সন্ন্যাসী হওয়ার জন্য গৃহ ত্যাগ করেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডোগান- এক রহস্যময় জাতি

লিখেছেন কিরকুট, ০৪ ঠা মে, ২০২৬ বিকাল ৫:১০



আফ্রিকার মালি এর হৃদয়ে, খাড়া পাথুরে পাহাড় আর নির্জন উপত্যকার মাঝে বাস করে এক বিস্ময়কর জনগোষ্ঠী ডোগান। বান্দিয়াগারা এস্কার্পমেন্ট অঞ্চলের গা ঘেঁষে তাদের বসতি । এরা যেন সময় কে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×