(সংগ্রহীত)
কোনো রকম মাশুল ছাড়াই বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে নৌপথে ট্রায়াল ট্রানজিট শুরু করেছে ভারত। মাশুল তো নয়ই বরং সম্ভাব্য শুল্ক-করের সমপরিমাণ ব্যাংক গ্যারান্টি চেয়ে জারি করা আদেশও আপত্তির মুখে তাড়াহুড়া করে বাতিল করা হয়েছে। আর তাই লোহা-লক্কর নিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে চলমান দুটি ভারতীয় জাহাজ বিনা ফিতে পণ্য পরিবহনের সুযোগ পাচ্ছে। আর আদেশ বাতিল করায় এখন থেকে ভারতীয় জাহাজে বিনা ফিতে স্বাভাবিক পণ্য পরিবহনে আর কোনো বাধাও থাকছে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও নৌমন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এ ধরনের ঘটনাকে অত্যন্ত অস্বাভাবিক বলে অভিহিত করেছেন অর্থনীতিবিদ ও বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. কে এস মুরশিদ। তিনি বলেন, 'যেহেতু এখনো সরকারিভাবে ফি ধার্য করা হয়নি, তাই অন্তর্বর্তীকালীন নূ্যনতম একটি ফি নেওয়া যেত অথবা ব্যাংক গ্যারান্টি নেওয়ার আদেশটিই যুক্তিযুক্ত ছিল। এটা কেন বাতিল করা হলো তা আমার বোধগম্য হচ্ছে না। এখন যদি বিনা ফিতে পণ্য পরিবহন করা যায় সে ক্ষেত্রে আবার যখন ফি ধার্য করা হবে তখন আপত্তি তুলতে পারে ভারত।'
শুল্ক বিশেষজ্ঞ ও এনবিআরের সাবেক সদস্য ড. রশিদ-উল আহসান চৌধুরীও মনে করেন, এভাবে শুল্ক-কর না রাখার পরিবর্তে ব্যাংক গ্যারান্টি চাওয়া এবং তা বাতিল করা ঠিক হয়নি। তাঁর মতে, এখন যদি কোনো পণ্য খোয়া যায় তবে ওই পণ্যের শুল্ক চাওয়া হবে কিসের ভিত্তিতে? ব্যাংক গ্যারান্টিটি ছিল একটি নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা। এখন আর তা থাকছে না।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি না হওয়ায় বাংলাদেশও ট্রানজিট চুক্তি করেনি। তাতে অবশ্য ট্রানজিট থেমে থাকছে না। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চালু রয়েছে প্রটোকল অন ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রেড বা পিআইডাবি্লউটিটি নামে নৌচুক্তি। তবে ওই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের নৌপথে ভারতীয় পণ্য পরিবহন হলেও এত দিন বাংলাদেশের ভেতর তাদের স্থল পথ ব্যবহার করতে হয়নি। এবার স্থল পথ ব্যবহার হবে। তাই জাহাজে পণ্য এনে নামানো হবে আশুগঞ্জ বন্দরে। আর সেখান থেকে বাংলাদেশি ট্রাকে করে এসব পণ্য আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে পরিবহন করা হবে ভারতে। এভাবে পণ্য পরিবহনের এটাই প্রথম অভিজ্ঞতা।
তবে আশুগঞ্জকে শুল্ক স্টেশন ঘোষণা করে পণ্য ছাড় করার কোনো নীতিমালা বা আদেশ না থাকায় গত ২৫ আগস্ট ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের আগে আগে শুল্ক কর্তৃপক্ষ আশুগঞ্জ ও আখাউড়াকে শুল্ক স্টেশন ঘোষণা করে এ সংক্রান্ত একটি আদেশ জারি করে। তাতে কোনো ফি, মাশুল ও শুল্ক ছাড়াই পণ্য পরিবহনের সুযোগ দেওয়া হয়। যেহেতু ট্রানজিটের কোনো ফি এখনো নির্ধারণ করতে পারেনি সরকার, তাই অন্তর্বর্তীকালীন সমাধান হিসেবে ট্রানজিটের পণ্যের বিপরীতে সম্ভাব্য শুল্ক-করের সমপরিমাণ ব্যাংক গ্যারান্টির বিধান রাখা হয় ওই আদেশে।
সূত্র জানায়, তাতেও আপত্তি তোলে ভারত। তারা কোনো ব্যাংক গ্যারান্টিও দিতে আগ্রহী নয়। তাই সরকারের তরফ থেকে শুল্ক কর্তৃপক্ষের জারি করা আদেশ বাতিলের নির্দেশ আসে এনবিআরে। তারই ধারাবাহিকতায় গত ১৯ সেপ্টেম্বর নৌ-ট্রানজিটের আওতায় আশুগঞ্জ ও আখাউড়াকে শুল্ক স্টেশন ঘোষণা করে জারি করা আদেশ প্রত্যাহার করে নেয় এনবিআর। বস্তুত এর ফলে ভারত কোনো রকম শক্ত বিধিবিধানের মুখোমুখি না হয়েই নিজেদের পণ্য নিয়ে বাংলাদেশ অতিক্রম করতে পারবে। এর আগে ত্রিপুরার পালাটানা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালামাল যেভাবে বিশেষ বিচেনায় নেওয়া হয়েছে সেভাবেই পরিবহন হবে এসব পণ্য।
এ বিষয়ে এক শুল্ক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'এরই মধ্যে আমরা যে আদেশ জারি করেছিলাম, তা বাতিল করা হয়েছে। মূলত আদেশে শুল্ক-করের সমপরিমাণ ব্যাংক গ্যারান্টি চাওয়ার কারণেই আদেশটি বাতিল করতে হয়েছে।' তিনি আরো বলেন, ওডিসি পরিবহনের মতোই বিনা ফিতে ট্রায়াল ট্রানজিট হিসেবে পণ্যগুলো পরিবহন করা হবে। আপাতত কোনো ফি নেই, তবে ভবিষ্যতে ফি থাকবে কি না, তা পরে দেখা যাবে। ভারতীয় পণ্যবাহী জাহাজ দুটি বর্তমানে আশুগঞ্জের দিকে যাত্রা করেছে বলেও জানান ওই শুল্ক কর্মকর্তা।
এনবিআর সূত্র জানায়, গত ২৮ আগস্ট জারি করা আদেশে ভারতীয় পণ্য পরিবহন এবং আশুগঞ্জ ও আখাউড়া শুল্ক স্টেশনে পণ্য ছাড়করণের ক্ষেত্রে বেশ কড়াকড়ি ছিল। এর মধ্যে শুল্ক কর্তৃপক্ষের কাছে পণ্যবাহী জাহাজ বা কার্গো, পণ্যের বৈশিষ্ট্য, ফেরতযোগ্য ও অফেরতযোগ্য পণ্য, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র, খাদ্যদ্রব্য, জ্বালানি, মুদ্রা ইত্যাদির তালিকা জমা দেওয়া, বিল অব এন্ট্রির সঙ্গে পণ্য চালানের ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট, ইনস্যুরেন্স ডকুমেন্টস এবং ছবিসহ পণ্যের ক্যাটালগ দাখিল করা, পণ্যের মোড়কের গায়ে 'ফর ট্রানজিট/ট্রানশিপমেন্ট' শব্দগুলো লেখার বিধান রাখা হয়।
এ ছাড়া, কাস্টমস কর্মকর্তার সন্দেহ হলে জাহাজে তল্লাশি চালানো, কায়িক পরীক্ষা করা, পণ্যের প্যাকিং লিস্টের সঙ্গে ইনভয়েস মিলিয়ে দেখা, কায়িক পরীক্ষা সম্ভব না হলে পরবর্তী শুল্ক স্টেশন পর্যন্ত এসকর্ট করা, অপঘোষণা থাকলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ারও বিধান ছিল। আশুগঞ্জ শুল্ক স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার পর একই বিধিবিধান আখাউড়াতেও পরিপালন করার কথা। এ ছাড়া আরো বেশ কিছু বিধান রাখা হয়েছিল জারি করা আদেশে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


