প্রথম পর্ব Click This Link
দ্বিতীয় পর্ব Click This Link
ব্যাচেলর শেষ হবার পর মাস্টার্সটাও ওরা এই ইউনিভার্সিটি থেকে করবে বলে ঠিক করল। এদিকে ফাইনাল পরীক্ষাও শেষ। সুমাইয়া বাংলাদেশে যেতে চাইল। ও চায় বিয়ের আগে হবু শ্বশুর শ্বশুড়ীর সাথে পরিচিত হবে। আদিল কিছুটা চিন্তায় পড়ে গেল, সে এখন পর্যন্ত বাবা মাকে কিছুই জানায়নি। হঠাৎ নিয়ে গেলে কে কি মনে করে বসে, এইসব নানা রকম ভাবনা মাথায় ভীড় করছিল। সেই সাথে কিছুটা ভয়, লজ্জা, সংকোচও কাজ করছিল। সাহস করে একদিন মাকে ফোনে জিজ্ঞেস করল নাটোরের ওয়েদার এখন কেমন? তার এক মেয়ে বন্ধু তার সাথে এখানে বেড়াতে আসতে চায়। মা শুনে সব বুঝলেন। বুদ্ধিমতী মা তৎক্ষনাৎ আদিলকে ক্ষেপালেন না। বললেন এইবার এসে তুমি একা ঘুরে যাও, তোমার বাবার শরীরটা বেশী ভাল না পরের বার তাকে নিয়ে এসো।
সুমাইয়া প্রথমে মন খারাপ করলেও পরে মেনে নেয়। আদিল নাটোর ফিরে আসে। তার বাবা মা তার সমস্ত ধারনা ভুল প্রমান করে দিয়ে বেকে বসলেন। উনারা কিছুতেই ঐ ক্রিশ্চিয়ান মেয়েকে ঘরের বউ করে আনবেন না, তা সে যতই সুন্দরী, শিক্ষীতা, ধনী হোক না কেন। তাদের চৌদ্দ গুষ্টিতে এই ধরনের ঘটনা ঘটে নাই। আদিল এই কাজ করলে সমাজে তাদের মান সম্মান নাকি আর থাকবে না। আদিল প্রথমে অপ্রস্তুত হয়ে গেল কি করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। বাবা মায়ের সাথে কখনও এভাবে প্রকাশ্য বিরোধে জড়িয়ে পড়েনি। আদিল কিছুতেই বুঝাতে পারছে না সে একটা মেয়েকে ভালবেসে বিয়ে করে জীবন যাপন করতে চাচ্ছে এতে তাদের সমস্যাটা কি? চোখের সামনে বার বার সুমাইয়ার মিষ্টি মুখটা ভেসে উঠছিল। ভাবছিল, কি ভাববে মেয়েটা তাকে যদি ওকে বিয়ে করতে না পারে।
বাবা মা ঘোষনা দিলেন আদিলকে আর ইন্ডিয়া পাঠাবেন না। শুনেতো আদিলের আত্মা শুকিয়ে কাঠ। সার্টিফিকেট উঠানোর নাম করে পর্যন্ত বাবা মাকে রাজী করানোর চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুতেই তারা রাজী হলেন না। অবশেষে রাতের অন্ধকারে বাড়ী থেকে পালাতে বাধ্য হল। ব্যঙ্গালোর ফিরে আদিল বাড়ীতে কোন যোগাযোগ করল না। বেকার অবস্হায় কিভাবে সুমাইয়ার বাবার কাছে প্রস্তাব দিবে ভেবে পাচ্ছিল না। জমানো টাকাও শেষ হয়ে আসার পথে। সুমাইয়ার কাছে কিছুতেই সে হাত পাতবে না। এতটুকু আত্ম সম্মান ওর আছে।
এদিকে সুমাইয়াকে এখনও জানায়নি তার বাবা মায়ের রাজী না হবার খবর। কি করে বলবে এই কথা? এত দিন যে বলে এসেছে ওর বাবা মা আধুনিক মন মানসিকতার। বিয়েটা সহজেই মেনে নেবেন। কিন্তু না, ভাবনা এবং বাস্তবতার মধ্যে যে অনেক ফারাক এ কথা আদিল বুঝতে পারেনি। যত যাই হোক বাবা মাকে সে সুমাইয়ার কাছে ছোট করতে পারে না।
এদিকে ভোর বেলা আদিলকে না পেয়ে বাবা মা সব বুঝতে পারলেন, ছেলে তাদের ফাকি দিয়েছে। পরিচিত লোক মারফত খবর পাঠালেন বাবা সিরিয়াস অসুস্হ, মৃত্যুশয্যায় আছেন তাই তাকে শেষ বার দেখতে চান। আদিলের কি আর সেই ক্ষমতা আছে এমন সংবাদ অগ্রাহ্য করবে। খবরটা শুনে বুকের ভিতর একটা অপরাধ বোধ কাজ করতে পাগল। সুমাইয়ার কাছে বিদায় নিতে গেল। তারা তখনও জানতো না যে এটাই তাদের শেষ দেখা। আদিলের কাছ থেকে শেখা ভাঙা ভাঙা বাংলায় সুমাইয়া ওকে বলল "দেখ বাঙালী ছেলে আমাকে যেন ধোকা দিও না"। আদিল ওকে ধৈর্য্য ধরতে বলল এবং আবার ফিরে আসবে কথা দিয়ে নাটোর ফিরে এল।
বাড়ী ফিরে দেখে বাবা দিব্যি ভাল মানুষ। খুব রাগ হয় আদিলের। সে হুলুস্হুল বাধিয়ে বাড়ি মাথায় তোলে আর বলে এক্ষুনি বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে । বাবা মা কঠিন একটা কাজ করলেন, কৌশলে আদিলকে ঘরে বন্দী করে ফেললেন। দিন রাত এভাবেই বন্দী থাকে আদিল। ওর পাসপোর্ট জরুরী কাগজপত্র সব সরিয়ে ফেলা হয়েছে। শত কাকুতি মিনতিতেও কোন কাজ হল না। উল্টো তাকে প্রস্তাব দেয়া হল তাদের পছন্দ করা পাত্রীকে বিয়ে করলে তার মুক্তি মিলবে। অদ্ভুত যন্ত্রনায় আদিলের দিন কাটতে লাগল।
একদিকে বন্দিত্বের কষ্ট আরেক দিকে সুমাইয়ার কাছে ভন্ড প্রমানিত হবার কষ্ট। একটা খবরও দিতে পারছে না সুমাইয়াকে।
এভাবে কেটে গেল তিনটি মাস। মানুষ আর কতটা সহ্য করতে পারে। আদিল ভেবে পায় না তার বাবা মা এত শক্ত হলেন কি করে। তাদের এই রুপ সে আগে কখনও দেখেনি। তবে কি দূরত্ব মানুষের ভালবাসাও কমিয়ে দেয়?
ছেলের কষ্টে তারাও কষ্ট পাচ্ছেন ঠিকই। কিন্তু নিজেদের এই বলে স্বান্তনা দিয়েছিলেন, এই কষ্ট সাময়িক। এক সময় সব ঠিক হয়ে যাবে। ছেলে আজ বয়সের দোষে ভিন দেশের ভিন্ন ধর্মের মেয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে, এই মেয়ের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ,পারিবারিক শিক্ষা কিছুই তাদের সাথে মিলবে না। তখনই বাধবে সংঘাত। তাছাড়া ধনীর দুলালীরা একটু উচ্ছংখল ধরনের হয়, বিয়ের পরে ঐ উগ্র আচরন গুলো কি সে সইতে পারবে? চোখ থেকে রঙীন চশমাটা খুলে গেলে যে নিদারুন যন্ত্রনা সে পাবে তার চাইতে এই সাময়িক কষ্ট পাওয়া অনেক ভাল।
আরেকটা ব্যপারেও তারা কষ্ট পেলেন, কোথাকার কোন মেয়ের জন্য ছেলে আজ জন্মদাতা বাবা মা কেও ছেড়ে চলে যেতে চায়। ছেলের জন্য তাদের কি কোনই অবদান নাই। বাবা মা দীর্ঘ শ্বাস ফেলেন আর ভবেন, ছেলে কি করে পারল এতটা অকৃতজ্ঞ হতে। তবুও তারা ছেলের মঙ্গল কামনা করেন।
চলবে......
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই এপ্রিল, ২০১০ রাত ৯:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



