খোলা জানালায় চোখ পাতিয়ে
মেঘ ঢুকে যায় মেঘ ছেদিয়ে
অনেক ছোটবেলা থকেই আমি খুব ছন্দমুখর!মাথার মধ্যে ছন্দের ছটপটানি অনেক সহজেই উগ্রে দিতে পারতাম ছোটবেলার পড়া লেখার ডায়েরীর পাতায়।নিজেই মাঝে মাঝে অবাক হই,তখনো আমার স্কুল পরিধি আরম্ভ হয়নি,একদিন বিকেলে ধুমাই বৃষ্টি,হঠাৎ মাথার মধ্যে চারটা লাইন এসে কুতকুতি দিতে লাগলো।তখনো কবিতা কি জিনিস ,সেটা হৃদয়ঙ্গম করার বয়স হয়নি!লিখতেও পারি না ঠিকমত।কুতকুতি না মানে সীমাবদ্ধতার গ্লানি!মুখ তো আছে!মাকে ডেকে শুনাই দিলাম চার লাইন।প্রচন্ড আগ্রহ নিয়ে মায়ের মুখের দিকে চোখ আটকাই রাখছি,নিশ্চয়ই মা এখন খুশি হয়ে কিছু একটা বলে উঠবে,আমার মুখখানি তখন আলবাৎ শরদিন্দুনিভাননা!কিন্তু আমার মৌখিক ঔজ্জ্বলতার মুখে কালিমা মাখিয়ে আমার মা তখন এমন শব্দ করে হাসা শুরু করলো,সেটা দেখলে আমি নিশ্চিত সাকা চৌধুরী ও লজ্জা পেয়ে যেত! মার সেই শল্কময় হাসির অপমান ভুলতে না পেরে এই মর্মে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলাম,আর নয় পদ্য বিনিময়!
এই ঘটনার পর থেকে আমার লেখা যাবতীয় ছন্দাবলী আটকা পড়তো লালচে রঙের রূল টানা একটা ডায়েরীতে,যেখানে আমার স্কুলের পড়া লিখে রাখার বাধ্যকতা ছিল।মানুষ ডায়েরী লিখে জীবনী আটকে রাখার স্বার্থে,আমি কবিতা দিয়ে সময় আটকানো শুরু করলাম।দিনের শেষে একপাতা করে ডায়েরী লিখে মানুষের ব্যাক্তিগত ঘরাণার লেখালেখির হাতে খড়ি হয়,অথচ আমার জীবনে হাত দেয়া প্রথম ডায়েরী ভরে যেতে লাগলো পদ্য আর ছন্দে!প্রায় প্রতি রাতে নিয়ম করে একটা করে কবিতা লেখা হত,কতশত বিষয়,কত নির্নিমেষ ভাবনা!
সামনের বাসার তুলোর দোকানদার থেকে শুরু করে প্রিন্সেস ডায়না,কেউই বাদ যায়নি আমার ছন্দচর্চার বলির হাত থেকে!!
ডায়েরির পাতা ভরতে থাকে আর পাল্লা দিয়ে বাড়ে আমার আশংকা,পাছে কেউ পড়ে ফেলে।আর এই ভয়কে সামাল দিতেই সারাক্ষণ আমার ব্যাগের অনেক বইয়ের ভীড়ে হারিয়ে দিতাম লাল পদ্যের শব্দমালা।
তবুও শেষ রক্ষায় বরাবরের মতই আমি ব্যার্থ (বরাবর বলছি এ কারনে যে এখনো যখনই আমি কারো কাছে কিছু লুকাতে যাই,সাথে সাথে ধরা!) আমাদের বাসায় এক যুবক শ্রেণীর গৃহশিক্ষক ছিলেন।তিনি একদিন আমার সেই ডায়েরী আবিষ্কারকের ভূমিকা পালন করলেন।শুধু এটুক করে শান্ত থাকলেও মান বাচতো,কিন্তু তিনি থামলেন না,তিনি আমার লেখা রগরগে সব কবিতা বিশাল আয়োজন করে আমার সামনেই পড়া শুরু করলেন এবং আমার প্রিন্সেস ডায়েনা নিয়ে লিখা বিশেষ সংবেদনশীল কাব্যখানি জোর গলায় প্রথমে আমার সামনে,অতঃপর অন্তঃপুরে ধাবিত হয়ে আমার ভাই আর মাকে শুনিয়ে আসলেন।অতঃপর আমাদের বাসা আরেকবার শল্কময় গা জ্বালানো হাসিতে কেপে উঠলো,অপমানের ভাপে পুনরায় উষ্ণ হল আমার কর্ণযুগল,শক্ত হল শ্রোণীদেশ!সময় হল পুনঃপ্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ হবার।
ছুড়ে ফেললাম সেই লাল ডায়েরী,শপথ নিলাম আর কোনদিন কাব্যচর্চায় হাতে কলম ধরবো না।আমার ছন্দচর্চা আমার হাতেই শ্রথিত হল।
এরপর অনেক অনেক সময় গত হয়েছে জীবনে,অনেক উত্থান-পতন আর বোঝাপোড়ার ফাকে আবিষ্কার করলাম মানুষ হিসেবে আমার একাকীত্ত্ব আর দুর্বলতা।অসহায় সময়গুলোতে আজো তাই কলম তুলে নিতে চেষ্টা করি,হাতকে আদেশ দেই কিছু ছন্দ বোনার....শব্দ-ছন্দ।প্রতিবারই কলম তার না-মর্জির কথা পাষন্ডের মত জানিয়ে দেয়।আমি পদ্য জন্মানোর অক্ষমতায় ভুগি,কবি হতে পারি না,শব্দ নিয়ে খেলতে পারি না।আমি বেচে থাকি কাব্যহীন বাস্তবতায়,ছন্দস্বল্পতার অন্ধকারে।আমি পারিনি একজন কবির জীবন বেছে নিতে....
-----------------------
------------------------------
গতকাল ড্রয়ার পরিষ্কার করতে গিয়ে আশ্চর্যজনকভাবে আমি আমার সেই লাল ডায়েরীটা খুজে পেলাম।অবাক হয়ে আরেকবার উপভোগ করলাম আমার সেই ক্ষীণ-সময়ের কবিকাল!
-------------------
শব্দটীকাঃ
শরদিন্দুনিভাননাঃশরত্কালের চাঁদের মতো (উজ্জ্বল ও সুন্দর) মূখবিশিষ্ট।
শল্কীঃআঁশযুক্ত, শল্কময়।
শ্রথিতঃনিহত; বধ করা হয়েছে এমন।
আলোচিত ব্লগ
'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!
প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন
মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন
ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!
ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!
সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন
এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে
একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।
গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।