
রোমান পুরাণকথা অনুযায়ী প্রসেরপিনে (Proserpine) ছিলেন দেবতাদের রাজা জুপিটার (Jupiter) এবং সেরেস (Ceres) এর একমাত্র কন্যা। সেরেস ছিলেন কৃষি এবং ফসলের দেবী।
একদিন প্রসেরপিনে তাঁর সখীদের সাথে বাগানে ফুল তুলছিলেন। সেই সময় সেখান দিয়ে চারটি কালো ঘোড়া সংযোজিত রথে চড়ে যাচ্ছিলেন পাতালের দেবতা এবং নরকের রাজা প্লুটো (Pluto)। রথের গতি কমিয়ে তিনি ওদের সকলের দিকে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিলেন। প্রসেরপিনে’র মনোহারিণী রূপ প্লুটো’কে আকৃষ্ট করলো এবং চুড়ান্ত কামার্ত করে তুললো। তিনি প্রসেরপিনে’কে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন।
কিন্তু রাজি হলেন না প্রসেরপিনে, অনেক চেষ্টা করেও মন গলানো গেলো না তাঁর। এদিকে প্লুটোও ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছিলেন, তিনি আর ধৈর্য রাখতে পারলেন না। আচমকা দুই হাতে জাপটে তুলে নিলেন প্রসেরপিনে’কে, আর অতি দ্রুত তার রথে তুলে নিয়ে পাতলে প্রবেশ করলেন।
খবর পৌছুলো সেরেস’এর কাছে। কিন্তু তিনি যখন ঘটনাস্থলে পৌছুলেন তখন দেরি হয়ে গেছে। সারা পৃথিবী তিনি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও মেয়েকে পেলেন না। রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে তিনি পৃথিবীকে শুষ্ক করে দিলেন, সব ফসল নষ্ট করে দিলেন। পৃথিবী জুড়ে হাহাকার লেগে গেলো।
স্বর্গ থেকে সবই লক্ষ্য করছিলেন জুপিটার। প্লুটো যে তাঁরই ভাই। ঘটনা বেগতিক দেখে তিনি অবশেষে হস্তক্ষেপ করলেন এবং প্লুটোর সাথে একটা রফার মাধ্যমে সমস্যার তাত্ক্ষনিক সমাধান করলেন। স্থির হলো যে, বছরের অর্ধেক সময় প্রসেরপিনে প্লুটোর রানী হয়ে পাতালে থাকবেন আর বাকি অর্ধেক সময় তিনি তাঁর মায়ের কাছে অর্থাত্ সেরেস’এর কাছে থাকবেন।
সেরেস’এর অবশ্য এই প্রস্তাব মনঃপুত হলো না, কিন্তু অবস্থার গতিকে তিনি মেনে নিতে বাধ্য হলেন। বছরের যে সময়ে প্রসেরপিনে পাতালে থাকতেন, পৃথিবী সেই সময় বরফে ঢেকে থাকতো, কৃষিকাজ বন্ধ থাকতো, কোন ফসল ফলতো না। আর বসন্তের প্রারোম্ভে, যখন মেয়ে পৃথিবীতে উঠে আসতেন মায়ের কাছে, সেরেস তখন পৃথিবীকে ভরিয়ে দিতেন ফুলে ফলে ফসলে।
এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, গ্রীক পুরাণ অনুযায়ী প্রসেরপিনে হলেন পার্সিফোন (Persephone), জুপিটার হলেন জিউস (Zeus) , সেরেস হলেন দিমিতির (Demeter) এবং প্লুটো হলেন হেদেস (Hades)।
ভাস্কর্যের পেছনের কাহিনী সংক্ষেপে এমনই। ভাস্কর্যের
ইনসেটে ছবি যুক্ত শিল্পী ইতালির খ্যাতিমান ভাস্কর গিয়ান লোরেনজো বের্নিনি (১৫৯৮-১৬৮০)। তিনি এই শিল্পকর্মটি সৃষ্টি করেছিলেন ১৬২১ থেকে ১৬২২ সময়কালে এবং নাম দিয়েছেন "The Rape of Proserpine".
প্লুটো যেই মূহুর্তে প্রসেরপিনে’কে দুই হাতে জাপটে তুলে নিয়েছে তাঁকে অপহরণ করার উদ্দেশ্যে, ঠিক সেই মুহূর্তটিকেই এই ভাস্কর্যে মূর্ত করে তোলা হয়েছে। মূর্তিটি রাখা আছে ইতালির Galleria Borghese মিউজিয়ামে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে অসংখ্য পর্যটক আসেন আর মূর্তিটির চারদিকে ঘুরে ঘুরে দেখেন, এক খণ্ড মার্বেলের মধ্যে একজন শিল্পী কি অসাধারণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন পুরাণ কাহিনীর একটি মুহূর্তকে। প্লুটোর শরীরের প্রতিটি পেশি, মাথার চুল, দাড়ি, মুখমণ্ডলের ক্রূরতা আর নিদারুণ অসহায় প্রসেরপিনে’র সর্বশক্তি দিয়ে প্লুটোর বেষ্টনী থেকে মুক্তি পাবার ব্যাকুলতা, তাঁর বাঁ দিকের গালের কয়েক ফোঁটা অশ্রু, এইসব কিছুই যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে ওই পাথরের মূর্তিতে।
এইসব শিল্পকে বোঝবার মতো সামান্য জ্ঞানবুদ্ধিও এই অধমের নেই। আমি শুধু মুগ্ধ হই শিল্পীর দক্ষতা দেখে। আর একটা কথা এখানে বলার- পুরুষ আর নারী, নারীর দিকে পুরুষের লোলুপ দৃষ্টি, পেশিবহুল বর্ধিত হাত, নারী লুণ্ঠন, ভোগদখল, বিবাহ, সম্পত্তির উত্তরাধিকারের উদ্দেশ্যে সন্তান উতপাদন— এইসবই মানুষের সভ্যতার ইতিহাসের ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে আছে। আর তাই মানুষের সভ্যতার ইতিহাস এক অর্থে অ-সভ্যতার ইতিহাসও বটে।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৪ বিকাল ৩:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




