অসহায় মানুষের পাশে শতাধিক বছর........
আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম। দীর্ঘদিন ধরে সেবামূলক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত এ প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে সকলেরই বেশ পরিচিত। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের আজকের পরিরিচিতির পেছনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে বেওয়ারিশ/ দরিদ্র মানুষের লাশ বিনামূল্য দাফন কার্যক্রমের মাধ্যমে। এই কার্যক্রমের পাশাপাশি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস, মেডিক্যাল সার্ভিস, এতিমখানা ও স্কুল পরিচালনাও করে থাকে তারা।
আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম: আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম সেবার এক শতক পেরোনো এই উপমহাদেশের এক ব্যতিক্রমধর্মী জনকল্যাণমূলক সংস্থা। ১৯০৫ সালে কলকাতার "শেঠ ইব্রাহিম মোহাম্মদ ডুপ্লের" প্রচেষ্টায় এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। শেঠ ডুপ্লে ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক কাজের প্রতি ছিল তার আগ্রহ। সেখান থেকেই এই সেবা কার্যক্রমের যাত্রা শুরু হয়। ১৯০৫ সালে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বাংলাদেশের ঢাকা ছাড়াও মোট ৪২টি বিভাগীয় ও জেলা শহরে কার্যক্রম রয়েছে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর সে বছরই কলকাতার আঞ্জুমানের শাখা হিসেবে হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরী ঢাকায় এর কার্যক্রম শুরু করেন। এরপর ১৯৫০ সালে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের মাধ্যমে আঞ্জুমান পৃথক সত্তায় নিজেকে প্রতিষ্ঠার পথে এগুতে থাকে।
আঞ্জুমান মুফিদুলের বিভিন্ন কার্যক্রম: আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমগুলো হলো, বেওয়ারিশ লাশ দাফন, অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস, এতিমখানা পরিচালনা ও ভ্রাম্যমান মেডিক্যাল সার্ভিস।
বেওয়ারিশ লাশ দাফন: মূলত বেওয়ারিশ লাশ দাফন কার্যক্রমের মাধ্যমেই আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের পরিচিত। এই প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র ইনচার্জ মোহাম্মদ খায়রুল আমীন জানালেন, দুইভাবে বেওয়ারিশ লাশ এখানে দাফন করার জন্য নিয়ে আসা হয়। মেডিক্যালের মাধ্যমে এবং থানার মাধ্যমে। সাধারণত মেডিক্যাল থেকে যেসব বেওয়ারিশ লাশ এখানে নিয়ে আসা হয় সেগুলো কাটা-ছেঁড়া অবস্থায় থাকে বিধায় সেগুলো গোসল ও দাফন করা কিছুটা কষ্টকর। অন্যদিকে যে-কোন দুর্ঘটনায় যে লাশগুলো ২৪/৪৮ ঘন্টায় লাশের পরিচয় পাওয়া যায় না সেগুলো বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে আঞ্জুমান মুফিদুল দাফন করে থাকেন। বেওয়ারিশ লাশ ছাড়াও দরিদ্র মানুষের লাশও বিনামূল্যে দাফন করে থাকে এ সংস্থা। আজিমপুর কবরস্থান ও জুরাইন কবরস্থানে লাশ দাফন করা হয়। লাশের গোসল, কাফন পরানো এবং লাশ কবরস্থানে পৌঁছে দেয়ার সব কাজই করে থাকে আঞ্জুমান মুফিদুল।
অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস: দুঃসময়ের বাহন অ্যাম্বুলেন্স। মানুষের জীবনে কখন কিভাবে দুঃসময় বা দুর্ঘটনা ঘটে আগে থেকে কেউ বলতে পারে না। আর সেই সময় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস পেতে পারেন আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম সংস্থা থেকে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ২৪ ঘন্টা ফ্রি এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস দিয়ে থাকে আঞ্জুমান মুফিদুল। অবশ্য ঢাকা শহরের জন্য এই সার্ভিস বিনামূল্য হলেও ঢাকার বাইরে যদি এ্যাম্বুলেন্স সুবিধা পেতে চান সেইক্ষেত্রে এসি এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের জন্য এক হাজার থেকে দুই হাজার এবং নন এসি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের জন্য পাঁচশত থেকে পনেরশ' টাকা ডোনেশন দিতে হয়। পাশাপাশি তেল ও অন্যান্য খরচ সব আপনাকেই বহন করতে হবে। বর্তমানে এই সংস্থার মোট ২২ টি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। ঢাকার বাইরে কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর ও পাবনার ক্ষেত্রে নন এসি এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চার্জ হিসেবে ১ হাজার টাকা এবং এসি জন্য পনেরশ' টাকা ডোনেশন দিতে হয়। এছাড়া বাকি সব খরচ আপনাকেই বহন করতে হবে। অদ্যদিকে ঢাকার আশেপাশে যেমন নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরের জন্য এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের ক্ষেত্রে ৫০০ টাকা চার্জ দিতে হয়।
ভ্রাম্যমাণ মেডিক্যাল সার্ভিস: আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ভ্রাম্যমাণ মেডিক্যাল সার্ভিস। এই সার্ভিস প্রতি তিনমাস পর পর বিভিন্ন এলাকায় সম্পূর্ণ বিনামূল্য চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের এই মেডিক্যাল টিম ওষুধ বিতরণের পাশাপাশি বস্তি এলাকা অথবা আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে যেসব পরিবার তার সন্তানের সুন্নতে খাতনা করাতে পারছে না সেই কাজটিও মেডিক্যাল টিম সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করে থাকে। এছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে শহরে আসা মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়লে সেই ক্ষেত্রে তাদের সাথে যোগাযোগ করলে মেডিক্যাল টিম চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি ঘরে ফিরিয়ে দেয়ারও ব্যবস্থা করে দেয়। পাশাপাশি শিশুদের টিকা দান আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মেডিক্যাল টিম করে থাকে।
এতিমখানা পরিচালনা: আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে ৩টি এতিমখানা দীর্ঘদিন ধরে এতিমদের বিনামূল্যে খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা ও পড়াশোনার সুবিধা দিয়ে আসছে। পুরাতন ঢাকার গেণ্ডারিয়ায় ছেলেদের এতিমখানায় বর্তমানে ৫০০ জন এতিম রয়েছে। এছাড়াও নরসিংদীতে ছেলেদের একটি ও নারায়ণগঞ্জ মেয়েদের জন্য পৃথক এতিমখানা রয়েছে।
অন্যান্য কর্মকাণ্ড: আঞ্জুমান মুফিদুল উপরোক্ত কর্মকাণ্ড ছাড়াও অন্য অনেক সেবামূলক কর্মকাণ্ড করে থাকে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ঈদে দুঃস্থ মানুষের মাঝে নতুন কাপড় বিতরণ, বিভিন্ন দুর্যোগের সময় দুর্গত এলাকায় ত্রাণ কার্য পরিচালনা ও চিকিৎসা প্রদান। মেয়ের বিয়ের জন্য দায়গ্রস্ত পিতাকে সাহায্য করা। এছাড়াও শহরের বাসিন্দাদের জন্য লাশের গোসল, কাফন, পরিবহন ও দাফনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনার অভাব পূরণ করার উদ্দেশ্য "আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম" স্বল্প খরচে যাবতীয় কাজ করে থাকে।
আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের যে কোন সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে দিন-রাত যে কোন সময় সংস্থার কার্যালয় এস,কে দাস রোড, গেণ্ডারিয়া এবং কাকরাইল সেবা কেন্দ্রে ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে সেবাগ্রহণ করতে পারবেন সমাজের যে কোন শ্রেণীর মানুষ।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৪ বিকাল ৩:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


