একে একে নিভিছে দেউটি.......
আমার পিতৃ-মাতৃকূল এর প্রথম-দ্বিতীয় প্রজন্মের অর্থাৎ, দাদা-দাদী, মা-বাবা, চাচা-চাচী, ফুফা ফুফু এবং নানা-নানি, মামা-মামী, খালা-খালু কেউ বেঁচে নেই। মায়ের একজন চাচাতো ভাই খলিলুর রহমান(চান্দু) স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্য। যুদ্ধ শুরুর আগে ছুটিতে এসেছিলেন। যুদ্ধ শুরু হলে পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যাননি। দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য যোগ দেন মহান মুক্তি যুদ্ধে।
স্বাধীনতা যুদ্ধের ৯নং সেক্টরের সাব-সেক্টর হেডকোয়ার্টার বর্তমান বরগুনা জেলার বামনা থানাধীন বুকাবুনিয়ায়। সেখানেই অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে ছাত্র শিক্ষক, যুবকদের সংগঠিত করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন মামা খলিলুর রহমান। ক্যাপ্টেন মেহেদী আলী ইমাম (বীর বিক্রম), ক্যাপ্টেন শাজাহান ওমর (বীর উত্তম) দুজনেই ছিলেন অঞ্চল ভিত্তিক সাব-সেক্টর কমান্ডার।
সেকেন্ড ইন কমান্ডার আলমগীর হোসেনের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দলের সাথে খলিলুর রহমান সুন্দরবন এলাকায় লেঃ জিয়াউদ্দীন(লেঃ জিয়াউদ্দীন এবং খলিলুর রহমান একই এলাকার লোক এবং পূর্ব পরিচিত, ক্যাপ্টেন মেহেদী আলী ইমাম আগে থেকেই সেখানে অবস্থান করছিল) সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল এর সাথে দেখা করে- সাতক্ষীরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ইন্ডিয়া চলে যান। কিছুদিন পরেই চারটি নৌকা বোঝাই বিপুল পরিমাণ সমরাস্ত্র নিয়ে ফিরে আসেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সুবেদার বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মজিদ স্যার (ন্যশনাল ক্যাডেট কোর এর প্রশিক্ষক ছিলেন, সবাই তাকে ওস্তাদ বলতেন, আমি স্যার ডাকতাম), হাবিলদার মোবারক আলী মল্লিক এবং আরও কয়েকজন অস্র-গোলাবারুদের ইনভেন্ট্রি করেন। আমি এবং মালেক নামের একজন সেনা মুক্তিযোদ্ধা অস্র, গোলাবারুদের নাম, সংখ্যা দুটি রেজিস্ট্রার বইয়ে লিখে রাখার দায়িত্ব পালন করি।
কমান্ডারের নির্দেশে একবার অস্র বোঝাই দুটি নৌকা নিয়ে যাবে- পার্শ্ববর্তী থানা- রাজাপুর, বেতাগী, নেয়ামতি মুক্তি যোদ্ধাদের অস্র পৌঁছে দিতে.... এই অপারেশনে খলিলুর রহমান, ফজলু ভাই(স্থানীয় বাসিন্দা, বিএম কলেজে প্রথম বর্ষের ছাত্র), রুস্তম আলীর সাথে আমিও থাকবো- জানালেন স্বয়ং ক্যাপ্টেন মেহেদী আলী ইমাম। কয়েক দিন আগেই ফজলু ভাইর সাথে আমি উল্লেখিত এলাকা রেকি করে এসেছি। মুলত কয়েকটা রাজাকারের ক্যাম্প দেখে স্কেচ এবং আশপাশের বর্ননা লিখে নিয়ে ক্যাম্প কমান্ডারের কাছে দিয়েছিলাম।
আমাদের অপারেশন টাইম স্টেশনে ফিরে আসা পর্যন্ত সর্বোচ্চ পাঁচ দিনের। দুইটি নৌকায় চারজন করে সদস্য- তাদের মধ্যে একজন করে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য। আমাদের নৌকার মাঝি ২৫/২৬ বছর বয়সী শক্তসমর্থ রুস্তম আলী একজন প্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধা এবং স্থানীয় গাইড। পথে আমাদের পাক হানাদার বাহিনীর মোকাবিলা করার সম্ভাবনা নাই। তবে তিনটা থানা এলাকা পার হতে হবে- সেখানে থানা পুলিশ-রাজাকার এবং শান্তি কমিটির সদস্যদের মুখোমুখি হবার সম্ভাবনা আছে। রাজাকারদের হাতে থ্রি নট থ্রি রাইফেল থাকলেও তাদের মোকাবিলায় গোলাবারুদ ব্যবহার হয় না বললেই চলে। বেওনেট চার্জ সহ মল্লযুদ্ধেই ৭/৮ জনকে মামা আর রুস্তম আলী ধরাসায়ী করতে পারবে। ইতিপূর্বে রুস্তম আলী এভাবেই বেশ কয়েকজন রাজাকার পাকড়াও করেছে। নির্দেশনা মতো- ফজলু ভাই কোনো কোনো এলাকার নদী-খালের পাড় ধরে হেটে এগিয়ে যাবে। সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ যায়গায় আমি নৌকা চালাবো। মামা, ফজলু আর রুস্তম আলী নৌকা থেকে গড়িয়ে নৌকার আড়ালে থেকে নৌকা ধরে সন্তর্পণে সাতরে এগিয়ে যাবে.....ঝুঁকি এলাকা পার হয়ে আবার নৌকায় উঠবে... আমাদের থেকে যাদের কাছে অস্র হ্যান্ডওভার করা হবে তাদের নাম, শারীরিক চিনহ ছাড়াও তিন স্তরের কোড নম্বর আমাদের মুখস্থ।
আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছে গভীর রাতে। নৌকায় মাছ ধরার ছিপ নেওয়া হয়েছে- বিশেষ বিশেষ যায়গায় ছিপ ফেলে মাছ ধরার জন্য.....! খাবারের জন্য ক্যাম্প থেকে আটার রুটি, শুকনো চিড়া এবং পাটালীগুড় দেওয়া হয়েছে। আমাদের সামনে সব চাইতে বিপদজনক যায়গা- রাজারহাট, আমুয়া বাজারে রাজাকার ক্যাম্প, কাঠালিয়া, রাজাপুর থানা....। ৬'-২" উচ্চতার বিশালদেহী মামা খলিলুর রহমান নৌকার পাটাতনে অস্রের উপর শুয়ে আছেন- যাতে কেউ তাকে দেখতে না পায়। আমি নৌকার সামনে গলুইয়ে বসে কাছে দূরের নৌকা, ছোট লঞ্চ দেখে জানান দেই... ফজলু ভাই কখনও হেটে, কখনও নৌকায় চড়ে।
একই নিয়মে আনুমানিক দুইশো গজ দূরত্ব বজায় রেখে ২য় নৌকা আমাদের অনুসরণ করে এগিয়ে আসছে। বলা যায়- জনমানবহীন পৃথিবীতে আমাদের নৌকা আর আমরা চারটি প্রাণী ছাড়া কিছুই নাই। সকাল পেরিয়ে কাঠফাটা দুপুরে বিষখালী নদীর পাড় ঘেষে অতি সন্তর্পণে আমাদের নৌকা চলছে....
জাংগালিয়া নামক স্থানে পৌঁছুতেই দূরে লঞ্চের শব্দ শুনতে পাই এবং অনেক দূরে ছায়ার মতো একটা লঞ্চ দেখতে পাই....মামা বাইনোকুলার দিয়ে দেখেন- লঞ্চ ভর্তি পাক হানাদার আর এদেশীয় সহযোগী রাজাকার। মামার নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধা মাঝি রুস্তম আলী দ্রুত নৌকা নদীর পাড়ে হোগলা বনে ঢুকিয়ে দুজন ১৫/২০ ফিট দূরত্ব রেখে দুজন দুটি এলএমজি তাক করে বেরি বাঁধ এবং গাছের আড়ালে পজিশন নিয়ে বসেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে থাকা সব অস্র আমি চালাতে জানি। প্রচলিত অস্র অর্থাৎ Rifle, SLR, LMG, Rocket Lancer, Hand Grenade ইত্যাদি। আমার আর ফজলু ভাইয়ের হাতে SMC (Semi Machine Gun Carbine) মূলত ২৫/৩০ গজ দূরত্বের মধ্যে সামনা-সামনি যুদ্ধাস্ত্র। এক ম্যাগাজিনে ২৮/ ৩০ টা বুলেট লোড করা, কম রেঞ্জের গান হলেও এটা দিয়ে ব্রাস ফায়ার করা যায়, আবার সিংগেল ফায়ারও করা যায়। SMC নিয়ে নৌকা থেকে নেমে গাছের আড়ালে বসেছি। এক্সট্রা ফুল লোডেড ম্যাগাজিন গলায় ঝুলানো। দুইশো গজ দূরত্বে আমাদের অনুসরণকারী ২য় নৌকা থেকেও চারজন নেমে পজিশন নিয়ে আছে...
লঞ্চ আমাদের কাছাকাছি চলে এসেছে- আমরা জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। উত্তেজনায় আমার হার্টবিট বেড়ে গিয়েছে। আমি কানে শুনতে পাচ্ছি আমার হার্টবিট!
হোগলা বনের ফাঁক দিয়ে এখন সুস্পষ্ট ভাবে লঞ্চ দেখা যাচ্ছে। লঞ্চের সামনে-পেছনে হেভী মেশিনগান বসানো...লঞ্চের ছাদে দুইজন রাজাকার বাইনোকুলার দিয়ে চারিদিকে দেখছে। কয়েকজন সেনা সদস্য কিছুক্ষণ পর পর এমজি'র ট্যা-ট্যা-ট্যা ট্যা শব্দে ব্রাশ ফায়ার করে আতংক সৃষ্টি করছে- কিন্তু আমরা কেউই আতংকিত নই। আমাদের উপর নির্দেশনা ছিলো- স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগাযোগ না করে এবং নিতান্ত নিরুপায় না হলে, কিম্বা আক্রান্ত না হলে- প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অস্র ব্যবহার করা যাবে না। তবে Dispersed Command অবস্থায় পরিস্থিতি অনুযায়ী ট্রুপস কমান্ডারের ব্যাবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা থাকে। আগ্নেয়াস্ত্র ছাড়া সামনা-সামনি শত্রু আক্রমণ করলে Bayonet চার্জ করে কিম্বা শারীরিক শক্তিতে ধরাশায়ী করতে হবে। ১৪ বছরের কম বয়সী আমি অন্য তিনজনের চাইতে শারীরিক ভাবে কিছুটা দুর্বল। তবে খালি হাতে কিভাবে আমার থেকে দ্বিগুণ শক্তিশালী মানুষকে কয়েক সেকেন্ডে ঘায়েল করতে হয়, বেওনেট চার্জ কিভাবে করতে হয়- সেই টেকনিক/ ট্রেনিং আমার আছে- যা রাজাকারদের নাই।
....লঞ্চ আসছে.... আমি মনে প্রাণে চাই, আল্লাহর কাছে চাই, ওরা লঞ্চ ভিড়িয়ে নেমে পড়ুক লুটপাট করার জন্য....তাহলেই মামা আর রুস্তম আলী লঞ্চে এলএমজি ফায়ার করে লঞ্চ ডুবিয়ে দিবে। রাস্তার দুই পাস থেকে ৭/৮ গজ দূরত্বে আমি আর ফজলু ভাই লঞ্চ থেকে নেমে আসা সেনাদের কাছ থেকে ফায়ার করবো... আমি উত্তেজনায় টানটান....গান ফায়ার লক ওপেন করে ট্রিগারে আংগুল স্পর্শ করে আছি- শত্রুদের এক সেকেন্ডও সুযোগ দেওয়া যাবে না। আজই, কিছুক্ষণের মধ্যেই 'জয় বাংলা', 'ইয়া আলী' বলে আমার স্বপ্ন পূরণ হবে....
কিন্তু লঞ্চের দুইশো মিটার দূরত্বে আরও একটা লঞ্চ দেখা যাচ্ছে....প্রথম লঞ্চটা আমাদের এলএমজি ফায়ার রেঞ্জে থাকলেও কৌশলগত কারণে আক্রমণ করার সুযোগ ছিলো না। যেহেতু পাক হানাদার বাহিনীর প্রথম লঞ্চের পেছনে কাভার দেওয়ার জন্য আরও একটা অস্রস্বজ্জিত লঞ্চ আছে, তার উপর ওদের হেভী মেশিনগান আছে, প্রশিক্ষিত পাক সেনাবাহিনী আছে। আমাদের চারজনের মধ্যে মামাই প্রশিক্ষিত পেশাদার সেনা সদস্য। রুস্তম আলী কয়েক মাস যাবত গ্রেনেড চার্জ, রাইফেল, এলএমজি ফায়ার করার প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং কয়েকজন রাজাকার ধরেও এনে জবাই করে মেরেছে, কিন্তু শত্রুর সাথে মুখোমুখি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা হয়নি। তবে আমাদের পেশাদার মিলিটারী ট্রেনিং না থাকলেও বুকভরা দুঃসাহস আছে। সামনের লঞ্চটি সোজা দক্ষিণ দিকে চলে গিয়েছে। দ্বিতীয় লঞ্চটি প্রথম লঞ্চটিকে অনুসরণ করে চলে গিয়েছে।
আমরা প্রথমে রাজাপুর এলাকার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের কাছে তাদের জন্য বরাদ্দ অস্র হস্তান্তর করে এগিয়ে যাই বেতাগী/কাঠালিয়া থানার শৌজালিয়া এলাকায়। সেখানে একটা নৌকায় মাঝি সহ দুইজন মুক্তিযোদ্ধা অস্র গ্রহণ করেন। সন্ধ্যা নাগাদ আমরা নেয়ামতি পৌঁছি। ওটাই আমাদের লাস্ট স্টেশন। নেয়ামতির কাছেই একটা জায়গার নাম চামটা নেয়ামতি। ওখানে একটা জলথানা (৩টা বার্জের উপর নৌ-পুলিশ থানা। জলের উপর ভাসমান থানা, তাই জল থানা নাম) তিনটা বার্জে ৬০ জন পুলিশ এবং রাজাকার আছে। ওদের বিরুদ্ধে অভিযোগ- ওরা নদীতে চলাচল নৌযান থেকে ব্যবসায়ীদের মালামাল, টাকা পয়সা কেড়ে নেয়। গ্রামের যেয়ে মানুষের গরু ছাগল, চাল ডাল লুটে নেওয়ায় পাশাপাশি তরুণ যুবকদের ধরে পাকিদের হাতে তুলে দেয় এবং যুবক বয়সীদের মেরে ফেলে, নারী নির্যাতন করে। জল থানা আক্রমণ করে ওদের মেরে অস্র লুট করার পরিকল্পনার অংশ হিসাবে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে অস্র পৌঁছে দেওয়া।
★খলিলুর রহমান স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ফিরে যান এবং সুবেদার মেজর হিসাবে অবসরে যান। আমার সেই মামা ২৯ মার্চ ৮২ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
★(আমার লেখা মুক্তিযুদ্ধের টুকরো স্মৃতি বইয়ের ১৪ তম চ্যাপ্টারের সাথে যোগ করেছি)
ছবি / ভিডিও এড করার অপশন না আসায় ছবি যুক্ত করতে পারলাম না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



