বাংলাদেশ সচিবালয় স্থানান্তর....
বর্তমান সচিবালয়ের আয়তনঃ ঢাকার আবদুল গনি রোড- সেগুনবাগিচায় অবস্থিত বর্তমান বাংলাদেশ সচিবালয় প্রায় ৩২ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হলেও সেখানে মাত্র ১৭ লাখ বর্গফুট যায়গায় অপরিকল্পিত ভবন নির্মিত আছে।
আগারগাঁওয়ের প্রস্তাবিত স্থান ও জমির পরিমাণঃ শের ই বাংলা নগর/ আগারগাঁওয়ের পুরোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মাঠে নতুন সচিবালয় কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে। এই প্রস্তাবিত সচিবালয়টি প্রায় ৩১.৫০ একর জমির ওপর নির্মাণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সচিবালয় আগারগাঁওয়ে স্থানান্তরঃ
ঢাকার প্রাণকেন্দ্র পল্টন-সেগুনবাগিচা থেকে বাংলাদেশ সচিবালয়কে আগারগাঁওয়ের পুরোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মাঠে স্থানান্তরের সিদ্ধান্তটি কেবল একটি প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস নয়, বরং স্থবির হয়ে পড়া মেগাসিটি ঢাকাকে সচল করার একটি দূরদর্শী মহাপরিকল্পনা। প্রায় ৩২ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা বর্তমান সচিবালয়টি দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দেশের প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করলেও সময়ের প্রয়োজনে এবং রাজধানীর নগরায়ণ কাঠামোর পরিবর্তনের কারণে এটা এখন নানাবিধ সংকটে জর্জরিত। এই প্রেক্ষাপটে আগারগাঁওয়ের ৩১ একর জমিতে নতুন আধুনিক সচিবালয় কমপ্লেক্স নির্মাণের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত ও বহুমাত্রিক উপযোগিতাসম্পন্ন। এই সিদ্ধান্তের প্রধান উপযোগিতা ও গুরুত্বসমূহঃ
(১) যানজট নিরসন ও বিকেন্দ্রীকরণঃ
বর্তমান সচিবালয়টি গুলিস্তান, পল্টন, মতিঝিল এবং জিরো পয়েন্টের মতো ঢাকার সবচেয়ে ব্যস্ততম ও তীব্র যানজটপ্রবণ এলাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত। সচিবালয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং সেবাপ্রার্থী ভিআইপিদের যাতায়াতের কারণে পুরো ডাউনটাউন ঢাকা স্থবির হয়ে পড়ে। প্রশাসনিক এই মূল কেন্দ্রটিকে আগারগাঁওয়ে সরিয়ে নিলে শেরেবাংলা নগর ও আগারগাঁও এলাকায় ট্রাফিক চাপ সুষমভাবে বণ্টিত হবে, যা ঢাকার মধ্যাঞ্চলের যানজট উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে।
(২) আধুনিক যোগাযোগ অবকাঠামো ও মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের সর্বোচ্চ ব্যবহারঃ
আগারগাঁও এলাকাটি বর্তমানে ঢাকার অন্যতম সুপরিকল্পিত এবং আধুনিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত। বিশেষ করে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (DMTCL) পরিচালিত উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেল লাইনের (MRT Line-6) একটি অন্যতম প্রধান স্টেশন হলো আগারগাঁও। সচিবালয় এখানে স্থানান্তরিত হলে কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাধারণ নাগরিকরা দ্রুত, সাশ্রয়ী এবং যানজটমুক্ত উপায়ে মেট্রোরেল ব্যবহার করে যাতায়াত করতে পারবেন। এটা গণপরিবহন ব্যবহারের সংস্কৃতিকে যেমন উৎসাহিত করবে, তেমনি ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমাবে।
(৩) প্রশাসনিক সমন্বয় ও ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ জোন’ গঠনঃ
আগারগাঁও ও শেরেবাংলা নগর এলাকাটি আগে থেকেই বাংলাদেশের একটি প্রধান প্রশাসনিক হাব হিসেবে গড়ে উঠেছে। এখানে নির্বাচন কমিশন, পরিকল্পনা কমিশন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, পাসপোর্ট অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED), আবহাওয়া অধিদপ্তরসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় অবস্থিত। এই এলাকায় নতুন সচিবালয় নির্মিত হলে প্রায় সব প্রধান সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব কমে আসবে। যার ফলে আন্তঃমন্ত্রণালয় যোগাযোগ, নথিপত্র আদান-প্রদান এবং প্রশাসনিক সমন্বয় অনেক সহজ ও গতিশীল হবে।
(৪) আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও ‘গ্রিন সচিবালয়’ নির্মাণঃ
বর্তমান সচিবালয়ের ভবনগুলো বিশেষ করে ১৯৬০ সালে নির্মিত কয়েকটি ভবন দীর্ঘদিনের পুরোনো, অপরিকল্পিত এবং বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অনেক ভবনে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস বা আধুনিক অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। আগারগাঁওয়ের ৩১.৫৪ একর খালি জায়গায় সম্পূর্ণ নতুনভাবে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা (Master Plan) অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মানের বহুতল কমপ্লেক্স গড়ে তোলা হবে। এখানে ১৪ টি ১২ তলা ভবন, তিনটি বেজমেন্ট পার্কিং স্পেসে ৩৮০০ টি গাড়ি পার্কিং সুবিধা সহ এটা হবে একটি ‘স্মার্ট’ এবং পরিবেশবান্ধব (Green Building) কমপ্লেক্স, যেখানে অত্যাধুনিক আইটি অবকাঠামো, কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত পার্কিং এবং সবুজ চত্বর থাকবে।
(৫) সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তি লাঘব হবেঃ
বর্তমান সচিবালয়ে সাধারণ নাগরিকদের প্রবেশাধিকার অত্যন্ত সীমিত এবং কঠোর পাস নিয়ন্ত্রিত। জায়গা সংকুলানের অভাব এবং পুরোনো কাঠামোর কারণে সাধারণ মানুষ সঠিক দিকনির্দেশনা ও সেবা পেতে ভোগান্তির শিকার হন। নতুন পরিকল্পিত সচিবালয় কমপ্লেক্সে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার, আধুনিক ওয়েটিং লাউঞ্জ এবং ডিজিটাল বুথ স্থাপন করা সহজ হবে, যা সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের জন্য সরকারি সেবাপ্রাপ্তি অনেক বেশি সহজ ও জনবান্ধব করে তুলবে।
উপসংহারঃ
একটি আধুনিক রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কেন্দ্রকে অবশ্যই দূরদর্শী ও ভবিষ্যৎমুখী হতে হয়। ঢাকার বর্তমান জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক বাস্তবতায় বর্তমান সচিবালয়ের ধারণক্ষমতা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। তাই আগারগাঁওয়ের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে নতুন সচিবালয় কমপ্লেক্স স্থানান্তরের এই সিদ্ধান্তটি ঢাকার বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা, প্রশাসনিক কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক ও ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে একটি অত্যন্ত কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


