বাইরে ঝমঝম বৃস্টির মাঝে বাবা-ছেলের দাবা খেলা খুবই জমে উঠেছে। মা ফায়ার প্লেসের সামনে মোড়ায় বসে উল বুনে যাচ্ছেন আর ফাকে ফাকে ভারী চশমার উপর দিয়ে ছেলে আর বাবার দাবার যুদ্ধু উপভোগ করছেন। বাইরের অবস্হা অনেকটা ভিজা কালো চাদরে ঢাকা শুন্যতা। "আজ বোধহয় ও আর আসবেই না" মি: হোয়াইট রাগত স্বরে বলে উঠল। "এই এলাকাতে আর থাকা যাবে না। একটু বৃস্টিতেই কাদা-পানি, কারোই আসার জো নাই ।" মা অবশ্যই বুঝতে পারছেন স্বামীর মনের অবস্হা। ছেলের চেক-মেটের কাছে পরাজিত.. এদিকে সার্জেন্ট-মেজর মরিসের আসার নাম গন্ধও নাই। মা সান্তনা দিতে বলে উঠলেন " চিন্তা কর না.. পরের বার তুমিই জিতবে।"
ছেলে সকালে কারখানার কাজে যেতে হবে বলে উঠে দাড়াল। হঠাৎ দরজার কড়া নাড়ার শব্দে মি: হোয়াইটের দন্ত বিকশিত হাসি দেখে মা শান্ত পায়ে দরজা খুলে মি: মরিস কে নিয়ে ঘরের মাঝখানে নিয়ে এলেন। মি: মরিস আর মি: হোয়াইট একত্রে বসে ওয়াইন পান করার সময় দুনিয়া তাদের কাছে নাই হয়ে যায়। তৃতীয় পেগ পেঠে পড়ার পরই মি: মরিসের চোখ উজ্জল থেকে উজ্জলতর হয়ে কথা বলার জন্য গল্পের ঝাপি খুলতে আরম্ভ করলেন। "বুঝলেন মিসেস হোয়াইট .. পাক্কা ২১ বছর ধরে পুরো ভারত চষে বেড়িয়েছি। " আমাদের রানীর একজন সুযোগ্য প্রজা হিসাবে বৃটিশ বাহিনীতে থেকে অনেক মজার অভিজ্ঞতা নিয়েই আবার লন্ডনে ফিরে এলাম।" একদিন আমিও যাব ইন্ডিয়াকে দেখতে। শুনেছি নাকি একটা মিস্টেরিয়াস প্লেস" মি: হোয়াইটের বলা শেষ আগেই মি: মরিস বলে উঠলেন," যেখানে আছ ভালই আছ।" কিন্তু মি: মরিস এর কাছে আগের বারে শুনা মিস্টিক ফকির সাই, ধর্মশালার কথা আবার শুনার জন্য মি: হোয়াইট সেই কথা টা আবার তুললেন........তুমি না একবার বলেছিলে কি যেন একটা যাদুর কথা ... ঐ যে একটা বানরের তালু ??? "ও কিছু না" মরিস ক্ষীন ভাবে চেস্টা করল যাতে বানরের তালুর কথা আবার না উঠে। কিন্তু হোয়াইট আজ নাছোর বান্ধা... আজ সে পন করেছে যে এটা তাকে শুনতেই হবে।
বানরের তালু?? মিসেস হোয়াইট ও শুনার জন্য নিজের মোড়া টাকে আরো কাছে টেনে নিলেন। "ওয়েল, এটা বানর থেকে কাটা শুকনো একটা পায়ের তালু" বলতে বলতে নিজের পকেট হাতরিয়ে তালু টাকে টেবিলের উপর রাখলেন। "এই তালুর একটা ম্যাজিকাল পাওয়ার আছে" মরিসের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে চোখ বড় করে মি: হোয়াইট বলে উঠলেন.। "আরে বলই না কি এমন যাদু আছে এমন শুকনা পায়ের তালুতে"। মরিস বলা আরম্ভ করল "এক ফকির বাবা এই তালুর উপর যাদু-টোনা করেছেন। খুবই জ্ঞানী আর হোলি পার্সন ...উনি দেখাতে চেয়েছেন যে ভাগ্য মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রন করে। আর যারা ভাগ্যের উপর বাধার সৃস্টি করে, তাদের জীবনে নেমে আসে দুঃখের জোয়ার।" "উনার মতে তিনজন ভিন্ন ভিন্ন লোক এই তালুর সাহায্যে তাদের তিনটা ইচ্ছা কে পূর্ন করতে পারবে"
"কারো কি নিজের ইচ্ছে এই তালুর দ্বারা পূর্ন হয়েছে?", অস্হির হয়ে জিজ্ঞেস করলেন মিসেস হোয়াইট।
"হ্যা, প্রথম জনের তিনটে ইচ্ছেই পূর্ন হয়েছে, প্রথম দুটো ইচ্ছা কি ছিল জানি না কিন্তু তৃতীয় ইচ্ছে টি ছিল নিজের মৃত্য কামনা... আর তার মৃত্যর জন্যই এই তালু আমি পাই।" বললেন মরিস
" আপনার তো তিনটে ইচ্ছেই পূর্ন হয়েছে" বলে উঠলেন মিসেস হোয়াইট
" এখন তো এটা আর তোমার দরকার নাই মরিস" মি: হোয়াইট বলে উঠলেন
" তা ঠিক, একবার ভাবি যে এটাকে বিক্রি করব, আবার ভাবি যে এটা আমাকে এমন বিপদে ফেলেছিল যে যেটা জানার পর কেউই এটা কিনতে চাইবে না " কথা বলতে বলতে মরিস বিবর্ন তালু টাকে হঠাৎ ফায়ার প্লেসের আগুনে ছুড়ে মারল। কিন্তু মি: হোয়াইটের ছেলে হারবার্ট লাফ দিয়ে আসন থেকে উঠে গিয়ে তালু টাকে আগুন থেকে তুলে আনল
" না না তুলো না এটা অপয়া... এটাকে শেষ করে দাও .. আর যদি তুমি রাখতে চাও আমাকে দোষারূপ করতে পারবে না এর ফলাফলের জন্য। একজন সেনসিবল মানুষের মত একে জ্বলে পুড়ে শেষ হতে দাও".. অনেকটা হতাশার সাথে ক্ষোভ রাগ মিশিয়ে মরিস মাথা দোলাতে লাগলেন।
বানরের তালুর তৃতীয় মালিক মি: হোয়াইট খুব আগ্রহ ভরে জানতে চাইল কিভাবে উইশ করতে হয় তালুর কাছে
মরিস বলল " ডান হাতে এটাকে নিয়ে উচু স্বরে উইশ করলে ই হবে। কিন্তু আমি তোমাকে আবারো ও সাবধান করছি... বার বার চিন্তা কর তুমি কি উইশ করবে? বে কেয়ারফুল হোয়াট য়ু উইশ ফর? আই ওয়ার্ন ইয়ু অফ দ্যা কনসিকয়েন্সেস।"
মিসেস হোয়াইট বলেন উঠলেন" আরব্য রজনীর মত লাগছে" বলতে বলতে উনি উঠে দাড়ালেন রাতের খাওয়ার ব্যবস্হা করতে। " তুমি কি একটা উইশ করবে যাতে আমার চারটা হাত হয় তাতে আমি তাড়াতাড়ী সংসারের কাজকর্ম করতে পারব???" ঠাট্টার চ্ছলে উনি বলে উঠলেন।
খাওয়া শেষে মরিস লাস্ট ট্রেন ধরার জন্য ঘরের বাইরে যাবার আগেও বলে উঠলেন এটা কে ফেলে দাও..... এটা অভিশপ্ত....কিন্তু মি: হোয়াইট কথা টা কানে ই নিলেন না।
মা-বাবা আর ছেলে ঘরের মধ্যে পায়চারী করার মাঝেই নিজেরা শলা-পরামর্শ করতে লাগল কোন উইশ টা করা যায়। রাজা- উজির হওয়া, বড় লোক হওয়া, বিখ্যাত হওয়া..এমন অনেক কিছুর মাঝে ছেলে বলে উঠল প্রথম উইশটা মডারেট হওয়া ভাল ....... ২০০ পাউন্ড হলে সংসারের অনেক বিল আছে যা দেওয়া যাবে।
" আই উইশ ফর ২০০ পাউন্ড" বাবা বানরের তালুটাকে হাতে নিয়ে বলে উঠলেন। ওহ মাই গড .. চিৎকার করে উঠলেন বাবা.... এটা নড়ছে আমার হাতের মাঝে .... সাপের মত পেচিয়ে এটা আমার হাত থেকে পড়ে গেল!!!!! কাপতে কাপতে বলে উঠলেন বাবা
মা বলে উঠলেন এটা তোমার মনের চিন্তা.. আমি তো দেখিনি এটা নড়ছে???
কি জানি মনে হল এটা নড়ছে...স্বর্গোক্তি করে উঠলেন মি: হোয়াইট।
রাত গভীর হতে আরম্ভ করলে বাবা ঘুমানোর জন্য বেডরুমের দিকে পা দিলেন....
ছেলে হার্বাট বলে উঠল " কাল সকালে তুমি মনে হয় তোমার বেডে ক্যাশ পাউন্ডগুলি পাবে কিন্তু সামথিং হরিবল ওয়ারড্রবের উপর থেকে তোমাকে গিলে গিলে দেখতে থাকবে যে কিভাবে তুমি তোমার অবৈধ ভাবে আয় করা পাউন্ড গুলিকে পকেটে রাখ।" কিন্তু বাবা কথাটা কে তেমন আমলে নিলেন না
বাবা আরো কিছুক্ষন বসে থাকলেন আর ফায়ারপ্লেসের আগুনের দিকে তাকিয়ে মনে হয় দেখতে পারলেন বানরের মত একটা ফেইস উনার দিকে এক দৃস্টিতে তাকিয়ে আছে আর উনাকে দোষারূপ করছেন তার হারানো পায়ের তালুর জন্য। উনি একটু ভয় পেয়ে আশেপাশে পানি খুজতে লাগলেন আগুনে ছুড়ে মারার জন্য... একটু ভয় আর ক্লান্ত পায়ে উনি বেডরুমের দিকে হাটা শুরু করলেন
পরদিন ভোরবেলা.. বাইরে ঝকঝকে রোদ....। ছেলে হার্বাট ফ্যাক্টরির কাজে বেরিয়ে যাওয়ার আগে হাসতে হাসতে বলে উঠল " আমি ফিরে আসার আগে পাউন্ডে হাত দিবে না.. কেমন" কিন্তু পাউন্ডের কোন নাম গন্ধ নাই.... মি: হোয়াইট সন্দেহ করতে আরম্ভ করলেন যে আসলেই এই তালুটার কোন ম্যাজিক্যাল পাওয়ার আছে। মিসেস হোয়াইট বললেন" মনে হয় পোস্টম্যান পাউন্ডগুলি কে নিয়ে আসবে।" দুপুর গড়িয়ে সূর্যটা একটু হেলে পড়তেই জানালার ফাক দিয়ে পোস্টম্যান কে দেখা গেল জড় পায়ে মি: হোয়াইট এর দরজার দিকে এগিয়ে আসতে। মিসেস হোয়াইট উত্তেজিতভাবে তাড়াহুড়া করে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।
কিছুক্ষন পরে হতাশার সাথে একটা খাম নিয়ে ফিরে এলেন ......বিদ্যুতের বিল.......
বিকেল দিকে দেখা গেল একজন কেতা দুরুস্ত পোশাক পড়া ভদ্রলোক বাড়ীর বাহিরে উকিঝুকি মারছে। মিসেস হোয়াইট দরজা খুলে উনাকে ভিতরে নিয়ে আসলেন। অপরিচিত ভদ্রলোকটা কিছু টা অস্বস্হিতে ভুগছেন মনে হল। কিছু বলার চেস্টা করছেন.... আ... আ... আমি এসেছি ম এন্ড মেগিংস কোম্পানী থেকে" একথা শুনার সাথে মি এবং মিসেস হোয়াইট আতংকে নীল হয়ে উঠলেন..হার্বাট ম এন্ড মেগিংস এর ফ্যাক্টরিতে হার্বাট কাজ করে..... "কি হয়েছে আমার হার্বাটের... কি হয়েছে" চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলেন মিসেস হোয়াইট.......।
"আমরা অনেক চেস্টা করেছি বাচানোর জন্য কিন্তু হার্বাটের পুরা শরীরটাই কলের মধ্যে আটকিয়ে গিয়েছিল" আমরা খুবই দুঃখিত তোমাদের লসের জন্য। কিন্তু আমাদের কোম্পানী কোন দায় নিবে না যেহেতু আমাদের কলের কোন ত্রুটি ছিল না" তারপর ও...., বলতে বলতে পকেট থেকে একটা খাম বের করে টেবিলে রাখল, "এখানে ২০০ পাউন্ড আছে যেটা আমাদের কোম্পানী ক্ষতিপূরুন হিসাবে দান করল।
ছেলেকে 'কবর' দিয়ে মি: হোয়াইট ভারী মন নিয়ে বাড়ী ফিরলেন.......মায়ের কান্নায় আশ-পাশ সব ভারী হয়ে আছে.....। রাত নেমে সকাল হল কিন্তু মায়ের কান্না আর থামে না ... এভাবে ই দিন যায় রাত আসে হোয়াইট পরিবার কোনভাবে ধুকধুক করে বেচে থাকার অভিনয় করে যাচ্ছিল ........ দশ দিন পর হঠাৎ মা কান্না থামিয়ে খুব অস্হির ভাবে বানরের তালু টাকে খুজতে আরম্ভ করলেন। পুত্রের শোকে বাবা ভুলেই গিয়েছিলেন তালুর কথা।
মা উত্তেজিত হয়ে মনে করিয়ে দিলেন যে আরো দুইটা উইশ বাকী আছে। "প্লিজ তুমি হার্বাটকে ফিরিয়ে আন... এক্ষুনি এক্ষুনি...."
"তুমি কি পাগল হয়ে গেলে?" বলে উঠলেন বাবা। "ওর শরীর টা এমন ভাবে মেশিনে আটকিয়ে ছিল ওকে আর চিনা যাচ্ছিল না.....। আর এই দশদিনে ওর শরীর পচে গলে গিয়েছে..."
"তুমি কি বলছ এটা??? ও তো আমাদেরই সন্তান। যত বিভৎসই ওকে দেখাক, তুমি আবার উইশ কর ওকে ফিরিয়ে আনার জন্য"
স্ত্রীর পীড়াপিড়িতে তালুটাকে তিনি ডান হাতে তুলে বলে উঠলেন "আই উইশ মাই সান এলাইভ এগেইন।"
বাবা চেয়ারে নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলেন .. মা অস্হির হয়ে জানালার কাছে বার বার ছুটাছুটি করছেন ..... সন্ধ্যা হয়ে এল কিন্তু কেউই ঘরে আলো জ্বালানোর কথা মনে করলেন না। ঘরের ঘড়ি টা টিক টিক করে নিজেকে জানান দিচ্ছে
"কিসের শব্দ??? কিসের শব্দ???" মা পড়িমড়ি কে বিছানা থেকে নামতে নামতে বলে উঠলেন... "কিছু না বোধ হয় কোন ইদুর হবে" বাবা মাকে থামাতে চেস্টা করলেন। "তোমার অবচেতন মন তোমাকে কন্ট্রোল করছে"
"না .. না.. এটা আমার হার্বাট.. আমার হার্বাট ফিরে এসেছে.. আমার হার্বাট ফিরে এসেছে বলতে বলতে মা দরজার দিকে দৌড়াতে লাগলেন....... "আমি আসছি হার্বাট ... আমি আসছি হার্বাট"... "কোথায় তুমি প্লিজ নীচে নেমে আস আমি দরজা টা খুলতে পারছি না আমি ছিটকিনির নাগাল পাচ্ছি না" অস্হির ভাবে মা চিৎকার করে বাবা কে ডাকছেন..... কিন্তু বাবা অন্ধকারের মাঝে ব্যতিব্যস্ত ভাবে বিছানা আর তার আশ পাশ হাতড়িয়ে বেড়াতে লাগলেন তালুর খোজে। দরজার কড়া নাড়ার শব্দ টা প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে মা ফ্র্যান্টিক্যালি ছুটাছুটি করছেন উচু চেয়ার টাকে দরজার কাছে নেওয়ার জন্য আর চিৎকার করছেন "আমি আসছি বাবা হার্বাট.... আমি আসছি বাবা হার্বাট....।"
বাবা যেই হাতের কাছে বানরের তালুটা কে পেলেন তখনই শব্দ শুনলেন মার ছিটকানি খোলার শব্দ। বাবা ভয়ে সিটকিয়ে গেলেন যে বিভৎস চেহারার হার্বাট দেখার ছবি কিন্তু তখন তিনি তার সমস্ত শক্তি কে এক করে তালু টা কে ডান হাতে তুলে তার শেষ উইশ টা কে বড় এবং পরিস্কার গলায় বলে উঠলেন।
নীচে মা এক ঝটকায় দরজা খুলে ফেললেন ..এক ঝাক শীতল বাতাস মাকে ছুয়ে গেল.... মা দৌড়ে সামনের গেট পর্যন্ত্য গেলেন দুহাত কে সামনে নিয়ে যেন এখনই হার্বাটকে জড়িয়ে ধরবেন......
দুর থেকে মনে হচ্ছে স্টিট লাইটের ফ্লিকারিং লাইট টা শান্ত এবং ডেজার্টেড রোড টাকে তার মোলায়েম আলোতে আরেকটু উজ্জল করে তুললো।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ সকাল ১০:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





