বেশ কাপুনি ধরে গেল, ওফ কি অসহ্য অসময়ী বৃষ্টি রে বাবা! ক'দিন আগে ডান পায়ে হাল্কা চোট পেয়ে অস্ততিতে আছি তারওপরে এই বেকায়দা বৃষ্টি! হাটতে চরম অসুবিধে হচ্ছে। সন্ধ্যার পর এমন অলুক্ষনে বৃষ্টি কিছুতেই মানতে পারছি না, আর আপিস ছুটির পর বাড়ি ফেরার জন্য একটিও রিকশা, গাড়ি না পাওয়াতে নিজের ভিতরে ক্ষোভটা আরও বেড়ে গেল।
নেই, রাস্তার এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলাম কেউ নেই । কাক ভেজা হয়ে একটা রিকশা চালক আসতেছে দেখে ভেতরে ভেতরে খুব খুশি হলাম, কিন্তু নাকের ডগার পাশ দিয়ে যখন ক্রিং ক্রিং বেশ বাজিয়ে টুক করে চলে গেল তখন হা করে চেয়ে থাকলম রিকশাটির চলে যাওয়া পথের দিকে। রিকশাকে থামাতে ইশারা করতে গিয়ে বেশ খানিকটা ভিজে গেলাম। হুম, তাতেও কিছু যায় আসে না যদি রিকশা পেতাম , কিন্তু ভেজায় সার হল।
ছোট্ট একটা দৌড় দিয়ে একটা বিল্ডিংয়ের দেয়াল ঘেষে দাড়ালাম বৃষ্টির ভয়ে, তবু বাতাসের ঝাপটায় পায়ের নিচের দিকটা ভিজে গেল। অস্থির হয়ে কোন লাভ নেই জেনে শান্ত থেকে আরও কিছুটা দেয়ালের সাথে লেপ্টে থাকতে চেষ্টা করলাম। বেশ শীত লাগছে, শীত লাগায় স্বাভাবিক কারণ শীত তো পড়েই গেছে।
এমন সময় কে যেন আমার দেখাদেখি বিল্ডিংয়ের দেয়ালের ধারে এসে দাড়াল। তাকিয়ে দেখার চাইতে নিজেকে সামলাতে ব্যস্ত ছিলাম, ওমনি একটা মেয়ে কন্ঠ বলে উঠলো- ওফ কি অসহ্য বৃষ্টি!
আমি ভেতরে ভেতরে একটু নিজের আতলামি টের পাই, কেমন যেন একটু থতমতো লাগে। একটা মেয়ে একা একা, ভরা সন্ধ্যায়, তাও আবার ঝুম বৃষ্টিতে। আর ধেৎ এতকিছু ভাববার কি আছে, আমি যেমন বিপদে পড়ে বৃষ্টি থেকে আড়াল করার তাগিদে এখানে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাড়িয়েছি ঠিক তেমনি সেও করেছে। নিজেকে চোখ রাঙালাম।
মেয়েটা বৃষ্টিতে বেশ খানিকটা ভিজে গেছে। শরীরের উপর ভেজা কাপড় লেপ্টে গেছে, শীতে থর থর করে কাঁপছে। না ভিজার পরও আমার ভিতরে কাঁপুনি ধরে গেছে আর উনি তো পুরোদস্তুর ভিজে গেছে। একবার তাকিয়ে হাসবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু মেয়েটি তাকায়নি - খুব জড়োসড়ো হয়ে দেয়াল ঠেসে দাড়িয়ে আছে। কি একটা জিজ্ঞেস করবো মনে করে আবার থেমে গেলাম। না থাক কি দরকার!
বৃষ্টি বাড়ছে, ঝুমবৃষ্টি। পাশে রাস্তার লাম্বপোষ্টের হুলুদাভ আলো এসে ছিটকে পড়েছে বিদঘুটে আন্ধকারের মাঝে। হঠাৎ সামনে দিয়ে একটা খালি রিকশা যেতে দেখে হাঁক দিলাম। উহু আর বসে থাকা যাবে না, এবার যায় । ওমনি মেয়েটা বলল, ভাই চলে যাবেন? আপনি ছিলেন তাও একটু ভরসা পেলাম এতক্ষণ । বলেই মেয়েট চুপ হয়ে গেল। আমি বললাম, তাহলে আপনিও যান। এবার মেয়েটা খানিকটা কাছে সরে আসলো, বলল, ভাই আমার স্বামী নিতে আসবে, একটু দাড়ান না।
এই কথা শুনার পর আমার ভিতরে ভয় ঢুকে গেল, আমি কোন চক্রে জড়িয়ে পড়ছি না তো, হতে পারে তো ছিনতাই করার অভিনব কৌশুল এটা। কেন যেন মনে হচ্ছে -তাড়াতাড়ি সটকে পড়, নইলে বিপদ আছে। আবার ভাবলাম, নাও তো হতে পারে, হয়তো সত্যিই বিপদে পড়েছে। এরই মাঝে রিকশাওয়ালা সটকেছে। আমি চুপ এবং বেকুব হয়ে দাড়িয়ে থাকলাম। বৃষ্টি আরও জোরে পড়তে শুরু করল।
মেয়েটা আর কোন কথা বলল না। মনে হয় বেশ ঠাণ্ডা ধরে গেছে, শীতের শুরুতে এই বৃষ্টির ফোটা খুবই ঠাণ্ডা। থাকতে থাকতে আমিও ভিজে গেলাম পুরোপুরি। আর তাই ঠাণ্ডাটা আমিও টের পেতে শুরু করলুম। চিন্তা করলাম আর দাড়িয়ে থেকে কাজ নেই যা ভেজার তা তো ভিজেই গেছি।
চলে যেতে গিয়ে একটু দাড়ালাম, স্মৃতির কোথায় যেন একটু ধাক্কা খেলাম। ঠিক কে যেন কথা বলল, না ঠিক মনে পড়েও পড়ছে না। কণ্ঠটা আরেকবার শুনা দরকার। কিন্তু যে মেয়ে নিজেই আগ্রহ করে কাছে সরে এসে কথা বলতেছিল, সে-ই এখন দূরে গিয়ে একটু ঘুরে দাড়িয়েছে। ঘাড়টা দক্ষিন দিকে কাত করে বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে অনাসয়ে। আমি মনে মনে সাহস সঞ্চয় করে কাছে গিয়ে বৃষ্টির মধ্যে দাড়ালাম। এরি মাঝে এক ঝলক বিদুৎ চমকালো। আর সেই আলোতে আমার স্মৃতিটা বেশ স্পষ্ট হয়ে গেল। সেই চির চেনা অবয়বে রুনু দাড়িয়ে আছে। একবার ভাবলাম কি দরকার কথা বলার, তারপরও বললাম - কেমন আছো? এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেও আবার কি মনে করে উত্তর দিল- ভাল। শুধুই দুটো শব্দ তবু মনের ভিতর একটু অন্যরকম ছুয়ে গেল। আমি অসহায়ের মতো নিজেকে আবিস্কার করলাম- জড় বস্তুর মতো কাক ভেজা অবস্থায়। তুমি কেমন আছো? শুনতে অশ্চর্য লাগলো কিছুটা তবু ওই দুটো শব্দই তাকে ফিরিয়ে দিলাম। ভাল। আমি শুনেছি সেই দিন তুমিই তোমার বাবা মাকে বলেছিলে বিয়েতে তোমার অমত নেই। অবশ্য তার যথাযত কারণ ছিল, আমি বেকার গরীব ঘরের ছেলে। আর গ্রামের চালচুলা নেই এমন একটা ছেলেকে ... থাক সেসব বয়ান। শুনেছি স্বামীর পাশা পাশি তুমিও ভাল একটা চাকরি করো। বেশ আছ। অবশ্য এই ভেবেই মনে মনে অনেক সুখ পাই।
রুনু চুপ। ঘাড় তুলে ওর মুখের দিকে তাকাতেই দেখি চোখ গড়িয়ে জল পড়ে যাচ্ছে। আশ্চর্য, সারা মুখ বৃষ্টিতে ভিজে আছে তবু চোখের জল আলাদা করে দেখা যাচ্ছে। কি যেন বলতে গিয়ে বলতে পারলো না, গলা ধরে এসেছে বোধহয়। তোমার স্বামী কখন আসবে? অস্পষ্ট স্বরে বলল, ফোন দিয়েছি এসে যাবে হয়তো একখুনি। তারপর রুনু বলল, এখনও বিয়ে করনি কেন? এই প্রশ্নের উত্তর তোমার জানা। বলেই আমি চলে যেতে শুরু করেছি।ওমনি পিছন থেকে রুনু ডাক দিয়ে বলল, দাড়াও শুনে যাও। আমি শুনেও না শুনার মতো করে হাটতে থাকি। অশ্চর্য, ভিতরে আর কোন কাঁপুনি নাই, বরং বৃষ্টির ফোটা গুলো এখন বেশ ভালই লাগছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




