somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভারতের দিনগুলো (পর্ব 01) : কলকাতা

১২ ই মার্চ, ২০০৭ সকাল ১১:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

জীবনে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছি। আমাকে ফিল্মমেকার হতেই হবে। ফোরামে ফিল্মের উপর শটকোর্সকে সম্বল নিয়ে আর গ্রুপ থিয়েটার চর্চার রসদ আমাকে এ সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। বন্ধু ইউরেকার পরামর্শে ফিল্মমেকার হওয়ার জন্য প্রথমে এডিটিং কোর্সে ভর্তি হলাম দিল্লীর একটি মিডিয়া স্কুলে। 98এর সেপ্টেম্বরে এডমিশন নেয়ার জন্য রওনা দেই বেনাপোল-কলকাতা হয়ে দিল্লীর পথে। জীবনে এটাই ছিল আমার প্রথম বিদেশ যাত্রা। একদম একাকী।

সারারাত বাসজার্নি করে সকালে বেনাপোল পৌছাই। পকেটে প্রচুর টাকা। এনডোর্স করা টাকা ছাড়াও বাংলাদেশী 20000 টাকা ও ডলার 1000। কাস্টমস পার হওয়ার সময় খুব ভয় লাগছিল। যদি চেক করে। আমার সঙ্গে একটি ইন্ডিয়ান ফ্যামিলি ছিল। সঙ্গে 3 বছরের বাচ্চা। ইন্ডিয়ান কাস্টমস যখন আমার নাম ধরে ডাকছিল আমি সঙ্গে সঙ্গে ওই বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে আদর করা শুরু করলাম। শুনেও না শোনার ভান করলাম আমাকে যে ডাকছে। দুই-তিনবার ডাকার পর আমি হঠাৎই যেন খেয়াল করছি এ ভঙ্গিতে তাকাতেই কাস্টমস অফিসার আমাকে জিজ্ঞেস করে, আপনিই তো? আমি বাচ্চাটিকে কোল থেকে নামিয়ে বলি, জি্ব আমিই।

কাস্টম অফিসার - ওই বাচ্চাটি কে?
আমি - ও আমার সঙ্গে ঢাকা থেকে আসছিল। ওরা ইন্ডিয়ান। বাচ্চাটিকে আদর করছিলাম। তাই ডাকছেন যে শুনতে পারিনি।

কাস্টম অফিসার আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে পাসপোর্ট ফেরত দিয়ে চলে যেতে বলে। আমি হাঁপ ছাড়ি। আমার পাশেই তখন এক বাংলাদেশীকে চরম সার্চ করা হচ্ছে। আমি বাচ্চাটিকে আদর করে একটু সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করে সফল হওয়ায় মুচকি হাসি। গ্রুপ থিয়েটার চর্চা বিফলে যাইনি। বোধহয় এডিটিংও ভালো শিখতে পারব। হা হা হা।

কাস্টম-ইমিগ্রেশন চেক করে বের হয়ে আসি। ইমিগ্রেশনে অবশ্য 10টাকা দিতে হয়েছিল। যাই হোক পরিচয় হয়ে যায় কিছু বাংলাদেশীর সঙ্গে। একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে রওনা দিই কলকাতার উদ্দেশ্যে। আমার ভাগে 170 রুপী পড়েছে ট্যাক্সিভাড়া হিসেবে। নিউমার্কেটের পাশে হোটেল প্যারাডাইজে চেক ইন করে ব্যাগ কাঁধে (একটাই ছিল) বেরিয়ে পড়ি। যমুনা সিনেমা হলে (এখন বন্ধ) দিল সে ছবি চলছিল। টিকেট কেটে ঢুকে পড়ি। বলিউডে আমার প্রথম প্রেম ছিল মনীষা। তাই আর দেরি না করে দিল সে ছবি দেখতে শুরু করি।

পরদিন ডালহৌসির ফরেন কাউন্টারে গেলাম ফরেন কোটায় ট্রেনের টিকেট কাটতে। নিজেকে ফরেন ভাবতে ভালোই লাগছিল। কিন্তু কপাল খারাপ। টিকেট পেলাম 6দিন পর। প্রতিদিন হোটেলে 200 রুপী করে গুণতে হবে ভেবে মনটাই খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু আমি জানতাম না 200 রুপী বেশি দিলেই বিভিন্ন ট্রাভেলস থেকে টিকেট কাটা যায়।

ঘুরতে শুরু করলাম স্বপ্নের কলকাতা। জীবনে প্রথম দেখছি কিন্তু অনেক রাস্তাঘাটের নাম আগে থেকেই জানি। মেট্রো সিনেমার নিচে দাঁড়িয়ে অনেক অপেক্ষা করলাম কিন্তু সুনীলের নীরা এলো না। চৌরঙ্গীতে দাঁড়িয়ে ভাবলাম কফি হাউজে একবার যেতেই হবে। একবার কি দাদাদের আনন্দবাজার পত্রিকা অফিসে যাব না ?

আমাদের গ্রুপের অশোকদা তখন কলকাতায় ছিলেন। উনি বাংলাবাজারের বইয়ের প্রকাশক। যোগাযোগ করে উনার সঙ্গে এক হোটেলে উঠে গেলাম। কফি হাউজের পরের গলিতেই সেই ট্রাভেল লজটি ছিল। অশোকদা আমাকে নিয়ে গেলে আনন্দবাজার পাবলিকেশনেস। বইয়ের গুদামঘরে বইয়ের উপর বসে একটা উপন্যাস শেষ করে ফেল্লাম। সেই ফাঁকে অশোকদা তার ব্যবসায়িক কাজ সেরে নিলেন।

পরদিন কফি হাউজে গেলাম। পকেট থেকে বাংলা ফাইভের (আমার প্রিয় ব্র্যান্ড, এখন নাকি বাংলাদেশে খুব একটা পাওয়া যায় না) প্যাকেট বের করে টেবিলে রাখলাম। একট ধরালাম। চারিদিকে প্রচন্ড কেওয়াজ। কিন্তু ভালোই লাগছিল। ভবিষ্যত সুনীল, শীর্ষেন্দুতে ভরা চারিদিক। ভাবলাম এভাবে বসে না থেকে কারো সঙ্গে পরিচিত হওয়া গেলে ভালোই হতো। কিন্তু কার সঙ্গে পরিচিত হবো? কোনো মেয়ে হলে ভালো হয়।

দুরু দুরু বুকে একটা টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলাম। একটা ছেলে আর একটা মেয়ে বসে কথা বলছে। কাছে গিয়ে বললাম, ভাই আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। দেখলাম আপনারা গল্প করছেন। আপনাদের সঙ্গে কি কথা বলতে পারি?

আমাকে সম্পূর্ণ অবাক করে দিয়ে ছেলেটি বলল, না ভাই। পারেন না। আমরা একটু জরুরি আলাপ করছি।

আমি খুব স্মার্টলি বললাম, না না ঠিক আছে।

অপদস্থ হয়ে ফিরে আসতেই ছেলেটি আবার ডাক দিল। বলল, আমার পূর্বপুরুষ আগে রংপুরে ছিলেন শুনেছি। আপনি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন কিন্তু সত্যিই আমরা একটা সিরিয়াস প্রবলেমে আছি। নাহলে আপনার সঙ্গে গল্প করা যেতো।

আমি মেয়েটার দিকে তাকিয়ে দেখি গম্ভীর হয়ে বসে আছে। বুঝলাম প্রেম বিষয়ক কোনো সংকট হবে। সুড়সুড় করে নিজের জায়গায় গিয়ে বসে পড়লাম। পাশের টেবিলে তাকিয়ে দেখি একটা ছেলে (বয়ঃসন্ধিকালের) কানে ওয়াকম্যান দিয়ে কাগজে কি যেন লিখছে। উঠে ছেলেটির কাছে গেলাম। হাত বাড়িয়ে পরিচিতি হলাম। এবার আশাহত হলাম না। ছেলেটিও পরিচিত হয়ে আমাকে বসতে বলল।

জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম ছেলেটি কবিতা লিখছিল। আমি তো আবিষ্কারে মহাখুশি। নির্ঘাত এ ছেলে শক্তি চট্টোপাধ্যায় হবে। আমি বললাম কলকাতা তো কিছুই চিনি না। চল আমাকে ঘুরিয়ে দেখাও।

ছেলেটির সঙ্গে কলকাতা ঘুরতে বের হলাম। ভিক্টোরিয়া মেমরিয়ালে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ। ছেলেমেয়েরা অপেন কিসিং করছে। শিহরিত হলাম আমি। শক্তিকে বিদায় করে সন্ধ্যায় গেলাম রবীন্দ্রসদনে। ফোয়ারার পাশে ছেলেমেয়েদের ঘনিষ্ঠতা দেখে ভিক্টোরিয়া মেমরিয়ালকে তুচ্ছ মনে হলো। ব্যস আমার রুটিন হয়ে গেল সারাদিন যেখানেই থাকি না কেন সন্ধ্যায় ঠিকই রবীন্দ্রসদনের ফোয়ারার তলায়।

দেখতে দেখতে ছয়দিন পার হয়ে গেল। ছয়দিন আমার মোট খরচ হলো 5000 রুপী। প্রথম বিদেশ ভ্রমণ আর স্বপ্নের কলকাতা দেখার খায়েশ। মন একটু খারাপ করেই হাওড়ায় গিয়ে কালকা এক্সপ্রেসে উঠলাম। আমার সামনে দুইজন বাংলাদেশী ছেলে। সারাক্ষণই চোরের মতো আচরণ করছে। ট্রেণ ছাড়ি ছাড়ি করার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে একটা মেয়ে এসে জানালার পাশের সিটে বসল। আমার মন ভালো হয়ে গেল। মেয়েটির সঙ্গে তার বাবা এসেছিল। হিন্দিতে কথা বলছিল তারা। একটা ইয়া মোটা কোকের বোতল ধরিয়ে দিল বাবা মেয়েটিকে। মেয়েটিও বিদায় টিদায় নিল বাবার কাছ থেকে। ট্রেন চলতে শুরু করল। আমিও নড়েচড়ে বসলাম। 22 ঘন্টার জার্নি। মেয়েটার সঙ্গে ভাব জমাতে হবে। ট্রেন চলছে পুরোাদমে। উদ্যাম বাতাস। আমি উশখুশ করছি। হঠাৎই দুই বাংলাদেশী ছেলেটির মধ্যে একটি ছেলে আমাকে জিজ্ঞেস করল, এ্যাই তুমি সুজন না? আমার মুখ হাঁ হয়ে গেল।

ব্লগার ভাইয়েরা-যদি বোরিং লাগে বলবেন আর লিখব না। যদি ভালো লাগে তাহলে যে কোনো কমেন্টস মনে আসে করবেন।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জুন, ২০০৭ রাত ৮:৩৬
১৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Victims of enforced disappearances পার্সন হিসেবে আমার বক্তব্য.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৫ ই মে, ২০২৬ দুপুর ১২:২১

গত ২৫ এবং ২৬ এপ্রিল ২০২৬ এ মানবাধিকার সংগঠন 'অধিকার' এবং World Organization Against Torture (OMCT) এর যৌথ উদ্যোগে ঢাকায় “The Prevention of Torture and the Implementation of UNCAT and... ...বাকিটুকু পড়ুন

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান বাংলাদেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব

লিখেছেন ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন, ০৫ ই মে, ২০২৬ দুপুর ১:২৯

পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জয় এবং এর ফলে উদ্ভূত আদর্শিক পরিবর্তন কেবল ভারতের একটি প্রাদেশিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের খারাপ দিনের পর

লিখেছেন সামিয়া, ০৫ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৪




আমার মাথা যেন আর কাজ করছিল না। বাইরে থেকে আমি স্বাভাবিক হাঁটছি, চলছি, পড়ছি, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছি কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিলাম মায়ের কথা ছোট বোনটার... ...বাকিটুকু পড়ুন

গেরুয়া মানচিত্রে পশ্চিমবঙ্গ: একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও শিক্ষা।

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৫ ই মে, ২০২৬ রাত ১০:৩৮


দীর্ঘ ১৫ বছরের টিএমসির শাসনের সমাপ্তি ঘটিয়ে অবশেষে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। গেরুয়া শিবিরের এই ভূমিধস জয়ের পেছনে অবশ্য মোদি ম্যাজিকের চেয়ে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতার ব্যর্থতার... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিজের দোষ দেখা যায় না, পরের দোষ গুনে সারা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৬ ই মে, ২০২৬ রাত ২:১০


ভারতের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পতন নিয়ে বাংলাদেশে যে পরিমাণ চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে, তা দেখে অবাক না হয়ে উপায় নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকলেই দেখা যায় অদ্ভুত সব তত্ত্ব। ফেইসবুক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×