ইশ্বর তো আমাদের সরকারী অফিসের বড়বাবু নয়, যেমন ভাবা তেমন কাজ; স্যাটাস্যাট হাবুর মাকে স্বপ্ন দিলেন । মাঝরাতে হাবুর মা ঘুম ভেঙে উঠে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগল ।
পাঁচড়া হাইস্কুলের হেডমাষ্টার বিভূতিবাবু সেজ মেয়েটার বিয়ের গতি করার জন্যে টিভিতে অনলাইনে অশেচনক কামিনীমাতাকে ধরেছেন, টেলিফোনে । আপাতত রাহু-কেতু এক । টাফ সিচুয়েশন । শিবরাত্রির দিন সাদা শাড়ি পরে ভিজে গায় পাঁচটা মাটির জুতো ... । বিভূতিবাবু অর কিছু শুনতে পেলেন না, ইশ্বরের মাথায় জুতো ! ছি: ছি: ছি:, টিভির ভলিউম এমনিতেই শূণ্য, সেজ মেয়ে মা'হারা পমপম এক্সাইটেড হয়ে শুনছিল এক সাইডের কথাবার্তা, সেও কিছু ঠাউর করে উঠতে পারল না।
সারারাত হাবুর মা বিছানায় বসে হাউ হাউ করে কাঁদল, হাবু এমনিতে ব্যোমকে ছিল, রাত্তিরবেলা ইচ্ছে ছিল গোস্বামীদের নারকোলগাছ দুটো একটু হালকা করে দেবে, মায়ের ঘ্যানঘ্যানে কান্না শুনে সে তো ল্যাবড়ে গেল । এ কি আব্দার রে ভাই, জুতো চাই !
মাল হাপিস করাই যখন হাবুর কাজ, ফোকাস একটু শিফট করলেই হল । টাকা চাই না, ঘড়ি চাই না, ঘড়া চাই না, স্রেফ জুতো । মায়ের মাথর দিব্যি খেয়ে সরাইঘাট এক্সপ্রেস রাজধানী এক্সপ্রেস, মোকামা ফার্ষ্ট প্যাসেঞ্জার সব জায়গা থেকে জুতো সরাতে লাগল । আরেকটা মেইন সোর্স ছিল মন্দির, হেজি-পেঁজি সমস্ত মন্দিরের সামনে ওত পেতে থাকে হাবু, সুযোগ পেলেই জুতো উঠিয়ে ফুড়ুত ।
হাবুর মায়ের জানাই ছিল না, হাবুর মধ্যে এরকম একটা প্রতিভা লুকিয়ে ছিল । কেবল ইশ্বরই সেটা জানতেন, ঝোপ বুঝে কোপ মেরে দিয়েছেন । হাবুর মা স্বপ্নে ইশ্বরকে দেখেছেন বটে কিন্তু পায়ের দিকে নজর দেন নি, কোন সাইজের জুতো ফিট হবে তাই নিয়ে হাবু-হাবুর মা দুজনেই কনফিউজড । ইশ্বর ঠিকমতো চিনতেও পারেন নি হাবুর মা, পড়াশুনা নাই তো, তেত্রিশ কোটির মধ্যে কোন একটা হবে । ছেলে না মেয়ে সেটাও ক্লিয়ার নয় । হাবুর মা'র মতে ছেলে, হাবুর মতে মেয়ে; নইলে সে এত ইন্সপিরেশন পেত না । এইসব কথা শুনলেই হাবুর মায়ের মটকা গরম হয়ে যায়। সমস্ত জুতোই খুব সাধারন, মামুলি। মানুষের পায়ে ঠিক, কিন্তু ঈশ্বরের জন্য বিলো ষ্ট্যান্ডার্ড!
দিন যায়, মাস যায়, হাবুদের বাড়িতে জুতোর পাহাড় জমে ওঠে। হাবুর মা সেগুলো সার্ফ দিয়ে কেচে, পালিশ-ফালিশ করে চাঁদনি চকের চোরাবাজারে বেচে দিয়ে আসে । হাবু যথারীতি দূরপাল্লার ট্রেনে আর মন্দির-মসজিদে জুতো সরিয়ে এক্সপার্ট হয়ে উঠেছে । এখন সে ঘুঘুমাল । পালা-পার্বণে আগে থেকে ক্যালেন্ডারে দাগ দিয়ে রাখে, কোন মন্দিরে গরবাচৌথায় ভীড় আর কোন মসজিদে ঈদ-উল ফেতরে হেভি ক্তাউড তা একন হাবুর নখদর্পনে ।এমন করে দিন কাটছিল । ঈশ্বরও এর মধ্যে আসেননি হাবুর মায়ের কাছে মাল ডেলিভারী নিতে । ঈশ্বরের মর্জি তো! বোঝা ভার । এদিকে হাবুর নেশা-প্রেম সবই ... । বিশেষত লেডিজ চপ্পল । একেকটা চপ্পল শুঁকে সে নারী সম্পর্কে অনুসন্ধান করে, কল্পনা করে নেয় উর্মিলা কিম্বা রবিনা ট্যান্ডনের চেহারার । বিছানায় রাত্রে শোয় সেই সব জুতো নিয়ে । হাবুর মা ধরে নিয়েছেন ছেলের এই নেমকহারামীর জন্য ঈশ্বর আসছেন না ।
শিবরাত্রির দিন গঙ্গার ঘাটে হাবুর চোখ চিক্ চিক্ করে ওঠে, দু'পাটি বেওয়ারিস জুতো ! দুধ সাদা রং । লেডিজ চপ্পল । হাই হিল । হেভি । ফাটাফাটি । বীভত্স । গুটি গুটি পায়ে হাবু এগোয় সেটা সটকানোর জন্যে । এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে । জল বরাবর চেয়ে চোখ আটকে যায় । ওফ্ ! সারা শরীর ভিজে, সাদা শাড়িতে ঘাটে উঠে আসছে পমপম । ওফ্ গুরু ! উর্মিলা মাতন্ডকর কেউ না । রবিনার গুষ্টির পিন্ডি ! এ কি জিনিস গুরু । ঘাটে বসে পমপম মাটির জুতো বানাচ্ছে ঈশ্বরের জন্যে । হাবু চেয়ে থাকে অপলক । এই প্রথম জুতো সরাতে গিয়ে তার হাত কাঁপছে । একবার জুতোর দিকে তাকায় একবার পমপমের দিকে । লাব ডুব, লাব ডুব । মাটি কাঁপছে । সব ঝাপসা ।
জুতো বানানো শেষ করে ধীর লয়ে সিঁড়িতে এসে পড়ে থাকা জুতোর দিকে একবার তাকিয়ে সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে উঠতে থাকে । মন্ত্রমুগ্ধের মত হাবু জুতো দুটো উঠিয়ে যেতে থাকে পমপমের পিছন পিছনে । তার কানে তখনও বাজছে ঈশ্বরীর কন্ঠস্বর: ' জুতোটা একটু দেখবেন । প্লীজ ।'
প্রথম প্রকাশ: ছায়াবৃত্ত, মার্চ, ২০০৪
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



