
কখনো কখনো এমন হয় না গোধূলির আলোয় প্রিয়জনের সাথে কাটানো সময় শেষে বাড়ি ফেরার পথে হুট করে মন বিষণ্ণতায় ভরে যায় অথবা বৃষ্টি শেষে স্নিগ্ধ পিচঢালা পথে হাঁটতে গিয়ে ভালো লাগার পরিবর্তে দমবন্ধ অনুভূতি দেয় kazuo Ishiguro এর "নেভার লেট মি গো " তেমন একটা বই। বর্ষার প্রথম কদম কিংবা শরতের বিকেলে মাঠ ভর্তি ফসলের গায়ে দোল খাওয়া মৃদু হাওয়া আমাদের জীবনে যেমন সুন্দর স্মৃতির জন্ম দেয় গল্পের ক্যাথি ও তেমন একজন। যে সব হারিয়ে শেষ পর্যন্ত শুধুমাত্র স্মৃতিগুলো হারাতে চায় না। শূন্য প্রান্তরে চারদিকে ছিন্ন কাগজের টুকরো, শুকনো পাতা উড়ছে । সেই খোলা হাওয়ায় দাঁড়িয়ে ক্যাথি ভাবে এই পৃথিবী তার বন্ধু, ভালোবাসা সবই কেড়ে নিয়েছে কিন্তু স্মৃতিগুলো একান্তই তার নিজের, সেগুলো নিশ্চয় মুছে ফেলতে পারবে না। হয়তো কিছু মানুষের কাছে তারা ছিল শুধু মাত্রই অর্গান ডোনার। অথচ তারা আর দশটা মানুষের মতই অনুভূতি সম্পন্ন ছিল। শৈশবের দুরন্তপনা, টিনএজের যত পাগলামি, ক্লাসের কোন ছেলে কি করেছে, নোংরা ম্যাগাজিন দেখে হি-হি-হি করা, ভালোবাসার মানুষকে কখনো বলতে না পারা, শুধুই অনুভূতি বয়ে বেড়ানো সবই ছিল তাদের মধ্যে। অথচ প্রতি সপ্তাহে তারা তাদের বেস্ট আর্ট গুলো জমা দিত, তারা ভাবতো এগুলো হয়তো তাদের সৃজনশীলতা যাচাই করার জন্য। এগুলো ছিল তাদের মধ্যে আদৌ কোন সোল আছে কিনা যাচাই করার জন্য। কি নিষ্ঠুর নির্মমতা! যে মানুষ গুলোর মধ্যে কারো কষ্টে ব্যথিত হওয়া, সুখে হাসা, ভালোবাসা অনুভব করা , ভালোবাসার মানুষকে কাছে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, হারানোর ব্যথা সবই বিদ্যমান, তাদেরকে প্রমাণ করতে হচ্ছে তাদের আদৌ কোনো সোল আছে কিনা।
ইংল্যান্ডের Hailsham নামক একটি স্কুলে বেড়ে উঠে কিছু শিশু। যারা ছিল মুলত ক্লোন মানব। যাদেরকে তৈরি করা হয়েছিল অর্গান ডোনার হিসেবে। যারা পৃথিবীর চোখে শুধুই মাত্র ডোনার। গল্পের ক্যাথি, রুথ, টমি তিনজন বন্ধু। হেইলশ্যাম এ তারা স্বপ্নের মত শৈশব কাটায়। তখনও তারা পুরোপুরি সত্যটা জানতো না। একদিন ছোট্ট ক্যাথি গান শুনতে শুনতে বালিশ বুকের সাথে আকড়ে ধরে নাচতে থাকে। O baby, never let me go, never let me go. যদিও ছোট্ট ক্যাথি এর মিনিং বুঝতে পারেনি। যাদের কখনো কোন পরিবার, বিয়ে কিংবা সন্তান হবে না। দূর থেকে ম্যাডাম এই দৃশ্য দেখে ভেজা চোখে দাঁড়িয়ে ছিল। যার ক্ষমতা খুবই সীমিত।
ক্যাথি আর টমির বন্ধুত্ব ছিল অনেক গভীর, কিন্তু এই অনিশ্চিত জীবনে যদি শেষ পর্যন্ত রুথ একা হয়ে যায় সেই ভয় থেকে সে টমির সাথে সম্পর্কে জড়ায় এবং ক্যাথিকে সবসময় দূরে সরিয়ে রাখে। ক্যাথি মনের গভীরে টমির জন্য অনুভূতি লুকিয়ে রাখে কিন্তু কখনো কিছু বলে না। প্রাণবন্ত, আত্মবিশ্বাসী কখনো কখনো হয়তো স্বার্থপর রুথ তার দ্বিতীয় ডোনেশনের পর বুঝতে পারে সে টমি আর ক্যাথির মাঝে শুধু শুধু দেয়াল হয়ে আছে। তখন সে ক্ষমা চেয়ে তাদেরকে এক হতে বলে। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যায়। টমি একবার ডোনেট করে ফেলে। তবু ও টমি আর ক্যাথি তাদের ভালোবাসা নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। তারা একটা কথা শুনে যদি কেউ তাদের ভালোবাসা সত্যি এটা প্রমাণ করতে পারে, তাহলে তাদের ডোনেশন তিন বছর পিছিয়ে দেয়া হয়। যাতে তারা কিছু সময় একসাথে কাটাতে পারে। তারা ম্যাডামের কাছে ছুটে যায় এটা জানার জন্য। টমি লুকিয়ে লুকিয়ে করা বেস্ট আর্ট গুলো নিয়ে যায়, সে যে ক্যাথির যোগ্য এটা প্রমাণ করার করার জন্য। বাট এমন কিছু কখনোই ছিল না যেটা শুধু মাত্রই গুজব। দুজন মানুষ একে অপরকে ভালোবাসে। শুধুমাত্র একসাথে কাটানোর জন্য কিছু সময় চায়। ওহ, কি প্যাথেটিক! টমি তখন পাগলের মত চিৎকার করতে থাকে। রুথ মারা যায়। থার্ড ডোনেশনের সময় টমি মারা যায়। সেদিন সে শুধু পলকহীন ভাবে ক্যাথির দিকে তাকিয়ে ছিল। পৃথিবীতে আমরা কত কিছুর পিছে ছুটি। অথচ প্রিয় মানুষের সাথে কাটানো সময় এর চেয়ে মুল্যবান আর কিছুই নেই। কিছুই না। আমার তখন একটা কথাই মনে আসে... hold your tongue, and let me love. জীবনের নির্মম বাস্তবতা জেনে ও তারা ভালোবাসতে চেয়েছিল। ক্যাথি প্রিয়জন হারানোর ব্যথা নিয়ে অপেক্ষা করে মৃত্যুর। ওহ, ঈশ্বর! এ হারানোর ব্যথা কি কষ্টের। বেঁচে থাকা কি অসহনীয়। পৃথিবীর কাছে যাদের অনুভূতির কোনো মূল্যই নেই।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


