somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রীতু আরাশিগে

২২ শে এপ্রিল, ২০০৯ রাত ১২:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এক

'আপনার এখান থেকে আমি বাংলাদেশে ফোন করতে চাই।'
শ্রীলংকার কুকুলেগংগা জেলার মাতুগামা উপশহরের এক টেলিফোন বুথে ঢুকে ইংরেজিতে এ কথা জিজ্ঞাসা করতেই দশ-বার বছরের কিশোরীটি তার মুখমণ্ডলে একটা অপূর্ব নির্মল মিষ্টি হাসি ছড়িয়ে উঠে দাঁড়ালো।
শ্রীলংকায় উচ্চ এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের সবাই ইংরেজি বলতে পারলেও দরিদ্র জনগণের ভাষা সিনহালা। দরিদ্র-সম্ভবা টেলি-অপারেটর কিশোরী তাই পরদেশী আগন্তুকের ইংরেজি বাচ্য বুঝলো না। কাজেই সে তার নিজস্ব সিনহালা ভাষায় কী যেন বলতে চাইলো, কিন্তু সেই ভাষা মেজর এজাজ রহমান চৌধুরির কাছে পাখির ভাষার মতোই দুর্বোধ্য মনে হলো।
মাত্র দুদিন হয়েছে তাঁরা শ্রীলংকায় এসেছেন। আমেরিকা, বাংলাদেশ, নেপাল, মংগলিয়া ও স্বাগতিক শ্রীলংকার যৌথ অংশ্রগ্রহণে জাতিসংঘ মিশনে শান্তিরক্ষী বাহিনীর কার্যক্রমের ওপর প্রশিক্ষণের উদ্দেশে তাঁদের এখানে আগমন, যদিও সমস্ত ব্যয়ভার খোদ মার্কিন সরকার কর্তৃকই বহন করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ থেকে আসার সময় মেজর বলে এসেছিলেন কুকুলেগংগায় পৌঁছেই বাসায় ফোন করবেন। কিন্তু এখানে আসার পর দেখা গেলো টেলিসংযোগ স্থাপিত হতে আরো চার-পাঁচ দিনের মতো সময় লাগবে। এতোদিন অপেক্ষা করা যায় না, দেশে পরিবারের সবাই খুব দুশ্চিন্তায় থাকবেন।
যেখানে মার্কিনিদের আগমন সেখানে জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গের প্রাচূর্য সুনিশ্চিত। কিন্তু আয়োজক কর্তৃপক্ষের নানাবিধ সীমাবদ্ধতা ও ব্যস্ততার দরুণ ভিনদেশীগণের কুকুলেগংগায় পৌঁছাবার সংগে সংগেই সেই প্রাচূর্যের সুব্যবস্থা হয় নি, এবং একই কারণে নিজ নিজ দেশে টেলিফোনে যোগাযোগের জন্য কাউকে ক্যাম্পের বাইরে নিকটস্থ শহরে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব হলো না।

পরদেশে প্রবেশের সাথে সাথেই কয়েকটি দরকারি কথা ও-দেশের ভাষায় শিখে নেয়া অত্যন্ত জরুরি। যেমন :
'আপনি কেমন আছেন?'
'আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।'
'একটু দয়া করে আমার কথাটি শুনবেন কি?'
'এই জিনিসটার দাম কতো?'
'আমি কলম্বো যেতে চাই।'
'অনুগ্রহ করে আমাকে ক্যান্ডি যাওয়ার পথ বলে দিন।'

মেজর মেয়েটিকে আবার জিজ্ঞাসা করেন, 'আপনার এখান থেকে কি বাংলাদেশে ফোন করা সম্ভব হবে?'
এ কথা বলার সংগে সংগে তাঁর বোধোদয় হয় যে, মেয়েটি হয়তো তাঁর ইংরেজি বাচন বুঝতে পারে নি। গত দু দিনে দু-একটা ভাঙ্গা-ভাঙ্গা অতি সাধারণ সিনহালা শব্দ ও বাক্য শেখা হলেও টেলিফোন করার কথাটি কিভাবে বলতে হবে তা তাঁর জানা হয় নি, অথচ এখন মনে হচ্ছে এ কথাটি সর্বাগ্রে শেখা জরুরি ছিল।
কিন্তু বুদ্ধিমতী মেয়েটি তার টেলিফোনটি মেজরের দিকে এগিয়ে দিয়ে ইশারায় তার ডান পাশে দেয়ালে ঝোলানো চার্টটির দিকে নির্দেশ করে, সেখানে বাংলাদেশে ফোন করার প্রতিমিনিট কলচার্জ বাবদ ৪৫ রুপি লিপিবদ্ধ আছে।
'এটা ঠিক আছে।' বলে মেজর নিজের দিকে টেলিফোনটি টেনে এনে ডায়াল করতে থাকেন।
অপর প্রান্তে মেজরের আট বছর বয়সী কন্যা আবেগে কেঁদে ফেলে। সে বলে, 'আব্বু, তুমি এতো পরে আমার কাছে ফোন করলে কেন? আমি গত তিন দিন ধরে তোমার কথা শুনতে পাই না। তোমার জন্য আমার খুব খারাপ লাগছে। আমি তোমাকে খুব...খুউব মিস করছি আব্বু।'
এরপর মেজর তাঁর দশ বছর বয়সী ছেলের সাথে কথা বলেন। সে-ও কিশোর, কিন্তু কনিষ্ঠা ভগ্নির তুলনায় সে নিজেকে সর্বদা অধিকতর ব্যক্তিত্ববান, দায়িত্বশীল ও বোঝবান মনে করে। সে বলে, 'আব্বু, রীতু একটুও বোঝে না। তুমি তো চার সপ্তাহ পরেই চলে আসবে, তাই না আব্বু? তবু সে দিনভর তোমার জন্য কাঁদে। আমি সেজন্য ওকে অনেক বকা দিয়েছি।'
স্ত্রীর সাথে কথা হলে তিনি জানালেন ফোন করতে এতো বিলম্ব হওয়াতে গত দু দিন তিনি খুব দুশ্চিন্তায় কাটিয়েছেন।
ওপরের কথাগুলো দশ মিনিটের মধ্যেই শেষ করে মেজর অত্যন্ত তৃপ্তি ও সুখের সাথে জিন্‌সের পেছন পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করেন। মানিব্যাগের মুখ খুলতে খুলতে তিনি কিশোরীর দিকে তাকান, সে তখন এক পায়ে বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে অপলক চোখে মেজরের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে- কী অদ্ভুত সুনির্মল তার হাসিভরা মুখখানি, সমস্ত মুখাবয়ব কী এক করুণ মায়াবী মমতায় ছেয়ে আছে- অকস্মাৎ মেয়েটির চোখের ওপর তাঁর চোখ পড়তেই মেজরের বুকটা হু হু করে ওঠে- ঠিক এ রকম, অবিকল এ রকম একজোড়া চোখ তিনি তাঁর ঘরে সুদূর বাংলাদেশে রেখে এসেছেন, সেই চোখ দুটি এখন তাঁর জন্য দিনরাত অশ্রুতে ভিজে থাকে।
'স্যার...।'
ইউনিভার্সেল এই ইংরেজি সম্বোধনে মেজরের ধ্যানভঙ্গ হয়। তিনি মানিব্যাগ থেকে পাঁচটি এক শ রুপির নোট বের করে কিশোরীর হাতে দিয়ে সংকেতে বোঝাতে চেষ্টা করেন, 'বাড়তি পঞ্চাশ রুপি ফেরত দিতে হবে না। দেশে আমার একটা কন্যা আছে, তার চোখ দুটো তোমার চোখের মতো। তার কথা মনে করে আমি তোমাকে অতিরিক্ত এই পঞ্চাশ রুপি বকশিস দিচ্ছি। তা দিয়ে তুমি চকোলেট কিনে খেয়ো।'
কিন্তু কিশোরী এ সংকেতের কোনো কিছুই বুঝলো না। সে পাঁচটি দশ রুপির নোট মেজরের দিকে বাড়িয়ে দেয়। ততোক্ষণে টেলিফোন বুথে আরো দু-চারজন শ্রীলংকান নাগরিক টেলিফোন করার উদ্দেশে এসে জড়ো হয়েছেন। কিন্তু কেউ তাঁর ইংরেজি বাচন ও সংকেতের অর্থ উদ্ধার করতে পারলেন না। অবশেষে পঞ্চাশ রুপি ফেরত নিয়ে মানিব্যাগে গুঁজলেন এবং কিশোরীর মাথায় দু বার হাত বুলিয়ে গুডবাই বলে বিদায় নিলেন।

রাতে একটা আশ্চর্য স্বপ্ন দেখলেন মেজর। টেলিফোন বুথের সামনে গিয়ে তিনি অনর্গল মেয়েটির সাথে কথা বলছেন। মেয়েটির ইংরেজি বাচন শুনে তাঁর মনেই হচ্ছে না সে কোনো দরিদ্র ঘরের ইংরেজি না-জানা টেলিফোন অপারেটর।
'তুমি কতোদিন ধরে এখানে আছো, খুকি?'
'তিন মাস হলো।'
'তুমি কি স্কুলে যাও?'
'আমি স্কুলে যাই না। আমার মা-বাবা কেউ জীবিত নেই। এটা আমার এক দূর সম্পর্কীয় খালুর টেলিফোন বুথ। মাসিক মাইনে নেই। পেটে-ভাতে তাঁদের বাসায় থাকি, আর এখানে কাজ করি।'
'আমি খুবই দুঃখিত যে তুমি একটা এতিম বালিকা।'
'আপনাকে ধন্যবাদ, আমার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের জন্য।'
'তোমার নামটা কি আমাকে বলবে, খুকি?'
'নিশ্চয়ই। আমার নাম আরাশিগে।'
নামটি মেজরের কাছে খুব স্পষ্ট হলো না। ভ্রু-যুগল ও কপাল কুঞ্চিত করে মেয়েটির নাম পুনরাবৃত্তি করে বললেন, 'আরিচেগা?'
'না না, আপনি ভুল উচ্চারণ করছেন। আমি কাগজে লিখে দিচ্ছি। Arachchige. উচ্চারণ করুন- আ-রা-শি-গে।'
মেজর মেয়েটির মতো টেনে টেনে উচ্চারণ করলেন, 'আ-রা-শি-গে। হয়েছে?'
'চমৎকার।'
'আচ্ছা আরাশিগে, তুমি কি কখনো বাংলাদেশের নাম শুনেছো?'
'জি না স্যার।'
'স্যার' কথাটি উচ্চারিত হবার সাথে সাথেই তাঁর ঘুম ভেঙ্গে যায়। মানুষ বাস্তবে যা দেখে না বা শোনে না, স্বপ্নেও তা দেখতে কিংবা শুনতে পায় না। কিন্তু 'আরাশিগে' নামটি কিভাবে তাঁর স্বপ্নের মধ্যে ঢুকে গেলো তা তিনি ভেবে পাচ্ছেন না। এখনো মেজরের কানের কাছে মেয়েটির নিজকণ্ঠে উচ্চারিত 'আরাশিগে' নামটি গানের সুরের মতো বাজছে।

মেয়েটির নাম কি সত্যিই আরাশিগে? এ কথা যখন ভাবছেন তখন হঠাৎ করে তাঁর একটা কথা মনে পড়ে যায়- টেলিফোন বুথের দেয়ালে কলচার্জের যে চার্টটি ঝোলানো ছিল, তার ওপরে কলম দিয়ে অসুন্দর ইংরেজি অক্ষরে এই নামটি লেখা ছিল।
কিন্তু এ থেকেই ধরে নেয়া যায় না যে মেয়েটির নাম আরাশিগে। প্রথমত, মানুষের নাম আরাশিগে হতে পারে এটা নিয়েও তাঁর মনে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। দ্বিতীয়ত, এটা যে একটা মেয়ে-নাম তা-ও নিশ্চিত করে বোঝার উপায় নেই।
মেয়েটার নাম জানতে মেজরের খুব ইচ্ছে করতে লাগলো, তার চাইতেও মেয়েটাকে দেখার ইচ্ছেটা তাঁর প্রবল হতে থাকলো।
কিন্তু এর পরের দুটি সপ্তাহ খুব ব্যস্তভাবে কাটলো। ইতোমধ্যে আবাসিক-ক্যাম্প এলাকায় টেলিসংযোগ স্থাপিত হয়েছে। দু-তিন দিন পরপর মেজর বাংলাদেশে পরিবারের সবার সাথে কথা বলেন।

'রীতু মামণি, তুমি ভালো আছো?'
'আমি ভালো আছি। তুমি?'
'আমিও। তুমি কি এখনো আমার জন্য কাঁদো?'
'কাঁদি। কিন্তু সব সময় না। রাতে ঘুমুবার সময় কাঁদি, আর ভাইয়া যখন আমাকে মারে তখন কাঁদি।'
'তুমি একটুও কেঁদো না। আমি বাড়ি এসে তোমার ভাইয়ার বিচার করে দিব। ঠিক আছে?'
'হুঁম। ওকে কান ধরিয়ে টেবিলের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখবে।'
'আচ্ছা রাখবো।'
'তারপর তিনবার ওঠ্‌-বস্‌ করাবে।'
'করাবো।'
'উঁহু, তিনবার না, দুইবার। তিনবার করালে ও কষ্ট পাবে।'
'আচ্ছা, তুমি যা বলবে তাই করবো।'
'তারপর ওকে বাথরুমে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিবে।'
'হুঁম দিব।'
'আব্বু, আর কতোদিন পর আসবে তুমি?'
'আরো দু সপ্তাহ পরে।'
'দু সপ্তাহে কি চৌদ্দ দিন হয়?'
'হ্যাঁ।'
আমার জন্য কিন্তু চকোলেট আনবে। ভাইয়ার জন্য কিচ্ছু আনবে না।
ঠিক আছে। মামণি শুনতে পাচ্ছো?
শুনছি তো।
এখানে তোমার মতো একটা মেয়েকে দেখেছি।
সে কী করে?
টেলিফোনে কাজ করে।
একদম আমার মতো!
ওর চোখ দুটো তোমার চোখের মতো। তুমি যখন ওর সমান হবে তখন তোমাকে ওর মতোই দেখাবে।
রীতু খিলখিল করে হেসে উঠে বলে, 'তাহলে তো দুটো রীতু হয়ে যাবে।'
হ্যাঁ, তবে ওর নাম কিন্তু রীতু নয়, আরাশিগে।

আরাশিগেকে নিয়ে প্রতিবারই দু-একটা কথাবার্তা টেলিফোনে হয়। মেজরের স্ত্রীও তাকে নিয়ে খুব উৎসাহ প্রকাশ করেন। দেশে ফেরত যাবার সময় আরাশিগের একটা ছবিও সঙ্গে নিতে বলে দিলেন।
একদিন মেজর সামিরা নামক এক শ্রীলংকান অফিসারকে সংগে নিয়ে আরাশিগের টেলিফোন বুথে এলেন বাংলাদেশী মেজর। বুথে ঢোকামাত্র দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানালো মেয়েটি এবং বাংলাদেশী মেজরকে যে সে চিনতে পেরেছে তা সে শ্রীলংকান মেজরের মাধ্যমে জানিয়ে দিল। দ্বিতীয়বারের মতো তার বুথে আগমন করায় সে যারপরনাই গর্বিত ও সম্মানিত বোধ করছে।
আগের বারের মতো আজ পারস্পরিক কথোপকথনে কোনো অসুবিধার সৃষ্টি হচ্ছে না, কেননা, মেজর সামিরা আজ দোভাষীর কাজটি করে দিচ্ছেন।
তোমার চোখ দেখলে আমার মেয়ের কথাটি মনে পড়ে যায়।
আপনার মেয়েটির বয়স কতো?
আট বছর।
আমার বয়স বিশ বছর।
মেজর একটু বিব্রত হোন। মেয়েটির বয়স দশ-বারর মতো দেখায়, সেভাবেই এ যাবত তার সাথে আচরণ করছিলেন তিনি।
মেজর বলেন, 'তোমার সাথে আমার মেয়েটির প্রচুর মিল। এতো মিল যে সে যখন তোমার বয়সে পদার্পণ করবে তখন তাকে অবিকল তোমার মতো দেখাবে।'
আরাশিগে সলজ্জ হেসে নিচের দিকে তাকায়।
তুমি কি বাংলাদেশে বেড়াতে যাবে, আমার প্রিয় কন্যা?
আমার বাবার প্রচুর অর্থকড়ি নেই। থাকলে নিশ্চয়ই আপনার মতো আমার আরেকজন বাবার দেশে বেড়াতে যাওয়াটা আমার জন্য বেজায় সুখকর হতো।
তুমি কদ্দূর লেখাপড়া করেছো?
আমি লেখাপড়া করতে পারি নি। আমার আট বছর বয়সে আমার মা মারা যান। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন। তিনি বর্তমানে একজন অকাল-অবসরপ্রাপ্ত পঙ্গু সার্জেন্ট। জাফনা যুদ্ধে তিনি উরুতে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন।
দুই মেজরই অবাক হোন এবং তার প্রতি সহানুভূতি জানাতে থাকেন।
মেয়েটি বলে, 'পেনশনের টাকার একটা অংশ দিয়ে এই টেলিফোন বুথটি করা হয়েছে। আমাদের চার ভাইবোনের মধ্যে আমিই বড়। বাকিরা লেখাপড়া করছে বলে এ কাজটি আমাকেই করতে হয়।'
তোমার প্রতি আমার অশেষ সহানুভূতি রইলো বাছা। তুমি তোমার মনোবল, পরিশ্রম আর কর্মদক্ষতা দিয়ে তোমাদের সংসারটাকে টিকিয়ে রাখছো, তোমার মতো আর মেয়ে হয় না।
আপনাকেও অশেষ ধন্যবাদ।
তুমি আমার প্রিয়তমা কন্যার মতো। আমি এদেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে তোমাকে একটা সামান্য উপহার দিয়ে যেতে চাই। আমি খুবই খুশি হবো যদি তুমি আমাকে তোমার পছন্দের জিনিসটার কথা বলো, আমার আদরের কন্যাটি।
মহোদয়, আপনি আপনার এ মেয়েটিকে একটা উপহার দেয়ার কথা ভেবেছেন, এজন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ এবং আমি আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ। তবে দয়া করে আমাকে কিছু দেবার জন্য ব্যস্ত হবেন না, আপনি সারাটি জীবন আমার হৃদয়ে অবস্থান করবেন, ঠিক আমার জন্মদাতা পিতার মতোই।
আমার প্রিয় কন্যা, তোমার কথায় আমি খুবই সন্তুষ্ট হলাম।
নিজ কন্যা কী পেতে ভালোবাসে তা তো তাকে জিজ্ঞাসা করা যায়ই। সলজ্জ বালিকা সবিনয়ে উপহার গ্রহণে অনিচ্ছার কথা জানালেও মেজর মনে মনে স্থির করলেন, দেশে ফেরত যাবার আগে এ মেয়েটিকে তিনি অবশ্যই একটা উপহার প্রদান করে যাবেন এবং কী দিবেন তা-ও তিনি স্থির করে ফেললেন।

কলম্বোর সর্বাধুনিক 'ম্যাজেস্টিক সিটি' শুধু শ্রীলংকায় তৈরি সামগ্রীর জন্যই বিখ্যাত নয়, বিশ্বের প্রায় সকল উন্নত ব্র্যান্ডের সামগ্রীই এখানে পাওয়া যায়। এসব সামগ্রীর আকাশছোঁয়া মূল্যের কারণে ম্যাজেস্টিক সিটি মূলত শ্রীলংকান উচ্চবিত্ত ও অভিজাত শ্রেণী এবং ধনিক পর্যটকদের 'পারচেজ সেন্টার' হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
ম্যাজেস্টিক সিটিতে গিয়ে নিজ পরিবারের সদস্যদের জন্য মেজর বেশ কিছু দুর্লভ ও আকর্ষণীয় উপঢৌকন ক্রয় করলেন। কিন্তু মনে মনে যা তিনি খুঁজছেন তা কোথাও পাচ্ছেন না। মাঝখানে অবশ্য 'হাউজ অব ফ্যাশন' থেকেও ঘুরে এলেন। হাউজ অব ফ্যাশনকে কলম্বোর সবচাইতে ব্যস্ত শপিং মল বলা যেতে পারে। এখানে নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে সবার জন্যই সর্বাধুনিক ফ্যাশনের পোশাকাদি ন্যায্য মূল্যে পাওয়া যায়।

সন্ধ্যায় ক্যাম্পে ফেরার আগ দিয়ে আরেকবার সেই ম্যাজেস্টিক সিটিতে ঢুকলেন এবং দুটি দোকান পরই আরাশিগের জন্য চমৎকার একটা পোশাক পেয়ে গেলেন, ঠিক যেমনটি তিনি খুঁজছিলেন, যেটি পরলে আরাশিগেকে রাজকুমারীর মতো মনে হবে, রীতু যেদিন বড় হবে সেদিন ঠিক যেরকম তাকে দেখবেন বলে তিনি সর্বদা কল্পনা করেন।

কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে পরের দিনগুলো এতোই ব্যস্তভাবে কাটতে লাগলো যে দম ফেলবার মতো একদণ্ড অবসর পাওয়া গেলো না। বাংলাদেশে ফেরত যাবার দিন কলম্বো বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে কিছুটা ঘুরে মাতুগামা উপশহরে আসা হলো আরাশিগেকে উপহারটা দেয়ার জন্য। কিন্তু আরাশিগের টেলিফোন বুথ তখনো খোলা হয় নি। আশেপাশের দোকানও খোলা ছিল না। কিছুক্ষণ দিগ্বিদিক পায়চারি করার পর জনৈক পথচারীকে জিজ্ঞাসা করতেই জানা গেলো যে, এখানে আজ ছুটির দিন। মেজরের মনটা খুব বেদনার্ত হয়ে ওঠে।
একটা পথ অবশ্য আছে, এর আগে যে শ্রীলংকান মেজরকে নিয়ে এখানে আসা হয়েছিল, সেই মেজর সামিরার কাছে এটা পাঠিয়ে দেয়া যেতে পারে, তিনি এটা ঠিক আরাশিগের কাছে পৌঁছে দেবার সুব্যবস্থা করবেন। এই ভেবে তাঁরা বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন।
মাতুগামা উপশহর পার হয়েই মেজরের মনে পড়লো যে আজও আরাশিগের নাম সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেলো না। শেষবার যখন মেজর সামিরাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন তখন কতো কথা হলো মেয়েটার সঙ্গে, অথচ তার নামটাই শুধু জিজ্ঞাসা করা হলো না। আরাশিগে নামটি তাঁর মনের ভিতরে এতোখানিই গেঁথেছিল যে তার সাথে কথা বলার সময় মেজরের মনেই হয় নি- তিনি মেয়েটির নাম জানেন না। সেদিন ক্যাম্পে ফেরত যাবার পর থেকেই মেয়েটির নাম জানার জন্য তাঁর মনের ব্যাকুলতা ক্রমশ বাড়ছিল। তিনি অবশ্য ধরেই নিয়েছিলেন যে ওর নাম আরাশিগে হওয়াটা খুবই সম্ভব- এমনকি টেলিফোন বুথের নামও যদি আরাশিগে শীর্ষক হয় তাহলেও ধরে নেয়া যায় যে আরাশিগের নামের ওপরেই টেলিফোন বুথের নামকরণ করা হয়েছে।

মাঝামাঝি জায়গায় আসার পর একটা উটকো ঝামেলায় পড়তে হলো, জিপ গাড়ির পেছনের একটি চাকা বার্স্ট হয়ে গেছে। ওটি বদলাতে প্রায় মিনিট বিশেকের মতো সময় চলে গেলো। ক্যাম্প থেকে সবাইকে নিয়ে একই কনভয় যোগে সরাসরি রাস্তায় অন্যান্য বাংলাদেশী এবং বাকি দেশগুলোর লোকজন রওনা হয়েছে। কেবল তাঁর জন্য আলাদা একটি জিপ যোগে এই বিশেষ ব্যবস্থাটি করা হয়েছিল, কারণ এখানে আরাশিগে নামক তাঁর একটি মেয়ে আছে এ কথাটি অনেকে জানতে পেরেছিলেন; বিদায়ের দিন সেই মেয়েটির সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হোক কর্তৃপক্ষের জনৈক অফিসারের এই অতিমানবিক সৌজন্যবোধ জাগ্রত হয়েছিল।

মাতুগামা উপশহরে যেতে বাড়তি রাস্তা অতিক্রম করতে হবে এটা কর্তৃপক্ষ জানতেন, কিন্তু কনভয়বিহীন মাত্র একটি জিপ যোগে দ্রুততর গতিতে গাড়ি চালিয়ে মূল কনভয়ের আগেই বিমানবন্দরে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব হবে বলে সকলের ধারণা ছিল। কিন্তু গাড়ির চাকা পাংচার ও বদলিসংক্রান্ত সময়ক্ষেপণের জন্য বিমান উড্ডয়নের পূর্ব-সময়টুকু মনে হতে লাগলো দ্রুত সংক্ষিপ্ত হয়ে আসছে। সঙ্গী শ্রীলংকান অফিসার সহ মেজরের মনে টেনশন বাড়তে থাকে।
বিমানবন্দরে পৌঁছে দেখেন যাবতীয় ফর্মালিটি সম্পন্ন করে সবাইকে ভিতরে পৌঁছে দিয়ে অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অবস্থায় কনভয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্নেল তাঁর জন্য অপেক্ষা করছেন। তাঁকে দেখেই অফিসারের মুখাবয়ব উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সামনে এগিয়ে এসে সহাস্যে জিজ্ঞাসা করেন, 'হ্যালো মেজর, আশা করি আপনার কন্যার সাথে শেষ সাক্ষাৎটি খুব মধুময় হয়েছে।'
'দুঃখিত কর্নেল, তার দেখা মেলে নি। তার দোকান বন্ধ ছিল, ঐ মার্কেটে আজ পূর্ণ ছুটির দিন কিনা।'
'ওউফ, ভেরি স্যাড।'
এ অবস্থায় তাঁর প্রতি কর্নেলের অপ্রসন্ন অভিব্যক্তির পরিবর্তে অসাধারণ সৌজন্য প্রকাশে বাংলাদেশী মেজর খুব মুগ্ধ হলেন। কিন্তু সময় খুবই সংক্ষিপ্ত, সঙ্গী সেনা-জোয়ানরা ধরাধরি করে ব্যস্তভাবে তাঁর মালামাল নামাচ্ছেন, মেজর নিজেও তাঁদের সাথে যোগ দিলেন।

বিমান উড্ডয়নের সঙ্গে সঙ্গে মেজরের মনে পড়লো যে ভুলবশত এবং ব্যস্ততার জন্য আরাশিগের জন্য কেনা উপহারটা তাঁর সঙ্গেই চলে এসেছে।

এর পরের বছরখানেক সময় খুব হাসি-আনন্দে কেটে যেতে লাগলো মেজর পরিবারে। প্রথম-প্রথম খুব বিচ্ছিন্নভাবে তাঁদের আলোচনায় আরাশিগের নাম উচ্চারিত হতো। এরপর আরাশিগে তাঁদের আলোচনায় এমনই একটা স্থান জুড়ে নিল যে মনে হতে পারে আরাশিগে এই পরিবারেরই একটা অতি আদরণীয় কন্যা, যে তার পিতামাতা ও কনিষ্ঠ ভাইবোনকে ছেড়ে দ্বীপদেশীয় শ্রীলংকায় প্রবাসী হয়েছে।
আরাশিগের জন্য কেনা ঝলমলে পোশাকের প্যাকেটটা একদিন খোলা হয়েছিল। শখ করে রীতুকে যখন পরানো হলো তখন সে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলো। আরাশিগে যদিও বয়সে তার চেয়ে বার বছরের বড়, কিন্তু তার শারীরিক কোষ বৃদ্ধির হার আরাশিগের চেয়ে বেশি এবং তজ্জন্য পরবর্তী বছর তিনেকের মধ্যেই সে আরাশিগের সমান শারীরিক গঠন অর্জন করতে সক্ষম হবে বলেই মেজর মনে করেন।

রীতুকে পরানোর পর পোশাকটি পুনরায় প্যাকেটবন্দি করে রাখা হয়েছে। শ্রীলংকা থেকে প্রতি বছর অসংখ্য সেনা অফিসার বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে আসেন। এমনকি বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতেও কমিশন লাভের জন্য বহু শ্রীলংকান জেন্টলম্যান ক্যাডেট প্রশিক্ষণরত আছেন। তাঁদের যে কোনো একজনের মাধ্যমে এই প্যাকেটটি শ্রীলংকায় মেজর সামিরার কাছে পাঠিয়ে দেয়া হবে। তিনি অবশ্যই আরাশিগের কাছে ওটি পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করবেন।
কিন্তু বিভিন্ন ব্যস্ততার দরুণ অতি সহসাই কোনো শ্রীলংকান সেনাসদস্যের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হলো না। ঠিক এমন সময়ে মেজর পরিবারে এক বিষাদময় ও হৃদয়বিদারক কাহিনীর সূচনা হতে থাকলো। এবং পরবর্তী দু বছর সময়টাতে সৃষ্টি হলো তাঁদের পরিবারের করুণতম ইতিহাস।






গল্পের শেষ পর্বটির জন্য দয়া করে এখানে ক্লিক করুন



সর্বশেষ এডিট : ১১ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:৩৭
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রাসূলের (সা.) অনুসারি হবেন শুধুমাত্র সাহাবা (রা.), অন্যরা এবং ওলামা ওলামার অনুসারি হবেন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:৪০




সূরাঃ ৩৫ ফাতির, ২৮ নং আয়াতের অনুবাদ-
২৮। এভাবে রং বেরং- এর মানুষ, জন্তু ও আন’আম রয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে (ওলামা) আলেমরাই তাঁকে ভয় করে।নিশ্চয়্ই আল্লাহ পরাক্রমশালী ক্ষমাশীল।

সূরা:... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

লিখেছেন নতুন নকিব, ১১ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০৩

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

মানুষের জীবন মূলত অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্তের সমষ্টি। প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি মোড়ে আমাদের কোনো না কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×