সমুদ্র দেখার শখ কার না আছে, ছোটবেলা থেকে আমারও শখ বা ইচ্ছে সমুদ্র দেখার, এর তীরে পা ভিজিয়ে হাঁটার । ফ্যামিলি অ্যালবামে আমার বড় ভাই বোনের ছবি দেখেছি পতেঙ্গা সী বীচের তীরে, সেটা দেখে আমার ইচ্ছে আরও প্রবল হয় । তারা যখন গিয়েছিল তখন আমি খুব ছোট ছিলাম, (মাত্র দুনিয়ার মুখ দেখছি এই টাইপ ছোট), তাই আব্বু শুধু তাদেরকে নিয়ে যান পতেঙ্গায়, আমি বাদ । পরিবারের সবাইকে নিয়ে অনেক বার যাওয়ার আবেদন করেছিলাম ছোটবেলায় বাবার কাছে, ২/১ বার আবেদন মঞ্জুরও হয়েছিল কিন্তু বাস্তবায়ন হয় নাই।
৯৮বা ৯৯ সনে (৮ম বা ৯ম শ্রেণীতে পড়তাম) আমার সমবয়সী এক কাজিনের সাথে তার নানার বাড়ি চাঁদপুর যাই ২-৩ দিনের জন্য । সেখান থেকে হটাত করে তার চট্টগ্রাম যাওয়ার প্রয়োজন দেখা দিলে আমি তার সাথে যাওয়ার সুযোগ মিস করি না । বাবার অনুমতি আর কিছু টাকা পয়সা নিয়ে তাদের সাথে ( আমার সম বয়সী দুই কাজিন) বের হয়ে পড়ি । চাঁদপুর থেকে লোকাল বাসে ৭/৮ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম যাওয়ার অভিজ্ঞতা বিস্তারিত বলতে গেলে পোস্ট আর পোস্ট থাকবে না পোস্ট অফিস হয়ে যাবে । যাই হোক, চট্টগ্রাম শহরে পৌছার পর বিকেলের দিকে আমার কাজিনরা তাদের প্রয়োজনের কারনে পটিয়া চলে যায়, আমি তাদের সাথে না গিয়ে শহরে থেকে যাই। একা একা অলস সময় কাটানোর থেকে চিন্তা করলাম পতেঙ্গা বীচে চলে যাই। এই ভেবে রাস্তায় নেমেই পড়ি বিপদে... একে তো অপরিচিত জায়গা, রাস্তাঘাট চিনি না কিছু তার উপর স্থানীয় লোকজনের কথাবার্তাও কিছু বুঝি না, কিছু জিজ্ঞাস করলে উত্তরে কি যে বলে আল্লাহ্ই ভাল জানেন । যাই হোক, এক পান দোকানদারের সহযোগিতায় কোনোমতে লোকেশন বুঝে নিয়ে রিকশা তারপর বাস তারপর টেম্পুতে চড়ে পতেঙ্গায় পৌছতে পৌছতে ততক্ষনে সূর্যের অফিস আওয়ার প্রায় শেষ, ভোর থেকে একটানা দুনিয়াকে সার্ভিস দিয়ে ক্লান্ত হয়ে যেন ধীরে ধীরে ঢলে পড়ছে সমুদ্রের দিকে।
প্রথমবার সমুদ্র দেখার অনুভূতি কেমন তা আসলে আমার মত ভোতা অনুভূতির ব্যক্তির পক্ষে প্রকাশ করা সম্ভব না । কষ্ট করে আপনারাই সেই অনুভূতি কল্পনা করে নিন, কল্পনা করে নিন শহরের যান্ত্রিক জীবনে অভ্যস্ত একজন কিশোর যার আকাশ দেখার সুযোগ নেই, খেলাধুলার জন্য যে কোন স্থান খুজে পায় না, খানা খন্দক-খোলা ম্যানহোল আর রিক্সার স্পোক থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে যার প্রতিদিনের পথচলা সে যদি হটাত এক দিন একা হাজির হয় বিশাল সমুদ্রের পাড়ে কেমন লাগবে তার নিকট। আমি শুধু এতটুকুই বলতে পারি ...... সে দিন আমার মধ্যে এক ধরনের ভাল লাগার শুন্যতাভাব তৈরি হয়েছিল... এটা আসলে ঠিক ব্যাখ্যা করা কঠিন। অনেকটা যেমন বড় কোন হলরুম,অডিটোরিয়াম বা ইনডোর স্টেডিয়াম যদি আমি একা দাড়াই বা অবস্থান করি তখন এক ধরনের শূন্যতার অনুভব হয়......যেটাকে...যেটাকে বলা যায় "বদ্ধ শুন্যতা" । এই অনুভতি যখন অনুভব হয় তখন নিজেকে ছোট,হেয় মনে হতে থাকে। আবার এই একই আমি যদি হল ভর্তি মানুষের সাথে অবস্থান করি তাহলে আর সে অনুভূতিটা র থাকে না। আর যদি একই স্থানে সকলের মনোযোগের কেন্দ্রতে থাকি যেমন ষ্টেজে উঠলে, তখন চাইলেও নিজেকে ছোট ভাবা সম্ভব হয় না, কিছুক্ষণের জন্যও অন্যকেও বড় ভাবা কঠিন হয়ে পরে । কিন্তু সমুদ্রের বিশাল অন্তহীন প্রান্তরে যত বারই যাই না কেন প্রতিবারেই মনে একটা ভাল লাগার শূন্যতা, একটা পবিত্র অনুভূতির সৃষ্টি হয়,কোন বদ্ধতা না, এর বিশালত্তের সামনে কখনো নিজে কে ছোট মনে হয় না, হোক তখন একা থাকি বা বন্ধু-পরিজনদের সাথে । কারন সেমুহুর্তে অবাঞ্ছিত মন কিছুতেই সায় দেয় না নিজের অবস্থানের সাথে সমুদ্রের তুলনা দিতে ।
সূর্যাস্তের পরও সেবার পতেঙ্গা বীচে অনেকক্ষন ছিলাম, চোখের সামনে পুরো সমুদ্রকে যেন হটাত করে লেপে দেয়া হল অন্ধকারের কাল কালি প্রলেপ... ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে শুধু শোনা যায় ঢেউয়ের গর্জন আর মাঝে মধ্যে দেখা যায় দূরে জেলেদের ট্রলারের টিমটিমে আলো । আমার একবার সৌভাগ্য হয়েছিল জাহাজে করে লোহিত সাগর পাড়ি দেবার । সুইস ক্যানেল থেকে জেদ্দা । তখন দেখেছিলাম অন্ধকার কি জিনিস ! যে দিকেই তাকাই একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার, কোথাও সামান্যতম কোন আলোর উৎস নেই, ডেকের সামান্য আলোতে জাহাজের পাশে কেটে যাওয়া কালো পানির ঢেউয়ের দিকে তাকালে বুক কেঁপে উঠত ভয়ে । আর দিনের বেলা............ নাহ সেটার বর্ণনা আর আজকে লিখে শেষ করা সম্ভব না.........
উৎসাহ পেলে আরও লেখার ইচ্ছে আছে, কারন সাগর দেখে বেড়ানো আমার নেশা বা পেশা না হলেও কেন জানি এর পানে বার বার যেতে হয়েছে আমাকে। ভারত সাগরের পার্শে গড়ে উঠা কেনিয়ার প্রসিদ্ধ জনপথ মুম্বাসা, মালিন্দি ও পর্যটন দ্বীপ লামুতে এক বার প্রায় ২ মাসের জন্য অবস্থান করেছিলাম আমি । আজও তাজা সামুদ্রিক মাছের কথা ভেবে ফিরে যেতে ইচ্ছে হয় লামুতে। আর এর পাহাড় ঘেরা সৈকতের কিনারা দিয়ে খালি পায়ে হেটে যাওয়ার লোভ আপনাদের নাই বা দেখালাম। মিশরের শারমুস শেইখের কাঁচ স্বচ্ছ লোহিত সাগরের পানির কথা ভোলা আসলেই খুব কঠিন। জেদ্দার নিরিবিলি সমুদ্র সৈকতে খেজুর গাছের ছায়ায় বসে করা লাঞ্চ! জানি না কিসের সাথে এর তুলনা দিব । ভূমধ্য সাগরের সৌন্দর্য এবং এর তীরে গড়ে উঠা শহর "আলেক্সান্দ্রিয়া" আর বর্ণনা করে লেখার সাহস এই বান্দার নেই । শুধু এতটুকু বলি, এই প্রিয় শহরটিতে যেন ফিরে যাওয়ার সৌভাগ্য বার বার যেন আমার হয় ।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে মে, ২০১২ রাত ১:৪৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



