

আমার নাম নীরব। আমার নামের সাথে আমার জীবনের মিলটা কী অদ্ভূত তাই না? কলরব করতে করতে এই যে কিছুক্ষণ আগে জীবনের আলো দেখতে না দেখতেই কূপের অন্ধকারে সারা জীবনের জন্য হারিয়ে গেলাম। আমাকে এতোক্ষণে নিশ্চয়ই আপনারা চিনে থাকবেন। হাজারো ঘটনার মাঝে আজকে আমিই সবচেয়ে আলোচনার মধ্যমণি। কী সৌভাগ্য আমার!
টিভি সংবাদগুলো আমাকে নিয়ে মুখরিত হবে-পত্রিকায় বড় শিরোণাম হবে। এসবের ভিতর জানিনা- আমার কথাগুলো শোনার আপনাদের সময় হবে কিনা?
হয়তোবা হবেনা জানি। তারপরও আমি কিছু কথা পয়েন্ট আকারে বলে যেতে চাই যাতে বুঝতে সুবিধা হয়।
১) পাশের ছবিটি আমার মায়ের। পুত্রশোকে উনি কাঁদছেন, বারবার বেহুস হচ্ছেন। উনাকে কান্নার সুযোগ দিন। এ অবস্থায় পুত্র হারানোর শোকে উনার অনুভূতি কেমন? দয়া করে এই প্রশ্নটি কোনো সাংবাদিক , গুণীজনেরা উনাকে করবেন না।
২) রাজনৈতিক গোলযোগের মাঝে পড়ে আমি মারা যাইনি। আপনাদের সবাইকে আমি বাঁচিয়ে দিলাম। তাই, আমাকে নিয়ে আর দলাদলি করতে হবেনা। কারো বিরুদ্ধে মামলা -মোকাদ্দমা করতে হবেনা। থানা-পুলিশদের মামলা নিবে কি নিবেনা -এই চিন্তা করতে হবেনা।
৩) দীপন ভাইয়ের বাবা অনেক বড় মানুষ। উনি উনার সন্তান হত্যার বিচার চান নি। আর আমিতো আমি। কূপের ঢাকনা খোলা থাকতেই পারে। আমি কেন পড়তে যাবো? তাই, আমিও আমার এই মর্মান্তিক মৃত্যুর জন্য কারো বিচার চাইনা।
৪) আমি চাইনা। এ ঘটনা নিয়ে কোনো তদন্ত কমিটি গঠিত হোক। আমার মা একজন সাধারণ মহিলা। তদন্ত কমিটির বড় বড় কর্মকর্তারা ছুটোছুটি করবেন-মাকে হাজার প্রশ্ন করবেন। পুত্রশোকে মুহ্যমান মা - তদন্ত কমিটির বুঝবেনই বা কি আর জবাব দিবেনই বা কি? উনাকে একটু শান্তিতে থাকার সুযোগ দিন।
৫) তদন্ত কমিটির কাজগুলো যেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়- অভিযুক্তদের চরম শাস্তি হয়- এ জন্য উনাদের কেউ মায়ের কাছে ঘুষ চাইতে পারেন। ঘুষের টাকা দেওয়ারও দরকার নেই। তদন্ত কমিটিরও দরকার নেই।
৬) নির্বাচনী নানা ইশতেহারে নিয়ে প্রার্থীরা হাজির হোন। নানা মুখরোচক কথা বলেন। আমি ছোট মানুষ এসবের কিছুই বুঝিনা। শুধু ইচ্ছে ছিলো। মানবশিশুর মৌলিক চাহিদাগুলো যেন আমার পূর্ণ হয়। আমার স্বপ্নসব আজ পূর্ণ হলো- গভীর কূপে লাশ হয়ে। তাই, আমার বিনীত অনুরোধ- আগামী কোনো নির্বাচনে দয়া করে -আমার মায়ের কাছে আপনারা আর ভোট চাইতে আসবেন না।
৭) আমি কোনো বড় রাজনীতিবিদ কিংবা উর্ধ্বতন কর্মকর্তার ছেলে না। তাই, এই মৃত্যু নিয়ে শোকাহত হওয়ার কিছুই নেই। বরং লাভ হলো- এভাবে যদি কিছু শিশু কূপে পড়ে, খুণ হয়ে, গাড়ি চাপা পড়ে, পিটুনি খেয়ে মারা যায়- তবে এই জনবহুল দেশে জনসংখ্যার চাপ অনেক কমে।
৮) আমিতো বলতে গেলে অনেক ভাগ্যবান- মাতৃগর্ভে আমাকে গুলিবিদ্ধ হয়ে জন্ম নিতে হয়নি।
৯) আর এক সপ্তাহ পর আমার জন্মদিন ছিলো। আমি আমার মায়ের কাছে একটা ক্রিকেটের ব্যাট আর বল চেয়েছিলাম। স্বপ্নছিলো সাকিব, মাশরাফি'র মতো বিশ্বসেরা খেলোয়াড় হবো। মা রাগ করে বলেছিলেন- ধূর হ! ভাত খাওনের মুরোদ নেই- আবার ক্রিকেট ব্যাট। আমি চিরজীবনের জন্য দূরে-অনেক দূরে সরে গেলাম। মা-আমাকে দেখছেন না। কিন্তু, আমি মাকে দেখছি। মায়ের প্রতি ফোঁটা চোখের জল আমার গায়ে এসে পড়ছে। মায়ের গভীর বেদনার নিঃশ্বাস আমার শরীরে এসে বিঁধছে। এ কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা পৃথিবীর কোনো মাকে দেয়া হয়নি।
আমি বিচার চাইনা, কারো শাস্তি হোক সেটাও চাইনা। চেয়ে কি হবে বলুন। আমিতো আর মায়ের কোলে ফিরে যেতে পারবোনা।তবে একটা অনুরোধ- আর কোনো সন্তানকে যেন-আমার মতো এভাবে অকালে মারা যেতে নাহয়। আমার মায়ের মতো কোনো মাকে সারাজীবনভর পুত্রশোকে বিলাপ করে কাঁদতে না হয় ।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ রাত ৩:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




