somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এ এক অন্যরকমের বিজয়।

১৩ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ রাত ৯:০২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :





বিজয় দিবসের জন্য একটা লিখা লিখছিলাম। লিখার মাঝখানে এক শুভাকাঙ্খীর আমন্ত্রণে শিশুদের একটা প্রতিযোগিতা দেখতে ভোরের কুয়াশার নরম প্রাচীর ভেদ করে স্কুলে গিয়ে হাজির হলাম। পৃথিবীর নানা দেশের ছেলেমেয়েদের কলরোলে স্বর্ণ কঙ্কনের স্বরের বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাসে মুখরিত চারপাশ।

মোট ১০০ শিশুর মাঝে তুমুল প্রতিযোগিতা চলছে। পাঁচ রাউন্ডে পুরো প্রতিযোগিতাটি সাজানো। বাইরের বিশাল ক্যাফটেরিয়ার পরিজনদের উৎকন্টা আর ভিতরের পণ্চাশ টেবিল জুড়ে জমে ওঠছে তুমুল প্রতিযোগিতা। ভিতরের রুম থেকে কোনো শিশু ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাইরে এসে মায়ের কোলে দুহাতে মাকে আঁকড়ে ধরে তার কান্নার স্বর আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। মা যতই শান্ত্বনা দিয়ে বুঝাতে চান- এটা শুধুই একটা খেলা। এতো কান্নার দরকার নেই। আজকে হেরেছো- কালকে অবশ্যই জিতবে। কিন্তু, শিশু মানতে চায়না। হারতো হারই।

আমাদের রেয়ান দু রাউন্ড জিতে এক রাউন্ড ড্র করে এখন চতুর্থ রাউন্ড খেলার জন্য টেবিলে বসেছে। এই রাউন্ডে ড্র করতে পারলেও সে পণ্চম রাউণ্ডে খেলতে পারবে।অল্পদূরের টেবিলে বসা এক পরিবার। মা ছেলের প্রশংসা করেই যাচ্ছেন। প্রশংসাগুলো লম্বা হতে হতে একটার সাথে আরেকটা যেন জট পাকিয়ে যাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে, দেশীয় কোনো পরিবার। ভাবলাম- কথা বলবো কিনা?

কথা বলে জানলাম- পাকিস্তানের। আমরা বাংলাদেশের শুণেই- মা বললেন- ও বাঙ্গালী। তুম হামকো ধোঁকা দিয়া।
পাকিস্তানের সব মানুষের এখনো ধারণা- ৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে বাঙ্গালীরা পাকিস্তানকে ধোঁকা দিয়ে ভারতের পরামর্শে দেশটাকে দুভাগ করেছে। অত্যন্ত তুচ্ছার্থে ভদ্রলোক জানতে চাইলেন কি কাজ করি?
পাকিস্তানী আর ভারতীয়দের ধারণা -বাংলাদেশীরা কেউ তেমন একটা ভালো কাজ এ দেশে করেনা। আজ পাকিস্তানী কেউ হলে- কমপক্ষে কয়েকটা স্টোরের মালিক হতে পারতাম।
বললাম- এই একটা কাজ করি।
এবার উনি বললেন- তা কি কাজ করেন?
এবার বললাম - কি কাজ করি। শুণে ভদ্রলোক যেন একটু চুপসে গেলেন।

রেয়ান ওদিকে চতুর্থ রাউন্ডে ড্র করে পণ্চম রাউন্ডে ওঠেছে। লিজা আপুর চোখে মুখে নিমরাতের রুপালী চাঁদের ঝিলিক। পন্চম রাউন্ডে খেলবে মোট আটজন। ১০০ জন থেকে ৯২ জন ছিটকে পড়েছে। কর্তৃপক্ষের একজন বাইরে এসে লিস্ট দেয়ালে লাগিয়ে গেলেন।
কে কোন টেবিলে এবং কার সাথে খেলবে।

চতুর্থ টেবিলে খেলবে- ইতিশাফ রেয়ানের সাথে নিয়াজ খাঁন।
আমি লিজা আপুকে বললাম- এই নিয়াজ খাঁন কি ঐ পাকিস্তানী পরিবারের ছেলেটা?
উনি বললেন- হ্যাঁ। এখানে আর মুসলমান নামের কে হবে?

মনে মনে ভাবলাম- এবারতো শুরু হলো তাহলে আসল যুদ্ধ। সাধারণ শিশুদের একটা খেলা কীভাবে অন্যদিকে মোড় নিলো।
ফাইনাল রাউন্ড শুরু হওয়ার আগে দশ মিনিটের বিরতি ঘোষণা করা হলো। রেয়ানকে নিয়ে আমি টেবিলের এক পাশে গিয়ে বসে শিশু মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে গিনেজ ওয়ার্ল্ড-এর প্রাথমিক মেম্বারশিপপ্রাপ্ত সিদ্দিকুর রহমানের বীরত্বের গল্প ওকে বললাম। ৭১ সালে সিদ্দীকের বয়স ছিলো মাত্র ১১ বছর। বড় বড় চোখে রেয়ান সিদ্দিকুরের গল্প শুণলো। আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেছে ওর কোটি গুণ। চেহারায় বিজয়ের রঙ যেন মিশে আছে।

খেলা শুরু হয়ে গেছে। প্রতি সেকেণ্ডে আমাদের টানটান উত্তেজনা বেড়েই চলছে। ইচ্ছে করছে- ভিতরে গিয়ে রেয়ানের পাশে দাঁড়াই।
পাকিস্তানী পরিবারটি ধরে নিয়েছে -এ শুধু সময়ের অপেক্ষা। বিজয় ওদের নিশ্চিত। ৩৫ মিনিট , ৪০ মিনিট কেটে গেলো।
স্ফটিক সাদা কাঁচের জানালার ভিতর দিয়ে চেয়ে আছি। বুকের ভিতর বাজছে ভুকম্পউৎসব।

দেখলাম- রেয়ান এবার ওঠে দাঁড়িয়েছে। দৌড়ে ছুটে আসছে মায়ের দিকে। চোখে-মুখে হাসির ঝিলিক। যা বুঝার বুঝে গেলাম।
বিজয়ের মাসে এ যেন এক অন্যরকমের বিজয়। চোখ দিয়ে কয়েকফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।
কোনো বিদ্বেষ, ঘৃণা আর হিঙসায় নয় - মেধা, মননে আর যোগ্যতায় বাংলাদেশের এইসব সোনার টুকরো ছেলেরা সারা বিশ্ব জয় করুক।

লিজা আপু ছেলেকে বুকে আগলে ধরে বললেন- আল্লাহর কাছে অসংখ্য শুকরিয়া। ইস- লাল সবুজ পতাকাটার আজ বড় দরকার ছিলো।







সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ রাত ৯:০২
১৬টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জুলাই আগস্ট সেপ্টেম্বর কোন মাসেই নয় দুর্নীতি সেদিনই বন্ধ হবে-----

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৫৪



জুলাই আগস্ট সেপ্টেম্বর কোন মাসেই নয় ..।

দুর্নীতি সেদিনই বন্ধ হবে
যেদিন মানুষ নিজের কাছে
মিথ্যে বলা বন্ধ করবে
অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করে
সত্যের পথে দৃঢ় পায়ে চলবে।

যেদিন বিবেক জাগবে মনে
লোভ হারাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মধু মাসে বিয়া

লিখেছেন রোকসানা লেইস, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৫৮


সকাল থেকেই মেঘলা আকাশ অথচ রাতের বেলা দেখেছিলাম অনেক তারার মেলা আকাশে। একটুখানি অরোরার আলো ও ঝিলিক দিয়েছিল। রাত ভোরের দিকে অনেকটা সময় আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলাম। জরুরী কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

সরকার কি ইউনূস সাহেবকে ভয় পাচ্ছে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:০৩


ব্যাপারটা এখন আর কোনো সন্দেহের অবকাশ রাখে না। বাংলাদেশে যে সরকারই আসুক, আওয়ামী লীগ হোক কিংবা বর্তমান সরকার, সবাই যেন একজন কমন করফাঁকিদাতা খুঁজে পেয়েছে। সেই করফাঁকিদাতার নাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্ধকারের আলোকবর্তিকা

লিখেছেন স্প্যানকড, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৬




একটা দেশ যখন শিক্ষিত চাপাবাজ, ক্ষমতার দরবারে নতজানু বুদ্ধিজীবী এবং মুখোশধারী ডাকাতদের হাতে পড়ে, তখন সেই দেশ আর মানচিত্রে থাকা একটি ভূখণ্ড থাকে না, হয়ে যায় আলীবাবার চল্লিশ চোরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মৃত্যুর আগে কি মানুষ টের পায়, সে মারা যাচ্ছে!

লিখেছেন রাজীব নুর, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭



মৃত্যুর কয়েক মুহুর্ত আগে, টের পাওয়া যায়- মরে যাচ্ছি।
সময় শেষ। তবে সবাই বুঝতে পারে না। কেউ কেউ বুঝতে পারে। আমার বাবা একদিন মাকে বলল, আমার দোষ ত্রুটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×