
জানিনা, এ লিখাটি লিখে আমি শেষ করতে পারবো কিনা। বারবার আমার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসছে।
খুবই সহজ,সরল,বোকা আর ভাবুক ছিলো ছেলেটি। বই পড়তে পড়তে তন্ময় হয়ে যেতো তার মন। স্কুল ছুটি হলে রাস্তায় ধারে মাটিতে বসে পথকলি শিশুদের পাঠ দিতো। ঘন্টার পর ঘন্টা চলে যেতো। ছেলেটির আর বাসায় ফিরা হতোনা। কোনোদিন বাসায় ফিরে আসতো খালি গায়ে। মা একদিন ছেলের খুঁজে ঘর থেকে বের হয়ে একটু দূরে এসে দেখেন- তার আদরের ছেলেটি রাস্তার পাশে খালি গায়ে বসে ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদছে।
মা বললেন- সোনামনি তুমি এভাবে কাঁদছো কেন? তোমার গায়ের জামা কই?
বোকা ছেলেটি কাঁদতে কাঁদতে বলে- কাঁদবো না মা। জয়নুল যে কিছুতেই "তিন"এর নামতাটা বলতে পারছেনা।
মা এবার বলেন- জয়নুল টা কে ?
বোকা ছেলেটি তার পাশে বসা পথকলি শিশু জয়নুলকে দেখিয়ে দিয়ে বলে- এইতো জয়নুল। জয়নুলের গায়ে বোকা ছেলেটির জামা।
জানো মা, ওকে আমি আমার জামাটি দিয়েছিলাম যেন ও পড়া ঠিকমতো শিখে।
মা আঁচল দিয়ে ছেলের চোখ মুছেন। স্মিথ হেসে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে ঘরে ফিরেন।
এই বোকা ছেলেটি হঠাৎ করে এক অদ্ভূত কাণ্ড ঘটালো। মাত্র ১৪ বছর বয়সে পুরো পাকিস্তানে মাধ্যমিকে প্রথম। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় আবারো সেই চমক লাগা সাফল্য। তারপর ১৯৫৫ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে সর্বকালের সব রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়ে পুরো পাকিস্তানে প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক লাভ।
একাধিক চমক লাগানো অভিভূত সাফল্যের সবচেয়ে স্মরণীয় বছরটি ছিলো তার ১৯৬২ সাল। মাত্র তিরিশ বছর বয়সে এই বোকা চিরনবীন, চির তরুণ যুবকটি ইন্টারনাল মেডিসিন এবং কারডিওলজি- এই দুই বিষয়ে লন্ডনের রয়াল কলেজের ইতিহাসে রেকর্ড করে এমআরসিপি ডিগ্রী লাভ করেন। বিশ্ববিখ্যাত মেডিকেল জার্নালগুলোতে প্রকাশিত হতে থাকে তাঁর একের পর এক সাড়া জাগানো প্রবন্ধ।
লণ্ডনের রয়েল কলেজ সহ পৃথিবীর বিখ্যাত মেডিক্যালে কলেজগুলো থেকে শিক্ষকতার জন্য অনুরোধ আসতে থাকে।কিন্তু বোকা মানুষটির মন যে পড়ে আছে অনাথ জয়নুলদের কাছে। অসহায় মানুষগুলোর কথা ভাবলেই পরবাসে মনটা হাহাকার করে ওঠে। তাই,
অর্থ, বিত্ত, বৈভব সহ সমস্ত প্রলোভন উপেক্ষা করে বোকা মানুষটি শুধু দেশের ভালোবাসায় ফিরে এলেন দেশের মাটিতে। বোকা না হলে বলুন এমনটি কেউ করে!
এই বোকা ছেলেটি ১৯৬৮ সালে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে ঢাকা মেডিকেল কলেজে মেডিসিনের অধ্যাপক পদে উন্নীত হন।
দু বছরের মধ্যেই অসম্ভব মেধাবী, গুণি, প্রগ্গাবান এ মানুষটি ১৯৭০ সালে Pakistan best professor award" এ ভূষিত হন।গলায় মেডেল পরিয়ে দেয়ার জন্য-প্রেসিডেন্টের নিমন্ত্রণ আসে। কিন্তু বর্বর পাকিস্তানীদের যন্ত্রণা, জুলুম, নির্যাতনের প্রতিবাদে তিনি নিমন্ত্রণ পত্রটি শুধু ছিঁড়েই ফেললেন না বরং পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে তীব্র ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন- পৃথিবীর সব মেডেল দিয়ে কী হবে, যদি একটি স্বাধীন ভূখণ্ডই না থাকে।
দেশে ফেরে করেছিলেন এক ভুল। এখন প্রেসিডেন্ট পদক ফিরিয়ে দিয়ে করলেন সবচেয়ে বড় ভুল। সেদিন থেকেই সামরিক জান্তার চক্ষশূল হলেন। জীবিত থাকতেই নাম ওঠে গেলো- শহীদের লিস্টে।
দেখতে না দেখতেই শুরু হলো যুদ্ধ। মুক্তপাগল মানুষগুলো শুরু করলো জীবন মরণ লড়াই। বোকা মানুষটি জীবন নিয়ে পালাতে পারতেন। কিন্তু , তা না করে তিনি শুরু করলেন গোপনে মুক্তির উন্মাদনায় মেতে ওঠা মানুষগুলোর চিকিৎসা। দুঃস্থ, অসহায়, খেটে খাওয়া, বাঙালী , অবাঙগালী কাউকেই তাঁর চিকিৎসা সেবা থেকে বন্চিত করলেন না। জীবন বিপন্ন, মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে ছুটে গেছেন এই মানবতাবদী মানুষটি গোপনে গোপনে মানুষগুলোর চিকিৎসা সেবা দিতে।
দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বিজয়ের খবরগুলো শুণে শুণে শিহরিত হন। জানালা খুলে ভোরের আকাশের পাণে চেয়ে ভাবেন- এই বুঝি ওঠলো স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয়ের প্রথম লাল সুর্য। কেটে যায় দিন। তাঁর অপেক্ষার শেষ হয়না। বিজয় আসেনা। বিজয় কতদূর।
১৫ই ডিসেম্বর সকাল বেলা। মন বলছে মুক্তির সেই দিনটির আর বেশী দেরি নেই। কয়েকদিন আগে এক পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা এক হাতে স্ট্যানগান আর আরেক হাতে ব্যান্ডেজ নিয়ে রাতের আঁধারে হারিয়ে যেতে যেতে বলেছিলো- স্যার । দোয়া করবেন। এই সপ্তাহেই বিজয়ের লাল সূর্যটি ওঠবে। আজ আপনি অন্ধকারে আমার সেবা দিতে এই ঝুপড়ি ঘরে এসেছেন। একদিন ভোরে বিজয়ের খবর নিয়ে আপনার ঘরে আমি আসবো।
এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। মুখে অম্লান হাসিতে ভরে ওঠলো তাঁর।নিশ্চয়ই ছেলেটি বিজয়ের খবর নিয়ে এসেছে। দরজায় খুলেই দেখেন পাক হানাদার বাহিনীর দল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বেঁধে ফেললো তাঁর চোখ। স্ত্রী ডাঃ জাহানারা কিছুই বুঝতে পারছেন না। শরবিদ্ধ পাখীর মতো ছটফট করছেন। শুধু বাংলাদেশ, পাকিস্তান আর ভারতের নয় ।সারা পৃথিবীর এক অমূল্য সম্পদ ডাঃ ফজলে রাব্বিকে ধরে নিয়ে গেলো পৃথিবীর বর্বর হানাদার পাক কুত্তা, শুয়র বাহিনীরা। ১৬ ই ডিসেম্বর বিজয় আসলো। কিন্তু মুক্তি পাগল এইবোকা মানুষটি কই।
১৮ই ডিসেম্বর পৃথিবী বিখ্যাত ডাক্তার ফজলে রাব্বির মৃতদেহ পাওয়া গেলো রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে।খালি গায়ে বেয়নেটের খুঁচায় ক্ষতবিক্ষত দেহ। চোখ-হাত-পা বাঁধা। পকেটে পাওয়া গেলো ব্যান্ডেজ।কিছু ঔষধপত্র। স্বাধীনতা যু্দ্ধ শুরু হওয়ার পর সবসময় এগুলো পকেটে রাখতেন। যদি যুদ্ধে আহত কোনো মুক্তিযোদ্ধার দরকার হয়। কী দেশপ্রেম। কী ভালোবাসা।
বড় দুঃখ হয়। দেশের ভালোবাসায় জীবন দেয়া ডাঃ ফজলে রাব্বীর মতো কারো জন্ম হলোনা বিগত ৪৪ বছরে আর এই দেশে ।
কেউ কি গর্বের সাথে বলতে পারবেন? যে বিশ্বসেরা ডাক্তারকে বৃটিশ রয়েল কলেজ সম্মানের সাথে রেখে দিতে চেয়েছিলো-সেই রকম একজন ডাক্তার আজো আমাদের হলোনা। যদি হয়-তবে কেন- চিকিৎসা সেবা নিতে আমাদের মাননীয় মন্ত্রী, এম,পি,রাষ্ট্রনায়কেরা চিকিৎসা সেবা নিতে বিদেশের মাটিতে ছুটে যান? মৃত্যু যখন সামনে চলে আসে তখনতো আর আবেগ দিয়ে কথা বলা যায়না, তাইনা?
মালেশিয়া এয়ারপোর্টে বসে মাহাথির বলেছিলেন- তোমরা আমাকে চিকিৎসা দিতে এখানে নিয়ে এলে কেনো?
ওরা বলেছিলো-স্যার। দেশে ভালো চিকিৎসা নেই। আপনার চিকিৎসার জন্য সুইজারল্যাণ্ড যাওয়া দরকার।
মাহাথির বলেছিলেন- আমার দেশের যে মানুষগুলোকে নিয়ে আমি রাজনীতি করি-ওরা সবাই কি অসুস্থ হলে সুইজারল্যান্ড যেতে পারবে?সেই আর্থিক স্বচ্ছলতা কি সবার আছে?
ওরা বলেছিলো- না তা নেই। তবে স্যার। আপনি যে আমাদের প্রেসিডেন্ট।
মাহাথির রাগান্বিত স্বরে এবার বললেন- আমি আমার পুরো দেশকে অসম্মান করতে পারিনা। বিশ্বমানের সব চিকিৎসা সেবা কুয়ালামপুরে হওয়ার জন্য যা কিছু করা দরকার তাই করো। আমার চিকিৎসা দেশের মাটিতেই হবে। একটা দেশের প্রেসিডেন্ট চিকিৎসা করার জন্য যদি বিদেশের হাসপাতালে ছুটে যায়-তবে সেই দেশের গর্বের আর কিছুই রইলো না। চিকিৎসার উচ্চ অধ্যয়ন করতে, গবেষণা করতে, চিকিৎসা দিতে আমার সন্তানেরা বিদেশে যেতে পারে প্রয়োজনে হাজার বার। তবে চিকিৎসা নিতে একবারও নয়।
আমার মনে পড়ে- ফালানী তখন ভারতের কাটা তারে ঝুলে আছে। প্রতিবাদ মূখরিত চারপাশ। যে যেভাবে পারে প্রতিবাদে শামিল হচ্ছে।
কাটাতারে ঝুলন্ত ফালানীর ছবিটি সবার প্রোফাইলে। ভারতীয় সবকিছু বয়কটের দাবী জোড়দার হচ্ছে। আমার এক বন্ধুকে দেখা যায়-প্রতিবাদে মুখর।প্রতিটি মানববন্ধনে তার হাতে পোস্টার। ঝুলন্ত ফালানি নয়, এ যেন কাটা তারে ঝুলে আছে বাংলাদেশ" লিখে আমরা স্ট্যাটাস দেই। কিছুদিন পর-আমার সেই মা পাগল বন্ধুটি দূরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত তার মাকে নিয়ে ভারতের এক রেলওয়ে স্ট্যাশানে দৌড়াচ্ছে। অসুস্থ মা ভালোভাবে হাঁটতে পারছেন না। দৌড়াবেন কেমন করে? কিন্ত ট্রেন ধরতে না পারলে যে ঠিকমতো মা কে নিয়ে ভারতের হাসপাতালে পৌঁছানো যাবেনা। জীর্ণ শীর্ণ শুকিয়ে যাওয়া মাকে কাঁধে নিয়ে বন্ধুটি এবার দৌড়ায়। বাঁচাতে হবে মাকে। মা নাইতো পৃথিবী নাই।
৪৪ বছরে দেশে একটা ভালো হাসপাতাল হলে- সেই বন্ধুকে যারা ফালানীকে শ্যুট করে কাটাতারে ঝুলিয়ে রাখে তাদের মাটিতে চিকিৎসার জন্য মাকে কাঁধে নিয়ে অসহায়ের মতো এভাবে দৌড়াতে হতোনা। এই ব্যর্থতা কার? কে দিবে এর জবাব?
যে পাকিস্তান আজো আমাদের সাথে গাদ্দারী করে নারকীয় বর্বরতার জন্য ক্ষমা প্রার্থণা করেনা। বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে পাঠানোর মতো ধৃষ্টতা দেখায়। সেই পাকিস্তানের Shaukat Khanum Memorial Cancer Hospital & Research Centre এ অসংখ্য বাংলাদেশের মানুষ চিকিৎসা নিচ্ছেন। সবচেয়ে কম খরচে কিডনী প্রতিস্থাপন করা হয় পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে। ভুক্তভোগী কত মা, বোন,বাবা, ভাই সেখানে বাঁচার আশায় ছুটে যাচ্ছেন।
আজ ডাঃ ফজলে রাব্বীকে বারবার মনে পড়ছে। যে মানুষগুলোর সেবা দিতে উনি পৃথিবী বিখ্যাত হাসপাতালগুলো ছেড়ে এই দেশে চলে এসেছিলেন। যাদের প্রেসিডেন্ট পদক উনি তীব্র ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেছিলেন। স্বপ্ন দেখেছিলেন- এই দেশেই হবে পৃথিবীর সেরা চিকিৎসালয়। জীবন বাঁচানোর আশায় সেই মানুষগুলোই আজ শত্রু দেশে ছুটে যায়। বিজয়ের ৪৪ বছরে এই ব্যর্থতা কার?
কারণ করার কিছুই নেই। বেঁচে থাকাটাই যখন আসল হয়ে দাঁড়ায় তখন রাজনীতি,চেতনা আর আবেগ খাটেনা। জাতীয় পতাকা বানানো আর সোনার বাংলা গান গেয়ে রেকর্ড করে শুধু আবেগের বিপননই করা যায়। ৪৪ বছর পরেও আমি দেশে একটি হাসপাতাল খুঁজছি। লিখলে বিজয়ের অবমাননা করা হবে নাতো?
বিদেশের হসপিটালগুলো দেশে হাসপাতাল বানিয়ে টাকা নিয়ে যায়। আবার ধনী মানুষগুলো বিদেশের হাসপাতালে গিয়ে টাকা দিয়ে আসেন। অথচ ৪৪ বছরে ডঃ ফজলে রাব্বির রক্তে ভেজা এই দেশে একটা ভালো হসপিটাল হয়না কেন? কে দেবে এই জবাব?ডাঃ ফজলে রাব্বি আপনি ক্ষমা করবেন আমাদের। জানিনা কে লজ্জিত আপনার কাছে? আমি, আপনি, রাষ্ট্র, দেশ, রাজনীতি নাকি আমরা সবাই।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ সকাল ৯:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





