আমাদের সমাজে আমরা অনেকেই ধর্ম পালন করি, কিন্তু ধর্মের শিক্ষাটা আমাদের বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হয় না। কারন আমরা ধর্মকে নিছক কিছু রীতি-নীতির মধেই সীমাবদ্ধ মনে করছি। তবে ধর্ম মানে শুধুমাত্র কিছু আচার অনুষ্ঠান নয়, দ্বীন শব্দ দিয়ে বোঝানো হয়েছে একটি সামগ্রিক জীবনব্যবস্থা, অর্থাৎ ধর্মের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন কিভাবে পরিচালিত হবে।
এই ধর্মের শিক্ষা আমাদের অন্তরে ধারন না করায় দেখা যায়, ধর্ম কর্ম ঠিকমতো নিয়ম মেনে পালন করার পরও আমাদের ব্যক্তিগত চারিত্রিক শুদ্ধতা আসে না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও পড়ছি, আবার একই সময় মানুষ ঠকাচ্ছি, অন্যের জমি-সম্পদ দখল করছি, অনবরত মিথ্যা বলে বেড়াচ্ছি নিজের সুবিধার জন্যে। বাড়ীর চাকরের সাথে মসজিদে এক কাতারে নামাজ পড়তে পারলেও বাসায় এসে এক টেবিলে ভাত খাওয়া সম্ভব হয় না। আমরা হাজার লক্ষ টাকা ব্যয় করে দেশে বিদেশে ঘুরতে যাই, কিন্তু এর চেয়ে কম টাকা দিয়ে গরীব দু্ঃখীর উপকার হতে পারে। অনেক সময় ঘরের ছেলে-মেয়ে বিরাট ভুল করলে তেমন দোষ হিসেবে ধরা হয় না, কিন্তু কাজের মেয়ে সামান্য ভুল করলেও তাকে ব্যপকভাবে শাসানো হয়, ক্ষেত্র বিশেষে বেদম মারধর ও করা হয়। অন্যের জমি দখল করাকে, ভেজাল বা মেয়াদোর্ত্তীন্ন পণ্য বিক্রী করাকে, গরীবের পেটে লাথি মেরে শোষন করাকে, অনবরত মিথ্যা বলে লোক ঠকানোকে আজকালকার সমাজে কোন দোষ ধরা হয় না, এসব কাজকে বুদ্বিমত্তার মানদন্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আমাদের কিছু সংখ্যক মাওলানা সাহেবগন ও ক্রমাগত এক পক্ষ আরেক পক্ষকে নিয়ে কত বিষোদাগার করে যাচ্ছেন। নিজেদের মধ্যে কত বিভক্তি - সুন্নি, ওয়াহাবি, হানাফী, শাফেয়ী, শিয়া, জামাতি, বিভিন্ন মাজারপন্থী, বিভিন্ন পীরপন্থী, তাবলিগ, আহলে হাদিস, সালাফী, জিহাদী ইত্যাদি নানান দল-উপদলে বিভক্তি। প্রায় সময় দেখা যায়, জুমার নামাজের খুতবায় এরকম এক পক্ষ অন্য পক্ষকে নিয়ে আক্রমণ করাটাই হয়ে প্রধান আলোচ্য বিষয়। আর আমাদের মধ্যেও কিছু সংখ্যক জনগন এ ধরনের কাঁদা ছোরাছুরি বেশ উপভোগ করি। বিভিন্ন ধর্মীয় দল-উপদলের মধ্যে চরমপন্থা এখন প্রকট আকার ধারন করেছে। তাছাড়া অনেক সময় দেখা যায়, মসজিদের মতোয়াল্লী বা কমিটি উপরোক্ত যে দলের অনুসারী হয়, ইমাম সাহেবকেও সেই পক্ষ অবলম্বন করতে হয়। তাই অনেক ক্ষেত্রে সমাজের নানা অসংগতির চেয়ে তাদের বক্তব্যে ব্যক্তি তোষন প্রাধান্য পায়।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) এর অনেক হাদীস আছে যেখানে লেনদেনের এবং ব্যবসায়ীক অসততা নিয়ে, অভদ্রতা-অনম্রতা নিয়ে, কারো অপকার নিয়ে, সামাজিক অসমতা নিয়ে, সামাজিক দন্ধের বিরুদ্ধে, মিথ্যা ও চোগলখুরীর বিরুদ্ধে, প্রতারনা ও শোষন-জুলুম-দখলের বিরুদ্ধে, মুসলিম জাতির মধ্যে অনৈক্যের বিরুদ্ধে বলা হয়েছে। এর পরিণতিতে কাল কেয়ামতের ময়দানে কঠিন শাস্তির কথা বলা হয়েছে। দুঃখের ব্যাপার হলো আমরা ইসলামের সঠিক শিক্ষা না নেয়ায় বাস্তব জীবনে এবং কর্মে এই শিক্ষার কোন প্রতিফলন দেখতে পাই না। শুধুমাত্র কিছু রীতি-নীতির মধ্যেই আমরা ইসলামকে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। রাসুলের(সাঃ) অনুসারী হিসেবে আমরা নিজেকে দাবী করলেও তার এবং তার সাহাবীদের জীবন যাপন পদ্ধতি ও কর্ম থেকে কোন শিক্ষা নিই না।
আমাদের সামাজিক ও ব্যক্তিগত চারিত্রিক শুদ্ধতা না আসলে নামায-রোযাও শুদ্ধ হবে না। হারাম ভক্ষনকারীর ইবাদত কবুল হয় না।
আসলে আমরা নিজেদের ব্যক্তিগত ধ্যান-ধারনা ও চরিত্রের সাথে মিল রেখে আমরা নিজেরাই নিজের মত করে একটি জগাখিচুরী ধর্ম বানিয়ে ফেলেছি। সেই ধর্মই আমরা পালন করছি, আর নিজের মত করে যুক্তি দিয়ে বেড়াই।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই নভেম্বর, ২০১৫ সকাল ১০:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



