
হবি কাকার ঘরের পিছন-কুয়োপাড়ে 'খু-উ-ব' হৈচৈ চিৎকার চেচামেচী হচ্ছিল। সবাই দৌড়ে যাচ্ছে সেদিক। কিছু ঠাহর করার আগে- আমিও সেদিকে দে দৌড়। ঘটনাস্থল কুয়ো পাড়ে পৌছে যা দেখলাম- সে দৃশ্য বাংলা সিনেমার শেষ দৃশ্যের টানটান উত্তেজনার চেয়েও হাজারগুন এগিয়ে।
হালু চাচী মানে ছোট কাকার দ্বিতীয় স্ত্রী। ঘরে অপূর্ব সুন্দরী স্ত্রী থাকার পরও এই উড়নচন্ডী দেমাগী ললনায় বুদ হয়ে তুলে নিয়ে বিয়ে করেছিলেন ছোটকাকা। সেই থেকে তার ইহজাগতিক অশান্তির দাবানলের শুরু।
হালিমা আকতার ওরফে হালুচাচী। কাকার সাথে রুটীন ঝগড়ার তীব্রতা আজকের সকালে- উপকুল অতিক্রম করেছিল। তাই এ দশ নম্বর মহা বিপদের ঘনঘটা। ঝগড়া করে কাকার পেদানী খেয়ে রাগে- ক্ষোভে অভিমানে আত্নহত্যার জন্য চাকু নিয়ে কুয়োয় নেমেছে। পাড়ার সবলোক ভীড় জমিয়েছে। সবাই কুয়োর মধ্যে দড়ি ছেড়ে দিয়ে সেটি ধরে তাকে উঠে আসার জন্য কাকতি মিনতি করছে। বাড়ীর মুরুব্বী দাদা কাকা চাচী জেঠিরাও সমবেত হাহাকারে উঠে আসার মিনতি করছে। কিন্তু কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। হালু চাচী বিলাপের সুরে চিৎকার করছে আর বলছে, "আজকে নিজের গলা নিজেই কাইট্যা মইরা- গোলামের বেটা গোলামরে, জন্মের শিক্ষ্যা দিমু। ওরে চৌদ্ধ শিকে পচামু।" খবর পেয়ে ছোটকাকা কুয়োপাড়ে ছুটে এলেন। এসেই কুয়োর মধ্যে ফেলা দড়ি তার শরীরের উপর ছেড়ে- সেটা ধরার জন্য অনুরোধ- উপরোধ হুমকি ধামকি বকা- বকুনি পুলিশ ডাকার হুমকি সব চেষ্টাই বৃথা গেল। হালুচাচীর এক জপ- "আজকে এই কুয়োর মধ্যে মইর্যা জাইর্যা গোলামরে বিয়ে করার শিক্ষা দিমু।" উপায়হীন ছোটকাকা অবশেষে নিজেই- কুয়োয় নামার সিদ্ধান্ত নিলেন, তাকে উদ্ধারের জন্য। ওদিকে কুয়োর মধ্যে থেকে হালুচাচী চাকু উচুঁ করে হুঙ্কার ছাড়ছে," আয় নাইম্যা। আগে তরে খামু, তারপর নিজের জীবন নিজেই"। মা- চাচীরা বিলাপ করছে। কেউ কেউ ছোটকাকাকে কুয়োতে নামতে বাঁধা দিচ্ছে। লুঙ্গিটা কাছা মেরে ছোটকাকা কুয়োতে নামছে। চারদিকে টানটান উত্তেজনা। আমরা ছোটরা কিন্তু ততলেতলে খুব মজা পাচ্ছিলাম।
হঠাৎ হালু চাচাীর আকাশ কাঁপা চিৎকার! কুয়োর ভিতর কি হচ্ছে এত মানুষের ঠাসাঠাসী ভীড় ঠেলে ছোটদের দেখার উপায় ছিল না। তবে হালু চাচীর চিৎকার গুঙ্গানী শুনে অনুমান করতে পারছিলাম। এর খানিক্ষন পর মুরুব্বিরা কুয়োর পাশে ছয়জনকে রেখে বাকী সব লোক দূরে সরিয়ে দিলো। এইবার আমরা যেখানে দাঁড়ানো সেখান থেকে স্পষ্ট কুয়ো দেখতে পারছিলাম। এর মিনিট পাঁচেক পর যে দৃশ্য দেখলাম তা আমার জীবনে দেখা শ্রেষ্ঠ এ্যাডভেন্চার হয়ে রয়েছে আজ অবধি। দেখি দুইপাশে দুটো রশি লাগানো একটা বড় বালতিতে ছোটকাকা বসা, সে একহাত দিয়ে চাচীর চুলের মুঠি ধরে অন্য হাতে রশিটা ধরে আছে, চাচী কাকার মুষ্টিবদ্ধ হাতটি ধরা আর উপরে থাকা ছয়জনে দড়িটা টেনে উপরে টেনে তুলছে। কাকা-চাচী কুয়োর উপরের কাছে আসতেই দুজন লোক কাকাকে আর দুজন মহিলা কাকিকে ধরাধরি করে কলপাড়ে নিয়ে গেলো প্রাথমিক চিকিৎসা আর পরিষ্কা পরিচ্ছন্ন করতে। আমরা ছোটবড় সবাই একসাথে তালি দিয়ে উঠলাম। এ যেন আটলান্টিকের বুকের গভীর থেকে নিমজ্জিত টাইটানিক উদ্ধারকেও হার মানানো গল্প হয়ে ভাসে আমার দু'চোখের পাতায়- এখনো......!!
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা মার্চ, ২০১৮ দুপুর ২:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



