somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বন্ধু তোকে মনে পড়ে (গল্প)

০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ দুপুর ১:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজ আবিরের জন্মদিন। আজ শুধু আবিরের স্মৃতি রয়ে গেছে আবির আর নেই চলে গেছে না ফেরার দেশে। সময় কত দ্রুত কেটে যায়। মনে হয় এইতো সেদিন টিএসসিতে বসে আড্ডা দিয়েছি। আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে ও আবিরকে খুজে বেড়াই। মানুষ নাকি মরে গেলে তারা হয়ে যায়। আবির তুই তারা হয়ে থাকলে দেখ আমি এখনো তোকে ভুলি নাই।

এখনো আমি আবিরের জন্য অপরাধবোধে ভুগি। মনে হয় ওকে বাচানোর জন্য ও আরো কিছু করতে পারত। মাঝে মাঝে মনে হয় আবিরের মৃত্যুর জন্য ওই দায়ী। যদিও জানে সেদিন ওর আর কিছু করার কথা ছিল না, তবুও মন মানে না।

আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সব স্মৃতির সাথে জড়িয়ে আছে আবির। আবিরের সাথে আমার প্রথম দেখা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রথম দেখায় আবিরই যেচে পড়ে এসে পরিচিত হয়েছিল। বিরক্ত হলেও ভদ্রতার খাতিরে তারেকও কিছু কথা বলেছিল। আসলে আমি খুবই অন্তর্মুখি স্বভাবের, সহজে কারো সাথে মিশতে পারতাম না। কিন্তু আবির ছিল পুরো বিপরীত, খুবই মিশুক ও প্রাণচঞ্চল উচ্ছল প্রকৃতির ছেলে। সহজেই কাউকে আপন করে নেওয়ার বিরল ক্ষমতার অধিকারী ছিল। সবসময় ক্যাম্পাস মাতিয়ে রাখতো। পুরোপুরি বিপরীত স্বভাবের হয়েও কখন যে আমরা বন্ধু হয়ে গেছি আমরাও জানি না।

সহপাঠীরা আমাদের বিদ্রুপ করে মানিকজোড় বলে ডাকত, কারণ আমাদের দুজনের মধ্যে কোন মিলই ছিল না, যা ছিল তা হল অমিল। কিন্তু এসব কোন কিছুই আমাদের বন্ধুত্বের মধ্যে বাধা হয়ে দাড়ায় নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ছাদে বসে দুজনে মিলে কত নির্ঘুম রাত কাটিয়েছি গল্প করতে করতে। পূর্ণিমার রাত্র ও খুব রোমান্টিক হয়ে উঠত। বলত ও যাকে ভালবাসবে তাকে ও কখনো কষ্ট দিবে না। ওকি সেদিন জানত যে ওর এই কথা ও রাখতে পারবে না ? যদি জানত তাহলে হয়তবা ভালবাসত না মায়া কে।

আবির কবিতা লিখত, ওর কবিতার একমাত্র শ্রোতা ছিলাম আমি। ওর কবিতাগুলো সত্যিই দারুণ ছিল। ও ছিল খুব ইমোশনাল, ওর কবিতা শুনে রসকষ বিহীন আমারও কান্না চলে আসত। ওকে কতবার বলেছি পত্রিকায় লিখতে, ও শুনে হাসত আর বলত এসব ওর ভালবাসার মানুষের জন্য। ও যাকে ভালবাসে তার জন্যই শুধু এসব। আমাকে ছাড়া কাউকে ও ওগুলো শুনাত না, দেখতেও দিত না। ওনেকেই কত চেষ্টা করেছে ওগুলো চুরি করতে বা লুকিয়ে দেখতে কিন্তু ও যখের ধনের মত সবসময় আগলে রাখত।

বিশ্ববিদ্যালয়ে সব সমস্যার সমাধান করার দায়িত্ব ছিল ওর উপর। কাউকে ভালবাস ? বলতে পারছোনা ? কোন সমস্যা নেই, আবিরকে বললেই সমাধান হয়ে যাবে। কতজনের মাঝে যে ও সম্পর্ক গড়ে দিয়েছে নিজেই বলতে পারবে না। সহপাঠীরা কেউ কোন সমস্যা বা বিপদে পড়লে আবিরের কাছে ছুটে আসত, ও হাসিমুখে সব শুনত এবং চেষ্টা করত সমাধান করে দেওয়ার। ওকে কোনদিন দেখিনি কাওকে ফিরিয়ে দিতে। পারুক বা না পারুক কখনো হাল ছেড়ে দিত না।

সবার মাঝে প্রেম করিয়ে দেয়া কিউপিড আবির একদিন প্রেমে পড়ল, মেয়েটার নাম মায়া, আমাদের ডিপার্টমেন্টেরই। ও মায়াকে ভালোবাসত, কিন্তু মায়ার সামনে গিয়ে দাড়িয়ে ভালবাসার কথা বলার মত সাহস ওর হয়নি। মায়াও যে ওকে ভালোবাসত সেটা ওর মত আমিও বুঝতাম। কিন্তু মায়া চাইত আবির এগিয়ে এসে বলুক, কিন্তু আবির সাহস করে যেতে পারেনি।

বুঝলাম এবার ওকে দিয়ে কিছু হবে না, যা করার আমাকেই করতে হবে। দুজনের সাথে কথা বলে আবিরের জন্মদিনে ওদের ক্যাম্পাসে দেখা করানোর ব্যবস্থা করলাম। সেদিন আমি যদি জানতাম আজ ওর জন্মদিনেই ও আমদের ছেড়ে যাবে, তাহলে আমি কখনোই ওকে আসতে দিতাম না। বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকদিন ধরেই ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের মধ্যে ঝামেলা চলছিল। এসব বিশবিদ্যালয়ের স্বাভাবিক ব্যাপার, তাই কেউই খুব একটা গুরূত্ব দিতাম না।

আমি আর আবির রিক্সা থেকে নেমে দেখি মায়া দাড়িয়ে আছে। আবিরের হাতে হাতে লাল গোলাপ, আর মায়ার হাতে ফুলের তোড়া। আজ আমাদের কোন ক্লাস নেই প্ল্যান হল সারাদিন ঘুরব । আমরা তিনজন দাড়িয়ে দাড়িয়ে এটা সেটা নিয়ে কথা বলছি। এর মধ্যেই হঠাত গোলাগুলি শুরু হয়ে গেল। তিনজন দৌড় দিলাম নিরাপদ আশ্রয়ের আশায়, যদিও নিয়ম হল গোলাগুলি শুরু হলে মাটিতে শুয়ে পড়া। কোথা থেকে যেন লক্ষ্যভ্রষ্ট একটা গুলি এসে ওর বুকে লাগলো।

কিছু একটা আকড়ে ধরতে নিয়ে ও পড়ে গেল। আমি আর মায়া ছুটে গেলাম ওর কাছে। বুঝতে পারলাম আর বেশি সময় নেই, আবিরও বুঝতে পেরেছিল সেটা। আমি ওকে বললাম হাসপাতালে নিয়ে গেলেই ও সুস্থ হয়ে যাবে, প্রতিত্তরে ও শুধু হাসল, যেন আমার বোকামি দেখে। ও মায়ার হাতটা শক্ত করে ধরে হাতে তুলে দিল লাল গোলাপ। মায়াকে বলল, মায়া আমি তোমাকে ভালবাসি। মায়া কথা না বলে কাদতে কাদতে মাথা ঝাকিয়ে সম্মতি জানালো। আবির আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে যেন বলতে চাইল ভালো থাকিস, আমাকে ভুলে যাসনে। এরপরই ও নিশ্চল হয়ে গেল, ওর কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল রক্ত, গোলাপের চেয়ে বেশী লাল।

মায়ার হাতে আমি তুলে দিয়েছিলাম আবিরের লেখা কবিতার খাতা। সেদিন খাতা জড়িয়ে ধরে মায়ার কান্না আমি সহ্য করতে পারি নি। ছুটে বেরিয়ে এসেছিলাম ওর ঘর থেকে।

আমি আজও ভাবি গুলিটা ওর বুকে না লেগে আমার বুকে লাগল না কেন ? আমি তো ওর পাশেই ছিলাম। আমার মৃত্যুতে তো কারও কোন কিছু এসে যেত না।

আবিরের মৃতদেহে হাত রেখে আমি শপথ করেছিলাম ছাত্ররাজনীতির বিষাক্ত ছোবলে আর কোন আবিরকে মারা যেতে দিব না। আমি আমার কথা রাখতে পারিনি বন্ধু, তুই আমাকে ক্ষমা করে দিস।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ দুপুর ২:০৯
৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বঙ্গ ও বেঙ্গলীর শিকড় কী মুছে গেছে? নাকি পুণ্ড্রনগর সভ্যতার মত কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে ??

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৯:০৮


বঙ্গ ও বেঙ্গলীর শিকড় কী মুছে গেছে নাকি পুণ্ড্রনগর সভ্যতার মত কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে ?? সামু ব্লগের এই ক্রান্তিকালে বিষয়টি নিয়ে একটু আলোচনা/পর্যালোচনা করে কিছু সময় কাঠানো... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি বড়দের গল্প - ছোটরাও পড়তে পারে

লিখেছেন মুনতাসির, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:৫০

বিজ্ঞানীরা তিনটা আলাদা দ্বীপে দুইজন পুরুষ আর একজন মহিলা মানুষকে এক বছরের জন্য ফেলে রেখে এসেছে। একটা দ্বীপ ব্রিটিশদের, একটা ফ্রেঞ্চদের, আর শেষটা আমাদের বাংলাদেশীদের। এক বছর পর যখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

সংকটে আওয়ামী লীগের কর্মীরা কোথায় দাঁড়িয়ে?

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:০০

সংকটে আওয়ামী লীগের কর্মীরা কোথায় দাঁড়িয়ে?
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বহুবার প্রমাণ হয়েছে যে, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রকৃত শক্তি থাকে তার তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে। তাদের শ্রম, ত্যাগ, জেল-জুলুম সহ্য করার মানসিকতা এবং... ...বাকিটুকু পড়ুন

খাজনা

লিখেছেন রাজীব নুর, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:২৯



মন! মানুষের মন! মানুষকে তছনছ করে দেয়!
কখনো সে বাঘ, কখনো সে অজগর, কখনো সে শত্রু, কখনো সে বন্ধু!
কখনো সে ঈশ্বর, কখনো সে শয়তান, কখনো সে নিয়তি!
বিদিকিচ্ছিরি কান্ড!

লম্বা টানা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বৈচিত্রে ভরা মহাবিশ্ব, তবে মানুষ কেন একই রকম হবে?

লিখেছেন মিশু মিলন, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:৩৯



এবার শেখরনগর কালীপূজার মেলায় গিয়ে সন্ধ্যার পর ভাগ্নি আর এক দাদার মেয়েকে বললাম, ‘চল, তোদের অন্য এক জীবন দেখাই।’
সরু গলি দিয়ে ওদেরকে নিয়ে গেলাম পিছনদিকে যেখানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×