অনবরত মোবাইলে অচেনা নাম্বার থেকে কল আসায় এক প্রকার ভয়েই রুপালী রিসিভ করছেনা । ৬-৭ বার বাজার পর একবার ধরলো সে সাহস করেই ।
-হ্যালো
-এটা কি নিবিরের নাম্বার ?
-জী না, রং নাম্বার
বলেই রুপালী কল কেটে দিলো । বাসায় তখন সে আর তার ২ বছরের ছোট বোনটি ছিলো শুধু । কিছু অঘটন ঘটলে তো তার মা এসে তার খবর করে দিবে । তাই এরপর আরও অনেকবার মোবাইল বাজার পরও সেই নাম্বার থেকে সে আর রিসিভ করলোনা । চুপচাপ বসে বসে ছোট বোনের জামা-কাপড় গুছিয়ে রাখছে ।
অনেক সময় কেটে কেটে গেল । তবুও রুপালীর মা এখনো আসছেনা । এদিকে তার প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার কথা একটু পরেই । রুপালী খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল । সেই কখন সে দাদার বাসায় গেছে এখনো আসছেনা । নানান কিছু রুপালীর মাথায় ঘুরছে । এমন সময় রুপালীর মা চলে আসলো । রুপালী প্রাইভেট পড়ড়ে যাবে তাই তার নিরাপত্তার জন্যই ঘরের মোবাইলটি সে নিয়ে যায় সাথে করে । আজও যথারীতি সে মোবাইলটি সাথে নিয়ে বের হলো । সাথে তার বান্ধবী লিজাও তার সাথে যাচ্ছে । লিজাকে এরকম অচেনা নাম্বার থেকে কল আসছে বলায় লিজা তো ভেবেই বসছে কেউ হয়তো রুপালীকে পছন্দ করে তাই বারবার কল দিচ্ছিলো কথা বলার জন্য । রুপালী সবেমাত্র নবম শ্রেণির ১ম সাময়িক পরীক্ষা দিলো । এ বয়সে সব মেয়েদেরই একটু উড়ুউড়ু ভাব দেখা দেয় । রুপালীও এর বাহিরে নেই । আর লিজার কথা শুনে তো রীতিমতো নতুন আগ্রহ জন্মালো তার সেই অচেনা নাম্বারের মানুষটির সাথে কথা বলতে । আর এমনই সময় সেই অচেনা আগন্তুক রুপালীকে কল দিলো । রুপালী প্রবল আগ্রহ সহকারে রিসিভ করলো ।
-আচ্ছা আপনি যেই হোন কিছুক্ষণ কথা বললে তো কোন সমস্যা নেই, তাইনা । রং নাম্বার বলে তো আর আমি ভূত হয়ে যাইনি । মানুষই তো আমি । আর মানুষ তো মানুষের সাথে কথা বলবেই।
-জী, বলেন আপনি । (রুপালী)
-আমি মিলন । আপনি ?
- আমি রুপালী
-বাহ । বেশ সুন্দর নাম তো ।
-ধন্যবাদ
-কি করছেন ?
-এইতো একটু বের হলাম প্রাইভেট পড়তে যাবো বলে ।
-তো কি যাবেন না ?
-নাহ
-কেন ?
-এমনই
-তাহলে তো কথা বরার সময় বাড়লো আরও (হাসি দিচ্ছে মিলন )
-হয়তো
-কেন আপনার কি কথা বলতে ভালো লাগছেনা ? হয়তো বলেন যে ?
-তা বলিনি আমি । আপনি ভুল বুঝছেন ।
-তাহলে
রুপালীর খুব হাসি পেল তখন । তাই আর কিছু না বলে রুপালী হাসতেছে ।
-বাহ ! তোমার হাসিটা তো খুব সুন্দর ।
-জ্বী, না । সামনাসামনি ভালো লাগবেনা আমার হাসি এতোটা ।
-কি যে বলো । এতো সুন্দর যার হাসি তাকে সামনে থেকে দেখলে তো আরও কত না জানি ভালো লাগবে ।
-তাই
এভাবেই তাদের কথা শুরু । একে অপরকে জানতে শুরু করা । রুপালীর সারাদিন ভাবনা জুড়ে কেবল এই অচেনা মানুষটিই থাকে । তার পড়াশোনা যেন এবার সত্যি সব জলে গেল । পড়াশোনায় বিশাল অবহেলা করতে শুরু করলো সে । কি জন্য যেন সারাদিন সে শুধু সেই অচেনা আগন্তুকের আশায় থাকে । এভাবে বেশ কয়েক মাস যাওয়ার পর তারা বুঝতে পারলো তারা একে অপরকে ভালোবেসে ফেলেছে । প্রথমে যদিও মিলনই তাকে বলেছে ভালোবাসে, এরপর কয়েক দিন পর রুপালীও হ্যাঁ বলে দিলো । সেই থেকে তাদের সম্পর্ক শুরু । ভালোবাসার গভীরতায় পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা । মোবাইলে এমএমএসের মাধ্যমে একজন আরেকজনকে দেখা ছবিতে । এরপর যেন ভালোবাসা আরও বেড়ে গেল । এভাবে করে কেটে গেল প্রায় দুই বছর ।
রুপালীর এসএসসি পরীক্ষা শুরু হবে কয়দিনের মধ্যেই । এমনই সময় সেই মিলনই কেমন যেন পাল্টে যেতে শুরু করলো । কেমন যেন তার ভালোবাসা কমতে শুরু করলো । তার কথায় যেন শুধু সম্পর্কটাকে শেষ করে দেওয়ার ইচ্ছে ফুটে উঠছে । মিলনের পরিবার নাকি রুপালীর সাথে তার সম্পর্ক মেনে নিতে পারবেনা । মিলন তাই তার মায়ের পছন্দ মতোই বিয়ে করবে ।মিলনের ভাষ্যমতে তারা খুব ধনী । তাদের পরবিারের অনেক ব্যবসা আছে । মিলনকে সারাদিন ঐ ব্যবসাতেই সময় দিতে হয় । আর রুপালীর পরিবার মধ্যবিত্ত । তাই নিরবও চাইতোনা রুপালীকে আর । তার পক্ষে তাকে বিয়ে করা সম্ভব নয় এও সে রুপালীকে বলে দিলো । কিন্তু রুপালী যে তাকে তার সমস্ত মন জুড়ে স্থান দিয়ে দিয়েছে । তাকে ছাড়া যে সে আর কাউকেই সেই জায়গায় দিতে পারবেনা । তার আকাশ জুড়ে কেবল যেন শুধু মিলনের নামই উড়ে বেড়ায় । কয়দিন পরই পরীক্ষা আর এ সময় যদি এমন কিছু ঘটে যায় তার জীবনে তাহলে কি করে সে পরীক্ষা দিবে কিছুতেই বুঝতে পারছেনা । আর পরীক্ষার আগের রাতেই ঘটে গেল সবচেয়ে অঘটন । মিলন রুপালীকে ফোন দিয়ে বললো তার মায়ের পছন্দের মেয়ের সাথেই তার এ্যাংগেজমেন্ট হয়ে গেছে । বিয়ে ঠিকঠাক হয়ে আছে, কয়েক বছর পর বিয়ে করবে । রুপালী এ খবর শুনে আর কিছু তাকে বলতে পারলোনা । কান্না করে বিছানায় উপুড় হয়ে পরে রইলো সারা রাত । সকালেই যে তার পরীক্ষা, তার যেন সেদিকে কোন খেয়ালই নাই ।
সকালে পরীক্ষা দিতে গেল সে । পরীক্ষার মাঝেও বেশ কয়েকবার সে কান্না করে দিলো । রুপালী তাকে কতটা ভালোবসে ফেলেছে সেটা সে নিজেও জানেনা । কিছুতেই যেন সে করতে পারছেনা । কোন কিছুই তার ঠিকমতো চলছেনা । প্রায় দশ-বারদিন পর আবার মিলন তাকে ফোন দিলো, কথা বললো । আবার শুরু হলো তাদের আগের মতো কথা বলা । এভাবে করে বহুদিন কেটে গেল । রুপালী এসএসসি পাশ করে কলেজে উঠে গেল । বেশ ভালোই চলছে তখনো তাদের সম্পর্ক । কলেজের এক বান্ধবীকে সব বলায় সে তাকে বললো এবার দেখা করতে । এতো দিনের একটা সম্পর্ক এভাবে না দেখেই সামনাসামনি কি করে বিশ্বাস আর বিশ্বাস করা যায় । তাই এবার রুপালী দেখা করতে চাইলো তার সাথে । সেও রাজি হয়ে গেল । রুপালীর সাথে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা করবে । যেহেতু রুপালীর বাসা বিশ্ববিদ্যায়ের কাছেই তাই এই স্থান ঠিক বাছাই করা । মিলনের বাড়ি পাবনাতে । পাবনা থেকে রাজশাহী আসতে তেমন বেশি সময়ও লাগেনা ।
রুপালী ঠিক সকাল ১০.৩০ এ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যায়ে উপস্থিত হলো তার বান্ধবীকে নিয়ে। এরপর মিলনকে ফোন দেওয়ায় সে বললো সে কোন একটা হলে আছে । আসতেছে বলে ফোন কেটে দিলো । এরপর আরও বহুবার ফোন দেওয়ার পরও সে ফোন রিসিভ করলোনা আর । এভাবে করে কেটে গেল বহু সময় । সন্ধ্যার দিকে কোন কূল কিনারা না পেয়ে বাসায় চলে গেল রুপালী । সে শুধু কান্নাই করছে বাসায় যেয়ে । তার মা বুঝতে পারলো বিষয়টি, কারণ সেও জানতো বিষয়টি । আর খিচু বললোনা তাকে তাই । এরপর রাত দুইটার দিকে মিলন ফোন দিয়ে বললো সে খুব কাজে আটকে গেছিলো তাই আসতে পারেনি । রুপালীর ভালোবাসা তার প্রতি এতোটাই প্রখর ছিলো যে সে কিছুতেই নিজেকে বুঝাতে পারেনা যে মিলন আসলে তাকে নিয়ে খেলা করছে । তার ভালোবাসা নিয়ে সে প্রতিনিয়ত প্রতারণা করছে । তীব্র ভালোবাসার অজুহাতে মিলন রুপালকে বুঝাতে সমর্থ হলো যে সে আসলে আসতে যেয়েও আসতে পারেনি । এরপর যেন মিলনের ভালোবাসা আরও বেড়ে গেল । আরও মধুর মধুর কথা বলা শুরু হলো তাদের ।
রুপালী একদিন হঠাৎ করেই মিলনের মোবাইল নাম্বার দিয়ে ফেসবুকে সার্চ করে একটা আইডি পেল । সেই আইডিতে যে ছেলের ছবি সে দেখতে অনেক কালো আর খাটো । রুপালী ছবিতে যে মিলনকে চিনে সে অনেক সুন্দর একটা ছেলে । কিন্তু ফেসবুকে মিলনের মোবাইল নাম্বার দিয়ে খোলা আইডির মানুষটিকে দেখে সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল । তার এই সন্দেহ দূর করার জন্য সে তখনই মিলনকে ফোন দেয় ।
-আজ আমার সাথে সত্যি করে কিছু বলবেন ?
-হ্যাঁ, বলো ।
-আপনার মোবাইল নাম্বার দিয়ে যে আইডি ফেসবুকে আছে সেটাতে যে ছবিটা দেখা যাচ্ছে সেটা কে ? আপনি ?
-না, সেটা আমার ভাতিজা ।
-ও
-কেন সন্দেহ হচ্ছে ?
-না, আমি আপনাকে খুব বিশ্বাস করি । আপনার মুখে সত্যি শুনেলেই আমার সন্দেহ শেষ ।
-তাই
-হুম
-যদি সেই খাটো , কালো ছেলেটাই আমি হতাম তাহলে কি করবে ?
-কিছুনা ।
-কি কিছুনা ?
-বাদ দেন তো । আপনি তো আর সে নন ।
-ওকে ঠিক আছে ।
এইচএসসি পরীক্ষা চলছে রুপালীর এখন । পড়াশোনায় খুবই ব্যস্ত সে এখন । এমনই সময় মিলন ফোন দিয়ে বললো সে আসলে মিলন না সে নিরব । আর ফেসবুকে যে ছেলেটিকে রুপালী দেখেছে সেটাই ও । আর সে কোন ব্যবসা করেনা , সেও রুপালীর সাথে এইচএসসি দিচ্ছে এবার । তার বয়স ২৩ না ১৮ বছর । এসব সব বলার পর নিরব রুপালীর সাথে সম্পর্কটা শেষ করে দিতে চাইলো । কিন্তু রপালীর ভালোবাসাতো মিথ্যা ছিলোনা । সে তো সত্যিই তাকে খুব ভালেবাসে । সে যেই হোক, সে যে রুপালীর পুরো জীবনের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে মিশে গেছে ।
-প্লিজ আমাকে ছেড়ে যাবেন না । আপনি যেই হোন আপনার সাথে আমাদের এতোদিনের সম্পর্ক তো মিথ্যা নয় । আমি আপনাকেই ভালোবাসি । এখন থেকে না হয় সত্য মানুষটার সাথেই সম্পর্ক করবো ।
-না এ হয়না । আমার পক্ষে আর সম্ভব না ।
এরপর মিলন ফোন কেটে দিলো আর কথা হয়নি তাদের এরপর ।
রুপালী শুধু কাঁদছে । কয়দিন ধরে কিছু খেতে পারছেনা । ডাক্তার বলছে তার হার্টে সমস্যা দেখা দিচ্ছে । তাকে হাসিখুশি রাখতে হবে সব সময় । কিন্তু রুপালীর জীবনের সাথে যা ঘটে গেল তারপরও কি সে অন্য মানুষের মতো হাসি খুশি থাকতে পারবে ? হয়তো পারবে তার জন্য প্রয়োজন সময় আর তার ইচ্ছে শক্তি ।


অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

