একশ বছর আগেও ঢাকা ইউনিভার্সিটি, শাহবাগ, পরীবাগ, ইস্কাটন ছিল নবাবদের বাগানবাড়ী, সারি সারি ফুল ও ফলের গাছ ছিল। যেখান থেকে ঘোড়ার গাড়ীতে করে আহসান মঞ্জিলে ফুল ও ফল নিয়ে যেত ভূইঁয়ারা। ইস্কাটনে সেই ভুইঁয়াদের উত্তরসূরীরা এখন বড় বড় এপার্টমেন্টের যৌথ বিনিয়োগদাতা হয়েছে। মিরপুর থেকে রিকশায় ঘোরের মত বাংলামটর ক্রস করে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আহসান চৌধুরীর বাসার পাশের গলিতে এসে আটকে যায়। রাস্তার মুখে কলাপসিবল গেট। বন্ধ। দারোয়ান অন্য মাথায়। মার্জি চ্যাচায় - সালা ভুইঁয়ার গুষ্ঠি - গেট খোল- নইলে পোদ্দারী আমি ছোটাবো!
পিয়াস মার্জিকে ধরে রাখে। কিছু ঘটনা নেশার মত। মদের বদলে ঘটনা খেয়েই এখন সে মাতাল। চোখ ফুলে আছে, রক্তিমাভ। ঝুল শার্টের সাথে জিনস্ আর স্লিপারে বেঢপ ছড়ানো কৃষ্ণ চুলের লম্বা লতিকা আলু থালু। বাবু বলে ওপাশ দিয়ে চল। রিকশা ঘোরে। আরেকটু সামনে এগিয়ে লেফটে হলি ফ্যামিলির দিকে বড় রাসত্দা চলে গেছে। শফিক রেহমানের বাড়ীর একটু আগে আবার লেফটে। জিন্নাহ ভাইয়ের পাঁচতলা বাড়ির সামনে এসে রিকশা থামে। মার্জি থম মেরে আছে। দুবন্ধু উৎকন্ঠিত। মেয়ের গলা শুনলে - কেলেংকারী হয়ে যাবে। গেটে সিকিউরেক্সের এর দারোয়ান। খটাস করে স্যালুট মারে। ঘুমুচ্ছিল। মার্জিকে নারী হিসাবে ধরতে পারে না। ঘরের তালা খুলতেই - মার্জি একদম শান্ত শিষ্ট ল্যাজ বিশিষ্ট হয়ে যায়। বিকেল থেকে শষ্যকণা পেটের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে নাই। যা গিয়াছে তা হাওয়ায় হাওয়ায়। তাতে পেটের উপরে ফুসফুসের থলি দুর্বৃত্তিতে ভরে গেলেও - এখন মনে হয় মৌলিক প্রয়োজনের বিশেষত্ব হচ্ছে - সব ভুলিয়ে দেয়।
মুরগী রাধো! মার্জি হুকুম জারি করে। ফ্রেস হয়ে পিয়াসের লুংগী আর ফতুয়া পরেছে। বাবুর মাথায় এখন আবার পুরো ঘটনাটি রিঅন হয়ে গেছে। রান্নায় সে এত গোয়ারগোবিন্ধ যে পিয়াস বারবার ধমকাচ্ছে - পেয়াজটা ঠিকমত কাঁট! দুটো মরিচ মাঝখান দিয়ে চিড়ে দে তো! বাবু পিয়াজ আলুর মত বর্গাকার করে কাটে আর মরিচ মাঝখান দিয়ে না কেটে বহু খন্ড করে ফেলে। পিয়াস ধমক দেয়, সালা তোর কি হয়েছে? বাবু হতচকিত হয়ে যায়। পেয়াজ ও ঝাল জরানো হাত দিয়ে চোখ মোছে। দেখে টলমল করছে সেখানে জল। হাতের ছোয়ায় তা বেড়ে চলে।
মার্জি বসে বসে খুটিয়ে পেপার পড়ছে। পিয়াস বলে কার্তিকদাকে খবর দেই! এতক্ষণ অন্য কারো কথা মনে হয়নি। বসবাস এখনও ধুম্রজালে। মৃতু্যর চেয়ে মার্জির জীবন বড় বেশী উদ্ভট মনে হতে থাকে। কিন্তু মার্জির মুখে ঠেউ তোলে না প্রতুত্তরের। পিয়াস গ্যাসের চূলায় দিয়াশলাইয়ের কাঠি ছুড়ে দেয় হাড়ির নিচ দিয়ে। ধরে রাখলে হাত পুড়তে পারে। ফোন বাজে। কার্তিকের ফোন। চুলাও জ্বলে ওঠে। মার্জির সামনে টেবিলের উপরে মোবাইলটা। স্লিপ করিয়ে দেয় টেবিলের অন্য প্রানত্দে। গতি টেবিলের দৈর্ঘ্যের চেয়ে বেশী। পিয়াস দৌড়ে এসে শেষ প্রানত্দে ধরে ফেলে। নীল বোতামটা চেঁেপই আদ্র কন্ঠে বলে - মার্জির মাকে দাফন দিয়ে আসলাম! ওপ্রান্তেকার্তিকের নির্লিপ্ত কন্ঠস্বর - ভালো করেছিস। শোন মার্জিকে সকাল বেলা আমার এখানে নিয়ে আসিস। পিয়াস জিজ্ঞেস করে, বস আপনি কথা বলবেন? কার্তিক বলে - কথা বলার কোন দরকার নাই। ওর স্বান্ত্বনা লাগবে না।
সহজাত বাউন্ডারি প্রচলন থেকে ভিন্ন মনে হয় এ সম্পর্কগুলো। ক্ষয়ে যাওয়া সম্পর্কের মাত্রাবোধে নতুন সম্পর্কের ভিন্ন প্রকাশ। বড় জটিল, একালীণ গতিময়তা । পিয়াস তল খুঁজে পায় না। কিন্তু বাবুর সে ভাবার সুযোগটাও থাকে না। তার কাছে সবকিছুই মিথ্যে মনে হয়। তার ও পিয়াসের সম্পর্কের কথা মনে থাকে না। কেন আজ মার্জির এ অবস্থা! কেন সে যার তার সাথে নিশিযাপন করে! কেন সে কাঁদলো না! ইত্যাদি অভিজ্ঞতাজণিত পর্যবেক্ষণ এখানে ঠিক মেলে না। বাবু কিছুই বোঝে না। চোখে লেগে থাকা ঝাল কমাতে পানি ঢালে - আর চোখ ছুয়ে ফিরতি পানি কিছুটা অশ্রু নিয়ে নামে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




