এক কাক বেচারিকে এক ব্রাক্ষণী জলন্ত অংগারে পুড়িয়ে দিয়েছিল। সেই থেকে কাকেদের দুঃখ শুরু। জগতের সব মানুষ কাকদের অমংগল বলে। একমাত্র কাঠুরিয়া আকালুর বউ টেপি ছাড়া। পরিবর্তে কাক সর্দার ও সর্দারনী তাদের অনেক অর্থের খোজ দেয়, কিন্তু কুটিল মানুষ তাদের সে অর্থ কেড়ে নিয়ে সিরাজগঞ্জের বৈকুণ্ঠপুর ছাড়তে বাধ্য করে। আকালু কাককে অভিশপ্ত মনে করতে থাকে। কাক দেখলে ভীত হয়। শহরে এসে আকালু জয়নাল হয়। রাস্তায় টাকা কুড়িয়ে পেয়ে ফেরত দিতে গিয়ে পুলিশের নির্যাতনের শিকার হয়। একসময় ডাকাতী কেসে টেপি সহ তার জেল হয়ে যায়। জেলে এক কাক এসে নীলা পাথরের এক আংটি দিয়ে যায়। ঘটনাপ্রবাহে সে আংটি জেলারের হাতে পড়লে আবারো নির্যাতন নেমে আসে। দেড় বছর পরে জেলমুক্তি হলে, সে জেলারের কল্যানে তার নয়াটোলার খালি একটা জমিতে আকালু আর টেপির থাকার সৌভাগ্য মেলে। আকালু যে কাককে দেখে ভীত হয়ে পড়ে এবার সে কাকের সাথে মিতালী করে, দেখতে চায় কাক কিভাবে তার অনিষ্ট করে। বাঁশের মাচা করে দেয় কাকদের জন্য। রাজ্যের কাক এসে সেখানে বাসা বাঁধে। কাকরা তাদের ঠোটে করে নিয়ে আসে নানা দামী গয়না, অর্থ, প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদী। পাড়াপড়শীরা এ খোঁজ পেয়ে মাচা বানাতে শুরু করে, কিন্তু কোন কাক আর সেখানে যায় না। ক্রমশ তারা অশান্ত, প্রতিহিংসাপরায়ন হতে থাকে। আকালুর ডেরায় হামলা চালায়, কিন্তু কাকদের আক্রমনে পিছু হটে। কিন্তু পরক্ষণেই বিশাল প্রস্তুতিতে পড়শীরা এসে আকালুল আর টেপির ঘরে আগুণ লাগিয়ে দেয়। তার পুড়ে মরে।
কাকরা শোকে কাতর হয়। তারা আকালু আর টেপির পোড়া দেহ নিয়ে উড়তে থাকে। আকালু আর টেপির মনুষ্য শরীর ক্রমশ পরিবর্তিত হয়ে কাকেদের শরীরে পরিণত হয়। রামপুরার ঝিল পেরিয়ে উত্তরে, আরো উত্তরে তারা যেতে থাকে। আকালু আর টেপি পূর্ব পশ্চিমের দিগন্ত ছাপিয়ে তাদের পাখনা বিস্তৃত করে উড়তে থাকে আরো উত্তরের দিকে।
শহীদুল জহিরের উপরোক্ত গল্প অবলম্বনে নাসির উদ্দীন শেখের রচনা ও নির্দেশনায় দেশ নাটক প্রযোজনা করেছে জনমে জন্মান্তরে। নাটক দেখতে যাব বনবাতাসীকে নিয়ে। কিন্তু সাড়ে ছ'টাতে আমি খাচ্ছি রাজ কসুরী বসুন্ধরার ফুডকোর্টের ওয়েস্টার-2তে। সাথে ঘরবাতাসী, আর তার জননীবাতাসী। গাটবাঁধার পরে প্রথম জননীবাতাসীর আগমন। কাজেই শপিং, রোমিং শেষে ইটিং। এরপরে যেতে হবে ক্রিসেন্ট লেক মানে জিয়া উদ্যান। রাত্রি ঘনিতেছে, 7টা ঘনিতেছে, বনবাতাসীকে নিয়ে শ্যামলী - বেইলী রোডের 45 মিনিটের চক্কর। ওদিকে মুহাম্মদ খান ভাই ধানমন্ডি চারের মাঠে বিকাল তিনটায় যেতে বলেছিল বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির ক্রিকেট ম্যাচ দেখার জন্য। আমি রাজ কসুরী খাই - টক, ঝাল, মিস্টিতে অন্যন্য স্বাদ! এরপরে দইবড়া খাই। এরপরে কাকেদের পরিকল্পনা করি।
ঘরবাতাসীকে বলি সন্ধ্যার পরে ক্রিসেন্ট লেকে যাওয়া ঠিক হবে না। জননীবাতাসী বলে ঠিক, ঠিক! আমি তখন বেজায় খুশী। তাহলে একটু মোহাম্মদ খানের ইনভাইটেশনে যাই! ঘরবাতাসী বলে, তাহলে এখন তো বাসায় ফিরবো, কোন কাজ নেই, তোমার কাজ সেরে আসতে পারো। আমি সিএনজিতে তাদের তুলে দিয়ে বনবাতাসীকে ফোন করি, বের হবে! সে বলে তুমি অনেক ঘুরেছো, আজ থাক। আমি বলি, কোন ঝামেলা! সে বলে উত্তাল বাতাস বইছে ঘরে, বনবাতাসীও জননীকোপে টালমাটাল। অগত্যা কি আর করা, একাকী কাক হই, কাকেদের কষ্ট বোঝার যথেস্ট ভাল প্রেক্ষাপট। যখন মহিলা সমিতিতে, তখন কাকেদের চিৎকার সবেমাত্র শুরু হয়েছে। আমি পুরো নাটক দেখি অস্বাভাবিক মনযোগে।
নাটক দেখে বের হবার সময় ভাবি, আকালুল চমৎকার অভিনয় করেছে। ছেলেটাকে বলবো ভাবতেই দেখলাম, নাটকের সরঞ্জাম নিয়ে সে বাইরে রাখা ভ্যানের কাছে জরো করছে। সাধারণ একটা ছেলে কি অসাধারণ অভিনয় করলো। ফেরার পথে টেপির সাথে পরিচয় হলো। টেপি হচ্ছে লোপা। নাটকে তার কাকদের সাথে কথা বলার একটা দৃশ্য আছে, চমৎকার হয়েছে। ভয়ের, পাগলামীর আর অবাক হবার এক্সপ্রেশনগুলো দূর্দান্ত হয়েছে। তার কাছে নাম জানলাম আকালুর, সে হচ্ছে রাজন। অনেকদূর যাবে ছেলেটি।
সুনসান রাস্তায় যখন বাসায় ফিরছি, তখন মনে হলো, দুই হাত মেলে পূর্ব পশ্চিম দিগন্ত ছাপিয়ে আমি চলে যাবো উত্তরে আরো উত্তরে! তবে কোথায় যেন আগুণে পুড়িয়ে মারার ষরযন্ত্র টের পাচ্ছি! আমি হয়তো সত্যি একদিন কাক হবো আকালুর মতো, বনবাতাসীকে নিয়ে সরে যাবো আরো উত্তরে!
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



