রাত্রিভর না ঘুমিয়ে নিজের ভিতরে দুইটা মানুষের অস্তিত্ব আবিস্কার করলাম। একমানুষ থেকে অন্যমানুষে কনভার্সন। মাঝে মাঝে আচরণে অতিষ্ট হয় বনবাতাসী। তার অস্তিত্বহীনতার আশংকা যখন প্রবল হয় তখন আমি আর এক্সিসটেনসিয়ালিস্ট থাকতে পারি না। অস্থির লাগে। এমন একদিন বিকেলে বনবাতাসীকে নিয়ে বের হবো। তার বাসার সামনে যেখানে আমি অপেক্ষা করি, সেখানে পৌছে ফোন দিয়ে দেখছি অপেক্ষমান যাত্রীদের, পাশেই বাসের কাউন্টার। চোখের সামনে উচু একটা ভবণের বারান্দায় এক বৃদ্ধা বসে আছে, এক হাত তার রেলিং এর বাইরে। হয়তো ছেলের ঘর, স্বামী মরে গেছে, নিজেকে এখন তার ভাসমান স্রোতের শ্যওলা মনে হচ্ছে, জানে না কোথায় তার গন্তব্য। নিজেকে কল্পনা করি তার জায়গায়, কিছুটা বুদ হয়ে থাকা চিন্তার সুতো কেটে দিয়ে বনবাতাসী চমকে দেয়, অদ্ভুত সুন্দর সাজে সেজে এসেছে। সিলভার কালারের আইশ্যাডো আর টানা কাজলের অদ্ভুত কম্বিনেশন। ফুটপথে দাড়িয়ে দেখছি তাকে। তোমাকে ভীষন সুন্দর লাগছে! গ্রেট! বনবাতাসী হাসে, বলে, সবসময় বাড়িয়ে বলো। আমার আশংকা হয়, তার মা আমার সাথে বেড়ুচ্ছে সেজেগুজে বিষয়টা ভাল দেখেনি নিশ্চয়। বললাম, তোমার সাজুগুজু দেখে মা কিছু বলেনি!
বলেছে, আমি বলেছি ওর সাথে যাচ্ছি! মা অবশ্য জিজ্ঞেস করেছিল, ওর সাথে কেন মিশছিস! আমি বলেছি, ভাল লাগে তাই!
কি ভয়ংকর কথা। বনবাতাসী বলে, মা জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি কেন আমার সাথে মেশো!
কি বলেছো?
তোমারও ভাললাগে তাই মিশছো!
বনবাতাসীর মা আমাকে ছোটবেলা থেকে চেনে। নাড়ীনক্ষত্র ইত্যাদি। এখনও ভালই জানে। উদ্্বেগ হয় না। সাতটায় একটা প্রোগ্রামে যাবার আগে দুইঘন্টা হাতে আছে। পেটের মধ্যে গুরুগুরু খিদের মেঘ ডাকছে। বনবাতাসীরও। রাইফেল স্কয়ারের চারতলাতে ধাবা-2। দই পাপড়ি আর বটি কাবাব খেতে খেতে বনবাতাসী বলে তোমাকে একটা চমক দেবো, তোমার অবশ্য ভাললাগবে না! আমি বলি, ভাল না লাগলেও বলো! সে বলে, বলবো না! আমি জোর করি, বার বার জানতে চাই। সে ততবারই রহস্য করে, বলে, রহস্যের সন্ধান পেলে আর ধৈর্য্য থাকে না তোমার। শোনো, যখন যেখানে রহস্য দেখবে তখন সেটাতে নির্লিপ্ততা দেখাবে, তাহলে আমি ভাববো, রহস্য করে লাভ হলো না, তোমার মধ্যে আগ্রহ তৈরী করা গেল না। বাধ্য হয়ে তখন তো বলে দেবই!
আমি বলি, এটা তো টেকনিক। এ আমি অহরহই করি। কিন্তু তোমার সাথে টেকনিক ফলানো ভাল লাগে না। সব অনুভূতির খাঁটি প্রকাশ দেখাতে চাই, নো ভড়ামী! সে হাসে, বলে, এবার কিন্তু তোমার রহস্য নিয়েই থাকতে হবে!
আমি হাল ছেড়ে দেই, কারণ সাতটা ছুইছে। সেন্ট্রাল রোড যেতে হবে, রাইসুদারা যেখানে আকাঁউকি করে সে বাসাটাতে। বাসার নাম নোঙর। বেশ কিছু অপরিচিত মুখ পরিচিত আরো কিছু মানুষের মতই হয়ে গেলো নিমিষে। এসে রিডিং হবে। বিষয় জা পল সর্াত্রের শেষ সাক্ষাতকার। 1980 সালে নেয়া। তার অন্যতম একজন শিষ্য বেনি লেভী নিয়েছিলেন। বনবাতাসী আর আমি যে অস্তিত্ব আর অনস্তিত্বের সংকেট ভূগছি তা'র জন্য দারুন এক টনিক হয়ে গেল সর্ােত্রর আশা ও নিরাশার ব্যাখ্যা। সাতর্্র বলেন নিরাশা আশার বিপরীত নয়, আশার কিছু অব্যবহিত ব্যর্থতা, যা মানুষের অনুভূতিকে স্পষ্ট অনুধাবনে সাহায্য করে। আমি সার্ত্রের বক্তব্য শুনি রাইসুর চমৎকার পাঠে আর ভাবতে থাকি, আমার চিন্তা আছে বলে আজ বনবাতাসীর অস্তিত্ব, বনাতাসীকে বলি, কিন্তু তুমি আমার অস্তিত্ব ছাপিয়ে মাঝে মাঝে বড় হয়ে যাও! না মিলছে না! সার্ত্রের তত্ত্বের কোথাও ভুল আছে!
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই এপ্রিল, ২০০৭ রাত ২:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



