somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অবসাদের ভীড়ে (প্রায় সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা)

১১ ই জানুয়ারি, ২০১১ রাত ৩:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

- আব্বা, আব্বা, হামাক আজকা কয়ডা বেলুন কিন্যা দিবা ?
ফুলজার হাসে। বলে-
- দিমু না কিসক্? গোটাল দুনিয়াডাই কিন্যা দিমু।
ছেলে হাসতে হাসতে মায়ের দিকে চায়, মা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে-
- আজকা বাড়ীত এনা তাড়াতাড়ি অ্যাসো। লিত্তিদিন-ই তো দেরী করো।
- আসমুনি। বাজার থ্যাক্যা কিছু লিয়্যা আসা লাগবি?
- না, ল্যাগবিনা।
- আচ্চা, যাই।

ফুলজার হাসে, মনে মনে। বাচ্চাটার যতো আবদার! তাড়াতাড়ি অফিসে যেতে হবে। এই কথা মনে আসতেই পা দ্রুত চালালো। আজমপুর মেম্বার মোড় থেকে হাউজবিল্ডিং বেশী দূর না। দেশী একটা বড় কোম্পানীতে এমডির ড্রাইভার সে। বেতন তেমন বেশী না। তাই দিয়ে আজমপুরে এক ঘরের একটা বাসায় থাকে। বাসা বললে ভুল হবে, বলা যায় ফ্যামিলি মেস। কম আয়ের মানুষগুলো যেনো মুরগির খোপের মত ঘরগুলোতে নিত্যদিন খাঁচায় পোরা পোষা জন্তু গুলোর মতো বাইরে যায় আর রাত হলে ঘরে ফিরে। সামনা সামনি ঘর গুলোর মাঝে এক গলি, সেই গলির শেষ মাথায় বারোটা ফ্যামিলির দুইটা বাথরুম। গলিটা প্রায়ই বাথরুমের পানিতে ভেসে যায়। তখন ঘরে থাকাই কষ্ট।

ভাবতে ভাবতে ফুলজার অফিসে ঢুকে। বস তাকে দেখে বলে
- তাড়াতাড়ি গাড়ি বের করো, মতিঝিল যাওয়া লাগবে।
- জ্বি স্যার।
বস খুব ভালো মানুষ। ফুলজারের খোঁজ খবর রাখেন। তবে ড্রাইভারের চাকরী আর কি! মদ খেয়ে মাতাল হলে তাকেই বসকে ঘাড়ে করে ঘরে পৌঁছিয়ে দিয়ে আসতে হয়। বসের অনেক টাকা। ফুলজার মাঝে মাঝে কল্পনা করতে চেষ্টা করে নিজেকে বসের স্থানে, পারেনা। তবুও চায়। বস এই ব্যাবসার পাশাপাশি শেয়ারের বিজনেস ও করেন। তার কাছ থেকেই ফুলজার বিভিন্ন টিপস শিখে রেখেছে। সে তেমন বুঝেনা। বাড়ী থেকে গেলো বছর ধান বেচে চল্লিশ হাজার টাকা এনেছিলো, বসের কথামতো খাটিয়ে সেই টাকা আজ প্রায় আড়াই লাখ হয়েছে। আর বেশী কিছু জমলেই সে বাড়ী ফিরে যাবে। পড়াশুনা বেশী করেনি, তাতে কি, একটা গরুর খামার দিয়ে বসবে। আহ! তখন সুখ আর সুখ। ছৈলডারে ভালো স্কুলে পড়াবে, তার মতো ভুল করতে দেয়া যাবে না।

- বুঝলে ফুলজার, শেয়ার বাজার হলো মানুষকে বোকা বানানোর জায়গা। বসের কথাতে তার সম্বিত ফিরে। গাড়ীকে ডাইনে টার্ন নেয়ায়। বস বলতে থাকেন
- যে কিনছে হয় সে বোকা, না হয় যে বেচছে সে বোকা। এটা হলো বোকাদের খেলা।
- জ্বি বস।
- আব্দুল কালাম কোম্পানীর শেয়ার দেখছো? কিনছিলাম ৬৭ টাকা ৫০ পয়সা করে দেড় লাখ টাকার। এখন তার দাম কতো জানো?
- কতো স্যার? বোকার মতো প্রশ্ন করে ফুলজার।
- দেড় লাখের পাশে দুইটা শুন্য বসাও। বস বিগলিত হাসে। ঢোক গেলে ফুলজার। মনে মনে বলে, দেড় কোটি টাকা!
- তা এখন যারা এইগুলা কিনছে, তারা বোকা না বলো? বস প্রশ্ন করে।
- জ্বি স্যার! ঘন ঘন মাথা ঝাকায় ফুলজার।
- না, বোকা না। আজ আমরা মিটিং করবো। আগামী দশ তারিখে আরো শেয়ার কেনা হবে বাজার থেকে, এর দাম আগামী মাসের মাঝে দ্বিগুন হয়ে যাবে। বস আগের চেয়ে আরো বড়ো একটা হাসি দেন। ফুলজারের বোকা মাথায় আগুন জ্বলে! বস এইমাত্র তাকে যে কথাটা বললেন, তার দাম কোটি টাকা।
- স্যার, আগামীকাল থেকে দিন তিনেক একটু ছুটি দেন, বাড়ী যামু। অনুনয়ের সুরে বলে ফুলজার।
- আচ্ছা, সে হবে ক্ষন। ঐ সামনের বিল্ডিংয়ের পার্কিংয়ে ঢুকাও।


লাখ টাকা!
কোটি টাকা!
ফুলজারে চোখে স্বপ্ন ওড়ে। আগামী মাসেই সে খামারটা দিতে পারে, ছেলেকে ভর্তি করাবে জেলা স্কুলে, রাতে বুকের মাঝে বৌটা আরামে মোচড় খেতে খেতে আর বলবে না সকালে খাওয়ার কিছু নেই!

ফুলজার বাড়ী ছোটে। সাত ভাই তার। বাবা বেঁচে। সম্পত্তি এখনো ভাগাভাগি হয়নি। সে তার ভাগের অংশ চায়। বাবা যান খেপে। কতটুকুই বা জমি! সেটুকু বিক্রি করে মাত্র দেড় লাখ টাকার মতো হয়। মাথা খারাপ হয়ে যায় ফুলজারের। বাবা বলে দিয়েছেন ভাগের অংশ নিয়ে গেলে আর বাড়ীতে পা না রাখতে। সে ধার করে। মাসে বিশ পারসেন্ট সুদে দুই মাসের জন্য পাঁচ লাখ টাকা ধার করে। এতো অল্প সময়ে এতো টাকা জোগাড় করতে গিয়েই সুদের অংক টা চড়া হয়ে যায়। ব্যাপারনা! এক মাসের মাঝেই তো এই টাকা বিশ লাখ হয়ে ফেরত আসবে! ফুলজার ঢাকা ছোটে। সবগুলো টাকা দিয়ে কিনে ফেলে আব্দুল কালাম কোম্পানীর শেয়ার।

প্রথম দশ দিনেই তার টাকা হয়ে যায় দ্বিগুন! ফুলজার ঝড়ের গতিতে গাড়ী চালায়। পেছন ফিরে বসকে শুধু মুচকি মুচকি হাসতে দেখে। সেও হাসে, চালাকের হাসি। এই মার্কেটে সেই চালাক। আর সব শালা বোকা! আরও বাড়বে দাম, এই আশায় ফুলজার ধরে রাখে শেয়ার গুলো।

পনেরো দিন পর প্রতিদিনের মতো ফুলজার বাড়ী থেকে বের হয়। বস আজকেও মতিঝিল যাবেন।
- বুঝলে ফুলজার, শেয়ার গুলো গতকাল বেচে দিলাম। নতুন ফ্যাক্টরী দিবো, নীটের।
- জ্বি বস। ফুলজার বসের মুখের দিকে তাকায়। বসের মুখে সেই তেলতেলে হাসি।
মতিঝিলে প্রচন্ড গন্ডগোল! গাড়ি যাবেনা। বস গালি দিতে দিতে গাড়ী থেকে নামেন।
- শুওরের বাচ্চাগুলো গ্রাম থেকে উঠে এসে শহরটাকে ময়লা করে দিচ্ছে! ফুলজার নিজের জামার দিকে তাকায়, নাহ! সেখানে তো কোন ময়লা নেই। কিন্তু গ্যান্জাম কিসের? ফুলজার বস কে নামিয়ে দিয়ে গাড়ী পাশে রেখে এক বেলুন ওয়ালার কাছ থেকে ছেলের জন্য বেলুন কেনে। দৌড়াচ্ছে মানুষ, দৌড়াচ্ছে পুলিশ। ফুলজার পাশের মানুষটিকে জিজ্ঞাসা করে।
- জানেন না, শেয়ার বাজারে ৬০০ পয়েন্ট ধস নেমেছে?
- মানে?
- ও, আপনি বুঝবেন না।
ফুলজার বোঝে না। সে টাকা বোঝে। সে দৌড়ায় তার সিকিউরিটি এক্সচেন্জ অফিসে।

বিকেলের নরম রোদে এই নোংরা শহরের ততধিক নোংরা লেকে ভাসে একটি যুবক। যুবকের হাতে ধরা কয়েকটি বেলুন। তখনো উড়ছে। উড়ছে খামার, উড়ছে স্কুল, উড়ছে স্বপ্ন...


সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে আগস্ট, ২০১৫ রাত ১:৫৩
৩২টি মন্তব্য ৩২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আগামী নির্বাচন কি জাতিকে সাহায্য করবে, নাকি আরো বিপদের দিকে ঠেলে দিবে?

লিখেছেন জেন একাত্তর, ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০২৫ রাত ৮:১২



আগামী নির্বচন জাতিকে আরো কমপ্লেক্স সমস্যার মাঝে ঠেলে দিবে; জাতির সমস্যাগুলো কঠিন থেকে কঠিনতর হবে। এই নির্বাচনটা মুলত করা হচ্ছে আমেরিকান দুতাবাসের প্রয়োজনে, আমাদের দেশের কি হবে, সেটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফেসবুক বিপ্লবে সেভেন সিস্টার্স দখল—গুগল ম্যাপ আপডেট বাকি

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০২৫ রাত ৯:৩০




কিছু তথাকথিত “বাংলাদেশি বিপ্লবী” নাকি ঘোষণা দিয়েছে—ভারতের সেভেন সিস্টার্স বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে! সহযোগী হিসেবে থাকবে বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী আর পাকিস্তানি স্বপ্ন।শুনে মনে হয়—ট্যাংক আসবে ইনবক্সে। ড্রোন নামবে লাইভ কমেন্টে। আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গু এনালিস্ট কাম ইন্টারন্যাশনাল সাংবাদিক জুলকার নায়েরের মাস্টারক্লাস অবজারবেশন !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই ডিসেম্বর, ২০২৫ রাত ১২:২৬

বাংলাদেশের দক্ষিণপন্থীদের দম আছে বলতে হয়! নির্বাচন ঠেকানোর প্রকল্পের গতি কিছুটা পিছিয়ে পড়তেই নতুন টার্গেট শনাক্ত করতে দেরি করেনি তারা। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ ঘিরে নতুন কর্মসূচি সাজাতে শুরু করেছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিবাদ: দিল্লির ছায়া থেকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র

লিখেছেন কৃষ্ণচূড়া লাল রঙ, ১৮ ই ডিসেম্বর, ২০২৫ ভোর ৫:৫৭

একটা সত্য আজ স্পষ্ট করে বলা দরকার—
শেখ হাসিনার আর কোনো ক্ষমতা নেই।
বাংলাদেশের মাটিতে সে রাজনৈতিকভাবে পরাজিত।

কিন্তু বিপদ এখানেই শেষ হয়নি।

ক্ষমতা হারিয়ে শেখ হাসিনা এখন ভারতে আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

Grameen Phone স্পষ্ট ভাবেই ভারত প্রেমী হয়ে উঠেছে

লিখেছেন অপলক , ১৮ ই ডিসেম্বর, ২০২৫ দুপুর ২:৪৯



গত কয়েক মাসে GP বহু বাংলাদেশী অভিজ্ঞ কর্মীদের ছাটায় করেছে। GP র মেইন ব্রাঞ্চে প্রায় ১১৮০জন কর্মচারী আছেন যার ভেতরে ৭১৯ জন ভারতীয়। বলা যায়, GP এখন পুরোদস্তুর ভারতীয়।

কারনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×