
মনসার ভাসান গান
লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী (নবাগত কবি)
মনসার ভাসান গান শুনি বসে আটচালার ঘরে,
করুণ সুরে বাঁশি বাজে, চোখ আসে জলে ভরে।
বিশ্বকর্মা করেছিল নির্মাণ লোহার বাসর ঘর,
লোহার বাসরে ঘুমায়ে থাকে বেহুলা লখীন্দর।
লোহার বাসর ঘরেতে এক সূচের ছিদ্র ছিল।
সেই ছিদ্র পথ দিয়ে কালীনাগ প্রবেশ করিল।
মা মনসার বিবাদ ছিল চাঁদ সওদাগরের সাথে,
লোহার বাসরঘরে ঢুকে কালীনাগ গভীর রাতে।
লোহার বাসরে কালীনাগ প্রবেশ করিল যবে,
ভাবয়ে লখীন্দরে কেমনে সে দংশন করিবে।
ঊর্দ্ধফণা শিরে ধরে কালীনাগ বাসরেতে যায়,
লখীন্দরের চরণ লাগে কালী নাগের মাথায়।
মনসার ভাসান শুনি বসে রাত ভোর হয়ে যায়,
গানের সুরে ভুবন কাঁদে বাঁশির সুরের মূর্ছনায়।
মা মনসার ভাসান
কবিতার মূল ভাবার্থ।
শিবভক্ত চাঁদ সওদাগর তুচ্ছ নারীকে পূজা দিতে রাজি হন না। উল্টো মনসাকে লাঠি নিয়ে তাড়া করেন। যে কারণে মনসার রোষে চাঁদের চম্পকনগরে সাপের উপদ্রব শুরু হয়। একে একে চাঁদের ছয় সন্তান মারা যায়। বাণিজ্যের নৌকা ডুবে গেলে চাঁদ সব হারিয়ে সর্বশান্ত হয়। তার পরও মনসার পূজায় রাজি হয় না সে। অন্যদিকে চাঁদের বৌ সনকা মনসার ভক্ত। মনসার বরে সে এক পুত্র জন্ম দেয়। নাম লখিন্দর। যদি চাঁদ মনসার পূজা না দেয় তবে লখিন্দর বাসরঘরে সাপের কামড়ে মারা যাবে। এসব জেনেও চাঁদ মনসা পূজা না দিয়ে লখিন্দরের সঙ্গে উজানীনগরের বেহুলার বিয়ে ঠিক করেন। চাঁদ সওদাগর অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে এমন বাসরঘর তৈরি করেন, যা সাপের পক্ষে ছিদ্র করা অসম্ভব।
কিন্তু সব সাবধানতা সত্ত্বেও মনসা তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সমর্থ হয়। তার পাঠানো একটি সাপ লখিন্দরকে হত্যা করে। প্রচলিত প্রথা অনুসারে যারা সাপের দংশনে নিহত হতো, তাদের সত্কার প্রচলিত পদ্ধতিতে না করে তাদের মরদেহ ভেলায় করে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হতো এ আশায় যে, ব্যক্তিটি হয়তো কোনো অলৌকিক পদ্ধতিতে ফিরে আসবে। বেহুলা সবার বাধা অগ্রাহ্য করে তার মৃত স্বামীর সঙ্গে ভেলায় চড়ে যাত্রা করে এবং গ্রামের পর গ্রাম পাড়ি দিতে থাকে। ভাসতে ভাসতে ভেলা এসে পৌঁছে এক ঘাটে, যেখানে প্রতিদিন স্বর্গের ধোপানি কাপড় ধোয়। বেহুলা সেখানে এক অবাক কাণ্ড দেখল। ধোপানি কাপড় ধুতে এসেছে একটি ছোট শিশুকে নিয়ে। শিশুটি দুরন্ত, সারাক্ষণ দুষ্টুমি করছে। ধোপানি একসময় শিশুটিকে আঘাত করে মেরে ফেলল। পরে যখন কাপড় কাচা হয়ে গেল, তখন আবার তাকে বাঁচিয়ে তুলে নিয়ে চলে গেল। বেহুলা বুঝতে পারল, এ মানুষ বাঁচাতে জানে। পরদিন বেহুলা গিয়ে তার পদতলে পড়ল। তার স্বামীকে বাঁচিয়ে দিতে অনুরোধ করল। ওই ধোপানির নাম নেতাই। সে বলল, একে আমি বাঁচাতে পারব না, একে মেরেছে মনসা। তুমি স্বর্গে যাও, দেবতাদের সামনে উপস্থিত হও। দেবতারা ভালোবাসে নাচ দেখতে। তুমি যদি তোমার নাচ দেখিয়ে তাদের মুগ্ধ করতে পার, তাহলে তারা তোমার স্বামীকে বাঁচিয়ে দেবে।
আশা জ্বলে উঠল বেহুলার চোখে, মনে, সারা চেতনায়। সে স্বর্গে গেল। দেবতারা বসে আছে; তাদের সামনে নাচ ধরল বেহুলা। বেজে উঠল পায়ের নূপুর। বেহুলার নাচে চঞ্চল হয়ে উঠল চারদিক। তার নূপুরের ধ্বনিতে ভরে গেল স্বর্গলোক। বেহুলার নৃত্যে এক অসাধারণ ছন্দ। মুগ্ধ হলো দেবতারা। তারা বেহুলাকে বর প্রার্থনা করতে বললেন। সে তার স্বামীর প্রাণ ভিক্ষা চাইল। মহাদেব রাজি হলেন তাতে।
এনসাকে ডাকা হলো। মনসা এসে বলল, ‘আমি লখিন্দরকে ফিরিয়ে দিতে পারি, যদি চাঁদ আমার পুজো করে।’ বেহুলা তাতে রাজি হলো এবং বলল, তাহলে তোমাকে ফিরিয়ে দিতে হবে আমার শ্বশুরের সবকিছু। ফিরিয়ে দিতে হবে তাঁর পুত্র, তাঁর সব বাণিজ্যতরী। রাজি হলো মনসা।
মনসা সব ফিরিয়ে দিল, বেঁচে উঠল লখিন্দর, ভেসে উঠল চৌদ্দ ডিঙ্গা। চাঁদ পাগলের মতো ছুটে এল বেহুলার কাছে। কিন্তু এসে যেই শুনল যে, তাকে মনসার পুজো করতে হবে, তখন তার সব আনন্দ নিভে গেল। সে দৌড়ে সরে গেল সবকিছু থেকে। বেহুলা গিয়ে কেঁদে পড়ল চাঁদের পায়ে। যে চাঁদ মনসাকে চিরদিন অপমান করেছে, যে কোনোদিন পরাজিত হতে চায়নি। সে চাঁদ বেহুলার অশ্রুর কাছে পরাজিত হলো। বেহুলা বলল, ‘আপনি শুধু বাম হাতে একটি ফুল দিয়ে দিন, তাহলেই খুশি হবে মনসা।’ চাঁদ বললেন, ‘আমি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বাম হাতে ফুল দেব।’ তাই হলো। মুখ ফিরিয়ে বাম হাতে একটি ফুল হেলাভরে ছুড়ে দিলেন চাঁদ। মনসা তার পরও খুশি। আর পৃথিবীতে প্রচারিত হলো মনসার পুজো।
মনসা মঙ্গলের লোকনাট্যের নানা আঙ্গিকের পরিবেশনায় দেখা যায়, বর্তমানকালে এসে বহুলা-লখিন্দরের কাহিনী প্রাধান্য লাভ করেছে। এর মধ্যে দেবীর কথা আছে, দেবী বন্দনা আছে। মানুষের বেঁচে থাকা, টিকে থাকার সংগ্রাম এ কাহিনীর আসল কথা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

