somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছায়ার মুখ

১৩ ই এপ্রিল, ২০২৫ রাত ৯:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ষড়ঋপু: হিংসা পর্ব

খুলনার আকাশে তখন সন্ধ্যার ছায়া নামে। রূপসা নদীর তীরে বসে থাকা আর্য অনিরুদ্ধের চোখে এক অদ্ভুত ধরণির হাহাকার। সে স্থির, অথচ ভিতরে উথালপাথাল এক দ্বন্দ্বের ঢেউ। মাথার ভিতর কে যেন চাপা কণ্ঠে বলে ওঠে—

"আজ তুমি তাকেই দেখেছো, যাকে তুমি চিরকাল এড়িয়ে গেছো।"



আর্য অনিরুদ্ধ—খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের সর্বাধিক মেধাবী ছাত্র। শহরের সেরা কোচিং, সেরা স্কলারশিপ, আর সেরা সিভি—সব তার নামেই ঘোরে। কিন্তু সে যা লুকিয়ে রাখে, তা হলো তার অসহ্য ঈর্ষা। কোনো সহপাঠীর সাফল্য, কারো প্রশংসা, সামান্য আলোটুকুও—তার মনে আগুন লাগায়।

তার ভেতরে জন্ম নিয়েছিল এক ছায়া, এক প্রতিচ্ছবি, যেটি আয়নার ভিতর তার চোখে চোখ রাখে, এবং ফিসফিস করে বলে—

"তুমি না সেরা? কেন তবে ওরটা তুমি পেলে না?"

আয়নার সেই ছায়ার নাম নেই। কিন্তু আর্য তাকে বলে, "ছায়া আমি, ছায়া তুমি।"



আফরোজা সামিহা—একজন মৃদু অথচ অদ্ভুতভাবে দৃঢ়স্বভাবের মেয়ে। আর্যের প্রতি সে একসময় আকৃষ্ট হয়েছিল। কিন্তু যত সময় গেছে, তত বুঝেছে—আর্য নিজের ছায়ায় আসক্ত, নিজের অহং-নির্মিত অন্ধকারে বন্দী।

একদিন ক্যাম্পাসের এক কোণায় সামিহা বলে,

"তুমি আমার প্রেম চাও না, তুমি নিজের শ্রেষ্ঠত্বে আমার সমর্পণ চাও।"

আর্য স্তব্ধ হয়ে যায়। সে দেখে সামিহার চোখে কোনো প্রেম নেই—শুধু করুণা



ড. করিম—বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের প্রধান, এক প্রচ্ছন্ন ঈর্ষাপরায়ণ মানুষ। তিনি জানেন, আর্য তার চেয়েও বেশি জনপ্রিয়, মেধাবী। এই বিশ্ববিদ্যালয় তাকে নয়, আর্যকেই মনে রাখবে।

একদিন আর্যকে ডেকে তিনি বলেন,

"মেধা তোমার আছে, কিন্তু অভিজ্ঞতা আমার। একটা ভুল করলেই তুমি শেষ।"

তবে তার হাসির নিচে লুকানো এক ষড়যন্ত্র। তিনি চায়, আর্য নিজেই নিজের পতন ডেকে আনুক।



বৃষ্টির এক রাতে ফরেস্ট ঘাটে আর্য একা বসে থাকে। হঠাৎ সে দেখতে পায়, কুয়াশার ভিতর দিয়ে কেউ হেঁটে আসছে।

না, সে মানুষ না।
সে তারই মতো, কিন্তু চোখ দুটো একেবারে খালি। যেন গভীর শূন্যতা।

"তুই কে?"

ছায়া উত্তর দেয়—

"তুই।"

"তুই আমার মতো কেন?"

"তুই যে তোর ঈর্ষার চেয়ে বেশি কিছু নস। আমি তোর সেই অংশ, যে অন্যের হাসির নিচে শুধু বিদ্বেষ খোঁজে। আমি তোকে চালাবো, যেমন ড. করিম তোকে চালাচ্ছে, যেমন সামিহা তোকে ফেলে দিয়েছে।"

আর্য চিৎকার করে ওঠে, "চুপ কর!"

কিন্তু ছায়া তখনই বলে,

"তুই তো আমায় গড়েছিস, এবার আমার সময়।"



ড. করিম একটি জাল ডেটা নিয়ে আর্যকে ফাঁদে ফেলে। ল্যাবে একটি রিপোর্ট চুরি হয়, আর্যর নামেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে তদন্ত, মিডিয়া কভারেজ, আর সামিহার নীরবতা—সব মিলে আর্যর ভিতরে থাকা ছায়া জেগে ওঠে সম্পূর্ণরূপে।

সে এক রাতে ছাদে উঠে দাঁড়ায়। ঝড়ো বাতাসে তার চোখদুটো খালি, ঠোঁট ফেঁটে বেরোয় রক্ত, আর সে বলে,

"তারা আমাকে গিলে ফেলবে না। আমি আগে গিলবো তাদের।"



শেষ দৃশ্যে ফরেস্ট ঘাটে ছায়া আর আর্য মুখোমুখি।
ছায়া বলে,

"একজনই থাকবে—তুই, না আমি।"

আর্য এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর নিজেকে ছায়ার ভিতর ছুঁড়ে দেয়।



খুলনার আকাশে ঝড় থেমেছে।
সামিহা একদিন নিউ মার্কেটের ভিড়ে হঠাৎ দেখতে পায় একজনকে—যে দেখতে আর্যর মতো, কিন্তু চুলে পাক, চোখে নির্বিকার শূন্যতা।

সে তাকায়, হাসে না—শুধু চেয়ে থাকে।
তার পাশে পড়ে থাকে একটা আয়না।
মেঘলা আকাশে, আয়নার ভিতরে তখন ছায়া হাসে।

শেষ নয়... শুধু এক ছায়ার নতুন জন্ম।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৫ ভোর ৬:২১
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

‘বাঙালি মুসলমানের মন’ - আবারও পড়লাম!

লিখেছেন জাহিদ অনিক, ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আহমদ ছফা'র ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইটা আরাম করে পড়ার মতো না। এটা এমন এক আয়না, যেটা সামনে ধরলে মুখ সুন্দর দেখাবে- এমন আশা নিয়ে গেলে হতাশ হবেন। ছফা এখানে প্রশংসা... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাতানো নির্বাচনে বিএনপিকে কিভাবে ক্ষমতায় বসানো হল-(১) অথচ দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট শাসনের পর চাওয়া ছিল একটি সুষ্ঠ নির্বাচন।

লিখেছেন তানভির জুমার, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:২১

১/ ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের ভিতরে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ। অর্থাৎ মানুষকে ফোন বাসায় রেখে আসতে হবে। কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসার পক্ষপাতিত্ব করলে কেউ রেকর্ডও করতে পারবে না। কেন্দ্রে কোন অনিয়ম, জালভোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

শের

লিখেছেন এ.টি.এম.মোস্তফা কামাল, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:২৯


তিন শ' তিন
মুমিন তো নই, তবু খোদা টিকিয়ে রেখেছে!
প্রেমিক তো নই, তবু প্রেম বিকিয়ে রেখেছে!

তিন শ' চার

ভীষণ একাকী আমি, অপেক্ষায় কেটে যায় বেলা।
হতাশার মাঝে শুধু, পাশে আছে তার অবহেলা ! ...বাকিটুকু পড়ুন

কলেজ ও ভার্সিটির তরুণরা কেন ধর্মের দিকে ঝুঁকছে? করনীয় পথ নকশাটাই বা কী?

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৩৬


ধর্মের দিকে ঝোঁকার মানচিত্র

অচেনা পথে হাঁটে আজ তরুণের দল
পরিচয়ের কুয়াশায় ঢেকে গেছে কাল
শিক্ষা, কর্ম, সম্পর্ক সবই আজ প্রশ্নবিদ্ধ
কোথায় জীবনের মানে মন দ্বিধাবদ্ধ।

এই দোলাচলে ধর্ম দেয় দৃঢ় পরিচয়
উদ্দেশ্য, শৃঙ্খলা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসলাম কি নারী নেতৃত্ব বিরোধী?

লিখেছেন রাশিদুল ইসলাম লাবলু, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:৩২



ইসলামে নারী নেতৃত্ব জায়েজ কিনা এ বিষয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনা সমালোচনার ঝড় উঠেছে। নারী নেতৃত্ব নিয়ে সংশয় মূলক বেশ কিছু পোষ্টও আমার চোখে পড়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×