somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক হত্যাকান্ড - ( পর্ব -১ )

০৯ ই জুন, ২০১৪ দুপুর ২:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষমতায় এসে মানুষকে নিরাশ করেন। তার শাসনামলে (১৯৭২-৭৫) সাধারণ মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট, গুম, হত্যা, ব্যাংক ডাকাতি, রাহাজানি, দুর্ভিক্ষ, দুর্নীতি,দুঃশাসনের স্টিমরোলার চলতে থাকে। দেশে সে সময় সিরাজ শিকদারসহ প্রায় ২৭ হাজার ভিন্ন মতাবলম্বী রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ষীবাহিনী কর্তৃক হত্যা করা হয় এবং গুম করা হয় প্রায় ১০ হাজার বিরোধী নেতাকর্মীকে। গণতন্ত্রের পথ হয় রুদ্ধ, সৃষ্টি হয় বাকশাল, সব পত্র-পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মাত্র চারটি পত্রিকা রাখা হয়। প্রয়াত স্বনামধন্য সাংবাদিক নির্মল সেন দৈনিক ইত্তেফাকের এক উপসম্পাদকীয়তে লেখেন, ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই।’ সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা, ছড়াকার আবু সালেহ স্বাধীনতার এক বছর পর লিখলেন, ‘ধরা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না, বলা যাবে না কথা,রক্ত দিয়ে পেলাম শালার আজাব স্বাধীনতা।’ ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষে বিদেশ থেকে পর্যাপ্ত সাহায্য আসার পরও লাখ লাখ মানুষ না খেয়ে মারা গেল। তার পরিপ্রেক্ষিতে কবি রফিক আজাদ লিখলেন, ‘ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাবো।’শেখ মুজিবের একদলীয় দুঃশাসনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় মার্কিন মাসিক রিডার্স ডাইজেস্টে। ১৯৭৫-এর মে মাসের সংখ্যায় লেখা হয় "শেখ মুজিব দু’টি বেসামরিক সংগঠনের ওপর নির্ভরশীল। একটি হচ্ছে তার ভাগ্নে শেখ মনির এক লাখ সশস্ত্র একগুঁয়ে যুবকের সংগঠন যুবলীগ, আর একটি হলো নিষ্ঠুর রক্ষীবাহিনী।" তাদের কাজ হলো যখন-তখন কল কারখানায় ঢুকে পড়ে শ্রমিকদের ওপর অত্যাচার, নির্যাতন করা, হত্যা করে সন্ত্রাসের রাজত্ব চালানো।

১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে খুন করা হয় মুক্তিযোদ্ধা টুয়াড কামালকে,এর কিছুদিন পর হত্যা করা হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা নেভাল সিরাজকে। আর এই ভাবেই শুরু হয় এইদেশে হত্যার রাজনীতি।

"১৯৭২ সালে ( বিরোধী মতের রাজনৈতিক দল, পিকিং পন্থি) নকশালদের দেখা মাত্র গুলি করে হত্যার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান॥ ( তথ্যসূত্র: বাংলার বানী, ১ এপ্রিল, ১৯৭২)।"

"শুধু মাত্র ১৯৭২ সালে মুজিব সরকারের আমলে সারা দেশে ব্যাঙ্ক ডাকাতি হয় ৩১ টি, গুপ্তহত্যা হয় ১৪৬৭ টি, ডাকাতি ২০০০, নগদ অর্থ লুট প্রায় ৮ কোটি টাকা॥ ( তথ্যসূত্র: দৈনিক গনকন্ঠ, ২৬ জানুয়ারি, ১৯৭৩)।"

"১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ আওয়ামী শ্রমিক লীগ ১০০০০ সদস্য নিয়ে গঠন করে 'লাল বাহিনী'॥ যাদের কাজ ছিল গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে বিরোধী দলীয় নেতা কর্মীর উপর অত্যাচার করা॥( তথ্যসূত্র: দৈনিক সংবাদ, ২১ জুলাই, ১৯৭২)।"

"১৯৭৩ সালে পুলিশের গুলিতে মতিউল আলম এবং কাদেরুল ইসলাম নিহত হন। এই হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে ২ জানুয়ারি সারাদেশে হরতাল পালিত হয়॥ ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা ডাকসুর আজীবন সদস্য পদ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে বহিষ্কারের ঘোষণা দেন। (তথ্যসূত্র: দৈনিক বাংলা, ৪ জানুয়ারি, ১৯৭৩)।"

"১৯৭৩ সালে বাজিতপুরে রক্ষি বাহিনী এবং মুজিব বাহিনীর অত্যাচারে ১২৬ জন নিহত হয়॥ ( তথ্যসূত্র: আহমদ মুসা, প্রগুক্ত,পৃ- ৯১) । গাইবান্ধায় ৭৩ সালে মুজিব বাহিনীর হাতে খুন হয় জাসদ সভাপতি সুজা। এছাড়া আরো অনেক নেতা কর্মীকে হত্যা করে মুজিব বাহিনী॥ ( তথ্যসূত্র: গনকন্ঠ, ২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৪)"
৭২ - ৭৫ ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগনজে ছিল লাশের ছড়াছড়ি। হাশেম নামের একজনকে প্রকােশ্য গুলি করে হত্যা করে রক্ষি বাহিনী। ( তথ্যসূত্র: কাজী শামীম, সন্ত্রাস ৭৩ - ৭৪, সাপ্তাহিক সংহতি,৮ জানুয়ারি, ১৯৮৪)।

১৯৭৩ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের কিছু খবরের শিরোনাম ছিল এই রকম - 'ঝিনাইদহে এক সপ্তাহে আটটি গুপ্তহত্যা (০১/০৭/৭৩)'। 'বরিশালে থানা অস্ত্রশালা লুটঃ ৪ ব্যক্তি নিহত (৪/০৭/৭৩)'। 'পুলিশ ফাঁড়ি আক্রান্তঃ সমুদয় অস্ত্রশস্ত্র লুট (১২/০৭/৭৩)'। 'চট্টগ্রামে ব্যাংক ডাকাতি,লাল দীঘিতে গ্রেনেড চার্জে ১৮ জন আহত, (১৫/০৮/৭৩)'। 'খুন ডাকাতি রাহাজানিঃ নোয়াখালীর নিত্যকার ঘটনা,জনমনে ভীতি (১৬/০৮/৭৩)'। '২০ মাসে জামালপুরে ১৬১৮টি ডাকাতি ও হত্যাকান্ড (১৭/১১/৭৩)'। 'আরও একটি পুলিশ ক্যাম্প লুটঃ সুবেদরসহ ৩ জন পুলিশ অপহৃত (১৩/০৭/৭৩)'।

" শেখ মুজিবের শাসন আমলে সাড়ে ৪ হাজার জাসদ কর্মী হত্যার অভিযোগ করে থাকে জাসদ। সাম্যবাদী দলের প্রায় ৩০০০ কর্মী নিহত হয়॥ ৭৫ সালের ২ জানুয়ারি সম্পূর্ণ পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করা হয় সরবহারা দলের প্রধান সিরাজ সিকদারকে। ( তথ্যসূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, ১৪ ই জানুয়ারি,১৯৮২)। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারী শেখ মুজিবুর রহমান সংসদে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন, ' কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?'

" ১৯৭৩ সালের জুন থেকে ১৯৭৪ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে ঢাকা শহরে আনজুমান মুফিদুল ইসলাম ১৪০০ বেওয়ারিশ লাশ দাফন করেছে। আর ১৯৭৪ এর জুলাই হতে১৯৭৫ এর জুলাই পর্যন্ত দাফন করেছে ৬২৮১টি বেওয়ারিশ লাশ। ( তথ্যসূত্র: ইত্তেফাক: ২১ অক্টোবর ১৯৭৫)।"

" চরম বামপন্থী, নকশাল বাহিনী, সর্বহারা ও জাসদের গণবাহিনীর হাতে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা কর্মী নিহত হন। ১৯৭২ সালের ৬ জুন সংসদ সদস্য আবদুল গফুর নিহত হন। তাঁর সঙ্গে ছিল কামাল ও রিয়াজ নামের দুজন। তারাও নিহত হয়। আবদুল গফুর ১৯৭০ সালের নির্বাচনে খুলনা থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭৩ সালের ৩ জানুয়ারি নিহত হন সংসদ সদস্য সওগাতুল আলম সগির। তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে মঠবাড়িয়া থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭৩ সালের ৩ মে সংসদ সদস্য নুরুল হক নিহত হন। তিনি ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হিসেবে নড়িয়া থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালের ১০ জানুয়ারি নিহত হন সংসদ সদস্যমোতাহার উদ্দিন আহমদ। তিনি ১৯৭০ সালে ভোলা থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সংসদ সদস্য গাজী ফজলুর রহমান নিহত হন ১৯৭৪ সালের ১৬ মার্চ। তিনি ছিলেন নরসিংদীর মনোহরদী এলাকা থেকে নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য। ১ আগস্ট ১৯৭৪ সংসদ সদস্য এডভোকেট ইমান আলী নিহত হন। তিনিজাতীয় পরিষদের সদস্য এবং ময়মনসিংহ আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। ২৭ ডিসেম্বর ১৯৭৪কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ঈদের নামায পড়ার সময় নিহত হন সংসদ সদস্য গোলাম কিবরিয়া। তিনি ১৯৭০ সালে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের ২৪ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্য আবুল খালেক নিহত হন। তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন নেত্রকোনা থেকে। ১৯৭২ সালে ২৯ জন, ১৯৭৩ সালে ৭৭ জন, ১৯৭৪ সালে ৫২ জন এবং ১৯৭৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ৪৪ জন প্রতিনিধি, ছাত্রনেতা, শ্রমিকনেতা, মুক্তিযোদ্ধা, পুলিশ ও রক্ষীবাহিনীর সদস্যকে হত্যা করা হয়।
( তথ্যসূত্র: আনোয়ার উল আলমের স্মৃতিচারণ মূলক গ্রন্থ ‘রক্ষী বাহিনীর সত্য-মিথ্যা’)।

অবশেষে,১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট মেজর ফারুক এবং মেজর রশিদের নেতৃত্বে সপরিবারে হত্যা করা হয় শেখ মুজিবর রহমানকে।

................. চলবে
৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)
.................................................................................................................



কক্ষপথে ঘোরে আমার একলা মনের ইলেকট্রন,
নেগেটিভ চার্জে মেঘ জমেছে, খুঁজছে আজি কার্বন মাখা অন্যমন।
তুমি যখন পজিটিভ এনার্জিতে, এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫৮



পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

একটি একটি সামরিক কৌশল। কোনো সামরিক বাহিনী যখন পিছু হটে বা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে চায়, তখন তারা নিজেদেরই ফেলে যাওয়া এলাকার সমস্ত ফসল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের পরিকল্পনাটা কোথায় ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১০


ডা. জাহেদ উর রহমান। জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা বিরোধী ছিলেন এবং তাঁকে চেনেন না, এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। মানুষটি অ্যাক্টিভিজম ছেড়ে নতুন সরকারের মুখপাত্র হয়েছেন। এতে আমার মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:২৫

[মানুষ এতো দুষ্ট কেন? পুরনো কথা ভিডিও সহ ফেসবুকে এভাবে না ছাড়লে হয় না। ]

“আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন"

২৫ হাজার টাকার মজুরি আন্দোলন আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে- ভাল্লাগে!

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৭


আমাদের ঝাল খাওয়ার ইতিহাস হাজার বছরের নয়, তবুও কেন আমরা ঝাল পাগল জাতি হলাম এইটা নিঃসন্দেহে গবেষনার বিষয়। পর্তুগীজেরা না আসলে আমরা হয়তো কাঁচা লঙ্কা বা শুকনো লঙ্কা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×