somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

উপন্যাস: এখানে ওখানে ৪ (দ্বিতীয় অংশ)

২০ শে জুন, ২০০৭ দুপুর ১২:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

চতুর্থপর্ব(১মঅংশ)
++++++++++++++++++++++++++++

রাশেদ মুখ তুলে তাকায়, তার দুই চোখ ভরা শুধুই অশ্রু। সেই অশ্রুর এক-দুফোঁটা গড়িয়ে গড়িয়ে ভাতেও পড়ে। অসহায় এক আকুতি চোখেমুখে নিয়ে রাশেদ রিপার চোখেচোখ রেখে বলে,
রিপা, আমার ক্যান্সার হয়েছে, স্টমাক ক্যান্সার।

কি!! কি বলছ এসব!!!
রিপার চিৎকার রাতের আঁধারকে এক রহস্যময় অবয়বে ঢেকে ফেলে। রাস্তার মোড়ের নেড়ি কুত্তাটার 'কুঁই' 'কুঁই' ডাকগুলো হঠাৎ খুব স্পষ্ট হয়ে কানে বাজে।

দুটো মুখ বিহবল হয়ে তাকিয়ে থাকে পরস্পরের দিকে কতক্ষণ, সে সময়টা যেন ঘন্টা, মিনিট, সকেন্ডে হিসেব করবার মতো নয়। অনন্ত এক সময়ের চাদর চারপাশের সবকিছুকে হঠাৎ করেই আবৃত করে ফেলে, এমন ক্ষণগুলোতে পৃথিবী সম্ভবত আবর্তন বন্ধ করে দেয়, একটু থেমে দম নেয়, একটু থেমে দম দেয়।

হতবিহবলভাবে কতক্ষণ পার করেছে দুজন রিপা জানেনা।
হটাৎ সম্বিত ফিরে এলে তার মনে হয় রাশেদের কোথাও ভুল হচ্ছে। নিশ্চয়ই ভুল হচ্ছে, তা না হলে ক্যান্সার মানউষের হয় ঠিক আছে; তাই বলে তাকেই কেন এভাবে আঁকড়ে ধরবে? মাথায় ঝিম ধরে উঠে রিপার, চারপাশের সবকিছুকে কেমন উল্টে যাচ্ছে বলে মনে হতে থাকে, আবার মনে হয় যেন ডাইনিং হলের দেয়ালের জানালাটা ফুলে ফেঁপে উঠছে, আস্তে আস্তে গ্রাস করে নিতে আসছে। রিপা বুঝতে পারে এমন অস্থির পরিস্থিতির মুখোমুখি সে এর আগে কখনও হয়নি।

মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো মুখ লুকিয়ে থাকা রাশেদকে দেখে এই মুহূর্তে তার একরকম বিরক্তি বোধ হয়। রাশেদের ক্যান্সার হতে পারে, এটা যে রিপা একদমই ভাবেনি তা না। বরং, সেই ভয়ানক বমির ঘটনার দিন রিপার মনেও হয়েছিল একবার রাশেদকে বলে ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে গিয়ে চেক করাতে, আবার সাথেসাথেই ভেবেছিল সে নিজে মনে হয় খুব বেশী টেনশন করছে। হয়ত ছেলেরা বমি করলে এত বেশীই বমি করে, শুধু রিপা নিজেই জানেনা। তাও মাঝেমাঝে দুশ্চিন্তাটা মনের কোণে যে একদম আসেনি তা না, কিন্তু আসতে শুরু করলেই তাড়িয়ে দিয়েছে দূর দূর করে। একদম পাত্তাই দেয়নি। কিন্তু সেটা যে একদম এভাবে তার ঘাড়ে এসেই চাপবে, সত্যিসত্যিই যে চেপে বসবে সেটা বিশ্বাস করা আসলেই কষ্টের, সত্যিই ভয়ানক।

রিপা একটু ধাতস্থ হয়ে রাশেদকে আবার জিজ্ঞেস করে, রাশেদ তুমি কি আসলেই নিশ্চিত? তুমি ঠিক করে বলে কোথায় দেখিয়েছ?
রিপার জিজ্ঞাসার মধ্যে প্রাণপণে লুকিয়ে থাকে 'রাশেদ, না বলো; রাশেদ, না বলো।'

রাশেদ সেটা বুঝতে পারে। তার নিজেরও তেমনই হয়েছিল। ডাক্তার নাসিম যখন প্রথমবার ক্যান্সারের কথাটা বললেন, রাশেদ মুখ ফসকে বলে ফেলেছিল, স্যার আপনি কি নিশ্চিত?
অন্য ডাক্তাররা হলে হয়ত শীতল চোখে 'আমি নিশ্চিত না হয়ে কখনও বলিনা' বা সেধরনের কিছু বলত, কিন্তু ডা. নাসিমের মতো প্রচন্ড প্রফেশনাল ডাক্তার বলেই হয়ত রাশেদকে তিনি মায়াভরা চোখে বলেছিলেন, হ্যাঁ আমি নিশ্চিত, তবে রিকভারীর সম্ভাবনা যে নেই তা বলবনা। আর আপনাকে রিকভারির প্রস্তুতি নিতে হবে খুবই শীগগিরই, যত দ্রুত পারেন।
সেদিন রাশেদের কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিলনা, বারবার ভাবছিল ভুল হতে পারে। মুখ ফুটে ডাক্তারকে কিছু বলতে পারছিলনা, অথচ তার মনে হচ্ছিল ডাক্তারকে চ্যালেঞ্জ করে এই বলে যে আরেকবার চেকআপ করলে ভুলটা ধরা পড়বে। কিন্তু বলতে পারেনি, বোবা কান্না হয়ে আটকে গিয়েছিল নিজের অক্ষমতা নিজের মাঝেই। তাই আজ যখন রিপা বিশ্বাস করতে পারেনা, রাশেদ বুঝতে পারে রিপার মনোভাব। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি ভেঙে পড়লেতো হবেনা! অনেকপথ বাকী। রাশেদ শান্ত ধীরস্থিরভাবে রিপাকে বলে যায়, ক্যান্সার ইন্সটিটউটে
দেখিয়েছি রিপা, ডা. নাসিমকে দেখিয়েছি; তুমি তো জানই উনি কতবড় ক্যান্সার এক্সপার্ট।

রিপা দ্বিতীয়বার হতবিহবল হয়, তার মনের শেষ আশাটুকুও যেন ডা. নাসিমের নাম শোনার সাথেসাথে দপ করে নিভে যায়। হয়ত তার একটু আশা ছিল যে রাশেদের টেস্টের রেজালট ভুল হয়েছে, আজকাল যে এমন কেইস হয়না তা না। কিন্তু ডা. নাসিম বলে কথা, উনার ভুল করার কথা না। রিপার হঠাৎ করে গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে।

ক্যান্সারের সাথে যে তার আগে পরিচয় হয়নি তা না। ইউনিভার্সিটিতে থাকতে যখন সহপাঠী কামরুলের ক্যান্সার হয়েছিল, তখন তারা জানপ্রাণ দিয়ে কামরুলের জন্য ফান্ড রেইজ করেছে। তারপর তার চাকরীর স্থলেও তাদেরকে কেমোথেরাপীর ঔষধ নিয়ে কাজ করতে হয়েছে, আত্ণীয়দের মাঝেও মায়ের খালাতো বোনের ক্যান্সার হয়েছিল বছর তিনেক আগে, মারাও গেছেন। কিন্তু সেগুলো সবছিল নিজের আওতার বাহিরে, অন্যদের অসহায় অবস্থা দেখে তার মন পুড়েছে, কামরুল যেদিন প্রথম বলেছিল ওর ক্যান্সার হয়েছে রিপা কান্না আটকাতে পারেনি, এত কাছের একজন মানুষ চলে যাবে ভেবে। কিন্তু আজ তো ব্যাপারটা পুরোপুরি অন্য, আজ সে নিজেই সেই অবস্থানে যেখানে তাকে দেখে অন্যরা ভাববে, 'আহা!, কি কষ্ট!'। রিপার বিশ্বাস হতে চায়না কোনভাবেই, এতদিন যে ব্যাপারটা দেখে মানবতার জন্য নিজের প্রাণ কাঁদছে বলে আত্নতৃপ্তি পেয়েছে, আজ সেটা তার নিজেরই হয়ে গেছে! কেন তার বেলায়ই সবসময় এমন হয়! কেন রাশেদের ক্যান্সারটা আর সাত-আটমাস আগে হতে পারলনা, রিপা এও ভেবে বসে।

সামনে বসে থাকা রাশেদকে দেখতে তার অসহ্য লাগছে, সে ঠিক বুঝতে পারছেনা এটা কি রাশেদের অসহায় বসে থাকার কারণে, নাকি রাশেদের কারণে তার নিজের এই বিপর্যয়ের কারণে।

রিপা আবারও চীৎকার করে উঠে, তুমি কি আসলেই সিরিয়াস?, রিপার চিতকারে আবারও রাতের আঁধার ভেঙে খান খান হয়, রিপা হিস্টিরিয়া রোগীর মতো বলে যেতে থাকে, রাশেদ দেখো, তুমি মজা করবেনা, একদম মজা করবেনা। মজা করা তোমার স্বভাব, এবং আমি জানি তুমি যখন মজা কর, তখন সেটা সীমা ছাড়িয়ে যায়।
রিপার গলা চড়তে থাকে।

রিপার গলার চড়তে থাকা শুনে চোখ তুলে তাকায় রাশেদ, প্রচন্ড রাগে রিপার কপালের শিরা-উপশিরাগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, এবং তার গলার ক্রমশ উপরে ওঠা দেখে রাশেদ বুঝতে পারছিল যে রিপা এখনই কান্নায় ভেঙে পড়বে।
ভাত রেখে উঠে এসে রাশেদ দুহাতে রিপাকে জড়িয়ে ধরতে যায়। রিপা এক ঝটকায় রাশেদকে সরিয়ে দিয়ে চেয়ার ছেড়ে দৌড়ে চলে যায় বাথরুমের দিকে।
কান্নায় ভেঙে পড়ে রিপা, বাথরুমের দরজার দিকে মুখ করে বিড়বিড় করে বলে, সত্যি করে বল, কিছু হয়নি। তুমি সত্যি করে বল।
রাশেদ কৈফিয়তের ভঙিতে বলে, রিপা, আমার কি করার আছে বলো? রোগটাতো হয়েছে আমার, তোমার না।

হঠাৎ আগুন হয়ে ওঠে রিপা, হ্যাঁ হ্যাঁ তোমার তো কিছুই করার ছিলনা!! এটা কিভাবে সম্ভব? আমার কপালটা এত পোড়া কেন, এমন সর্বনাশ আমাকেই ধরবে কেন?

রিপার রাগ দেখে রাশেদ খানিকটা ধৈর্য্যহারা হয়, খানিকটা বিরক্ত কন্ঠে বলে, রিপা, সর্বনাশ তো আমারই বেশী হয়েছে।

রাশেদের কথায় হঠাৎ চোখ তুলে তাকায়, ভয়ংকর দৃষ্টিতে। রাশেদ এই ভয়াবহ সময়েও যুক্তি দিয়ে যাচ্ছে? রাশেদ কি বুঝছেনা রিপা কেন ভেঙে পড়ছে! রাশেদ কি বুঝছেনা যে কতটা ভালবাসলে রিপা এই খবরে এমন ভেঙে পড়তে পারে! পুরো পরিবেশটা তার কাছে আরও অসহ্য মনে হতে থাকে, হঠাৎ তার মনে হতে থাকে আসলে কি ভালবাসা আছে? অন্ততঃ রাশেদের মনে?
বিদ্যুতের বেগে তার মনে প্রশ্ন জাগে রাশেদ কেন এভাবে কৈফিয়ত দিচ্ছে?

রাশেদ কেন এভাবে কৈফিয়ত দিচ্ছে মনে হতেই রিপা খানিকটা থমকে যায়। শান্ত- ধীরস্থির দেখায় তাকে, মনে হয় এক সেকেন্ডের মধ্যেই সে বেশ ধাতস্থ হয়ে গেছে। চোখ সরু করে রাশেদকে জেরার স্বরে জিজ্ঞেস করে, একটা কথা সত্যি করে বলবে?

রাশেদের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। শান্তস্থির রিপাকে দেখে হঠাৎ তার মনে হয় এর চেয়ে একটু আগের হিস্টেরিক রিপাই তো ভাল ছিল। নিজেকে যথাযথ প্রস্তুত করে রাশেদ বলে, কি বলব?

রিপা একই স্বরে বলে যায়, তোমার ক্যান্সার আসলে কখন ধরা পড়েছিল? আমাদের বিয়ের আগে? নাকি পরে?

(চলবে ...)
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে জুন, ২০০৭ সকাল ৯:৪৬
১৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রুবা

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:২৮




রুবার সাথে আমার বিয়েটা ওঠ ছেড়ি তোর বিয়ের মতোই হয়েছে । একদম সাধারন কোনরকম অনুষ্ঠান নাই । সেইদিন অফিসে অনেক কাজ ছিলো । চোখে তারা ফারা দেখছিলাম । বসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রথম .........।

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৪


আন্ডারগ্রাউন্ড শোতে এটাই আমার প্রথম ড্রামস বাজানোর একটা মুহূর্ত।

কিছু গল্প আসলে পরিকল্পনা করে শুরু হয় না।কিছু গল্প হঠাৎ করে একটা মুহূর্ত থেকে জন্ম নেয় আর তারপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সমুদ্রের নীল খাম

লিখেছেন ডি এইচ তুহিন, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৪২


এই শহরে থাকি প্রায় সাতাশ-আটাশ বছর ধরে। তিন প্রেমিকার মায়া ছেড়ে যাওয়া যায় না এমন এক অদ্ভুত সুন্দর এই শহর। যার এক হাতে নদী, অন্য হাতে সমুদ্র, আর কপালে জায়গা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী দুঃশাসনের পতন অনিবার্য ছিল, জুলাই তো স্রেফ উছিলা মাত্র!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৮



জুলাই নিয়ে অনেক বিতর্ক, সমালোচনা আছে। কিন্তু, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে জুলাই গণঅভ্যূত্থান না হলে আমরা দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি পেতাম না। জুলাই ঘিরে যত বিতর্ক, সমালোচনাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুমুখোচিন্তা

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:১৬

সব মৃত্যু গণনায় আসে না। রাজনৈতিক সহিংসতার একটি পুরনো নিয়ম আছে। মৃত্যু সমান মৃত্যু নয়। কোনো মৃত্যু পত্রিকার প্রথম পাতায় যায়, কোনো মৃত্যু জয়পুরহাটেই থেকে যায়। এই বাছাইটা দৈবাৎ হয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×