গত 29 জানুয়ারি 1994 'দেশ'-এ তসলিমা নাসরিনের 'এক বছরের পড়া' প্রবন্ধের অনেক কিছুই ভালো লাগেনি । সেই ভালো না লাগার কারণ দশর্াতেই এই চিঠি ।
তাঁর প্রবন্ধের এক পযর্ায়ে তিনি লিখেছেন:
'নিজের সম্পর্কে আমি এরকম একটি ধারণা পোষণ করি যে, আমি পন্ডিত হয়েছি কি বিজ্ঞানী হয়েছি সে বড় কথা নয়, আমি মানুষ হলাম কতটুকু সেটিই বড় । এই উপমহাদেশে বাস করে অসামপ্রদায়িক হওয়া কিন্তু মানুষ হবার অন্যতম গুন । আমি অসামপ্রদায়িক হয়েছি...'
ভালো কথা, তবে এই প্রবন্ধেরই পরবর্তী কিছু উক্তি তাঁর এই কথাগুলোর সঙ্গে সঙ্গতি হারিয়ে ফেলেছে । তিনি বলেছেন, 'জারি-সারি-ভাটিয়ালির এই বাংলাদেশ, গ্রামে গ্রামে কবিগান, পালাগান, যাত্রা নাটক হবে, তা না হয়ে যদি গ্রামের মাঠে মাঠে ইসলামি জলসা বসে, যে দৃশ্য আমি আমার শৈশবে দেখিনি, কৈশোরেও এত দেখিনি, তা দেখে আজকাল আশঙ্কায় বুক কাঁপে ।'
এতে আশঙ্কার কোন ব্যাপার থাকতে পারে সত্যিই জানা ছিল না । জারি সারি ভাটিয়ালির সঙ্গে আমার কোন বিরোধ নেই। এরা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ - চলে এসেছে যুগ যুগ ধরে, আশা করি চলবেও । উল্ল্লেখ্য যে, বিংশ শতাব্দির গোড়ার দিকে এবং মাঝামাঝি সময়ে যাত্রা-থিয়েটারে 'নবাব সিরাজদৌল্লার মত ঐতিহাসিক নাটক যেমন দেখানো হতো, তেমনি থাকতো 'রামলীলা' কিংবা 'বেহুলা-লখিন্দার' - এর মতো পালাও । অথর্াৎ সংস্কৃতির ওপর ধর্মের প্রভাব কিন্তু পড়ছে গোড়া থেকেই । এটাই তো স্বাভাবিক । একটি সমাজে বসবাসকারী মানুষ আর তাঁদের বিশ্বাস নিয়েই তো একটি সংস্কৃতি গড়ে ওঠে ।
লেখিকা নিজেই স্বীকার করেছেন বাংলাদেশ কারো লেজুর নয় । তাই যদি হয় তাঁর বিশ্বাস তবে বাংলাদেশের মাঠে মাঠে ইসলামি জলসা তাঁর মনে ত্রাসের সঞ্চার করার কারণ নেই কোন । কারণ যাত্রা পালাগান এদের মতই ইসলামি সংস্কৃতি বাংলাদেশের জনজীবনের অংশ ।
আমার বাবার শৈশব কেটেছে 50 দশকের গোড়ার দিকে, তিনি কিন্তু ইসলামী জলসা এবং মজলিস আশৈশব দেখে আসছেন । তসলিমা নাসরিন যদি বলেন তিনি দেখেন নি, তা হলে অবশ্য বলার কিছু নেই । কিন্তু আমরা জানা মতে এরকম জলসা নতুন কোন ব্যাপার নয় । জারি-সারি ভাটিয়ালির পাশাপাশি এও চলে এসেছে এবং এদের মধ্যে কোন বিরোধ তো নেই । যদি থেকেও থাকে, সেই বিরোধের কারণ ধমর্ান্ধতা - ধর্ম নয় ।
ধর্ম এবং ধমর্ান্ধতা তাঁর পরবর্তী উক্তি এরকম - ধর্ম আছে বলেই ধর্মান্ধতা আছে । ধমর্ান্ধতা বিদেয় করলেও আবার ধর্ম থেকে ধর্মান্ধতা গজাবে । তাই এই বিষকেই মানুষের মন থেকে, সমাজ থেকে রাষ্ট্র থেকে তাড়াতে হবে ।'
কথাটা আমার মনে হয়েছে অযৌক্তিক, অর্থহীন এবং কিছু মাত্রায় হাস্যকর ও । ব্যাপারটা অনেকটা এরকম শোনায় - 'মাথা থাকলেই মাথা ধরা থাকবে, তাই মাথাটা কেটে বাদ দেয়া দরকার ।' ওরকম করলে কিন্তু জীবনই থাকবেনা ।
ধর্ম সম্পর্কে তাঁর উক্তিকে সমর্থণের প্রয়াসে তিনি আহ্মদ শরীফ, অন্নদাশংকর রায়, বদরুদ্দীন উমর, সাদত আলী আখন্দ প্রমুখের বিভিন্ন মতামত হাজির করেছেন । কিন্তু লক্ষ্য করলেই দেখা যায় যে এঁদের প্রত্যেকের মতামতই কিন্তু ধমর্ান্ধতার বিরুদ্ধে, ধর্মের বিরুদ্ধে নয় ।
একটি রাস্তার যানবাহন চলাচলের জন্য যেমন ট্রাফিক আইন থাকে, সমাজ অথবা ধর্মও তেমনি মানুষের জীবন চলার পথের কিছু নিয়ম । যা না থাকলে একটি সংস্কৃতি গড়ে ওঠা অসম্ভব । এ প্রসঙ্গে এরিক হফটার এর একটা উক্তি মনে পড়ছে:
হোয়েন পিপল আর ফ্রি টু ডু এ্যাজ দে প্লিজ, দে ইডজুয়ালি ইমিটেট ইচ আদার।
পৃথিবীতে খুব কম মানুষই এমন আছেন যাঁরা নিজেদের পথ নিজেরা আবিষ্কার করে সামনে এগোতে পারেন । হয়তো তসলিমা নাসরিন তাঁদের মধ্যে একজন । তাঁরা অগ্রগামী, কিন্তু পৃথিবীর বাকিরা অন্যদের প্রদর্শিত পথে চলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন - তাঁদের জন্য সামাজিক আইনের মতন ধর্মেরও প্রয়োজন । ধমর্ান্ধতা সম্পর্কে আরও একটা কথা না বলে পারছি না । 'ধর্মের প্রতি অন্ধতা' এবং 'ধর্মের বিরুদ্ধে অন্ধতা, দুটোই ্তুইগনোরানস্থ অথবা অজ্ঞতা, আমি মনে করি দুটোই সমান তিকারক ।
এবার আসা যাক সামপ্রদায়িকতার প্রশ্নে । তসলিমা নাসরিনের মতে অসামপ্রদায়িকতার অর্থ কি আমার জানা নেই । তবে নিজেকে অসাম্প্রদায়িক প্রমাণ করবার মানসে তাঁর রচনার এক জায়গায় তিনি লিখেছেন - জীবনে কখনো আমার শিয়রে কোনও বেদ, বাইবেল বা কোরান রাখিনি । রেখেছি অন্নদাশংকর রায়, শিবনারায়ণ রায়, গোর্কি, টলস্টয়...
আমার কাছে অসামপ্রদায়িকতার অর্থ এর চেয়ে ব্যাপক । এর অর্থ আমি বুঝি একজন মানুষকে শুধু মানুষ হিসাবেই ভালোবাসার চেষ্টা করা - তার ধর্ম, বিশ্বাস, জাতি অথবা গায়ের রং পরের কথা । সে অর্থে তসলিমা নাসরিনকে আমার অসামপ্রদায়িক মনে হয়নি । মনে হয়েছে তিনি শুধু মাত্র ইসলামের বিরুদ্ধেই একটি বিদ্বেষ মনে মনে লালন করেন ।
'ধর্ম সামপ্রদায়িকতার বীজ ছড়ায়' - এ কথাটা আমি মেনে নিতে পারি না । বাংলাদেশে আমি তেরো বছর বয়স পর্যন্ত ছিলাম । আমার বন্ধুদের মধ্যে হিন্দু ও খ্রিস্টীয় ধমর্াবলম্বী অনেকেই ছিল । ঈদের সময় আমার সবাই একত্রেই ঘুরতাম । আবার বিজয়াদশমীর দিন হিন্দু বন্ধুদের বাসায় আমার দাওয়াত থাকতো । আমাদের বিশ্বাস আলাদা ছিল । এ নিয়ে অনেক তর্কবিতর্ক হাসিঠাট্টাও হতো, কিন্তু এ নিয়ে আমাদের বন্ধুতে কোন অসুবিধা হয় নি । অসামপ্রদায়িকতার আরেকটু ব্যাপক অর্থ তাই করা যেতে পারে - 'কোন বিষয়ে নিজের মতামতের পাশাপাশি ভিন্ন মতামত মেনে নেবার মত মানসিক পরিপক্কতা' ।
তসলিমা নাসরিন বলেছেন 'ধর্ম সংস্কৃতি নয়' । সত্যি কথা । কিন্তু বাংলাদেশের কথা আমার যখন মনে পড়ে তখন শুধু যাত্রা-জারি-সারিা কথাই মনে পড়ে না; বরং ঈদের দিন বন্ধুদের সঙ্গে বেড়ানো, সকালবেলার আজান, রমজান মাসে সাইরেন শুনে সেহ্রী খেতে ওঠা সমস্তই মনে পড়ে । ভোররাতে খেতে উঠলে দেখতে পেতাম আশেপাশের সমস্ত বাড়ীতে আলো জ্বলছে । তখন খুব গভীরভাবে অনুভর করতাম বাংলাদেশই আমার দেশ । এই অস্ট্রেলিয়াতে তেমন তো লাগে না ! এর অর্থ কি এই নয় যে ধর্ম সংস্কৃতি না হোক, সংস্কৃতির অঙ্গ অবশ্যই । আর আমি তো শুধুই বাংলাদেশের কথা বল্লাম । ভারতেও তো দীপাবলি, হোলি কিংবা ভাইফোঁটা ধর্মীয় উৎসব হলেও সংস্কৃতির একটা বড় অংশ । আমার তো মনে হয় ধর্মের এই প্রভাবটুকু না থাকলে সংস্কৃতি অনেকটাই রঙ হারাবে ।
এবার অন্য প্রসঙ্গে আসা যাক । লেখিকা তাঁর প্রবন্ধের এক স্তরে ফেমিনিজম সম্পর্কে ওয়েরস্টারের ব্যাখ্যা দিয়েছেন
এ. দ্যা থিওরী দ্যাট উইমেন সু্যড হ্যাভ পলিটিক্যাল, ইকনমিক এ্যান্ড সোশ্যাল রাইটস ইকুয়াল টু দো'জ অফ মেন।
বি. দ্যা মুভমেন্ট টু উইন সাচ রাইটস ফর উইমেন।
কিন্তু এর পরবতর্ী নানা অযৌক্তিক কথায় তিনি এই ব্যাখ্যাটা ডিঙিয়ে যেতে চেয়েছেন । ফ্রিডম এক কথা আর কেয়স কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা ।
গণতন্ত্র সম্পর্কে একটি মজার উক্তি আছে - ডেমোক্রেসি ইন দ্যা ইষ্টার্ণ কানট্রিস ইজ দ্যা রাইট টু ডু দ্যা রং থিঙ অ্যান্ড ডেমোক্রেসি ইন দ্যা ওয়েষ্টাণ্য কানট্রিস ইজ দ্যা রাইট টু ডু দ্যা রাইট থিঙ বাট দ্যা রাইট থিঙ ইজ হোয়াট ইউ থিঙ্ক ইজ রাইট।
তসলিমা নাসরিনের স্বচাপানো ফেমিনিজমের ব্যাখ্যায় এই কথাটিই বারবার মনে পড়েছে । তিনি নারী স্বাধীনতা সম্পর্কে অন্নদাশংকরের 'স্ত্রী-পুরুষ' রচনার সমালোচনা করেছেন । অন্নদাশংকর নারী ও পুরুষকে বলেছেন একে অপরের পরিপুরক।
এই প্রসঙ্গে লেখিকা বলেছেন- স্ত্রী না হলে যদি পুরুষ না হয়, পুরুষ না হলে যদি নারী না হয়, এতই যদি তাদের দিন এবং রাত পূর্ব ও পশ্চিমের মত সম্পর্ক তবে হোমোসেক্সুয়ালিটি এবং লেজবিয়ানিজম, যা ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে সমাজে সেটিকে কি একেবারে নাকচ করে দিতে পারি?...
যা কিছুই বেড়ে ওঠে সমাজে তাই যে গ্রহনযোগ্য হতে হবে আমার তা মনে হয় না । সেরকম হলে তো দুনর্ীতি, খুন, ধর্ষণ, ড্রাগ এ্যবিউজ ইত্যাদি আরো যে সমস্ত দিক বেড়ে উঠছে সব কিছুকেই জায়গা করে দিতে হয় । লেখিকা নিজেকে একজন প্রগতিশীল এবং আধুনিক ব্যক্তি বলে মনে করেন, অথচ 'নারী-পুরুষ একে অপরের পরিপুরক' এই কথায় তিনি শুধু শারিরীক সম্পর্ক ছাড়া আর কিছু দেখলেন না । নারী ও পুরুষ মানসিকভাবেও তো একে অপরের পরিপূরক হতে পারে । সেই অর্থে একটি সমাজের প্রত্যেক মানুষই একে অপরের পরিপূরক ।
নারী স্বাধীনতা সম্পর্কে তাঁর পরের বক্তব্য এরকম - যদি প্রকৃতির দৃষ্টিতে দুজনকে পরিপূরক ধরি, তবে সামাজিক এবং ধমর্ীয় অবস্থানে তারা আদৌ কি সুপারিয়র ইনফিরিওর নয়? প্রভু দাসী সম্পর্ক নয় ?...
এ ধরনের কথা মনের ভেতর ইনফিরিওটি কমপ্লেক্স থাকলেই বলা সম্ভব । প্রকৃতির নিয়মে নারী ও পুরুষ আলাদা - পুরুষ তাঁর পুরুষত্ব নিয়ে আলাদা, নারীও আলাদা তাঁর নারীত্ব নিয়ে । এখানে কেউ ছোট নন, কেউ বড় নন ।
লেখিকা আরও বলেছেন - স্ত্রীরও প্রয়োজন পুরুষের মত স্বাধীন হওয়া বা তার সমান হওয়া ।...
তাঁর এই একটি কথাতেই কিন্তু এতক্ষণের 'নারী স্বাধীনতা'কামী সমস্ত স্লোগান ভেস্তে গেল । এর থেকেই প্রমানিত হলো তিনি নিজেও মনে করেন নারী ইনফিরিওর, নয়তো 'পুরুষের মতো স্বাধীন' হবার প্রশ্ন তিনি তুলতেন না । এতই যদি তিনি স্বাধীনচেতা তবে মাথা উঁচু করে কেন বলতে পারলেন না - নারীর হওয়া উচিৎ তার নিজেরই মতো, নিজস্ব নিয়মে?
লুনা রুশদী
প্রকাশ: 09 এপ্রিল 1994 'দেশ', কোলকাতা
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা ফেব্রুয়ারি, ২০০৬ দুপুর ২:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


