সোনামনি ডাকটা তাকে আমি শিখিয়েছি আর আমাকে শিখিয়েছিল সায়ন।
মামা বললো - আপা দুলাভাই কই রে?
- বাজারে গেছে বললো ওরা..
- তুই কখন আসলি?
- এইতো একটু আগে
আমি অলকাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।
- অলিবাবু। তুমি কি আমায় ভালোবাসো?
- হুম ! ভালোবাথি!
- এই, ওই গান টা গাও না
- কোনতা?
- পাগলারে ছাড়িয়া পাগলি যায় চলিয়া..
- পাগলাল মন ঘলে তাকে না...তাকে না.
এই গানটা সায়ন গাইতো মজা করার জন্য। কোন গানেরই সুর হতো না ওর। কিন্তু এই দুই লাইন ওর মতো করে কেউ গাইতে পারে না, কেমন যেন ভেঙে ভেঙে গায়, খুব মজা লাগে শুনতে। ক্যাসেট প্লেয়ারে চন্দন দাশের গান বাজছে -
উয়োহ না হোগা তো কিয়া কামি হোগী
বাস আধুরী সি জিন্দেগী হোগী...
আব্বা আম্মা চলে এসেছে এর মধ্যে । সঙ্গে রাজ্যের সব বাজার। আব্বা কোন জিনিষই কম কিনতে পারে না।
- কিরে মা! কেমন আছিস?
- ভালো। তুমি কেমন আছ?
- আছি রে মা। এই গরীবের খোঁজ কে রাখে বল।
এটা আব্বার প্রতিদিনের ডায়ালগ।
আমি বললাম - কেন গরীবের খোঁজ গরীবের বউ রাখে। আম্মা প্রতিদিন আমার হলে ফোন করে তুমি যখন অফিসে থাক, আর বলে যে ইতি তোর আব্বা তো এখনও এল না, কি যে করি! আম্মা তোমাকে মহা ভালোবাসে তুমি খোঁজ তো রাখোনা কিছু।
আব্বা হেসে ফেলে আমার মাথার চুল এলো মেলো করে দিতে দিতে বললো - থাম তুই, তুই একটা মহা ঘটক। আমি আর তোর কথা বিশ্বাস করছি না।
মাঝখান থেকে আম্মা বললো - সত্যি কথা বিশ্বাস করবে কেন?
- সত্যি নাকি? না মেয়ের সামনে একটু দেখিয়ে নিচ্ছ?
- দেখানোর জন্যও তো কিছু থাকতে হয়। তুমি তো দেখাতেও পার না।
আমরা সবাই বসার ঘরে বসে গল্প করছিলাম। মামা সবসময়েই মজার মজার কথা বলে। ওদের ছোটবেলার এক একজনের কথা বলে বলে অভিনয় করে দেখাচ্ছিল আর আমরা সবাই হাসতে হাসতে চোখে পানি এনে ফেলছিলাম। ভীষণ পরিপূর্ন লাগছিল ঘরটাকে।
হঠাৎ ফোন বেজে উঠলো। আমি ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে অপারেটার বললো বাংলাদেশের ফোন, লাইনে থাকতে। আমি আব্বার হাতে ফোন দিলাম।
ফোনে কথা বলতে বলতে হঠাৎ আব্বা খুব গম্ভীর হয়ে গেল। কেমন একটা ছায়া নেমে এল তার চোখে। বুঝতে পারছিলাম খারাপ কোন খবর। ফোন রেখে দিয়ে আব্বা প্রায় মৃত মানুষের গলায় বললো - ভাই মারা গেছে, মা খুব অসুস্থ।'
ঘরের ভেতর একটা অসস্তিকর নীরবতা নেমে এল। আব্বার কষ্টটা আমরা সবাই বুঝতে পারছি কিন্তু কেউ অনুভব করতে পারছি না তেমন করে।
আব্বার ভাই, অর্থাৎ আমার বড় চাচার সাথে সেরকম ভাবে মেশার সুযোগ আমরা পাইনি কখনও। বাংলাদেশে যখন ছিলাম তখনও না। আর এখানে আসার পরে সেই ব্যবধান আরও বেড়েছে। তাই এই মৃতু্য তেমন ভাবে আমাকে স্পর্শ করলো না, যেমনভাবে করলো আব্বার কষ্ট। আমি তার পাশে বসলাম, হাত ধরলাম। কিই বা বলার আছে আমার? মৃতু্যর মত সুনিশ্চিত অথচ আকস্মিক ঘটনাও তো আর নেই পৃথিবীতে। আব্বার চোখের পাতায় ফোঁটায় ফোঁটায় শিশিরের মত পানি জমতে লাগলো...
প্রকাশ: পরবাস
ছবি: সাহিদুর রহমান
(চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


