somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তিনতলার বারান্দা - 1

১৮ ই মার্চ, ২০০৬ বিকাল ৫:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কয়েক বছর আগে বাংলালাইভ নামের একটা অনলাইন পত্রিকায় আমি একটা ধারাবাহিক ফিচার লেখা শুরু করেছিলাম। অলসতাবশত, সেই লেখা কয়েক পর্বের পরে আর লেখা হয় নাই। এখানে প্রথম পর্ব তুলে দিলাম:

.........

আম্মা বলেছিল নতুন বাড়িতে গেলে আমার তিনচাকার সাইকেলটা আর চালানো যাবে না। কি করে চালাবো? তিনতলার উপরে তো! আমাদের মীরপুরের বাড়ীর মতন একতলা না। আর তার চারপাশে এরকম সবুজ জংলা জায়গা নাই, এমনকি আমাদের বাড়ীর দেয়ালের বাইরে একটা যে ছোট পুকুড়ের মত আছে, তাও নাকি নাই। মাঝে মাঝে সন্ধ্যাবেলায় চাঁদের আলোতে, ওই দেয়ালের উপর আমাকে নিয়ে বসে ছোটমামা ভূতের গল্প বলত। আর দেয়াল ঘেষে অনেকগুলি সুপারি গাছ ছিল। তাদের পাতায় বাতাসের শব্দে কেমন গা ছমছম করত।

এ সব ছেড়ে আসতে খুব একটা মন খারাপ হয়েছিল কিনা এখন আর মনে নাই। সে বয়সে স্মৃতির ভাঁড়ারে খুব বেশী জমাবার সুযোগ করে উঠতে পারিনি। তাই পুরানোকে ছেড়ে যাওয়ার কষ্টের চেয়ে নতুনের টানটাই বেশী করে অনুভব করেছিলাম সন্দেহ নাই। আম্মার কথা শুনে চার বছরের কল্পনায় দেখতে পেয়েছিলাম ছোট একটা ঘর, আর আব্বা, আম্মা, সানিয়া, বুবু (দাদী), ছোটমামা, আমি এমনকি কাঁথায় মোড়া কয়েক মাসের ইফা সবাই গায়ে গায়ে মিশে লম্বা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। একদম স্ট্যাচু খেলার মত। ওই খেলাটা তখন নতুন শিখেছিলাম -

'এলোনা বেলোনা কলার পাতা ঝুম,
ওলো সালেকা মালেকা সালামালাইকুম'

বলে মুর্তির মতো দাঁড়িয়ে যেতে হয় । নড়লেই আউট! আমার খুব মজা লেগেছিল। নাও ঠেলা সামলাও এবার। যতই আমার রাতের বেলা ঘুম পাড়িয়ে অন্য ঘরে চলে যেতে চাও, আর পারবে না। দুইটা ঠেলাগাড়ির উপরে সংসারের যাবতীয় আসবাব চাপিয়ে আব্বা আর মামা রিকশায়, ওদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে। আর আমরা সবাই বেবী ট্যাক্সিতে - আমার সেই সময়ের দারুন সব বিলাসিতার একটা। নতুন বাড়িতে যাওয়ার আনন্দের চেয়েও এতটা পথ বেবীট্যক্সিতে যাওয়ার আশায় আমি তখন বাকবাকুম। আম্মার সামনে সানিয়া, মাঝখানে বুবুর কোলে গোলাপী একটা পুতুলের মত ইফা, ছোট ছোট মুঠি পাকানো আঙুলে কাউকে ধরলে আর ছাড়তে পারে না। আম্মা বিরক্তিতে নাকে মুখে আঁচল গুঁজে কুল পাচ্ছেনা। আর আমি হয়তো আপন মনে বাইরের দিকে দেখতে দেখতে চলেছিলাম। সেই সময়ের আধো হারিয়ে যাওয়া, জোড়াতালি দেয়া স্মৃতি নাড়তে নাড়তে মনে হয়, দৃশ্যটা এরকম হলেই খুব মানায়।

মীরপুর তেরো নাম্বারের এবড়োখেবড়ো মাটির রাস্তা। দুইপাশে মাচানের মত দোকান। তাতে ছোট বড় মাঝারী বয়ামে কত রকমের বিস্কুট আর চকলেট সাজানো। আমার একটা বয়সের দৃঢ় সংকল্প ছিল ওইরকম পুরা একবয়াম মিমি চকলেট আমি কিনবো।

দোকানগুলির পিছনে ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা কিছু অরক্ষিত জমি, আর ছড়ানো ছিটানো বসতি। এই দোকানীদেরই পরিবারবর্গ।... মাটির রাস্তা ছেড়ে পীচঢালা রাস্তায়। ততক্ষণে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তার ভীড়ও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। বাস, ট্রাক, বেবী-ট্যক্সি, রিকশা, গাড়ী, ডিজেল-পেট্রোলের ধোঁয়া-ধুলি মিলে মিশে সে এক এলাহী কান্ড। আর মাঝে মাঝে দুই একটা অতি সাহসী গরু কিংবা মহিষ, কিছু অবাধ্য ছাগল, লোম ওঠা কুকুর।

রাস্তার মাঝখানেই লালরঙের বাসগুলি থেমে যাচ্ছে আর কন্ডাকটার দরজায় চাপড় মারতে মারতে বলে চলেছে ঢাকা ইউনিভার্সিটি, ঢাকা মেডিক্যাল ... আরও কত সব নাম। কেউ হয়তো কোনরকমে দৌড়ে এসে হারাতে হারাতে শেষ মুহুর্তে বাসটাকে ধরে ফেলে আশাতীত সাফল্যে কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। এইসব দৃশ্যতো পরবর্তীতে শত সহস্রবার দেখতে দেখতে মনের ভিতরে একটা স্থায়ী ছবি করে নিয়েছে। সেইদিনও নিশ্চয়ই এর চেয়ে আলাদা কিছু ছিল না। অবশেষে ফুলার রোড ধরে, রোকেয়া হল পিছনে ফেলে বেবীট্যাক্সি চলে এল ঢাকা ইউনিভার্সিটির পাশে। এতক্ষণ আম্মা তার নিয়মমাফিক রানিং কমেন্টারি চালিয়ে যাচ্ছে - ' এই যে ভাই একটু আস্তে চালান, আরে মেরে ফেলবেন নাকি মিঞা! আরে আরে, বিশাল ম্যানহোল। লুনা! হাতল শক্ত করে ধরো, ভ্যাবলার মতো বাইরে তাকিয়ে থেকো না পড়ে যাবে। এই যে ভাই আপনি কি মোটর রেইস লাগাইছেন? গরুর উপরে পড়বেন তো মিঞা!'

সেটা বন্ধ করে বললো 'ওইযে দেখো ঢাকা ইউনিভার্সিটি, তোমার আব্বা ওখানে পড়ান।' আমি অবাক হয়ে দেখলাম, সাদা রঙ করা লোহার শিকের গেট, তার ভিতরে রাস্তা, ঘাসের মাঠ আর কিছু ছড়ানো ছিটানো দালান। দেওয়ালে বিভিন্ন রঙের আঁকিবুঁকি কাটা, লেখাই মনে হয়। দেখলাম বুবুও আমার মতই অবাক হয়ে দেখছে। পরে আম্মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ওই আঁকিবুকিগুলি কি। ওইগুলি নাকি স্লোগান, ছাত্ররা লিখে রাখে। আমি হতবাক হয়ে জানতে চেয়েছিলাম 'ওরা দেওয়ালে লিখে কেন, কাগজ নাই?'

হাতের বায়ে ভিসির বাড়ী। আর কিছুটা বাঁক নিয়ে ডান পাশে ফুলার রোড পাড়া। ইউনিভার্সিটি, ভিসির বাড়ি আর ফুলার রোড পাড়ার ঠিক মাঝখানে একটা ত্রিভুজাকৃতি আইল্যান্ড। তার ঠিক মাঝখানে একটা কৃষ্ণচুড়া গাছ, লালফুলে ভর্তি। অনেকদিন পরে, মেলবোর্ণে বসে, শক্তি চট্যোপাধ্যায়ের কবিতার লাইন ' কৃষ্ণচুড়ার ফুল কি প্রয়াসে লাল', পড়ে আমার ওই গাছটার কথা মনে হয়েছিল।

তারপরেই আমাদের নতুন পাড়া। ডানদিকে 35 নম্বর বাড়ী, বামদিকে দাড়োয়ানের ঘর। একটা গাছের নীচে সীমেন্ট বাঁধানো একটুখানি বসার জায়গা। বাচ্চাদের খেলার মাঠ। তার ওপাশে আরও সব দালান। আমাদের বাড়ি সোজা গিয়ে ডান দিকে, তারপরে বাম দিকে। 36/এফ ফুলার রোড। এরপরের আরো প্রায় দশটা বছর এতবড় পৃথিবীর মাঝখানে আমার ছোট্ট একটুখানি পৃথিবী।

ট্যাক্সি থেকে নামতে নামতে আম্মা হাত উঠিয়ে দেখিয়েছিল - ওই দেখ, তিনতলার বারান্দা, ওইটা আমাদের বাড়ী।

আমি ঘাড় টানটান করে দেখেছিলাম। এত উঁচুতে আমরা থাকবো!

...
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই মার্চ, ২০০৬ বিকাল ৫:৪২
১৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সিটিজেন ভিজিল্যান্টি থেকে কালেমার মিছিল: সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কতগুলো অশনি সংকেত - প্রথম পর্ব

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৮


গত মাসে আমেরিকায় "সিটিজেন ভিজিল্যান্টি" নামে মুসলিম ও অভিবাসীবিদ্বেষী একটি সিনেমা মুক্তি পায়। চলচ্চিত্রটি প্রথমদিকে দর্শকদের মধ্যে তেমন জনপ্রিয় হয়নি। পরে যখন ইলন মাস্ক এক্স প্ল্যাটফর্মে তার ২৪ কোটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

'গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড' আন্দোলন কেন ব্যর্থ হলো

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:১৩



মাও সে তুং-এর গৃহীত "গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড" (১৯৫৮-১৯৬০) আন্দোলনটি মূলত অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা, চরম অব্যবস্থাপনা এবং ভুল কৃষি নীতির কারণে মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী লীগ ফিরতে পারে, তবে…

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:২০




১। ২০১২ থেকে সংঘটিত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১২ বছরের গু/ম, খু/ন, অ*পশাসন, গণতন্ত্র হ*ত্যা, নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বং*স, দুর্নী*তি, বাকস্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকার হরণের মাত্রা এমন চরমই ছিল যে, শুধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

সিনেমা-গান-খেলাধুলা

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ২:১৭

আইন সমাজ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি নয়। আইন দৃশ্যমান, প্রতিরোধযোগ্য। সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো মানুষকে নিজেই নিজের আনন্দ নিষিদ্ধ করতে শেখানো। জীবন থেকে আনন্দের উচ্ছেদ ঘটানো। এই কাজটি বাংলাদেশে গত... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রতি বছর জুলাই আসলেই কি কাউয়া ক্যাচাল লাগতে হবে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:৫০


জুলাই মাসটা আবার ঘুরে ফিরে আসতেই দেশের রাজনৈতিক পাড়ায় পারদ চড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে যারা গত দুই বছর আগের আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলেছেন, তাদের কাছে এই জুলাইয়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×