somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

৭১ পরবর্তি বাংলাদেশ ( পর্ব ১২)

১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পরাজয় ও আত্মসমর্পণের পর পাকিস্তান ও তার বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলো প্রচার করেছিল যে, বাংলাদেশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর দখলে আছে এবং ভারত জোর করে বাংলাদেশ নামে পাকিস্তানের সেই অংশকে দখল করে রেখেছে। এই প্রচারণার পরোক্ষ প্রভাবে ও স্বাধীন বাংলাদেশে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবস্থানের কারণে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দেশ বাংলাদেশকে স্বাধীনতার পর পরই স্বীকৃতি দেয়নি। ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, ইউনেস্কো, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বহু আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ পেলেও জাতিসংঘের দ্বার তখনো পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য উন্মুক্ত হয়নি। জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার রুখতে চীন ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করেছিল।১৯৭৩ সালের জুন মাসে সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন বিবৃতিতে বলেন, মোট ১১টি দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তার মানে, পৃথিবীর খুব অল্পসংখ্যক দেশ তখন পর্যন্ত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল।স্বীকৃতি না দেয়া গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ছিল সৌদি আরব ও চীন। সোভিয়েত রাশিয়া ও সোভিয়েতপন্থি সকল দেশ, ভারত ও জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন-এর অধিকাংশ সদস্যের সক্রিয় সমর্থন লাভের পরেও পাশ্চাত্যের সাহায্যদাতা দেশসমূহ, আমেরিকার প্রভাব বলয়ের মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের সঙ্গে বাংলাদেশ তখন পর্যন্ত কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেনি।

পাকিস্তানের প্রায় ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দি তখনো ভারতে আটক ছিল। এটাই জাতিসংঘ ও প্রধান প্রধান কয়েকটি দেশের স্বীকৃতি অর্জনের পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশ সরকারও প্রথমদিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে স্থিরপ্রতিজ্ঞ ছিল। তাই যুদ্ধবন্দিদের বিচার করা হবে—এই প্রতিশ্রুতি দেয়ার সময় তারা এ ব্যাপারে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়ার কোনো পরোয়া করতো না। এ কারণেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদও ১৯৭২ সালের ৯ জুন শেখ মুজিবুর রহমান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর মধ্যে একটি শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ইন্দোনেশিয়ার প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।১৯৭২ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৭৩ সালের মার্চ পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচারকালীন গোটা সময়ে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ প্রতিটি জনসভায় পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার সমুচিত জবাব দেয়ার প্রতিশ্রুতি উচ্চারণ করে জনগণের ভাবাবেগকে কাজে লাগাবার চেষ্টা করেন।অন্যদিকে, অর্ধভগ্ন, বিধ্বস্ত ও মনোবলহীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ তখন জুলফিকার আলী ভুট্টোর হাতে। তিনি তখন পৃথিবীর শক্তিশালী জাতিসমূহকে এই বলে বোঝাবার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন যে, পাকিস্তানি সৈন্যদের আটক রাখার কিংবা তাদের বিচার করার কোনো অধিকার ভারতের নেই। তার মতে, ভারত নিজেই ছিল আক্রমণকারী দেশ। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী কেবল সার্বভৌম দেশের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশের বিদ্রোহ দমনের জন্য তাদের ওপর প্রদত্ত আদেশ পালন করেছিল।পাকিস্তান তার সংবিধানে তখনো বাংলাদেশকে তার ভৌগোলিক সীমানাভুক্ত অংশ বলে দাবি করে আসছিল। আবার এদিকে বাংলাদেশ সরকার পাকিস্তানি সৈন্যদের বিচার করার জন্য বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে বারবার ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়ে আসছিল।এদিকে, বন্দি পাকিস্তানি সেনাদের ফিরিয়ে দেয়ার জন্যও ভারতের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এক্ষেত্রে যুক্তি ছিল যে, পাকিস্তানের ভূখণ্ড থেকে সৈন্যদের আটক করেছে ভারত। যেহেতু পাকবাহিনী ভারতের বুকে কোনো অপরাধ সংঘটন করেনি, তাই ভারতের তাদের বন্দি রাখার যুক্তি নেই ।

সাধারণভাবে যুদ্ধের পরে পক্ষগুলো দ্রুতই একটা শাস্তি চুক্তিতে উপনীত হয়—এটাই আধুনিক দুনিয়ার রীতি। নানা কূটনৈতিক তৎপরতার পরে ইন্দিরা গান্ধী ও জুলফিকার আলী ভুট্টো ১৯৭২ সালের জুন মাসের ২৮ তারিখ থেকে জুলাই মাসের ২ তারিখ পর্যন্ত সিমলায় অনুষ্ঠিত শীর্ষ বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকে দু'দেশের মধ্যে স্থগিত যোগাযোগ পুনর্বহালসহ তাদের সকল বিরোধ নিষ্পত্তিতে শান্তিপূর্ণ পথ অনুসরণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আলোচনার সময় যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবন্দি সংক্রান্ত কোনো প্রশ্ন উত্থাপিত হয়নি, তবুও জনমনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, সিমলা চুক্তি ছিল পাক যুদ্ধবন্দিদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রশ্নে প্রথম পদক্ষেপ। বৈঠকশেষে যুদ্ধকালে ভারত কর্তৃক অধিকৃত পাকিস্তানের ৬০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা ফেরত নিয়ে ভুট্টো বেশ হৃষ্টচিত্তেই দেশে ফিরে আসেন। সিমলা শীর্ষ বৈঠকের পর শেখ মুজিবের মনে এই সন্দেহ ঘনীভূত হয় যে, ভারত বাংলাদেশের বদলে পাকিস্তানের হাতে যুদ্ধবন্দিদের প্রত্যর্পণ করবে। তখন শেখ মুজিব বলেন, ভারত এ কাজ করতে পারে না। কারণ পাকিস্তানি পাকিস্তান ও বাংলাদেশের এই পারস্পরিক সমস্যা মেটানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দেখা দেয় এ দুই রাষ্ট্রের মধ্যে কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা। বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যুদ্ধাপরাধী ও মানবিক সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে পাকিস্তানের সঙ্গে সমঝোতায় আসার জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে আলোচনা করার অনুমোদন প্রদান করে।মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ডেপুটি সেক্রেটারি কেনেথ রাস্ক এবং সহকারী সেক্রেটারি জোসেফ সিসকো ১৮ এপ্রিল, ১৯৭৩ পাঁচ ঘণ্টার জন্য যাত্রাবিরতি করেন বাংলাদেশে। এ সময় তারা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে মার্কিন সরকারের অবস্থান সম্পর্কে অবহিত করেন। বলেন, ‘১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার করতে গেলে তা এই অঞ্চলের পরিবেশ নষ্ট করবে।' আবার পাকিস্তান সরকার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে যে, বাংলাদেশ সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করলে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আটক বাঙালি সামরিক ও বেসামরিক অফিসারের বিচার করবে ইসলামাবাদ।

প্রথমে বাংলাদেশ সরকার বলেছিল, তারা সকল যুদ্ধবন্দির বিচার করবে। পরে তারা বুঝতে পারলো, তা বাস্তবক্ষেত্রে করা সম্ভব নয় । তখন তারা বিচারযোগ্য যুদ্ধবন্দির সংখ্যা ১৫০০-তে স্থির করে, যা পরে আরো কমিয়ে ১৯৫-এ আনা হয়। একপর্যায়ে বাংলাদেশ বুঝে যায়, সীমিতসংখ্যক যুদ্ধবন্দি ছাড়া আর কারো বিচার করা সম্ভব হবে না। তখন বাংলাদেশ সরকার অন্যান্য মানবিক সমস্যা সমাধানের দিকে নজর দেয় । এর মধ্যে ছিল দু'দেশের বেসমরিক নাগরিকদের বিনিময় এবং যুদ্ধবন্দিদের পরিবার ও গুরুতর আহতদের ফেরত দেয়ার প্রশ্ন।
‘স্টেট্সম্যান', 'টাইম্‌স্ অব ইন্ডিয়া’, ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর মতো প্রভাবশালী ভারতীয় দৈনিকগুলো যুদ্ধবন্দি প্রশ্নে ভারতের সরকারি অবস্থানের বিপরীতে অবস্থান নেয়। তাদের অভিযোগ হলো— পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের ছেড়ে না দিয়ে এবং বাংলাদেশের দাবি অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধীদের আটক রেখে ইন্দিরা সরকার অন্যায় করেছে। তাদের দাবি, বাংলাদেশ অখুশি হোক, তাতে কোনো ক্ষতি নেই; যুদ্ধবন্দিদের ছেড়ে দিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে অবিলম্বে সম্পর্ক ভালো করতে হবে। ভারতীয় রাজনীতিবিদদের মধ্যে পার্লামেন্ট সদস্য পিলু মোদী, বিরোধীদলের নেত্রী তারকেশ্বরী সিনহা, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ইন্দ্ৰজিৎ গুপ্ত এই মত সমর্থন করেন।আবার ভারত সরকারের একটি অংশ, যার অন্যতম ছিলেন ডিপি ধর, তিনি মনে করতেন যে, ভারতের স্বার্থে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যেন দ্রুত স্বাভাবিক না হয়, তার উদ্যোগ নেয়া উচিত।
প্রথম পর্যায়ে ভারত ও বাংলাদেশ পক্ষ পূর্ব প্রস্তাবিত ৬০০০ জন যুদ্ধবন্দির পরিবারবর্গের সঙ্গে পাকিস্তানে আটকেপড়া ১০০০ জন বাংলাদেশি নারী ও শিশু বিনিময়ের জন্য পাকিস্তান সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়। কিন্তু পাকিস্তান এ ব্যাপারে কোনো ইতিবাচক সাড়া প্রদানে বিরত থাকে। উপরন্তু তারা পাকিস্তানে আটকেপড়া বিপুলসংখ্যক সামরিক ও বেসামরিক অফিসারকে বিশ্বাসঘাতকতা ও গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে বিচার করার পাল্টা চাপ দেয়ার উদ্যোগ নেয়। বাংলাদেশের ওপর পাল্টা চাপ হিসেবে তারা পাকিস্তানে অবস্থানরত বাঙালিদের বিচারের হুমকি দিতে থাকে। তাদের অনেককে বাড়িতে চড়াও হয়ে গ্রেপ্তার করে এবং বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্পে আটক রাখা হয়।


বাংলাদেশের স্বীকৃতি প্রসঙ্গে কয়েকজন মার্কিন সাংবাদিকের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ভুট্টো বলেছিলেন, ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দির বিচারের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত তিনি স্বীকৃতি প্রদান স্থগিত রাখবেন। এর উত্তরে বাংলাদেশ সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ব্যতিরেকে পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো সংলাপ সম্ভব নয়। পাকিস্তান নিজে যেমন বিরত ছিল স্বীকৃতি প্রদান থেকে, তেমনি জুলফিকার আলী ভুট্টো স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, কোনো রাষ্ট্র যদি তাড়াহুড়ো করে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে পাকিস্তান স্বীকৃতিদানকারী রাষ্ট্রের সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করবে। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ায় সত্যি সত্যি পাকিস্তান কয়েকটি রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল। পাকিস্তানের এমন নীতির কারণে নবীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।

পাকিস্তান ফৌজদারি অপরাধের দায়ে যুদ্ধবন্দিদের বিচার করার ব্যাপারে বাংলাদেশের দাবি কোনো অবস্থাতেই মেনে না নেয়ার কথা জানায়। পাকিস্তান সরকার যুক্তি প্রদর্শন করে যে, যেহেতু দায়েরকৃত অভিযোগ পাকিস্তানের একটি অংশে সংঘটিত হয়েছে এবং পাকিস্তানি নাগরিকরা এই অপরাধ করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে, সেহেতু আন্তর্জাতিক আইনের স্বীকৃত ধারাবলে কেবলমাত্র পাকিস্তানে গঠিত একটি যথাযোগ্য ট্রাইব্যুনাল এর বিচার করতে পারে। এ ব্যাপারে অন্যের হাতে এই কর্তৃত্ব ছেড়ে দেয়ার অর্থ হবে পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের ওপরই আঘাত হানা। এতে অপরাধী ব্যক্তিদের বিচার করার জন্য পাকিস্তান সরকার যথাযথ বিচার বিভাগীয় ট্রাইব্যুনাল গঠনে প্রস্তুত রয়েছে বলেও স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়।শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশের প্রতি হুমকি প্রদর্শন করে বলা হয়, ঢাকা যদি ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দির বিচারের উদ্যোগ নেয়, তাহলে তা শুধু শাস্তি ও সৌহার্দ্যের পরিবেশকেই দূষিত করে তুলবে না বরং পাকিস্তান সরকার পাকিস্তানে আটক বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে ধ্বংসমূলক তৎপরতা, গুপ্তচরবৃত্তি ও বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারে যে সহিষ্ণুতা ও ধৈর্য প্রদর্শন করে আসছে, সে ধৈর্য বজায় রাখাও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
এদিকে, বাংলাদেশ এ সময়ে ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দির বিচারের প্রত্যয় অব্যাহত রেখে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ জোগাড় করছিল। বাংলাদেশ বলেছিল, প্রতিহিংসার জন্য নয়, সুবিচারের স্বার্থেই বাংলাদেশের মাটিতে ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দির বিচার হওয়া প্রয়োজন । ১৩ ভারত কর্তৃক বাংলাদেশে যুদ্ধবন্দি হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতার কাজও এগিয়ে নিচ্ছিল। পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের বিচার করার জন্য একটি আইনও জাতীয় সংসদে উত্থাপনের জন্য প্রণয়ন করা হয়। এ প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছলে এবং বাংলাদেশের কঠোর মনোভাব অনুধাবন করে ভুট্টো শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের ইস্যুটি পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে পেশ করেন এবং পাকিস্তানের স্বার্থে অতিসত্ত্বর বিষয়টি নিষ্পত্তির প্রস্তাব দেন।
১৯৭৩ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের সংবিধানে সংশোধনী এনে যুদ্ধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের পরিপ্রেক্ষিতে যুদ্ধাপরাধীদের আটক, বিচার ও দণ্ডাদেশ প্রদানের কতিপয় ক্ষমতা সরকারের হাতে প্রদান করা হয়। এর এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার করার জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বিল পেশ করা হয়।

আলজেরীয় রাষ্ট্রপতি হুয়ারি বুমেদিনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল শেখ মুজিবকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবার জন্য ঢাকায় আসেন। আলজেরীয় রাষ্ট্রপতির সেই বিমানই শেখ মুজিব ও তার প্রতিনিধিদলকে বহন করে ঐতিহাসিক অভিযানে লাহোর পৌছলে ভুট্টো শেখ মুজিবকে সেখানে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। এই ঘটনা অসংখ্য ভারতবাসীর মনে বিরক্তি সৃষ্টি করলেও সে মুহূর্তে তাদের করার কিছুই ছিল না।
ওআইসি সম্মেলন থেকে ফিরে এসে ১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে ভারতের ‘স্টেট্সম্যান' পত্রিকাকে শেখ মুজিব সাক্ষাৎকার দেন। সাক্ষাৎকারে ওআইসি সম্মেলনকালে তার প্রতি পাকিস্তান সরকার বিশেষ করে ভুট্টোর আতিথেয়তার কথা বলতে গিয়ে মুজিব আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন। তিনি বলেন, “জনগণের উচিত পাকিস্তানের তিক্ত অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে ১৯৭১ সালের অভিজ্ঞতা ভুলে যাওয়া।'
লাহোরে সম্মেলনকালে ভুট্টোকে শেখ মুজিব 'আমার পুরনো বন্ধু' বলে আলিঙ্গন করেন এবং তার গালে চুমু খান।
১৯৭৪-এর ৫-৯ এপ্রিল বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন মুজিব সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন। বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার । এতে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, 'কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকলে (আমার) সরকার তার নিন্দা জ্ঞাপন এবং গভীর দুঃখ প্রকাশ করছে।' এদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোও বলেন, 'মিটমাট ত্বরান্বিত করার জন্য অতীতের সমস্ত ভুল ক্ষমা করে দিন এবং ভুলে যান।



এই দুই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার সিদ্ধান্ত নেয় ক্ষমাশীলতার নিদর্শনস্বরূপ এই বিচার প্রক্রিয়ায় তারা আর অগ্রসর হবে না'। দেশে ফিরে ১১ এপ্রিল ১৯৭৪ সালে ড. কামাল হোসেন বলেন, 'বাংলাদেশে পাকিস্তান যে অপরাধ করেছে তা প্রতিষ্ঠা করা, পাকিস্তান কর্তৃক তার সব অপরাধকে স্বীকার করানো ও বাংলাদেশের বিচার অনুষ্ঠানের সামর্থ্য প্রতিষ্ঠা করাই ছিল প্রস্তাবিত যুদ্ধাপরাধী বিচারের মুখ্য উদ্দেশ্য। বর্তমান ক্ষেত্রেও পাকিস্তান তার অপরাধ স্বীকার ও ক্ষমা প্রার্থনা করায় এই লক্ষ্য অর্জন করা গেছে।' ড. কামাল হোসেনের এই বক্তব্য পরদিন দৈনিক বাংলা'য় প্রকাশিত হয়। ২৯ এরপর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ১৯৫ জন যুদ্ধপরাধীর বিচারের সিদ্ধান্তটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়।
এর পরে ১৯৭৪ সালের ১ অক্টোবর ওয়াশিংটনে শেখ মুজিবের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের আনুষ্ঠানিক বৈঠকের সময়ে শেখ মুজিব ফোর্ডকে বলেন, ‘আমরা পাকিস্তানি বন্দিদের ছেড়ে দিয়েছি, যার মধ্যে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী ছিল ।
এই স্বল্পসংখ্যক যুদ্ধাপরাধীর ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ সরকার সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ কিংবা মামলার নথিপত্র প্রস্তুতির ব্যাপারে তেমন তৎপর ছিল না। শেখ মুজিবুর রহমান এ ব্যাপারে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হাকসারকে বলেছিলেন, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহে অসুবিধার কারণে তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয়ে শক্তি ও সময় নষ্ট করতে চান না। হয়তো কোনো দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের কথা ভেবেই মুজিব এ ধরনের একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেয়ার পথে চালিত হয়েছিলেন। তিনি এমন কিছু করতে চাননি, যাতে পাকিস্তানসহ অন্যান্য মুসলিম দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানে বাধাপ্রাপ্ত হয়।
ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান এবং আন্তর্জাতিক বলয়ে নতুন পরিচিতি অর্জনের কথা বাদ দিলে আওয়ামী লীগ যুদ্ধবন্দিদের ব্যাপারে তার প্রত্যয় বজায় রাখতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়।



ভুট্টো যা চেয়েছিলেন, অবশেষে তিনি তা-ই পেয়েছেন। সমস্ত যুদ্ধবন্দিকে তিনি ফেরত নিয়েছেন। ভারতের অসন্তুষ্টির মুখে বাংলাদেশকে টেনে নিয়ে গেছেন ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে। নিজের ইচ্ছানুযায়ী সময়ে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। কোনো আপস না করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাতিল করেছেন এবং সর্বশেষে বিচার বাতিলের সঙ্গে দরদাম করে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। সর্বোপরি, ‘পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনকারী অবাঙালিদের দায়ভারও তিনি বহন করেননি।
শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষে সমঝোতা স্থাপনের পর দেখা গেল, সমস্ত কৃতিত্বের ভাগ নিয়েছে ভারত সরকার। পাকিস্তান অর্জন করেছে এক ব্যাপক রাজনৈতিক বিজয় এবং বাংলাদেশ কেবলমাত্র বাহাবা ছাড়া আর কিছুই পায়নি।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৪
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এনসিপি কি সত্যিই ডঃ ইউনুসকে হত্যার চক্রান্ত করছে?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:১৫



এটা সত্যি যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এনসিপি নেতারা ডঃ ইউনুসকে যাচ্ছেতাই ভাষায় গালিগালাজ করেছেন। কিন্তু, তাই বলে হত্যা কেন করবে!!! ব্লগে আমার এই পোস্টের মাধ্যমে এন,সি,পি নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেমন হলো নতুন 'মন্ত্রীসভা'?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:১৪


সংসদে এমপি হিসেবে শপথপাঠ করতে জনাব তারেক রহমান যখন এসে নিজের চেয়ারে বসতে গেলেন, বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও জনাব খন্দকার মোশাররফ হোসেন তখন উঠতে একটু দেরী করে ফেললেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধন্যবাদ ওয়াকার উজ জামান স্যার !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:২৭


২০২৪ সালের জুলাই মাসের সেই উত্তপ্ত দিনগুলোর কথা মনে করুন। রাজপথ জুড়ে তখন আগুন, কোটা আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে সরকারের দেয়ালে। এই টালমাটাল মুহূর্তে একজন সামরিক অফিসার এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রেম করে বিয়ে করবেন? নাকি বাড়ির পছন্দ অনুযায়ী বিয়ে করবেন?

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১০:৪১



লালনের একটা গান আছে,
"এমন মানব জনম আর কি হবে। মন যা কর ত্বরায় কর এই ভবে।" চমৎকার গান। চমৎকার গানের কথা। কথা গুলো বুঝতে চেষ্টা করুন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশ নিয়া ব্যাকেটের সাথে কিছুক্ষণ আগেই কথা বলমাম ---

লিখেছেন জাহিদ অনিক, ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৫৬



কিছুক্ষণ আগে অফিসে আসার সময় লেগুনায় ওঠার সময় হঠাত করেই দেখি আমার পাশের সিটে বসা মি: স্যামুয়েল ব্যাকেট! একজন বিরাট ব্যাকেট ভক্ত হিসেবে উনি আমাকে চিনেন। আর কোনো কথা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×