somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ধন্যবাদ ওয়াকার উজ জামান স্যার !

১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


২০২৪ সালের জুলাই মাসের সেই উত্তপ্ত দিনগুলোর কথা মনে করুন। রাজপথ জুড়ে তখন আগুন, কোটা আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে সরকারের দেয়ালে। এই টালমাটাল মুহূর্তে একজন সামরিক অফিসার এমন একটি সিদ্ধান্ত নিলেন যা বাংলাদেশের ইতিহাস বদলে দিল। শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশ তিনি মানলেন না। সেই একটি মুহূর্তে, সেই একটি না-বলার সাহসে, পনেরো বছরের এক লৌহকঠিন সরকারের ভিত নড়ে উঠল।

চীফ জেনারেল ওয়াকার উজ জামান। নামটা তখন অনেকেই জানতেন না। কিন্তু ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর থেকে এই নামটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে একটি আলাদা মাত্রা নিল। শেখ হাসিনার পতনের পরপরই তিনি ঘোষণা দিলেন — আজ থেকে বাংলাদেশের দায়িত্ব তিনি নিজ কাঁধে তুলে নিলেন। একজন সামরিক কর্মকর্তার মুখে এই কথা শুনে দেশবাসী স্বস্তি পেল, কিন্তু একই সঙ্গে উৎকণ্ঠাও বাড়ল। ৬ থেকে ৮ আগস্ট — এই তিনটি দিন বাংলাদেশ কার্যত নেতৃত্বশূন্য ছিল। সেই শূন্যতায় ওয়াকার উজ জামান একটি অদৃশ্য খুঁটি হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

ইন্টারিম সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ওয়াকার উজ জামান একটি কাজ করলেন যা তাঁর জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠল। তিনি নির্বাচনের কথা বললেন। একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে, সর্বপ্রথম তিনিই উচ্চস্বরে বললেন — দ্রুত নির্বাচন দরকার। এই কথাটুকু তাঁকে রাতারাতি শত্রু বানিয়ে দিল। ইন্টারিম সরকার চটল, ছাত্র নেতারা খেপল। যারা নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছিলেন তাদের অনেকেই মনে করলেন — এই জেনারেল বাগড়া দিচ্ছেন।

তারপর শুরু হলো সেই অধ্যায় যেটাকে চরিত্র হনন ছাড়া আর কোনো নামে ডাকা যায় না। আওয়ামী লীগের সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা প্রচার শুরু করল — ওয়াকার উজ জামান নাকি জামাতি। তিনি নাকি আমান আযমীর শিষ্য। তাঁর স্ত্রীও নাকি জামাতি। সুতরাং ২০২৬ সালের নির্বাচনে জামায়াতই জিতবে, এবং এই জেনারেলই সেটা ঘটাবেন। অন্যদিকে জামায়াত-এনসিপি জোট চেষ্টা করল ঠিক উল্টোটা প্রমাণ করতে — ওয়াকার উজ জামান নাকি আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন দিতে চান। দুই বিপরীত শিবির একই মানুষকে দুটো ভিন্ন মুখোশ পরাতে ব্যস্ত হয়ে গেল।

ছাত্র নেতারা এবং পিনাকি-গং একসাথে মানসিক চাপ দিতে শুরু করলেন। তাঁকে ইন্টারিমের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর চেষ্টা হলো। রজার খলিল, যিনি বর্তমানে তারেক রহমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন, নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে তাঁর উপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলেন। ষড়যন্ত্রের জাল ক্রমে বড় হতে থাকল। কিন্তু প্রতিটি চেষ্টা একে একে নস্যাৎ হয়ে গেল।

ছাত্র নেতাদের রাগের সবচেয়ে বড় কারণটা ছিল আলাদা। সংবিধান রদ করে রাষ্ট্রপতিকে জোর করে পদত্যাগ করিয়ে বিপ্লবী সরকার গঠনের একটা পরিকল্পনা ছিল। সেই পরিকল্পনা ভেস্তে গেল ওয়াকার উজ জামানের কারণে। তিনি রাজি হননি। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় তিনি অটল রইলেন। এই একটি সিদ্ধান্ত তাঁকে অনেকের চোখে ভিলেন বানিয়ে দিল, কিন্তু ইতিহাস হয়তো একদিন এটাকেই তাঁর সবচেয়ে বড় সাহসিকতা হিসেবে মনে রাখবে।

মানসিক নির্যাতন আরও বাড়তে থাকল। ক্যান্টনমেন্টের ইট খুলে নিয়ে আসার হুমকি এলো। সামাজিক মাধ্যমে তাঁকে ভীতু বলা হলো, হিজড়া জেনারেল বলা হলো। একজন মানুষকে ভাঙতে যা যা করা যায় তার প্রায় সবটাই করা হলো। কিন্তু পর্বত নড়ে না। ওয়াকার উজ জামান নীরব রইলেন, কিন্তু অনড় রইলেন। ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচনের বিষয়ে তাঁর অবস্থান এক বিন্দুও নড়ল না।

গোপালগঞ্জের সেই উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তে তিনি শক্ত হাতে পরিস্থিতি সামলালেন। সেনাবাহিনী নামিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখলেন। পাকিস্তান মিলিটারির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং আমেরিকান নীতির সাথে সামঞ্জস্য রাখার বিষয়ে তিনি নিজের মতো করে কাজ করলেন। বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে ইন্টারিম ও সেনাবাহিনীর মধ্যে যখন টেনশন দেখা দিল, তখন তিনি সেতু হিসেবে কাজ করলেন।

তবে সব কিছু নিখুঁত ছিল না। রবি দাস নামের একজন নিরীহ নাপিতকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁর মৃত্যু মানুষকে ব্যথিত করেছিল। বিএনপির কয়েকজন কর্মীকে সেনাবাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে মেরে ফেলার ঘটনা মানুষের মনে অস্বস্তি তৈরি করেছিল। এই ব্যর্থতাগুলো অস্বীকার করার উপায় নেই, করা উচিতও নয়। একজন ন্যায্য মূল্যায়নে এই দিকগুলো এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

কিন্তু সামগ্রিকভাবে দেখলে যে ছবিটা ফুটে ওঠে সেটা একজন অসাধারণ সংকটকালীন নাবিকের। চারদিক থেকে ঝড় আসছে, তরঙ্গ আছড়াচ্ছে, পরিচিত মুখেরাও বিশ্বাসঘাতকতা করছে — কিন্তু লোকটা হাল ছাড়ছেন না। নির্বাচনের প্রশ্নে তিনি অটল থেকেছেন, রাষ্ট্রপতিকে অসাংবিধানিকভাবে না সরানোর প্রশ্নে তিনি অটল থেকেছেন। এই দুটো বিষয়ে তাঁর দৃঢ়তা বাংলাদেশকে আরও বড় একটা সংকট থেকে বাঁচিয়েছে কিনা সেটা নিয়ে হয়তো তর্ক হবে, কিন্তু যে মানসিক শক্তির পরিচয় তিনি দিয়েছেন সেটা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।

ইতিহাস সাধারণত সেই মানুষগুলোকে মনে রাখে যারা ক্ষমতার শীর্ষে বসে থাকেন। কিন্তু কখনো কখনো এমন কিছু মানুষ থাকেন যারা ক্ষমতার পেছনে দাঁড়িয়ে পুরো কাঠামোটাকে ধরে রাখেন। ওয়াকার উজ জামান সেই দ্বিতীয় দলের মানুষ। বাংলাদেশের সবচেয়ে অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক একটা রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে তিনি কান্ডারীর ভূমিকা পালন করেছেন। জাতি তাঁকে দীর্ঘদিন মনে রাখবে — এই প্রত্যাশাটুকু অমূলক নয়।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৪৩
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিএনপিপন্থী ব্লগারদের বাকস্বাধীনতা হরনের নমুনা

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ১৪ ই মার্চ, ২০২৬ সকাল ১০:১৬

বিএনপির মির্জা আব্বাস অসুস্থ হবার পর কিছু বিএনপি সমর্থক এর দায় খুবই ন্যক্কারজনকভাবে নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীর উপড় চাপাতে চাইছে !! অসুস্থ মির্জা আব্বাসের ছবি দিয়ে এরকম... ...বাকিটুকু পড়ুন

মির্জা আব্বাস ও দায় এড়িয়ে যাওয়া

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৪ ই মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১২:২৯

মির্জা আব্বাস ও দায় এড়িয়ে যাওয়া



মির্জা আব্বাসের যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটে, তাহলে এর নৈতিক দায় এড়িয়ে যাওয়া সহজ হবে না। সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে তাকে লক্ষ্য করে অসম্মানজনক... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রিয় সামু ব্লগারদের কাছে খোলা চিঠি....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৪ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৩২

প্রিয় সামু ব্লগারদের কাছে খোলা চিঠি....

প্রিয় সহব্লগার,
আমার লেখা একটা পোস্টের তথ্য খুজতে অনেক দিন পর আজ আবার লগইন করলাম আমাদের প্রিয় সামুতে। লগইন করার পর প্রথমেই অভ্যাসবশত চোখ গেল প্রথম... ...বাকিটুকু পড়ুন

কমরেড তারেক রহমান , লাল সেলাম ।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৫ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ১:৪৮


ভোটের কালি নখ থেকে মোছার আগেই তিনি কাজ শুরু করেছেন। এই কথাটা তিনি নিজেই বলেছেন, গতকাল, ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে। আর এই কথাটা পড়ে আমার বুকের ভেতরে একটা উষ্ণতা অনুভব... ...বাকিটুকু পড়ুন

×