বাসটার টায়ার ফেটেছিল অতিরিক্ত ওজন নেবার কারনে। আটটা চাকা যখন লোড নিতে পারেনি তখন সাত চাকায় সেটা আশা করা যায় না। ফলাফল যা হবার তাই হল। আধা ঘন্টার মত চলার পরই ফেটে যাওয়া চাকার সাথের চাকাটাও ফেটে যায়। বাসটা ভারসাম্যহীন হয়ে খাদে প্রায় পড়ো পড়ো হয়েও কিছুদুর গিয়ে থেমে গেল। পিছে বসা একজনের মাথা ফেটে গেল, আর দু একজন বেশ ব্যাথা পেল। ফলাফল হয়ত আরো খারাপ হতে পারত, কিন্তু বাসের অতিরিক্ত ওজনই সেটাকে বেশীদূর যেতে দেয়নি।
দ্্বিতীয় দফা দূর্ঘটনার প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠার পর যাত্রীরা চড়াও হল ড্রাইভার আর সুপাভাইজারের উপর।
"বালের গাড়ী চালান মিঞা! লং রুটে গাড়ী চালাইতাছেন আর একটা একস্ট্রা টায়ার লইয়া আহেন নাই!! আনবেন কেমতে ঐহানেও তো মাল উঠাইছেন।"
"তুগার কোন জ্ঞান বুদ্ধি আছেরে বুকাচুদা। টায়ার ফাইটে যাবার পরেও গাড়ি চাইলেছিস!! আমাগের জেবনের কি দাম নেই নাকি অ্যাঁ?"
মাথা ফেটে যাওয়া লোকটার পরিচর্যা করে রক্ত বন্ধ করা হল। সুপারভাইজার এর মধ্যে কোথা থেকে লোকাল বাস থামাল কয়েকটা তাতে তুলে দিতে লাগল একে একে যাত্রীদের। যাতে তারা আরিচা ঘাট পর্যন্ত যেতে পারে। পরে তারা নিজেদের আরেকটা গাড়ী যোগাড় করে নদী পার হয়ে বাকি পথ নিয়ে যাবে।
বিপদে পড়ে ভয়ে, অনিশ্চয়তায়, দুশ্চিন্তায় এতটুকু হয়ে গেছে নাজমার মন। ছেলেদুটা অবশ্য অত চিন্তা করছে না। আশেপাশে কোথা থেকে যেন ডাবওয়ালা, পেয়ারাওয়ালা জুটে গেছে। মজা করে সেগুলো খাচ্ছে। চিন্তিত নাজমা বরকত সাহেবকে বকা দিতে ছাড়েন না।
"তোমার জন্য কত কষ্ট করতে হচ্ছে দেখলা। বল্লাম চেয়ার কোচের টিকিট কাটো। তা না পয়সা বাঁচানোর জন্য রদ্দি মার্কা বিআরটিসির বাসের টিকিট নিয়ে এসেছো।"
বিরক্ত বরকত সাহেবও, "আমি কি করব বলো? এ সময় আর টিকিট পেলাম বলেই তো এই বাসে আসতে হলো। এখন সব দোষ আমার?"
একসময় তাদের পালা আসলে লোকাল গাড়ীতে উঠলেন তারা। সঙ্গে একগাদা মালপত্র সেগুলো টেনেটুনে ওঠানোও তো যন্ত্রনা। এক সময় আরিচা ঘাটে পৌছান তারা। সেখানে বরকত সাহেব খুঁজে পেতে একটা সরকারী মাইক্রো বের করেন বরকত সাহেব। সেই ড্রাইভার একলাই ফিরে যাচ্ছিল যশোরের দিকে, 800 টাকার বিনিময়ে পৌছে দিতে রাজি হল। টাকার পরোয়া করলেন না বরকত সাহেব আর। বৌ-বাচ্চা নিয়ে সহি সালামতে পৌছতে পারলেই তিনি অনেক খুশী হবেন এখন। বেশী দেরী করে ফেললে পথে রাত হয়ে যাবে। তখন বিপদ বাড়বে বই কমবে না। ক্ষুধার্ত, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বরকত পরিবার চড়ে বসল সরকারী মাইক্রোবাসে।
সকালে যে আনন্দ নিয়ে বাসে উঠেছিলেন তার ছিটে ফোটা নেই আর নাজমার মনে। দুরুদ শরীফ পড়তে পড়তে একটা একটা করে মিনিট গুনতে লাগলেন তিনি। ছেলেদুটোকে ছড়িয়ে ধলে রেখেছেন শক্ত করে, "আল্লাহ আর যাই ঘটুক আমার মানিক দুটোর যেন কিছু না হয়"।
(দুই শেষ। চলবে...)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



