somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সৃষ্টিশীল মানুষের চিন্তা ভাবনা - ১

২২ শে এপ্রিল, ২০০৭ দুপুর ১:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ভূমিকা

মানুষ জন্মগত ভাবেই সৃষ্টিশীল।

একটা জেনারেল পারপাস কম্পিউটার যখন আমরা কিনি তখন এর ভিতর তেমন কোন সফটওয়্যার থাকে না। একে আমরা সফটওয়্যার ইনস্টল করি আর কম্পিটার তখন একেক বিশেষ কাজে পারদর্শী হয়ে উঠে। অথচ বিভিন্ন ক্যামেরা, ডিজিটাল পণ্যের সাথে যেমস্ত ক্ষুদে মাইক্রোকম্পিউটার আসে সেগুলোর সফটওয়্যার নিতান্তই একঘেয়ে আর অন্যান্য কাজে পারদর্শী হয়ে উঠতে অক্ষম।

একটা মানুষের বাচ্চা যখন জন্ম গ্রহন করে তখন একটি খালি কম্পিউটারের মতোই তার মধ্যে বিশেষ কিছু থাকেনা। সময়ে সে বিভিন্ন বিষয়ে বু্ৎপত্তি লাভ করে এবং সৃষ্টি করতে থাকে অমর সব র্কীতি। অথচ ডিফল্ট কিছু জ্ঞান নিয়ে জন্ম নেয়া বিভিন্ন প্রানীর বাচ্চারা জন্মের পর পরই দৌড়াতে পারলেও সৃষ্টিশীল না।

মানুষ স্বভাবগত ভাবে সৃষ্টিশীল হলেও সবাই কিন্তু সমান মাপের স্রষ্টা নন। মোনালিসা একজন মানুষেরই সৃষ্টি আবার অনেক কুৎসিত গণহত্যাও একজন মানুষেরই হাতে সংঘটিত হয়। তাহলে কোন বিষয়টি একজন সাধারন মাপের মানুষকে অসাধারন মাপের স্রষ্টা বানায়?

আমরা ধরেই নেই যে কিছু কিছু মানুষ ওই জিনিসটা সঙ্গে নিয়ে জন্মায়। কিন্তু তাহলে বাকিদের কি হবে? কেন আমরা সৃষ্টিশীলতা অর্জন করতে পারব না? ব্যাপারটা কি তাহলে গায়ের রঙয়ের মতো হয়ে গেল না, যেখানে মনে করা হয় কিছু নির্দিষ্ট গায়ের রংয়ের মানুষ সেরা অথচ সৃষ্টিশীল মানুষের মতো গায়ের রংও অর্জন করা যায় না?

এই ব্যাপার নিয়ে প্রচুর গবেষনা হয়েছে। মনস্তত্ত্ব, ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইনের মতো বিষয়গুলোতে এব্যপারে প্রচুর আলোচনা রয়েছে। এ বিষয়ে দুটো পর্বে যে বিষয়গুলো তুলে ধরব ঠিক করেছি সেগুলো হল: ১। কেমন হয় সৃষ্টিশীল মানুষ, ২। কিভাবে সৃষ্টিশীলতা চর্চা করা যায়। যদি আপনি সৃষ্টিশীল মানুষ হন তাহলে আপনি হয়ত নিজের সাথে প্রথম পর্বের বিষয়গুলো মেলাতে পারবেন। তবে সৃষ্টিশীল হন বা না হন সৃষ্টিশীলতার চর্চা আপনাকে নতুন কিছু তৈরীর ক্ষেত্রে সাহায্য করবে নির্ঘাৎ।

“তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী?”
এটা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করে থাকবেন গড়পড়তা সৃষ্টিশীল মানুষ পোষাক আশাকের দিকদিয়ে বেশীরভাগক্ষেত্র আমার আপনার মতো স্বাভাবিক সাধারন মানুষ। সত্যিকার একজন সৃষ্টিশীল আমার আপনার থেকে আলাদা হয় তার মানসিক বোধ, ব্যবহার আর অভ্যেসের প্রয়োগে, জন্মগত কোন বিশেষত্বের কারনে না। নিয়ম করে অভ্যেস করলে এইধরনের গুণের অধিকারী হতে পারেন আপনিও।

একটা সৃষ্টিশীল মানুষ জানে মন হচ্ছে অফুরন্ত সম্ভাবনার কারখানা। তাতে অনবরত আইডিয়া, চিন্তা এবং জ্ঞানের যোগান দেয়া চাই যাতে করে মন নতুনতর আইডিয়া তৈরী এবং বিভিন্ন বিষয়ের ভিতর যোগসুত্র গড়ে তুলতে পারে। এই ধরনের একজন মানুষ সযত্নে পরিষ্কার কিছু লক্ষ্য গড়ে রেখেছেন। যেহেতু তিনি জানেন মাথা নিংড়ালেই রস বের হয়, প্রতিদিন তিনি তিনটি বিষয় নিয়ে চিন্তা করতেই থাকেন: নিজেকে নিয়ে, তার নিজের মূল্য নিয়ে এবং তার আশেপাশের মানুষ নিয়ে। এভাবে এই তিন বিষয়ে চিন্তা করাতে করতে তিনি ক্রমশ অফুরন্ত সম্ভাবনার রত্নভান্ডারের কাছাকাছি চলে আসতে থাকেন।

এধরনের লোক আইডিয়ার জন্য যেকারো কাছে হাত পাততে পারেন, অন্যের বুদ্ধিমত্তাকে তাই সম্মান করতে জানেন এবং অন্যকে তার প্রাপ্য কৃতিত্বটুক দিতে দ্বিধা করেন না। আসলে অনেক মানুষের কাছেই টুকটাক আইডিয়া আছে যেগুলো সৃষ্টিশীল মানুষ মুফতে যোগাড় করতে পারেন, তার অনেকগুলোই কিন্তু আইডিয়া হিসেবে অসাধারন। সৃষ্টিশীল মানুষ অনেক সময়েই এই আইডিয়াগুলো জোগাড় করেন, পরিবর্তীত, পরিমার্জিত করেন এবং মূল আইডিয়াকারীকে যথাযোগ্য সম্মান প্রর্দশন পূর্বক কাজে লাগান।

আবার আইডিয়াগুলো কিন্তু বান মাছের মতো পিচ্ছিল। তারা বিশেষ দক্ষতায় পিছলে যায় যদি ঘ্যাঁৎ করে পেন্সিলের আগা দিয়ে তাদের গেঁথে না ফেলতে পারেন। সৃষ্টিশীল মানুষদের দেখবেন আইডিয়া পেলে তাকে বেঁধে রাখতে ভুল করেন না। একবার এক বই লেখককে দেখা গেছে বিষয় ভিত্তিক বাক্স সামনে রাখতে। তার যখন কোন আইডিয়া আসতো তখনই তিনি একটা কাগজে লিখে সঠিক বাক্সের মধ্যে ফেলতেন। এভাবে খুব অল্প সময়ে তার হাতে একটা অসাধারন বই লেখার প্রয়োজনীয় মসলা জুটে যায়।

সৃষ্টিশীল মানুষের আরেকটা ভালো গুণ হচ্ছে আশেপাশের জিনিস সে খুব ভালো করে লক্ষ্য করে। কে কি বলল, করল ভাল করে লক্ষ্য করা বা নিজের চিন্তার মধ্যে ডুবে থাকা সে খুব ভালো পারে। সে সব সময় নিজের কাজটা আরো ভাল করে কি করে করা যায় কিংবা নিজের জীবনটা কিভাবে আরো ভাল করে উপভোগ করা যায় তা খুঁজতে থাকে।
সৃষ্টিশীল মানুষ আন্দাজ করতে পারে সে কি অর্জন করতে যাচ্ছে। সে অনেক সময় ধরে ফেলতে পারে যে জয় তার হবেই। আশেপাশের মানুষ অনেক সময় তার এই ক্ষমতায় অনুপ্রানিত হয়। যারা তাকে চেনে তাদের কাছে সে একটা অনুপ্রেরনার প্রতীক।

সৃষ্টিশীল মানুষের কাছে একেকটা সমস্যা হচ্ছে একেকটা চ্যালেঞ্জের মতো। যেহেতু সৃষ্টিশীল মানুষ সারাক্ষন চিন্তা করতে থাকে, ভাবনার খোরাকের জন্য তাই তাদের চ্যালেঞ্জ চাই। সমস্যাকে জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য এবং অপ্রতিরোধ্য অংশ হিসেব তারা ধরে নেয়। তাই সমস্যায় পড়লে তার জন্য দুশ্চিন্তা করে কান্না কাটি করার চেয়ে তার সমাধানে বেশী মনোযোগী হয় তারা।

সৃষ্টিশীল মানুষ খুব গুছিয়ে সমস্যার সমাধানে আগায়। অনেক সময় আগেভাগে সমস্যা সর্ম্পকে আন্দাজ করে সমাধান করেই রাখে।
যেহেতু সৃষ্টিশীল মানুষ জানে কিভাবে নিজের আইডিয়াগুলো অন্যের সাথে শেয়ার করতে হয়। সে যেমন অন্যের আইডিয়া নেয় তেমনিই অন্যদেরকে দেয়ও। কেননা দিন শেষে ওই হাত গুলোই আইডিয়া খুঁজে পাবে যারা আইডিয়া দেবে।

সৃষ্টিশীল মানুষ কোন নতুন আইডিয়া পেলে সুনিদির্ষ্ট ধাপে ধাপে সেটাকে আরো ভালো করার চেষ্টা করে। সে ছোটছোট আইডিয়া জুড়ে তৈরী করে নতুন আইডিয়া, পুরোনো আইডিয়া ভেঙ্গে তৈরী করে নতুন কিছু। সে আইডিয়াকে ক্রমাগত প্রশ্নের মুখোমুকি দাঁড় করায়। কেননা প্রশ্ন হচ্ছে বুদ্ধিমান মনের সৃষ্টিশীল কাজ।

নিজের অতিরিক্ত সময়টাকে সৃষ্টিশীল মানুষ খুব ভালভাবে ব্যবহার করে। কেননা সে জানে পৃথিবীর অনেক কল্যাণকর কাজই তৈরী হয়েছে অবসরের সময়টাতে। বেন ফ্রান্কলিন বলেছেন, ‘সৃষ্টিশীল ভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা রহিত হয়ে গেলে, বেঁচে থেকে কোন লাভই নেই।’
তাই নিজের কল্পনাকে ব্যবহার করে জীবনের বাঁধা অতিক্রম করা আমাদের পক্ষে অবশ্যই সম্ভব। লর্ড ম্যাককলে বলেছেন, ‘কল্পনা অস্ট্রীচ পাখির ডানার মতো, সেগুলো আমাদের উড়তে হয়ত সাহায্য করতে পারে না কিন্তু দৌড়াতে সাহায্য অবশ্যই করে; অথচ আমাদের অনেকে হাটতেও পারে না।’

গুস্তাফ ফ্লাউবার্টের একটি উক্তি দিয়ে শেষ করি। ‘সৃজনশীলতা হচ্ছে পরকীয়া প্রেমের মতো। অব্যবহারে আমরা একে দমিয়ে ফেলতে পারি, আবার সৃষ্টিশীলতা, সমস্যা সমাধানের অভ্যেস, অবসর সময়ের ভালো ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা এর উৎকর্ষ সাধন করতে পারি; যতক্ষণ না আমরা সুখী, গুরুত্বপূর্ণ এবং বুদ্ধিমান মানুষ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারছি।’



(পরের পর্বে থাকছে সৃষ্টিশীল মানুষের এই যোগ্যতাগুলো অনুসরন করে আইডিয়া তৈরীর পদ্ধতি)
৩৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সে কোন বনের হরিণ ছিলো আমার মনে-১৯

লিখেছেন অপ্‌সরা, ২৫ শে নভেম্বর, ২০২২ রাত ৯:৩৫



আজকাল আমি রোজ বিকেলে সিদ্দিকা কবিরের বই দেখে দেখে ডালপুরি, সিঙ্গাড়া, সামুচা বানাই। বাবার বাড়িতে আমি কিছুই রান্না শিখিনি, এমনকি ভাতও টিপ দিয়ে বুঝতে শিখিনি সিদ্ধ হলো নাকি হলো না... ...বাকিটুকু পড়ুন

নূর মোহাম্মদ নূরু ভাইয়া আর কখনও ফিরবেনা আমাদের মাঝে

লিখেছেন শায়মা, ২৬ শে নভেম্বর, ২০২২ রাত ২:০২


নূর মোহাম্মদ নূরু
আমরা কিছু সামু পাগল আছি যাদের সামুতে না লিখলে কিছুই ভালো লাগে না। নুরুভাইয়া মনে হয় ছিলেন সেই দলে। প্রথমদিকে উনাকে ফুল ফল ও মনিষীদের জীবন নিয়েই লিখতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শোক সংবাদঃ ব্লগার নূর মোহাম্মদ নূর আর আমাদের মাঝে নেই।

লিখেছেন কাল্পনিক_ভালোবাসা, ২৬ শে নভেম্বর, ২০২২ রাত ৩:০৪



সুপ্রিয় ব্লগারবৃন্দ,
আমরা অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানাতে চাই যে, সামহোয়্যারইন ব্লগের ব্লগার নূর মোহাম্মদ নূরু (নূর মোহাম্মদ বালী) আর আমাদের মাঝে নেই। ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্নইলাহি রাজিউন। গত ২৯ অক্টোবর রাত... ...বাকিটুকু পড়ুন

যেকোনো মৃত্যু: বড় কষ্টের, বড় বেদনার.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৬ শে নভেম্বর, ২০২২ সকাল ১০:৪৯

যেকোনো মৃত্যু: বড় কষ্টের, বড় বেদনার.....

ছড়াকার সাংবাদিক ব্লগার বন্ধু নুর মোহাম্মদ নুরু ভাইর চলে যাওয়া খুব কষ্টের। আরও বেশী কষ্ট পেয়েছি ব্লগার শায়মার পোস্টে নুরু ভাইয়ের মেয়ের হৃদয়বিদারক লেখা পড়ে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

১ মাস গত হয়ে যাবার পর?

লিখেছেন শূন্য সারমর্ম, ২৬ শে নভেম্বর, ২০২২ দুপুর ১:২৮





ব্লগে রেজিস্ট্রেশন করে লিখতে শুরু করলেন, সময় গত হবার পর আপনি পরিচিতি পেলেন, সবাই আপনার পোস্ট, কমেন্ট চায় ; আপনি যথেষ্ট সক্রিয় ব্লগে।হঠাৎ আপনি অসুস্থ হয়ে অনিয়মিত, অসুস্থতায় আপনি মৃত্যুবরণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×