কিন্তু আমি বিদেশিদের জন্য ফিল্ম তৈরি করি না। আমি নিজের মানুষদের জন্য সিনেমা বানাই। আমার ধারণা, এ মানুষদের সম্পর্কে আমি যা ভাবি তা তাদের দেখতে দেয়া উচিত।
আফ্রিকার উন্নয়নের বর্তমান স্তরে সিনেমা হলো নাইট স্কুল। আমি হয়তো ভালো শিক্ষক নই। কিন্তু আফ্রিকানদের তার গন্তব্যে পৌছতে এবং ভিক্ষা না করে জীবিকা নির্বাহের জন্য যথার্থ শিক্ষা আমাকে এখন দিতেই হবে। মানুষের জন্য ভিক্ষাবৃত্তি সম্মানজনক পথ নয়।
ইওরোপে যারা বাস করেন সিনেমা তাদের কাছে রেফারেন্স। কিন্তু আমার কাছে ইওরোপের লোকেরা কি দেখতে পায় সেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো আফ্রিকায় তারা কি দেখতে পায়। আর এখন আফ্রিকা জুড়ে সিনেমা বানিয়ে সেগুলো দেখানোও হচ্ছে। এগুলো আমাদের সব পলিটিশিয়ান ও ধর্মীয় নেতার মনে সিনেমা সম্পর্কে মৃত্যুর ভয়-ভীতি জাগিয়ে তুলেছে। কারণ সিনেমা তাদের বিচক্ষণতার পেছনের মিথ্যাকে প্রকাশ করেছে।
সেনেগালে আমাদের কোনো মুভি থিয়েটার নেই। কিন্তু অন্তত এমন ১০ জন ডিরেক্টর আছেন, যারা সিনেমার কণ্ঠরোধ করার রাজনৈতিক সব উদ্যোগ সত্ত্বেও কাজ চালিয়ে যাবেন। তারা প্রতিবেশী জনসামবেশে যান এবং সিনেমা দেখান। বলাই বাহুল্য, এটা খুবই ভয়ঙ্কর একটা কাজ। তারা টাকা বানাতে চান না। তাদের একজন মাদাম ব্রোটির পরিচালক মুসা সেনে আবসা। তার সিনেমার একটি কপি এবং সেটাও আছে তার নিজের কাছে। লন্ডনে শো করার পর এটা নিয়ে তিনি ডারবানে যাবেন। তিনি যে ঝুকি, সাহস ও শক্তির পরিচয় দিয়েছেন সেটা ভেবে দেখুন।
ফ্যাট কিন হলো আমার নির্মিত ট্রিলজির প্রথম সিনেমা। কোনো আহামরি ব্যাপার এটাতে ঘটেনি। এটা দৈনন্দিন বীরত্ব বিষয়ক একটি মুভি, যা সব জায়গাতেই দেখতে পাওয়া যায়। এটা এক নারীকে নিয়ে যার বাচ্চা আছে, পুরুষ তাকে পরিত্যাগ করেছে এবং সমাজকে একলা মোকাবেলা করার মুখে ঠেলে দিয়েছে। সে নিজের জীবনের দায়িত্ব গ্রহণ করে। যেখানেই যাওয়া যাক এ ধরনের নারীর দেখা মিলবে, যে বাচ্চাদের শিক্ষিত করে তুলছে, পুরনো স্বামী বা ছেলে বন্ধুদের মোকাবেলা করছে।
ফ্যাট কিন শহুরে আফ্রিকার গল্প। দ্বিতীয় মুভিটাও একজন নারীকে নিয়ে, একই সময়ের গ্রামের এক নারী। যে চায় না চলার পথে তার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তার নিজের মেয়ের ক্ষেত্রে তা ঘটুক। যে পদ্ধতিতে সে জীবনযাপন করে তা দৃষ্টান্তমূলক। যে সমাজ ইসলামী আইন দ্বারা পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত, সেই সমাজের বিরুদ্ধে সে প্রতিরোধ তৈরি করে। যে সমস্যা সে মোকাবেলা করে সেনেগালে তা সাধারণ ঘটনা।
তৃতীয় মুভিটা একজন লোককে নিয়ে, সেও তার সমাজের চাপকে প্রতিরোধ করতো। এটাতেও আহামরি কিছু ছিল না। কিন্তু আমি নিজের মানুষের কাছে এটা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন বোধ করেছিলাম যে, যা ঘটেছে তা তাদের ভুলের কারণেই ঘটেছে। আর সমাধানটা বাইরের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল নয়। এ ধরনের সাহায্য সমাধানের পাশাপাশি সমস্যাও। উত্তরটা ক্রিশ্চিয়ান, মুসলিম বা অন্য কোনো দেশ থেকে আসবে না। মানুষ সবাই একই রকম আর পদার্থবিজ্ঞানের নীতিগুলো সব ভাষাতেই একই রকম।
আফ্রিকার যেখানেই যাওয়া হোক সেখানেই দেখা যাবে, অনেক গৃহস্থালি যারা নারীদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। আমাদের মহাদেশ যুদ্ধে পর্যুদস্ত। পুরুষরা যখন একে অন্যকে খুন করছে, তখন নারীদের সমর্থনেই গৃহস্থালির কাজগুলো চলছে। একজন করে মানুষ আছে, যারা প্রত্যেকের প্রতিদিনের খাবারের নিশ্চয়তা যোগাচ্ছে। আফ্রিকায় পুরুষরা সন্তান উৎপাদন ছাড়া আর কোনো কাজই ভালোভাবে পারে না। এ সাধারণীকরণ থেকে আমি নিজেকে আলাদা করতে চাই না। আমি বিশেষভাবে সিরিয়াস।
ফ্যাট কিন তৈরি করার পর এর প্রথম প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল সেনেগালের নারী সংঘ। সব কৃতিত্বই তাদের। আমার মুভির নায়িকা এ নারীর মতো সাহসী ছিল না। তারা ছিল তার চেয়েও মারমুখী কারণ, তাদের সমস্যা তার সমস্যার চেয়ে কঠোর ছিল। আফ্রিকার নারীরা যে সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে মুভি তার মূল চিত্র তুলে ধরতে পারে না। পুরুষ ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পেশা ছাড়া কিভাবে একটি পরিবারের ছেলেমেয়েদের বড় করে তোলা সম্ভব? যারা আফ্রিকার পথের ধারে নারীদের চীনাবাদাম বা কমলালেবুর জন্য শরীরের কোনো অঙ্গ বিক্রি করতে দেখেছেন তারা ভুল দেখেন নি। তারা এটা করছে নিজেদের সন্তানদের জন্য, তাদের শিক্ষিত করার জন্য।
আমরা নতুন আফিকার জন্ম প্রত্যক্ষ করছি। অবশ্যই তাতে অনেক সমস্যা আছে, কিন্তু স্বপ্নও আছে। আর এ স্বপ্ন বাস্তবায়নে সিনেমা অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ছোট একটি ব্যাপারেও এটা এখন দেখা যায়, আফ্রিকার নারী-পুরুষরা যে পদ্ধতিতে এখন পোশাক পরে তাতেই। আগে লোকে এমন পোশাক পরতো যা তার নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই। বিশেষ পদ্ধতিতে কাপড় কাটা হচ্ছে। এটা ছিল তাদের আত্মপরিচয়, অন্তত আত্মপরিচয়ের একটা সূত্র। এখন দেখা যাচ্ছে, স্টাইলের ক্ষেত্রে এক পূর্ণাঙ্গ সংমিশ্রণ। তরুণীরা তাদের পোশাকের ডিজাইন বা চুল সাজানোর ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী প্রচলিত স্টাইল থেকে গ্রহণ করছে। নিজেরা একটি নতুন স্টাইল দাড় করাচ্ছে।
আমি যখন আফ্রিকা সফর করেছি, এমন লোকের দেখা পেয়েছি যারা হয়তো একটি ভাষায় ভাব বিনিময় করতে পারবে না। কিন্তু কিছু উৎপ্রেক্ষা বা প্রতীকের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারবে। তারা যখন এ প্রতীকগুলো দেখে, তখন বুঝতে পারে সাংস্কৃতিকভাবে তারা কোনো বিষয়টি ভাগাভাগি করে নিতে পারে। সেনেগাল, মালি, গিনি, গাম্বিয়ার সংস্কৃতি কাছাকাছি আসছে। উদাহরণ হিসেবে ফ্যাট কিনে একটি দৃশ্য আছে, যেখানে গ্যাস স্টেশনে একজন মুসলিম পাম্পের অ্যাটেন্ডেন্টকে জিজ্ঞাসা করছে কোথায় সে নামাজ পড়তে পারে। অ্যাটেন্ডেন্ট ক্রিশ্চিয়ান হওয়া সত্ত্বেও তাকে নামাজের জায়গা দেখিয়ে দিচ্ছে। মুসলিম লোকটি তার বুকের ক্রস দেখে বললো, আল্লাহু আকবার। এটুকুই। এ ছোট ব্যাপারগুলো আমার ভালো লাগে। কিন্তু আফ্রিকায় সিনেমা বানানো খুব সহজ নয়, বলা দরকার কঠিন। কারণ এর মাধ্যমে টাকা আসে না।
কিন্তু আফ্রিকার সমস্যা হলো, আমরা হীনমন্যতার মধ্যে নিমজ্জিত। আমরা নিজেদের সংস্কৃতিকে জানি না। কারণ নিজেরা এ বিষয়ে জ্ঞান লাভের প্রয়োজন বোধ করিনি। নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করছি আমি, কেউ যদি আফ্রিকায় যান তবে দেখতে পাবেন, আমি শুধু ফ্রেঞ্চভাষী আফ্রিকার কথাই বলছি। এছাড়া স্কুলের কারিকুলামে অনেক আফ্রিকান লেখকের বইও আছে। যদিও তাতে মূলত আমেরিকা, বৃটেন ও ফ্রান্সের সাদা লেখকদের বইয়ের সংখ্যাই বেশি।
কাউকেই আফ্রিকান সিনেমা দেখতে বাধ্য করা যায় না। আর মুভি থিয়েটারও সেখানে খুব কম। উদাহরণ, গিনির রাজধানী কোনাক্রিতে আছে মাত্র একটি। বইয়ের দোকানও খুব কম। ইওরোপে বসবাসকারী আফ্রিকানরা নিজেদের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে ফেলেছে। এখানেই তাদের চূড়ান্ত বৈপরীত্য, যখনই তারা ইওরোপে যায় তখনই নিজেদের আফ্রিকান সত্তাকে আবিষ্কার করে। এটাই প্রকৃত ঘটনা, ইওরোপই তাদের নিজের সংস্কৃতি খোজার দিকে চালিত করে।
উত্তর ঔপনিবেশিক সময় থেকে শুরু হওয়া প্রজন্মগুলোর মধ্যকার রাজনৈতিক সংঘর্ষ এখনো আফ্রিকায় বিদ্যমান। আমি যখন তরুণ বয়সে ফ্রান্সে ছিলাম, তখন জঙ্গি পন্থায় সেনেগালের স্বাধীনতার পক্ষে দাড়িয়েছিলাম। যারা স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছে তারা সেটা দৃঢ় বিশ্বাস থেকেই করেছে। শেষ পর্যন্ত আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। কিন্তু একটি দেশ চালানোর প্রশিক্ষণ আমরা পাইনি। অর্থনীতি বিষয়ে লোকে কিছু জানে না। কিছু আফ্রিকান দেশে এমনকি ডাক্তারও নেই। সেনেগালে আমরা জানি না কিভাবে চুক্তি করতে হয়, আমাদের প্রশিক্ষিত আইনজীবী বা অভিজ্ঞ শিক্ষক নেই। শিক্ষা লাভ করা নতুন প্রজন্মের পক্ষে অজ্ঞ পুরনো প্রজন্মকে দায়ী করা খুব সহজ।
যাহোক, এটা বোঝা জরুরি যে, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আমাদের অগ্রজদের অনেকেই সৎ ছিলেন না। কেউ কেউ দুর্নীতিগ্রস্ত ছিলেন, এ সমস্যাটাই প্রজন্মগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ জিইয়ে রেখেছে। আমাদের তরুণরা স্বাধীনতার পরের তৃতীয় প্রজন্ম কিন্তু সংঘর্ষ সেখানেও। আছে আমার মতো পুরনো প্রজন্মের লোকেরা যারা এখনও পুরনো আফ্রিার সঙ্গে সংযোগ অনুভব করে। কিন্তু আমাকে এটা বলে যেতেই হবে যে, সেই অতীত আর ফিরে আসবে না। নতুন আফ্রিকা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।
যে তরুণ আফ্রিকানরা আফ্রিকা মহাদেশে পেশার জন্য প্রশিক্ষণ নিতে পারেনি, তাদের বাইরে ভ্রমণ করতে হবে। অবশ্যই তারা সেই সুখ ভালোবাসে। এ মুহূর্তে আমরা আফ্রিকায় মেধা পাচারের ব্যাপারটি অনুভব করছি। এশিয়ায়ও এমনটি ঘটছে। আর এ মেধা পাচারে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে আমেরিকা ও বৃটেন। তরুণদের স্বাধীনতা আছে, যা আগে ছিল না। তাদের শরীর ও মন মুক্ত। আমি মনে করি, আমরা এ তরুণরাই স্বাধীনতার দাবি করতে পারি। আমি মনে করি, সে সময় এসে গেছে যখন প্রজন্মগুলো একত্রিত হয়ে নতুন কিছুকে জমজমাট করতে পারে।
একটা উদাহরণ দিই, বর্ণবাদের অন্ত ঘটার পর সাউথ আফ্রিকা, নামিবিয়াসহ পুরো অঞ্চলে প্রশ্ন উঠলো : কে প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতা অর্জন করলো? সাউথ আফ্রিকার সংখ্যাগরিষ্ঠ কালোরা নাকি সংখ্যালঘু সাদারা? একথা সত্য, বর্ণবাদী শাসনকাল ছিল ভয়াবহ। একে ছুড়ে ফেলতেই হতো। কিন্তু প্রথমত ও সর্বোপরি এটা ছিল সাউথ আফ্রিকার সাদা সংখ্যালঘুদের স্বাধীনতা। তারা ঔপনিবেশিকতার রোগ থেকে মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু সাউথ আফ্রিকার মূল সমস্যা হলো, বর্ণবাদী অর্থনীতি ও এর আইনগুলো এখনো থেকে গেছে। এটাই সমস্যা। আফ্রিকা যে সংগ্রামের মধ্য দিযে যাচ্ছে এটা হলো তার অন্যতম।
(২০০৩ সালে দেয়া ওসমান সেমবেনের একটি সাক্ষাৎকার থেকে সংকলিত।)
অনুবাদ : মাহবুব মোর্শেদ
৯ জুন মারা গেলেন ওসমান সেমবেন (১৯২৩-২০০৭)। তাকে অভিহিত করা হয় আফ্রিকান সিনেমার জনক হিসেবে। শুধু মুভি ডিরেক্টর নন, তিনি সাহিত্যিক হিসেবেও খ্যাতিমান। চিনোয়া আচেবে, ওলে সোয়েঙ্কার পাশাপাশি আফ্রিকান সাহিত্যে তার নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করা হয়। তাকে স্মরণ করে এ লেখাটি প্রকাশ করা হলো। লেখাটি আজকের যায়যায়দিনেও আছে।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুলাই, ২০০৭ সন্ধ্যা ৭:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


