somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নিষিদ্ধ গল্প

১৫ ই নভেম্বর, ২০১২ রাত ৯:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হাবিবুর রহমান সাহেবের সবকিছুই কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে৷ ইদানিং অনেক কিছুই ভুলে যান৷ অসময়ে মনে পড়ে আবার মনে পড়ে না৷ এই তো সবে সাতচল্লিশ পা দিলেন, এ বয়সে তো এ রকম হবার কথা না৷ নিজের খেয়ালীপনার কথা ভেবে ভেবে বিব্রত হন৷ আশ্চর্যের বিষয় বিব্রতকর সব কয়টি ঘটনাই তার মনে আছে৷ এই তো সেদিন টাই না বেধে গলায় ঝুলিয়ে অফিসে গিয়েছেন, শুধু তাই না বসের রুমেও গিয়েছেন কয়েকবার৷ বস অবশ্য সরাসরি এই কথা না জিজ্ঞাস করে বলেছেন কয়েকটা দিন ছুটি নিতে৷ আরেকদিন নিজের অফিসের ফ্লোর কত বেমালুম ভুলে গেলেন৷ গোল্ডেন টাওয়ারে ৩ত্‍ফ ফ্লোরে কাজ করেন৷ শুধু ১ম ফ্লোর থেকে ৯ম ফ্লোর পর্যন্ত লিফটে উঠানামা করছিলেন৷ শেষে একাউন্টেন্ড জামিল বৃষ্টিতে ছাতা ছাড়া বাসা থেকে বের হয়ে হেটে হেটে অফিসের গেটের কাছে এসে দারোয়ানের কথায় খেয়াল হল হাতে ছাতা নেই৷



এতক্ষন উনার ধারনা ছিল মাথায় ছাতা ধরে আছেন! অফিস থেকে সাতদিনের ছুটি নেয়া হয়েছে৷ আজ ২য় দিন৷ স্ত্রী লায়লাকে কিছু বলা হয়নি৷ মেয়েরা অল্পতে হুলস্থুল করে৷ নয়টার সময় বাসা থেকে বের হয়ে সন্ধ্যা ছয়টা অবধি পার্কে বসে থাকেন৷ বাসায় যা কিছু প্রয়োজনীয় কাজের ছেলে মনিরকে দিয়ে লায়লা আনিয়ে নেয়৷ আজ পার্কে এসেছেন ১০-১৮ মিনিটে, আমগাছের নিচের বেঞ্চিটাতে বসে আছেন৷ ইদানিং বুক পকেটে একটা ছোট্ট নোট বুকে সারাদিন কি করণীয় লিখে রাখেন৷ নোট বুকটা হাতে নিয়ে বসে আছেন আর এলোমেলো ভাবছেন৷



আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি ?

আচ্ছা, আমি কেন অস্থির হচ্ছি৷ আমার তো শারীরিক সমস্যা নেই৷ প্রেসার, সুগার সব নিয়ন্ত্রনে৷ তবে সমস্যা হচ্ছে কেন? অর্থনৈতিকভাবে নিজেকে অসচ্ছল মনে হচ্ছে না৷ অবশ্য এই মুহুর্তে মাসিক বেতন কত মনে পড়ছে না৷ এ টুকু মনে পড়ছে বস ছাড়া সবাই স্যার ডাকে, সমীহ করে৷ আমিতো মানসিক বিপর্যস্তও নই বরং ভুলে যাওয়াটাই মানসিক ভাবে বিপর্যসত করছে৷



আজ বসে থাকতে ভাল লাগছে না৷ ড্রাগ নেবো নাকি? আপন মনেই বলে উঠলেন, যদিও তিনি ধুমপান করেন না৷ পার্কের বাদামওয়ালা ছেলেটাকে ডাক দিলেন…… স্যার, কয় টেহার বাদাম দিমু?

কি সুন্দর সাদা দাঁত ছেলেটার! তার মেয়ে ঐশির কথা মনে পড়ে ঐশির বয়স চার৷ কি সুন্দর মিহি দাঁতে ইঁদুরের মত কুট কুট মেয়ের কথা মনে হওয়ায় মনটা ভাল হয়ে গেল৷ ছেলেটাকে কি জন্য ডেকেছিলেন ভুলে গেলেন, মনটা আবার খারাপ হয়ে গেল৷

স্যার, কয় টেহার বাদাম দিমু৷



ছেলেটাকে পাঁচ টাকা দিয়ে বললেন বাদাম লাগবে না৷ ছেলেটা টাকা নিয়ে নিমিশেই চলে গেল৷ তখনি মনে পড়ল কেন ছেলেটাকে জানতে চাচ্ছিলেন এই পার্কের আশে পাশে কোন প্রকার ড্রাগ ঠিক করলেন আজ দ্রুত বাসায় চলে যাবেন৷ নোট বুকে নিজের বাসার ঠিকানাটা এক ঝলক দেখে উঠে দাড়ালেন৷ বাসায় আসতে রাত নয়টা বেজে গেল৷ লায়লা দরজা খুলেই বললেন তুমি আজও আনোনি৷ মেয়েটা আজও কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে তিনি আসলে ভুলে গেছেন, চাইলেন না স্ত্রীর সাথে সমস্যাটা নিয়ে আলোচনা করতে৷ যে জিনিসটার জন্য তার মেয়ে কেঁদে কেঁদে ঘুমায় সে জিনিসটার কথা ভুলে বসে আছেন৷



খাবার পর্ব শেষ করে বারান্দায় বসলেন৷ লায়লা দরজার পাশে দাড়িয়ে তোমার মেয়ে তো তোমার কাছে আকাশের চাঁদ চায়নি, তুমি এনে দিচ্ছনা কেন? তুমি তো এ রকম ছিলে না৷ নিজে না পার কাউকে দিয়ে আনিয়ে নিলেই পার৷ মেয়েটা শুধু শুধু তোমার জন্য কষ্ট পাচ্ছে৷ লায়লা চলে গেলে নোট বুকটা মেলে ধরলেন৷ মেয়েটা কি চেয়েছিল৷ মনে করতে পারলেন না, নোট বইয়ের কোথাও লেখা নেই৷



নোট বইয়ে লিখলেন- কাল যদি ঐশি যা চেয়েছে এনে দিতে না পারি তবে বাসায় এক গ্লাস হরলিক্স খেয়ে ঘুমুতে গেলেন৷ মাঝে মাঝে লুকিয়ে মেয়ের হরলিক্স খান যদি অবস্থার উন্নতি হয়৷ ঘুম থেকে উঠে নোট বইটা দেখলেন৷ নোট বইয়ের লেখা শেষ পৃষ্ঠা ছিঁড়ে পকেটে নিলেন৷ হাত মুখ ধুয়ে ২০০ টাকা নিয়ে বাসা থেকে বের হলেন৷ কোথায় যাবেন জানেন না৷ সায়দাবাদ বাসস্টপে এসে বাসে উঠলেন৷ বাসের গন্তব্য সমর্্পকে তিনি কিছুই জানেন না৷ বাসের জানালায় চোখ আটকে আছে৷ কোন কিছু ভাল লাগলেই নেমে পড়বেন৷ হাত ঘড়িতে দেখলেন ১০.১৫ মিনিট বাসের জানালা দিয়ে খন্ড খন্ড ছবি চলে যাচ্ছে অবিরত৷ জানালা দিয়ে গাছপালা ঘেরা একটি গ্রাম দেখে ভাল লাগল৷ হেল্পারকে বলে নেমে পড়লেন৷ মহাসড়ক ছেড়ে ক্ষেতের আল ধরে ঐ গাঁয়ের দিকে চললেন৷ একটি মেহগনি গাছের ছায়ায় বিষন্ন মনে সূর্যের দিকে মুখ করে বসলেন৷ ইচ্ছা করছিল বাসায় ফিরে যেতে কিন্তু ঠিকানা মনে করতে ভাবছেন মেয়েটা কি চেয়েছিল, ভাবতে ভাবতে চোখের পাতা ভারি কোথা হতে যেন এক লোক গাছের ছায়ায় এসে বসল৷



আপন মনে কথা বলতে শুরু করল, যেন সে একা আশে পাশে কেউ নেই ! ইশ্! মাইয়াডা কি আউস কইরা লাল শাড়ি চাইছিল, দিতে পারলাম না৷ কপালদোষে বটতলার পুকুরে ডুইব্যা মরল৷ লোকটি হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল৷ যেভাবে এসেছিল সে ভাবেই চলে গেল৷ হঠাত্‍ রহমান সাহেবের তন্দ্রা ভাঙ্গল৷ অনুভব করলেন চোখের কোণে জল৷ আশে পাশে কোন মানুষজন নেই৷ এতক্ষন তিনি স্বপ্ন দেখছিলেন নাকি আসলেই কেউ একজন তারপাশে এসে বসেছিল বুঝতে পারলেন না৷



ঠিক করলেন বটতলার ঘাটে বসবেন৷ মোটামুটি সব গ্রামেই ১/২ টা বটগাছ থাকে, এখানেও বটগাছ থাকতে পারে তবে বটগাছের সাথে উঠে দাড়াঁতে গিয়ে বুঝতে পারলেন তীব্র ক্ষুদা আর ক্লান্তি তে শরীর ভারি হয়ে এসেছে৷ মানুষের কাছে জিজ্ঞেসা করে বটতলার পুকুর খুঁেজ বের করলেন৷ সত্যিই এই গ্রামে বটতলার পুকুর পাবেন ভাবেন সূর্য ডুবতে শুরু করেছে৷ পুকুর ঘাটে বসেই শান্তি শান্তি ভাব অনুভব করলেন৷ ক্লান্তিতে চোখ বুঝে এল৷

কত সময় চোখ বুঝেছিলেন খেয়াল নেই৷ চোখ খুলেই অবিভূত হয়ে গেলেন, সন্ধ্যা পেরিয়ে এখন রাত৷ চারপাশে তারার মতো জোনাকিদের মেলা! আনন্দে চোখে পানি এসে গেল৷ বাচ্চাদের মত জোনাকি ধরে ধরে বুক পকেটে ভরতে লাগলেন৷



আশ্চর্য ! মেয়েটা তার কাছে কয়েকটি জোনাকি পোকা চেয়েছিল ।



রহমান সাহেব বুক পকেটের মুখ চেপে ফিরছেন৷ ক্ষুদা আর শারীরিক ক্লান্তি চলে গেছে হঠাত্‍ খেয়াল হল সব কিছুই মনে করতে পারছেন, প্রফুল্ল অনুভব করলেন৷ বাসার পথে পা বাড়ালেন , এতটা পথ দূরে তিনি গিয়েছিলেন ভেবে খুবই অবাক হচ্ছেন। মনে হচ্ছে এই পথ আর ফুরাবে না , কখন যে ঐশী কে জড়িয়ে ধরবেন!



প্রতিটি সিঁড়ির ধাপে পা ফেলেন আর বুকের ভেতর তীব্র চিনচিনে ব্যাথা অনুভব করেন৷ ব্যাথায় যতই বুক পকেট ভর্তি জোনাকি পিষে ফেলার ইচ্ছা জাগে, ভালবাসায় ততই পকেট আকড়ে ধরেন। দরজার সামনে এসে কলিংবেলে হাত রাখলেন তীব্র ব্যাথায় পকেট চেপে ধরে মেঝেতে পড়ে গেলেন৷



এখনো লায়লা দরজা খুলছে না কেন?



কেন জানি মনে হচ্ছে এ দরজা আর কখনোই খুলবে না৷

সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই নভেম্বর, ২০১২ রাত ১১:৪২
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন মহামানব - একজন মহান শিক্ষক

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৫ শে জানুয়ারি, ২০২১ রাত ১০:১৫



আমার স্যার, অনেক অনেক বড় মানুষ, তাল গাছের মতোই তিনি বড়। না - না তাল গাছ ছাড়িয়ে তিনি আকাশ ছোঁয়েছেন, তিনি আকাশের মতোই বড় মানুষ। অনেক দূর দূরান্ত থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

হৃদস্পন্দন পাঠালাম…

লিখেছেন নান্দনিক নন্দিনী, ২৫ শে জানুয়ারি, ২০২১ রাত ১০:৫০



ভালোবাসা কি এইভাবেই একটু একটু করে জন্মাতে থাকে? এই হালকা মেজাজ, খুশি-খুশি ভাব। এই এলোমেলো কথা বলা, অতিরিক্ত আত্মসচেতনতা এবং পুরোপুরি ভিন্ন একজন মানুষ হয়ে উঠা; একেই কি... ...বাকিটুকু পড়ুন

তুমি আমার দুঃখ বিলাসের একমাত্র কারণ

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৬ শে জানুয়ারি, ২০২১ সকাল ৯:০৬



কংক্রিটের রাত্রিতে, আঁধারের ওপার হতে দাও হাতছানি।
তুমি কি আলোর পাখি?

আগুন রঙা তোমার দু পাখায় আলোর ঝলকানি,
আমি বিহ্বল হয়ে চেয়ে থাকি,
তোমার বৈচিত্রময়তায়।

আঁধার হতে আলোয় উত্তরনের চেষ্টায় আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

গনেশ মূর্তি-এক্সপেরিমেন্ট আর অন্ধ বিশ্বাস

লিখেছেন কলাবাগান১, ২৬ শে জানুয়ারি, ২০২১ সকাল ১০:০৩

Repost


ল্যাবে কলকাতার হিন্দু মেয়ে গ্রাজুয়েট স্টুডেন্ড হিসাবে জয়েন করল। খুবই করিৎকর্মা ছাত্রী, প্রথম কয়েকমাস ছোট খাটো এক্সপেরিমেন্ট খুব সহজেই করা হত...আসল সমস্য শুরু হয় যখন স্যাম্পল থেকে প্রোটিন বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশে থাকা মানেই কি দেশের সেবা করা???

লিখেছেন ভুয়া মফিজ, ২৬ শে জানুয়ারি, ২০২১ দুপুর ১২:০২



ব্লগে আসি কিছু আনন্দময় সময় কাটাতে। লিখতে ভালো লাগে, তাই লেখি। পড়তে ভালো লাগে, তাই যখনই সময় পাই, ব্লগে বিভিন্ন ধরনের লেখা পড়ি। ব্লগে সময় কাটানো মানেই একধরনের কোয়ালিটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×