কিছু স্মৃতি বিস্মৃতির অতল থেকে উঠে আসে আবার নতুন করে কিছু হারিয়ে যায় মনের আজান্তে।ভুলে যাবার চেস্টা করেও কিছু কিছু মানুষ ভুলতে পারে এমন কিছু ঘটনা আমাদের জীবনে আষ্টেপিষ্ঠে থাকে আর খোঁচা চেয় আমাদের বিশুদ্ধ অনুভূতিকে।
আর কিছু দিন পর এই সেমিস্টারের পরীক্ষা শেষ হবে।আস্তে আস্তে সবাই বাড়ী চলে যাবে।আমিও হয়তো যাব একদিন দিন তারিখ ঠিক করে কিন্তু প্রতিবার যাবার বাড়ী যাবার সময় যে আমার একটা দুঃখের স্মৃতি মনে পড়ে যায়।কিছুতেই ভুলতে পারি না।মনে মনে ঈশ্বরকে বলি যেন আর কোন দিনও এই রকম কোন ঘটনা না ঘটে।
এই সেমিস্টারের মাঝে(মিড টার্ম ছুটিতে) বাড়ী গিয়েছিলাম শেষ বার ।সে বার ফেরি ঘাটে প্রায় ১০ ঘন্টা বসে থাকতে হয়েছিলো কুয়াশার জন্য ।সারা রাত বাস একটা জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো।সাথে অনেক গুলো ছোট ভাই ছিলো।তাদের সাথে গল্পগুজব করতে করতে রাত কেতে যায়,দুপুরে গড়িয়ে গেলে ফেরি ছাড়ে।প্রায় ১৮ ঘন্টা বাস ভ্রমন শেষে বাড়ী গেলাম কিন্তু মা-বাবার মুখের হাসি সব ক্লান্তি মুছে দিলো।মনে হলো কোন কষ্ট হয়নি।বেশ কিছু দিন বাড়ি থাকলাম ।এর পর আবার সেই ইউনিভার্সিটির হোস্টেলে ফেরা আর সেই এক ঘেঁয়েমি জীবন।কিন্তু এই বাড়ি যাওয়া আসা ছিলো আনন্দ ঘন যা আর পাঁচ বার বাড়ী যাওয়ার মতোই(শুধু ব্যতিক্রম ফেরি ঘাটে ১০ ঘ্ন্টা লেট,যা আগেও হয়েছে,এটা ভাগ্যের ব্যাপার কারন শীতকালে সব দিন কুয়াশা হয়না)।
এই যাওয়া আসার ভেতর ঠিক গত সেমিস্টারের শুরুতেও বরাবরের মতো বাড়ি গেলাম,না সেই বার পথে কোন দেরি হয় নি।একটুও কষ্ট হয়নি,মধ্যরাতে বাড়ী পৌচ্ছে ঘুমিয়ে ছিলাম ।কিন্তু এই ঘুমের ভেতর যে কতো কিছু ঘটে গেলো ...।
আমাদের বাড়ীর পাশের ছোট্ট এক্তা বাচ্ছা।আমাদের চোখের সামনে বড় হয়ে উঠতে লাগলো।জন্মের সমইয় কিছু সমস্যা থাকার জন্য মাত্র ৩ দিন বয়সে তার বড় ধরনের এক্তা অপারেশন করা হয়।এক বার নিউমোনিয়া হয়ে প্রায় যায় যায় অবস্থা কিন্তু কেন যেন শিশুটা ঈশ্বরের আশীর্বাদে বেঁচে ছিলো অসীম মমতায় ছড়িয়ে সবাই কে।ফুট ফুট এক্তা বাচ্চা।যতই বড় হচ্ছিলো ততই সবার মনে দাঁগ কাটছিল।সারাদিন দৌড়াদৌড়ি-হৈ চৈ -মারামারি-দুষ্টুমি-...পারার সবার চোখের মনি।আশেপাশের অন্য বাড়ির তুলনায় আমাদের বাড়ী বেশি আসতো।আমার মা বাবার সাথে তার প্রচন্ড ভাব।সকাল হলেই দৌড়ে চলে আসতো আর গলা জড়িয়ে আমার আমার মাকে বলতো "ও ঠাকুমা দাদু কই"।এর পর তার বিভিন্ন বাইনা ।আমার মা বাবা তাকে নিয়ে সারা দিন বেশ মজা পেত।আমাদের খুব আদর করে কাকু ডাকতো আমাদের দুই ভাইকে।আমার দিদিকে পিসি।একটু বকা দিলে প্রচন্ড করুন দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকতো যদি কেউ তার ছোট্ট অপরাধ ক্ষমা করে আবার বুকে জড়িয়ে ধরে।ওর মা বকা দিলে আমাদের বাড়ী এক দৌড়ে চলে আসতো...।স্মৃতি অনেক ...বলে বা লিখে আসল আবেগ বা অনুভূতি গুলো আমি বোঝাতে পারবো না মনে হয়।
আমিও সেই দিন বাড়ীতে পৌচ্ছায় অনেক রাতে এবং ঘুমিয়ে ছিলাম।সে অনেক সকালে আমাদের বাড়ী চলে আসে ঐ দিন।সকাল থেকেই তার দুরন্তপনা শুরু।আমার মা বাবা সাথে কয়েক দফা দুষ্টুমি করে আমার ঘরে গিয়ে দেখে যে আমি বাড়ি আসছি।তখন সে আমাকে বলতে থাকে "বাশিঁ আলা কাকু আমার জন্য কি আনছো"।আমি একটু আধটু বাশিঁ বাজাতাম বলে আমার নাম মনে না রেখে ও আমাকে বাশিঁ আলা কাকু বলতো।আমি ঘুমের ভেতর কিছু টের পাইনি,অনেক্ষন ধরে আমাকে ডাকাডাকি করেছে...।আমাকে এই গুলো বলেছিলো আমার দিদি।কারন ঘুমের ভেতর বিরক্ত করছিলো বলে ওকে আমার ঘর থেকে দিদিই ওকে নিয়ে গিয়েছিলো।এর পর আমার দাদা মটর সাইকেলে ঊঠে কছুক্ষন মুখ দিয়ে গাড়ি চালানোর শব্দ করে যখন দেখলো আর কেউ তাকে নিয়ে ব্যাস্ত না তখন সে বাড়ী চলে যায়।কিন্তু তার এই বাড়িতে যাওয়া যে অনেক বড় একটা শূণ্যতা তৈরি করবে সেটা কেউ মনে হয় জানতো না।ওদের বাড়ীতে টিনের বেড়া।তাই কোন কারনে পুরা ঘর বিদ্যূতায়িত হয়ে গিয়েছিলো।সে খেলার ছলে হয়তো বেড়া ধরেছিলো।কিন্তু এতো ছোট মানুষ যে নিজেকে আর ছাড়াতে পারে নি।ওর বাবা যখন দেখতে পায় তখন দেখে ও খুব ক্ষিন স্বরে বলছে 'বাবা আমারে ধলে রাখছে...'...।
তাকে হাসপাতেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো বাচাঁনো যায় নি।ফুটফুটে এক শিশু নিরব নিথর হয়ে যায়।থেমে যায় তার সব দুষ্টুমি,সব হাসি আনন্দ...।আমার ঘুম ভেঙে ছিলো দিদির ডাকে..."ভাই ... আর নেই"।আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না আমি কি করবো।ওদের বাড়িতে গিয়ে আর সহ্য করতে পারিনি নিজেকে।মনে মেঘ গুলো ভারী হয়ে এক সময় চোখ দিয়ে বের হয়ে আসে।কতোক্ষন অঘোরে কেঁদেছিলাম জানি না .........।জীবনে কারো মৃত্যুতে কেঁদেছিলাম।আমার সব টুকু সহ্য শক্তি সেদিন পেরিয়ে গেয়েছিলো।
আজো যখন বাড়ি যাবার কথা মনে আসে,চোখের কোনটা ভারী হয়ে আসে।ভাবতে থাকি আমাকে বাড়ি গিয়ে আবার কি দেখতে হবে ...।যখনই আমার বাঁশিটা বের করে ফু দেয় তখনই তার কথা মনে আসে।যখন বাড়ী গিয়ে রাতের বেলায় রাস্তায় বসে থাকি ওর কথা মনে পড়ে।বাড়ি থেকে চলে আসার পর সে মাঝে মাঝে ফোনে বলতো কাকু তুমি আবার কবে আসবা।কাকু তুমি কেমন ...এখন আর কেউ বলে না।শুধু তার নিস্পাপ মুখের ছবি খানি ভেসে উঠে।
বাচ্ছাটার ছবি ও নাম উল্লেখ করতে পারলাম।কিছু দিন পর বাড়ী যাব।ওদের বাড়ির দিকে তাকালে কি ধরনের অনুভূতি হবে জানি না।তবে তাকে এখনো ফিল করি।তার সেই দেব তূল্য হাসি,করুন দৃষ্টিতে অপরাধ করে ক্ষমা চাওয়ার ভংগি(আমাদের দৃষ্টিতে অপরাধ নয়)...।ওর চলে যাবার দিন পুরা নড়াইল শহর কেঁদেছিলো কারন এমন দেব তুল্য শিশুকে যেই পথে দেখতো সেই আদর করতো।
পূর্ণতা থেকে শূন্যতা হতে সময় লেগেছিলো মাত্র ৫ মিনিট।তার চারপাশের মানুষ গুলো এখনো তার জন্য কাঁদে।হয়তো একদিন ভুলে যাব বেমালুম।
আসুন আমাদের চারপাশের শিশুকে চোখে চোখে রাখি।এক নিমিষের জন্যও যেন তাদের মনে দুঃখ না দেয়।ওদের মন খুব নরম।একটু খানি হাসি মুখে দেখলে ওরা যেমন ভালো বেসে ফেলে তেমন একটু খানি রাগ দেখালেই ওদের মুখ ভারী হয়ে যায়।
অনেক বড় লিখে ফেল্লাম।লিখতে লিখতে আমি নিজেই চোখের জল ফেললাম ২ বার ।জানি না এই রকম স্মৃতি আর কত বয়ে বেরাতে হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

