আমি প্রায়ই আমার লেখায় ইসলামিক রেফারেন্স ব্যবহার করি। অনেকেই সে কারনে আমাকে মৌলবাদী বলে থাকেন। যখন আমি জিজ্ঞেস করি, "মৌলবাদের আমি কি দেখালাম?"
তখন আর উত্তর দিতে পারেনা। আমতা আমতা করেন। একপর্যায়ে কথা ঘুরিয়ে নেন।
সুযোগ পেলেই ইসলামকে গালাগালি করে মজা পায়। মুসলমানের ছেলে, অথচ ইচ্ছা করেই নবীজির নাম ঠিকভাবে উচ্চারণ করেনা। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলাতো বহুদূর!
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বুঝতে পারি যে ইসলাম তাঁদের কাছে একটি তিক্ততার নাম। তাঁদের অধিকাংশই জন্মগতভাবেই মুসলমান। এবং প্রায় একশো ভাগ ক্ষেত্রেই তাঁরা নিজেদের ধর্ম সম্পর্কে কিছুই জানেননা।
আমাদের দেশ সহ বিশ্বের এখন প্রতিটা দেশেই দেখা যায় চরমপন্থী কিছু মাওলানা ইসলামকে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করে একে হিংসার দিকে ঠেলে দিয়েছে। তাদের এমন আচরণে বিধর্মীরাতো বটেই, এমনকি স্বল্প জ্ঞান সম্পন্ন মুসলিমরাও ধর্মটিকে গালাগালি করতে মুখ আটকায় না। এইসব মাওলানারা নাস্তিকদের "নাস্তিক! নাস্তিক!!" বলে গালাগালি করে, কিন্তু এটা কেউ বুঝতে চায়না যে তাদের নাস্তিকতার দিকে ঠেলে দেয়ার জন্য তারাও কোন অংশে কম দায়ী নন।
আমার মনে আছে একবার দূর্গা পূজোর সময়ে আমাদের রমযান মাস পড়ে গিয়েছিল। মনে পড়ে, হিন্দুরা তখন কেমন অস্বস্তি নিয়ে তাঁদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করতেন। তাঁদের হয়তো আশঙ্কা ছিল, কোন সময়ে ক্ষেপে গিয়ে মুসলমানেরা তাঁদের পূজো মন্ডপে আক্রমণ করে বসে!
দেশের কোথাও কোথাও এমন ঘটনা ঘটে থাকতেও পারে, আমার জানা নেই।
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টানদের আমাদের দেশে অনায়াসে মারধর করা যায়। ইসলামের একটা লেবেল লাগিয়ে দিলেই হলো। তখন সেটা জিহাদের রূপ পায়। এবং বকধার্মিক মুসলমানেরা একে পবিত্র দায়িত্ব মনে করে লাঠি হাতে রাস্তায় নেমে আসেন। কোন ভাবা ভাবি নেই। মসজিদের মাওলানা আওয়াজ দিয়েছে, এত ভাবার কি আছে?
তাদের জন্যই একটি ছোট গল্প বলতে চাই। এবং অবশ্যই তা হযরত মুহাম্মদের(সঃ) জীবন থেকে।
ইসলামের একদম শুরুর দিকে খ্রীষ্ট ধর্মীয় একদল লোক মদিনায় এসেছিলেন হযরত মুহাম্মদের(সঃ) সাথে দেখা করতে। নবীজি তাঁদের অভ্যর্থনা জানালেন, এবং মসজিদে নববীতেই তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করলেন।
এখানে লক্ষ্য করার মতন বিষয় হচ্ছে, খ্রিষ্টান দলটিতে বেশির ভাগই ছিলেন পাদ্রী বা ধার্মিক খ্রিষ্টান। তাঁরা অবশ্যই তখন যীশুর পূজা করতেন। এবং নবীজি(সঃ) সেটা জানার পরেও মসজিদের ভিতরেই তাঁদের থাকার অনুমতি দিয়েছিলেন। তাঁরা সেই মসজিদে বসেই যীশুর পূজা করেছিলেন।
এই ঘটনা যদি কারও কাছে যথেষ্ট মনে না হয়, তাহলে আরেকবার এক আরব বেদূইন তাঁর সাথে দেখা করতে মসজিদে নববীতে আসেন। নবীজির সাথে তখন সাহাবীরা (তাঁর সঙ্গী) ছিলেন। বেদূইন বেচারা প্রায় জংলী একজন মানুষ, সে ভদ্রতার কিছুই জানেনা। তাঁর প্রকৃতির ডাক আসলো, সে মসজিদের ভিতরেই এক কোণায় গিয়ে পেশাব করতে শুরু করে দিল।
সাহাবীরা তেড়ে এলেন।
"এই ব্যাটা! তুই করিস কি!"
নবীজি (সঃ) সাথে সাথে তাঁদের থামিয়ে দিলেন। বললেন, "ওকে ওর কাজ শেষ করতে দাও।"
বেদূইন বেচারা ঘাবড়ে গিয়েছিল। প্রাকৃতিক কর্মের মাঝপথে কেউ বললেই কি থেমে যাওয়া সম্ভব নাকি? নবীজির (সঃ) কথায় সে আশ্বস্ত হলো। ধীরে সুস্থেই সে কর্ম সম্পাদন করলো।
সে উঠে এলে নবীজি(সঃ) তাঁর সঙ্গীদের নির্দেশ দিলেন, "তোমরা এখন পানি দিয়ে জায়গাটা ভাল মত ধুয়ে ফেল।"
সাহাবীরা চলে গেলে তিনি বেদূইন বেচারাকে খুবই নরম স্বরে বোঝালেন যে মসজিদ একটি পবিত্র স্থান, এখানে আল্লাহর ইবাদত হয়। আজেবাজে কাজ করার স্থান মসজিদ নয়।
যদি স্বয়ং নবীজি (সঃ) এত ধৈর্য্যের পরিচয় দিতে পারেন, যদি তাঁর জীবনকেই আমাদের অনুসরণ করার কথা হয়ে থাকে, তবে কোন লজিকে আমাদের দেশে একদল মানুষ আরেকদলকে মারার অপরাধকে যায়েজ করার যুক্তি দেখায়? তাও আবার নবীজির দোহাই দিয়ে?
কিছুদিন আগে নেলসন ম্যান্ডেলা মারা গেলেন। গান্ধী পরবর্তী যুগে এমন মহান নেতা বিশ্বে আর একটিও আসেননি। ফেসবুকে সবাই R.I.P লিখতে লিখতে ভরিয়ে দিল, আমি নিজেও শ্রদ্ধাঞ্জলী হিসেবে দুই চার লাইন লিখেছিলাম।
মজা লাগলো সেসময়ে যখন কয়েকজনের "ম্যান্ডেলা জ্ঞান" সম্পর্কে জানতে পারলাম।
"ম্যান্ডেলা ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার একজন মহান নেতা। যিনি কালোদের অধিকারের জন্য লড়েছেন!"
বেশিরভাগের দৌড় দেখি এই পর্যন্তই। এর বেশি আর কিছু বলতে পারেনা। কিন্তু তাঁর মৃত্যুতে স্ট্যাটাস, প্রোফাইল পিকচার বদল ইত্যাদি দেখে মনে হচ্ছিল যেন তাঁর চেয়ে বড় ম্যান্ডেলা ভক্ত পৃথিবীতে আর কেউ নেই।
কালোদের অধিকারের জন্য অনেকেই লড়েছেন। আমাদের দেশের সন্তু লারমাও চাকমাদের অধিকারের জন্য লড়েছেন। কিন্তু ম্যান্ডেলা পর্যায়ে কেউই যেতে পারেননি।
নেলসন ম্যান্ডেলার সবচেয়ে মহান দিকটি ছিল তাঁর ক্ষমা করার গুণ। সাতাশ বছর অন্যায়ভাবে জেল খাটার পরেও যখন তিনি বেরিয়ে এসে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট হলেন তখনও তিনি প্রতিশোধ না নিয়ে উল্টো সবাইকে ক্ষমা করে দিলেন। শত শত বছর ধরে চলে আসা বর্ণবাদী সাদা চামড়ার মানুষদের তিনি ক্ষমা করে দিলেন নিঃশর্তে। বিশ্ব তাঁর মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে গেল। নেলসন মেন্ডেলা ভালবাসা দিয়েই বিশ্ব জয় করে ফেললেন।
ঠিক একই ঘটনা কি চৌদ্দশো বছর আগে ঘটেনি?
যখন দশ হাজার সেনা নিয়ে বিনা রক্তপাতে হযরত মক্কা জয় করলেন, এবং পরাজিত মক্কাবাসী যখন এই ভেবে ভয়ে কাঁপছে যে তাঁদের সাথে কী ঘটতে চলেছে, তখন নবীজি (সঃ) তাঁদের জিজ্ঞেস করলেন, "তোমাদের কি মনে হয়? আমি তোমাদের কী শাস্তি দেব?"
তখন মক্কাবাসীদের মনে পড়ে গেল কী অত্যাচারটাই না তাঁরা করেছিলেন মুসলমানদের উপর। তাঁদের অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়েছিল, সমাজচ্যুত করা হয়েছিল। বছরের পর বছর নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। গায়ে হাত তুলে মারধর করাতো ছিল প্রতিদিনকার ব্যপার। তাঁকে হত্যাকরারোতো কম চেষ্টা হয়নি। হত্যা করা হয়েছিল অনেক সাহাবীদের। হযরত হামজার (রাঃ) মৃত দেহের নাক কান কেটে ফেলা হয়েছিল, দাঁত গিয়ে কামড়ানো হয়েছিল তাঁর কেটে ফেলা কলিজা! স্বয়ং নবীজিও সেদিন প্রকাশ্যে কেঁদে ফেলেছিলেন।
এত এত অত্যাচারের কি শাস্তি হবে আজকে?
তাঁরা বিনীত স্বরে বলল, "আপনি একজন মহান মানুষ। আমরা আপনার কাছে মহানুভবতাই আশা করি।"
নবীজি(সঃ) তখন একবাক্যে বললেন, "যাও! আজকে তোমাদের সবাইকে ক্ষমা করে দেয়া হলো! আজকে থেকে তোমরা মুক্ত!"
এখন আমি নেলসন ম্যান্ডেলার গুণগান গাইলে প্রগতিশীল, কিন্তু মুহাম্মদের(সঃ) কথা বললেই হয়ে যাব মৌলবাদী?
তাঁদেরকে আমি বলবো, educate yourselves my dear brothers and sisters! নবীজি আপনার নিজের অমূল্য সম্পদ, তাঁকে ফেলে অন্য মানুষের সম্পত্তিতে নজর দেয়ার কোনই প্রয়োজন নেই আপনার।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



