somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

ফাঁস হওয়া প্রশ্নের জেনারেশন

২০ শে জুন, ২০১৪ রাত ১১:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমরা যখন স্কুলে পড়ি তখন আমাদের এক স্যার (সংগত কারনেই নাম বলতে চাইছি না, উনি আসলেই শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি, ধরা যাক তাঁর নাম ছিল জালালউদ্দিন) ছাত্রদের কাছে খুব জনপ্রিয় ছিলেন।
তিনি স্কুলে কোন ক্লাস নিতেন না, কিন্তু তাঁর কাছে কোচিং করার জন্য মানুষ পারলে ওয়েটিং লিস্টেও নাম লেখাতো। কারণ স্যারের দেয়া 'সাজেশন' নাকি পরীক্ষায় হুবহু মিলে যায়।
বিষয় বুঝতে কারোরই কোন সমস্যা হতো না।
স্কুলের অফিসে কাজ করায় স্যার সব ক্লাসের সব পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আগে থেকেই দেখতে পারতেন। তাঁর সাজেশনতো মিলবেই।
আমার আব্বু আম্মু একটা ভাল কাজ করেছিলেন, আমাদের জালালউদ্দিন স্যারের কোচিংয়ে কোচিং করাননি। স্কুলের পরীক্ষায় ফার্স্ট সেকেন্ড হতেই হবে এমন কোন প্রেসার কখনই দেননি। আমরা হাসতে খেলতেই পড়ালেখা করেছি, এবং একসময় মোটামুটি গ্রহণযোগ্য রেজাল্ট নিয়ে বেরিয়েও এসেছি।
কিন্তু সব অভিভাবকতো আর জনাব আশরাফুর রহমান চৌধুরী বা আয়েশা সিদ্দিকা ছিলেন না। তাঁদের কাছে ছেলে মেয়ের ভাল রেজাল্টই ছিল শেষ কথা। কিভাবে করছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ না। কাজেই জালালউদ্দিন স্যারের কাছে কোচিংয়ে সীট পাওয়া যেত না।
মজার ব্যপার হচ্ছে, পরীক্ষা শেষে রেজাল্ট বেরোলে দেখা যেত অরূপ, নিলয়, তিন্নি, রাহী, মৌটুসী, স্বর্ণা, কুটি, যিমুতি এবং এরকম যারা আসলেই ভাল ছাত্রছাত্রী ছিল, তারা জালাল স্যারের কাছে না পড়েও ঠিকই ভাল রেজাল্ট করতো। আর 'অব্যর্থ সাজেশন' পাবার পরেও জালাল স্যারের ছাত্রছাত্রীরা তাদের সাথে টেক্কা দিতে পারতো না।
এখানেই রাহুল ড্রাভিডের সেই বিখ্যাত উক্তির সত্যতা প্রমাণিত হয়। "Form is temporary, class is permanent."
ইদানিং প্রায়ই দেখা যায় পাবলিক পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায়। এক জাফর ইকবাল স্যার ছাড়া কাউকেই এর প্রতিবাদ করতে দেখা যায়না। প্রশাসন নিরব থাকেন, সরকার নিরব থাকেন এমনকি অভিভাবকরা পর্যন্ত নিরব থাকেন! তাঁদের সন্তানেরা যদি এই চান্সে গোল্ডেন জিপিএ পেয়ে যায় ক্ষতি কি? উল্টো অনেককেই শুনেছি জাফর ইকবাল স্যারকে গালাগালি পর্যন্ত করছেন। "আওয়ামীলীগের দালাল" "নাস্তিক" ইত্যাদি প্রসঙ্গ টেনে আনছেন।
একটি অন্যায়ের প্রতিবাদের সাথে তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাস কিভাবে জড়িত হতে পারে সেটা আমার মাথায় কিছুতেই ঢুকে না।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হয়তো পোলাপান নকল করে গোল্ডেন জিপিএ পাচ্ছেও। কিন্তু ঐ যে বললাম, আসল ভাল ছাত্র ছাত্রীদের সাথে টেক্কা দেয়ার সময় তারা ঠিকই ঝরে পড়ছে।
এবারে একটু লাফ দিয়ে বাংলাদেশ থেকে অ্যামেরিকায় চলে আসা যাক।
এখানে এসে যখন আমি প্রথমবারের মত পরীক্ষা দিতে বসলাম, তখন দেখি প্রোফেসর প্রশ্নপত্র বিলি শেষে নিজে ল্যাপটপ খুলে জরুরী কাজ সেরে নিচ্ছেন। আমরা যে পরীক্ষা দিচ্ছি সেদিকে তাঁর কোন খেয়ালই নেই। আমি এদিক সেদিক মাথা নেড়ে দেখে নিলাম। সব সাদা কালো চামড়ার বিদেশী (শুধু অ্যামেরিকানই না, অস্ট্রেলিয়ান দুই ছেলে ছিল, ইউরোপিয়ান কয়েকটা মেয়েও ছিল, কিছু টানা চোখের চাইনিজ-জাপানিজও ছিল) মাথা নিচু করে পরীক্ষা দিচ্ছে। আমি ছাড়া কোন দেশী (ইন্ডিয়ান-পাকিস্তানি-বাংলাদেশী) স্টুডেন্ট নেই।
আমি ভাবলাম, "আহারে....এই সুযোগটা আমার দেশের পোলাপান পেলে নকল করে ফাটায় দিত!"
আমার ধারনা মিথ্যা না। পরে টের পেয়েছি।
স্কুলের শেষের দিকের যেকোন পরীক্ষা দেয়ার সময়ে আমাদের স্টেট ইস্যুড আইডি কার্ড নিয়ে যেতে হত। আমিই যে আমার পরীক্ষা দিচ্ছি সেটার প্রমান।
কিছু কিছু পরীক্ষায় প্রতিটা সারিতে একজন করে গার্ড থাকতো, এদিকে স্যার/টিচার অনবরত টহল দিচ্ছেন। সেই সাথে ক্লাস রুমে আছে সিসি টিভি ক্যামেরা। কোনভাবেই যেন কেউ নকল করতে না পারে।
ভাল মানুষ অ্যামেরিকানরা হঠাৎ এত বিগড়ে গেল কেন?
পরে শুনলাম কিছু ইন্ডিয়ান এবং পাকিস্তানি ছাত্রছাত্রী নাকি এক বন্ধুর জায়গায় আরেক বন্ধু গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে আসে। কেউ কেউ নাকি অন্য সেকশনে পরীক্ষার সময়ে ঢুকে প্রশ্নপত্র নিয়ে বেরিয়ে আসে, এবং নিজের সেকশনের পরীক্ষার সময়ে এসে পরীক্ষা দিয়ে একশোতে একশো পেয়ে যায়। আমার ধারনাই সঠিক প্রমাণ করতে দেশী কেউ এই সুযোগ পেয়ে নকল করে ফাটিয়ে ফেলেছে!
ছাত্রছাত্রীদের সততার উপর বিশ্বাস রাখার শাস্তি স্বরূপ বেচারা অ্যামেরিকানদের একটু কড়া হতে হলো।
আমরা জাতি হিসেবে এখন শর্টকাটে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ধৈর্য ধরে সৎ থেকে পরিশ্রম করে সফল হতে এখন কেউই আগ্রহী নই।
বিশ্বকাপের উদাহরণই দেয়া যাক।
স্পেন বিদায় নেয়ায় ব্রাজিলের সমর্থকেরা আনন্দে আত্মহারা। কেন? কারণ দ্বিতীয় রাউন্ডে স্পেনের মুখোমুখি হতে হবে না।
ভাই! যে দলকে তুমি বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দেখতে চাও, তাঁদের তুমি স্পেনের সাথে মুখোমুখি হতে ভয় পাও? নিজের দলের প্রতি এই যদি তোমার কনফিডেন্স লেভেল হয় তাহলে দল পরিবর্তন করে ফেল। যেই দলের উপর তোমার আস্থা আছে, তাঁদেরকেই সমর্থন করো।
আমার ব্রাজিলকে ভাল লাগে, এবং আমি চাই ফাইনালে যাবার আগে জার্মানি, ইটালি, নেদারল্যান্ডস সবাইকে উড়িয়েই তারা ফাইনালে যাক। এবং ফাইনালে প্রতিপক্ষ হিসেবে আমার প্রথম পছন্দ অবশ্যই আর্জেন্টিনা! যাতে চ্যাম্পিয়ন হবার পর কেউ বলতে না পারে যে ব্রাজিল 'চামে দিয়ে' অথবা 'শর্ট কাটে' চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আর যদি সেটা না পারে, তাহলে দরকার হলে আরও চার বছর অপেক্ষা করা যাবে। যোগ্য দল হিসেবেই যেন তাঁরা ফিরে আসে।
মূল প্রসঙ্গে ফেরা যাক।
বাংলাদেশী মুসলমান হিসেবে আমরা মনে করি অ্যামেরিকানদের গালাগালি করা আমাদের উপর ফরয। আমাদের মাওলানারা প্রকাশ্যে গালাগালি করে থাকেন, "ইহুদি নাছারারা(খ্রিষ্টান) আমাদের শত্রু! এদের সমর্থন করা হারাম! আর এদের আস্কারা দেয় অ্যামেরিকা!"
আমরাও মূর্খের মতন কিছু চিন্তা ভাবনা না করেই মাথা নেড়ে বলি "ঠিক! ঠিক!!"
কিন্তু এই ইহুদি খ্রিষ্টানদের দেশে এসে দেখি এরাই আমাদের চেয়ে বেশি মুসলমান!
যেমন, এখানকার ট্রাফিক আইন ভাঙলে এখানকার খ্রিষ্টান পুলিশ আমাদের দেশের মুসলমান পুলিশদের মতন ঘুষ নিয়ে দোষীকে ছেড়ে দেন না।
ড্রাইভারস লাইসেন্স নিতে গেলে আসলেই ভাল ড্রাইভিং জানতে হয়, আমাদের মুসলিম দেশের মত টাকা দিলেই লাইসেন্স পাওয়া যায় না।
সরকারী অফিসে গেলে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। "ফার্স্ট কামস, ফার্স্ট সার্ভড" নীতি মেনে চলা হয়। প্রায়োরিটি বেসিসে যে কোন কেস হ্যান্ডেল করা হয়। এমন নয় যে ফাইলকে এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে নাড়াতেই লাখ খানেক টাকা খরচ করতে হয়। যার টাকা নেই, তার ফাইলে ধুলো জমতে শুরু করে।
এমন কি ব্যবসা করতে গেলেও সৎভাবে ব্যবসা করতে হয়। যেমন প্রতিটা রেস্টুরেন্টে একবার খাবার বানানো হয়ে গেলে সেই খাবার একটা নির্দিষ্ট সময় পরে অবশ্যই ফেলে দিতে হবে। আমাদের দেশের মতন চার পাঁচ দিনের পুরনো বার্গার কাস্টমারের কাছে বেঁচে দেয়ার প্রশ্নই আসেনা।
আমি নিজে একজনকে চিনি, যে খুব গর্ব করে একদিন আমাকে বলেছিল, "আজকে একটা বার্গার বেঁচেছি, পাঁচদিন ধরে বিক্রি হচ্ছিল না।"
আমি অবাক হয়ে বলেছিলাম, "লোকটা বুঝতে পারেনাই?"
"বুঝবে না আবার? আমাকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ভাই বার্গার কি বাসি? গন্ধ করছে একটা।"
"তুমি কি করলে?"
"আমি বার্গারটাতে গন্ধ শুঁকে বললাম, 'কই নাতো। কোন গন্ধ নেই। আজকেই বানানো বার্গারে গন্ধ করবে কেন?' হিহিহি।"
একজন লোককে ঠকিয়ে কি নির্মল আনন্দ! অবাক হয়ে তাকানো ছাড়া আমার কিই বা করার ছিল?
মাওলানারা কি বলবেন সেটা তাঁদের বিষয়, কিন্তু ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রে গোল্ডেন জিপিএ পাওয়া জেনারেশনের পরিণতিতো এইটাই হওয়া স্বাভাবিক!
৭টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)
.................................................................................................................



কক্ষপথে ঘোরে আমার একলা মনের ইলেকট্রন,
নেগেটিভ চার্জে মেঘ জমেছে, খুঁজছে আজি কার্বন মাখা অন্যমন।
তুমি যখন পজিটিভ এনার্জিতে, এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫৮



পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

একটি একটি সামরিক কৌশল। কোনো সামরিক বাহিনী যখন পিছু হটে বা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে চায়, তখন তারা নিজেদেরই ফেলে যাওয়া এলাকার সমস্ত ফসল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের পরিকল্পনাটা কোথায় ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১০


ডা. জাহেদ উর রহমান। জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা বিরোধী ছিলেন এবং তাঁকে চেনেন না, এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। মানুষটি অ্যাক্টিভিজম ছেড়ে নতুন সরকারের মুখপাত্র হয়েছেন। এতে আমার মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:২৫

[মানুষ এতো দুষ্ট কেন? পুরনো কথা ভিডিও সহ ফেসবুকে এভাবে না ছাড়লে হয় না। ]

“আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন"

২৫ হাজার টাকার মজুরি আন্দোলন আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে- ভাল্লাগে!

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৭


আমাদের ঝাল খাওয়ার ইতিহাস হাজার বছরের নয়, তবুও কেন আমরা ঝাল পাগল জাতি হলাম এইটা নিঃসন্দেহে গবেষনার বিষয়। পর্তুগীজেরা না আসলে আমরা হয়তো কাঁচা লঙ্কা বা শুকনো লঙ্কা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×