somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কাগজের সার্টিফিকেট - একটি ছোট গল্প

১৮ ই জুলাই, ২০১৪ রাত ২:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আরও একটা ইন্টারভিউ হয়ে গেল। তমাল জানে, আরও একবার তার চাকরি হবেনা।
এই নিয়ে কতটা ইন্টারভিউ সে দিল? পঞ্চাশ? ষাট? নাকি তারচেয়েও বেশি?
তমাল আর তার হিসাব রাখেনা। হিসাব রাখার প্রয়োজন নেই।
হাতে তার কাগজের ফাইল ধরা থাকে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট। বিশ বছর পড়াশোনার একমাত্র দালিলিক প্রমাণ।
সেই যখন ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পেয়ে বাবার পা ছুঁয়ে সালাম করেছিল, বাবা বুকে জড়িয়ে ভেজা চোখে বলেছিলেন, "আরও বড় হ বাবা! তোকে আরও বড় হতে হবে!"
এসএসসি, এইচএসসি, বিএসসি, এমএসসি.....সে আর কত বড় হবে? কাগজের ফাইলে আর কয়টা সার্টিফিকেট জমা হলে ছোটখাটো অফিসের বড় বড় সাহেবেরা বুঝতে পারবেন সে তাঁদের অফিসের হয়ে কাজ করার যোগ্য?
একজন টাইপিস্টের চাকরির জন্য আজকাল বি.এ. পাশ খোঁজা হয়! একজন সেক্রেটারির চাকরির জন্য আজকাল এমবিএ খোঁজা হয়!
হায়! উচ্চশিক্ষার এইরকম অপমান বুঝিবা কেবল আমাদের দেশেই সম্ভব!
"আপনার সবইতো ভাল কিন্তু অভিজ্ঞতা যে কম!"
ইন্টারভিউ চলার সময়ে যখন কোন মোটা ভূরিওলা লোক এইভাবে কথা বলে, তখন বারবার বলতে ইচ্ছা করে, "তুই যখন বিয়ে করতে গিয়েছিলি, তোর শ্বশুরকি তোকে জিজ্ঞেস করেছিল, আগে সংসার করার অভিজ্ঞতা আছে কিনা? তুই যদি অভিজ্ঞতা ছাড়াই বিয়ে করতে পারিস, তাহলে আমাদের চাকরির ক্ষেত্রে এমন প্রশ্ন কেন?"
তমাল মুখ ফুটে কিছু বলেনা। একটি চাকরি পেতে হলে কেবল ততটুকুই বলতে হয় যা বসেরা শুনতে চান।
লাবণ্যের বিয়ে হয়ে গেছে সেই কবেই। একটি চাকরিইতো কেবল সে চেয়েছিল তার কাছে। বলেছিল, "আমি বাড়ি ঘর, আত্মীয় স্বজন সব ছেড়ে তোমার কাছে ছুটে আসবো। তুমি শুধু আমাকে একটি চাকরি যোগার করে দেখাও।"
তমাল দেখাতে পারেনি। একটি চাকরি তার কাছে এতটাই দূর্লভ!
লাবণ্যের ঘরে এখন ফুটফুটে দুটি শিশু। স্বামী সন্তান নিয়ে এখন তার সুখের সংসার!
বন্ধুরা একএক করে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে। প্রথমে গেল নওশাদ, অ্যামেরিকা। ডিভি লটারিতে তার নাম উঠেছিল। সাত বছর আগের কথা। এখন তার নাকি নিজের বাড়ি আছে। নিজের গাড়ি চালিয়ে সে অফিসে যায়। বিয়ে করে সংসারও শুরু করেছে। ইশ! ডিভি লটারি যদি এখনও চালু থাকতো!
মাজেদ চলে গেল ইংল্যান্ড। স্টুডেন্ট ভিসায়। কী এক দুই নম্বরী কলেজে গিয়ে ভর্তি হয়ে সে পাড়ি জমায় রানীর দেশে। তারপর সেখানকার এক মেয়েকে বিয়ে করে নাগরিকও হয়ে যায়। এখন সে এক রিটেইল শপে কাজ করে। তমাল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবে, তারওতো একটি চাকরি আছে!
শাহীনের কথা বাদ যাবে কেন? অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী চাচাতো বোনকে বিয়ে করে এখন সে সিডনীতে প্রবাসী। সেদিন ফোন করে জানালো মার্কওয়াহ, স্টিভ ওয়াহকে নাকি স্বচক্ষে দেখেছে। স্টিভ ওয়াহর সাথে তোলা ছবি এখন তার ফেসবুকের প্রফাইল পিকচার। সে সুখেই আছে।
তমালের মা সেদিন বললেন, "মন ছোট করিস না। ধৈর্য্য ধর। একদিন ঠিকই চাকরি হবে।"
বাবা বলতেন, "ফেইলর ইজ দ্য পিলার অব সাকসেস।"
বাবা ইংরেজি তেমন জানতেন না। শুধু এই একটি বাক্যই কি করে যেন মুখস্ত করে ফেলেছিলেন।
বাবা এখন আর নেই। থাকলে দেখতেন তাঁর ছেলের একের পর এক পিলারই শুধু দাঁড়িয়েছে, সাকসেস ধরা দেয়নি।
ঝুলে যাওয়া কাঁধ নিয়ে হেঁটে যেতে যেতে তমাল একবার পথচারীদের দিকে চোখ বুলায়।
অনেকের হাতেই ব্রিফকেস, গলায় টাই। কোন কোম্পানির এক্সিকিউটিভ এরা। কেউবা ব্যাংকে কাজ করে। কেউ বা সেলসম্যান।
তাদের এক আড্ডায় সে কান পেতে শুনেছিল একজনকে বলতে, "আর বলো না। এমন চাকরির মুখে লাথি মারি! মানুষে করে এমন চাকরি?"
উৎকর্ণ হয়ে তমাল শোনার চেষ্টা করেছিল ঘটনা কি।
"সকাল আটটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত গাধার খাটুনি খাটতে হয়! কোন লাইফ থাকে?"
তমালের বলতে ইচ্ছে করে, "থাকে। একটি চাকরি থাকলেই কেবল 'লাইফ' থাকে।"
হাঁটতে হাঁটতে তমালের ক্ষিধে পায় খুব। রেস্টুরেন্টে গরম গরম সিঙ্গারা ভাজা হচ্ছে। গন্ধে পেট মোচড় দেয়।
সিঙ্গারা কেনার মত বিলাসী অর্থ তার নেই। রিকশায় চড়ার মত টাকাও এখন তার কাছে নেই। টিউশ্যনি করে কতই বা আয় হয়? কত ছোট হলে মায়ের কাছে বারবার হাত পাতা যায়?
হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মাথার ঘাম মুছতে গিয়ে কাগজের ফাইলের উপর দৃষ্টি যায় তার। কাগজের সার্টিফিকেট! বিশ বছরের পড়াশোনার একমাত্র দালিলিক প্রমাণ! তাঁর কাছে মহামূল্যবান হলেও ছোট অফিসের বড় সাহেবদের কাছে যা মূল্যহীন।
রেস্টুরেন্টের উনুনে জ্বলতে থাকা তেল ভর্তি কড়াইয়ের দিকে চোখ যায় তার। সিঙ্গারা ভাজা হচ্ছে।
তমালের ইচ্ছে হয় একবার গিয়ে লোকটাকে বলে, "ভাই আমার সার্টিফিকেটগুলো একটু ভেজে দিতে পারবেন? অনেকদিন পর তৃপ্তি ভরে কিছু খেতাম!"
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জুলাই, ২০১৪ রাত ৯:২৬
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পরিস্থিতি কি জটিল?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯

বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি, অথচ বাইরে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ার গ্যাসের শব্দে চারদিক প্রকম্পিত! মিরপুরে আমার বাসার কাছেই মেট্রো রেলের নিচে আগুন দেওয়া হয়েছে; কিছুক্ষণের জন্য মেট্রো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৯



খাওয়া দাওয়া করাটা আজকাল বিরক্তকর লাগে।
কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকতে হলে- খেতে হবে। না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। প্রিয় খাবার গুলোও খেতে ইচ্ছা করে না। ভালো লাগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৬


এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন এই গুজবটি ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইসরায়েল ট্রাম্পকে রাজি করিয়েছে, যাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই আমেরিকা ইরানে পারমাণবিক বোমা হামলা করে। বিগত বছরগুলোতে ইসরাইল সারা বিশ্বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Haze দমনে সিঙ্গাপুরের কুটনৈতিক দক্ষতা

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩১

সিঙ্গাপুর সাম্প্রতিককালে স্মরনকালের ভয়াবহ Haze (ধোঁয়াশা ও বায়ুদূষণ) এর কবলে পড়ে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সারা শহর ঘন ধোয়ার আবরনে ঢেকে যায়। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার বেঁচে থাকাই তাদের ভয়ের কারণ॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৫১





শেখ হাসিনার বেঁচে থাকা নিয়ে আক্ষেপ কেন? একটি রাজনৈতিক সমীকরণের বিশ্লেষণ

সম্প্রতি তারেক রহমানের উপদেষ্টা জাহেদুর রহমানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আলোচনা শুরু হয়েছে - "শেখ হাসিনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×