somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সব দোষ হিন্দি সিরিয়াল এবং বিদেশী চ্যানেলের

০১ লা আগস্ট, ২০১৪ রাত ১:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

"O nice room."
"Thank you."
"Nice lamp."
"Thanks."
"Actually এই nice room এ আমি অনেক আগেই আসতে চাইছিলাম, তোমার ভাইয়ার জন্য আসলে আসতে পারিনাই।"
"ওহো....."
মেয়েটা এদিক ওদিক দেখতে লাগলো, ছেলেটা "বাই দ্য ওয়ে হ্যাপী বার্থডে" বলেই মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরলো।
তারপর তারা দুইজনই একটু অস্বস্তিতে পড়ার অভিনয় করলো। এবং প্রায় সাথে সাথেই ছেলেটা অতিরিক্ত উৎসাহে "nice bed" বলে মেয়েটির বিছানায় ঝাপ দিল।
কাহিনী কোনদিকে যাচ্ছে দর্শক স্পষ্ট বুঝতে পারলেও বেকুব মেয়েটা বুঝতে পারেনি। অথবা বুঝেছে ঠিকই, ট্যাটনামি করতেই ভাব নিয়েছে যেন বুঝেনাই।
সে খ্যাক খ্যাক করে হেসে বলল, "thank you."
ছেলেটা যেন শপথ করেই এসেছে চোখের সামনে যাই দেখবে, তাই nice বলবে। টয়লেটে গেলেও বলতো "nice বদনা!" "nice কমোড!!" "nice টয়লেট পেপার!!!"
আল্লাহর শোকর, তাকে বাথরুমে যেতে হয়নি।
সে বিছানার উপর কম্বল দেখে বলল, "nice কম্বল!"
মেয়েটা কিছু বলার আগেই ছেলেটা বলল, "তোমার এখানে এত গরম কেন? গরম আমার একদম ভাল লাগেনা।"
বলেই সে নিজের টিশার্ট খুলে দূরে ছুড়ে ফেলল। একেবারে সালমান খান স্টাইলে।
কাহিনী কোন ইংলিশ বা হিন্দি সিরিয়ালের নয়। আমাদের দেশে নির্মিত একটি টেলিফিল্মের শুরুর গল্প। নির্মাতা আমার খুবই প্রিয় একজন ডিরেক্টর। তিনি এই জিনিস বানাবেন, সেটা বিশ্বাস হচ্ছিল না।
যতদূর মনে হয় আমরা এখনও বাসায় সাধারণত পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসাথে বাংলা অনুষ্ঠান দেখি।
যতদূর মনে হয় আমাদের সমাজ অনেক দূর এগিয়ে গেলেও এখনও বেশির ভাগ বাড়ির পরিবেশই কনজারভেটিভ।
ঠিক এই কারনেই আমরা স্পার্টাকাস, গেম অফ থ্রোনস সিরিয়ালগুলো মা বাবা ভাই বোন সবাই একসাথে মিলে দেখিনা। হুমায়ূন আহমেদের নাটক কিংবা ইত্যাদি দেখি।
সেদিন ঘরে মোটামুটি আন্দোলন করে একটা বাংলা নাটক ছেড়েছিলাম মা এবং বউকে নিয়ে দেখবো বলে।
নাটকের কাহিনী মোটামুটি এরকম।
নায়ক নায়িকাকে নিয়ে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে ফেলেছে। এখন নায়কের ফার্মেসি যেতে লজ্জা লাগছে, কাজেই তার বন্ধুকে পাঠিয়েছে।
বন্ধুরও লজ্জা বেশি। সে ইশারায় বোঝানোর চেষ্টা করছে যে সে কি চায়।
"কিছু লাগবে ভাইয়া?"
ফার্মেসির কম্পাউন্ডারের প্রশ্নে বন্ধু আঙ্গুলের ইশারায় নিজের একটি অঙ্গের দিকে ইঙ্গিত করলো।
"পেট ব্যথার ওষুধ?"
বন্ধু বিরক্ত হয়ে যায়।
"আপনার সমস্যাটা একটু ভাইঙ্গা বলেন, তাইলে আমি দেখি আপনেরে কি সাহায্য করতে পারি।"
"পরে কইতাছি" বলে বন্ধু উঠে চলে গেল।
কম্পাউন্ডার ফার্মেসি বন্ধ করে ফেরার পথে বন্ধু তাকে আটকায়।
"কানে ধর!"
"ক্যা ভাই?"
"একটা থাবর দিয়া দাঁত মুখ ফাডায়া দিমু। কানে ধরতে কইছি, কানে ধর।"
কম্পাউন্ডার কানে ধরে উঠবস করে।
"ভাব লইলি ক্যান দোকানে এত?"
"কই ভাব লইলাম ভাই?"
"তোরে যে আমি ইশারা দিলাম, তুই বুঝোস নাই?"
"ভাই আমিতো ডাক্তার না, আমি ক্যামনে আপনের ইশারা বুঝুম?"
"আমি একটা সুস্থ লোক, আমার জ্বর নাই, সর্দি নাই, কাশি নাই, মাথাব্যথা নাই - একটা সুস্থ্য লোক ফার্মেসিতে গেছে কি লাইগা তুই বুঝোস নাই?"
"সিভিটা কিনতে ভাই।"
বন্ধু কম্পাউন্ডারকে ধামাধাম মার দিতে দিতে বলে,
"সিভিটা কিনতে যায়?"
মার খেতে খেতে কম্পাউন্ডার বলে, "বুঝছি ভাই, বুঝছি। আর কইতে হইবো না।"
"বুঝছোস? এখন দোকান বন্ধ হইছে না? তাইলে তুই আমারে দিবি ক্যামনে?"
"দোকান লাগবো না ভাই। আমার লগেই থাকে।"
"লগে থাকে? এই জিনিস লগে লইয়া ঘুরো? এই করো তাইলে?"
এতটুকু দেখার পর আমার অত্যন্ত জরুরি কোন একটা কাজের কথা মনে পড়ে গেল। আমি উঠে চলে গেলাম।
একটু পরে বউও উঠে চলে এলো। তার কি জরুরি কাজ সেটা যদিও তখনও মনে পড়েনি, আপাতত উঠে আসাটাই তার কাছে জরুরী বলে মনে হলো।
বেচারী আম্মু পড়লো মহাবিপদে। তারপর চ্যানেল পরিবর্তন করে হিন্দি সিরিয়াল দর্শন।
বলাই বাহুল্য। এরপর আমি আর জীবনেও ঘরে "বাংলা নাটক দেখতে হবে" টাইপ আন্দোলনে যাইনি।
এক ভাবি সেদিন জানালেন, তাঁর শ্বশুর শ্বাশুড়ি বেড়াতে আসায় ঘরে খুব বাংলা চ্যানেল চালানো হয়েছে। কিন্তু ডায়লগ, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ইত্যাদিতে অস্বস্তি বোধ করে চ্যানেল পাল্টাতে পাল্টাতে শেষ পর্যন্ত গিয়ে খবরে গিয়ে থামতে হয়েছে। মোদ্দা কথা, যতদিন তাঁর শ্বশুর শ্বাশুড়ি ছিলেন, ততদিন তাঁরা বাংলা সংবাদ শুনেই বিনোদিত হয়েছেন।
বিদেশী চ্যানেল বন্ধ হওয়ায় দেশের মিডিয়া পাড়ায় আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। খুবই উত্তম পদক্ষেপ। সরকারকে সাধুবাদ।
কিন্তু টেলিভিশনে দর্শক ধরে রাখার দায়িত্ব কিন্তু সরকারের না। সেটা নির্মাতাদের। এবং এইসমস্ত বর্জ্য পদার্থ যতদিন তাঁহারা উৎপন্ন করিয়া যাইবেন, ততদিন পর্যন্ত যতই চ্যানেল বন্ধ করা হউক না কেন, কোনই লাভ হইবেনা। ইন্টারনেটের যুগে মানুষ প্রয়োজনে ডাউনলোড করে হলেও কোয়ালিটি অনুষ্ঠান দেখবে।
কিছুদিন আগে এরশাদ চাচুর একটা ছবি দেখেছিলাম। তিনি লাল গোলাপ নাকের সামনে ধরে লাজুক হাসি দিচ্ছেন।
চাচ্চু রোমান্টিক পাবলিক। তাঁর এইধরনের ছবি দেখে হাসাহাসির কিছু নেই। তবে ক্যাপশনটা পড়ে না হেসে পারলাম না।
"মার্কা যদি হয় তোমার লাল ঠোঁট, আমি একাই দিব ষোল কোটি ভোট।"
আমি ভেবেছিলাম কেউ হয়তো মজা করে বানিয়েছে। এইটা যে একটা গানের লিরিক, সেটা জানতাম না। সেদিন এর ভিডিও দেখে চক্ষু ছানাবড়া! ইহা কি বাংলাদেশে উৎপন্ন কোন মডেলকন্যা? এর সমস্যা কি? এত স্বল্প পোশাকে এভাবে মোচড়া মুচড়ি করছে কেন?
গায়কেরই বা হঠাৎ কি হয়ে গেল? সে কি বাংলার 'মধু মিয়া' ওরফে হানি সিং হতে চায়? সে পথেইতো এগুচ্ছে।
আমার কলকাতার বেশ কিছু বন্ধু বান্ধব আছে। একবার টেলিভিশন নিয়ে কথা হওয়ায় তারা বলছিল, "তোমাদের দেশের নাটক, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানতো খুবই সুন্দর হয়ে থাকে।"
গর্বে বুক ফুলে উঠলো। বললাম, "তাই? তোমরা দেখ?"
"এখনতো আর দেখা হয়না। তবে যখন কলকাতায় থাকতাম, তখন এন্টেনার সাহায্যে দেখা হতো।"
"কি কি দেখতে?"
"ঐ যে তোমাদের একটা নাটক ছিল না, কোথাও কেউ নেই? বা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানগুলো হতো? সেসব দেখতে আমাদের ভীষণ ভাল লাগতো, জানো?"
আমি মনে মনে বললাম, "সেই দিন আর নাইরে নাতি, ধামা ভইরা চিনি খাতি।"
আমাদের নির্মাতারা একটি সহজ সত্য বুঝতে চাননা। একটি নাটকে দর্শক ধরে রাখতে হলে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, অভিনয়, গ্ল্যামার সবকিছুর চাইতেও বেশি জরুরি একটি ভাল গল্প। সেটাকে সাইডে রেখে আমাদের নির্মাতারা জোর করে লোক হাসানোর চেষ্টা করেন। ফাজলামি কমেডিতে এখন কাজ হচ্ছে না। এখন অন্য জায়গায় সুরসুরি দেয়া শুরু হয়েছে। কাতুকুতু দিয়ে আর কতক্ষণই বা হাসা সম্ভব? একটা সময়ে হাপিয়েতো উঠতেই হয়।
সেই সাথে যোগ হয় বিজ্ঞাপন বিরতি। একবার শুরু হলে যা আর শেষই হতে চায়না। আমরা এখানে নাটক বানাই, আমরা জানি। আধা ঘন্টার নাটক হলে আমাদের আসলে আঠারো মিনিট থেকে বিশ মিনিটের টাইম ফ্রেম বেঁধে দেয়া হয়। একঘন্টার নাটক হলে চল্লিশ মিনিট। মানে পাঁচ ছয় মিনিট করে একেকটা বিজ্ঞাপন বিরতি। মানুষ বিজ্ঞাপন বিরতি শেষে কাহিনী কি করে মনে রাখবে?
এই ঈদে পাখি ড্রেস নিয়ে তোলপাড় লেগে গিয়েছিল। আমি দেশে থাকতে মনে আছে "কাশিষ ড্রেস" কেনার জন্য মেয়েরা পাগল হয়ে যেত। সবাই হিন্দি সিরিয়ালের নায়িকা।
একটা সময়ে এদের মায়েরাই শমী, বিপাশা, মিমি হতে চাইতো। বাবারা চোখে সানগ্লাস পড়ে বাকের ভাইয়ের মত চেইন ঘুরাতো। হিমু পাঞ্জাবিতো এখনও বাজারে পাওয়া যায়। একটি নাটকে ব্যবহার করা "মারো চিকা মারো" গানটি শুনতে শুনতেতো কান ঝালাপালা হয়ে গিয়েছিল।
এসব বলছি কারন আমাদের দেশীয় প্রোডাক্টকেও নতুন প্রজন্মের ক্রেজ বানানো সম্ভব। শুধু ঠিকঠাক মতন পরিবেশন করতে পারলেই হলো।
নিজের প্রোডাক্টের কোয়ালিটির দিকে নজর দিন, মানুষ আবার এন্টেনার সাহায্যে হলেও আপনার প্রোগ্রাম দেখবে। বিদেশী চ্যানেল নিষিদ্ধ করতে হবেনা।
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পরিস্থিতি কি জটিল?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯

বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি, অথচ বাইরে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ার গ্যাসের শব্দে চারদিক প্রকম্পিত! মিরপুরে আমার বাসার কাছেই মেট্রো রেলের নিচে আগুন দেওয়া হয়েছে; কিছুক্ষণের জন্য মেট্রো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৯



খাওয়া দাওয়া করাটা আজকাল বিরক্তকর লাগে।
কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকতে হলে- খেতে হবে। না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। প্রিয় খাবার গুলোও খেতে ইচ্ছা করে না। ভালো লাগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৬


এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন এই গুজবটি ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইসরায়েল ট্রাম্পকে রাজি করিয়েছে, যাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই আমেরিকা ইরানে পারমাণবিক বোমা হামলা করে। বিগত বছরগুলোতে ইসরাইল সারা বিশ্বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Haze দমনে সিঙ্গাপুরের কুটনৈতিক দক্ষতা

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩১

সিঙ্গাপুর সাম্প্রতিককালে স্মরনকালের ভয়াবহ Haze (ধোঁয়াশা ও বায়ুদূষণ) এর কবলে পড়ে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সারা শহর ঘন ধোয়ার আবরনে ঢেকে যায়। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার বেঁচে থাকাই তাদের ভয়ের কারণ॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৫১





শেখ হাসিনার বেঁচে থাকা নিয়ে আক্ষেপ কেন? একটি রাজনৈতিক সমীকরণের বিশ্লেষণ

সম্প্রতি তারেক রহমানের উপদেষ্টা জাহেদুর রহমানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আলোচনা শুরু হয়েছে - "শেখ হাসিনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×