somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তুমি কালো, তুমি কুৎসিত!

০১ লা জানুয়ারি, ২০১৫ রাত ৩:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দেশের রাস্তাঘাটে প্রায়ই দেখা যায় এক দুইজন ক্যানভাসারকে ঘিরে জটলা পেকে যায়। তাঁরা সেখানে স্বপ্নে প্রাপ্ত ঔষধ বিক্রি করেন।
অত্যন্ত নাটকীয় ভঙ্গিতে মাইকে ঘোষণা করা হয়, "এই মলম ব্যবহারে আপনার দাউদ, খাউজ, পাছড়া, একজিমাসহ যাবতীয় চর্মরোগ নিমিষেই দূর হবে। দাম মাত্র দশ টাকা। দশ টাকা। দশ টাকা! বিফলে মূল্য ফেরত!"
কেউ কেউ আবার ক্যানসার, এইডস এবং বিভিন্ন "জটিল রোগেরও" অব্যর্থ ওষুধ বিক্রি করে থাকেন। সেসবের ফর্মূলাও স্বপ্নে প্রাপ্ত!
এইসব 'স্বপ্নপ্রাপ্ত ঔষধ' নিয়ে কিছুই বলার নেই। যারা পকেটের পয়সা খরচ করে ঔষধ কিনেন, তাঁরা যদি টাকাটা কোন দুস্থ্য মানুষকে দান করতেন, তাহলেও পুণ্যের পাল্লা কিছুটা হলেও ভারী হত। এখানে খরচ করা আর পয়সা নর্দমায় ফেলে দেয়া একই ব্যপার।
একবার বাসে চড়ে ইউনিভার্সিটি যাবার সময়ে এক ক্যানভাসার টুথ পাউডার নিয়ে উঠলো। দাঁতের যেকোন দাগ দূরীকরণে এই পাউডার নাকি অব্যর্থ।
এক ভদ্রলোক পরীক্ষা করতেই দাঁতে পাউডার ঘষলেন। কুলি করে দেখেন তাঁর দাঁতে আসলেই কোন দাগ নেই! তিনি মুগ্ধ হয়ে কয়েক ফাইল পাউডার কিনে ফেললেন। মনে মনে হয়তো কল্পনাও করে ফেললেন তিনি ঝকঝকে দাঁত নিয়ে হাসতে হাসতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আর সুন্দরীরা তাঁর পেছনে দৌড়াচ্ছে।
বেচারা এইটা জানারও প্রয়োজন বোধ করলেন না, অতি শস্তা এই পাউডারে ব্যবহৃত কেমিক্যালগুলো কী হতে পারে যা বড় বড় ওষুধ কোম্পানিগুলো তাঁদের টুথপেস্টে ব্যবহার করেন না। তিনি চোখের সামনে ফল দেখেছেন, তাঁর মাথায় অন্য কিছু আসবেনা।
সবাই নাক উঁচিয়ে বলবেন, "শিক্ষার অভাব। শিক্ষিত মানুষেরা এইসব ক্যানভাসারের ফাঁদে পা দেয় না।"
না ভাই, দেয়। রাস্তার গরীব ক্যানভাসারের কাছ থেকে কিছু না কিনলেও মাল্টিন্যাশনাল ফেরিওয়ালার ফাঁদে কিন্তু এই শিক্ষিত মানুষেরাই সাধ করে ফাঁদে পা দেন।
ছোটবেলায় একটা বিজ্ঞাপন খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। এক বান্ধবী আরেক বান্ধবীকে বলছে, "রফিক ভাই এখন কোথায়? কী মিষ্টি আর লাজুক ছিলি তুই!"
ফ্ল্যাশব্যাকে দেখাচ্ছে মেয়েটি কলেজ জীবনে রফিক ভাইকে পছন্দ করতো, কিন্তু রফিক ভাই পাত্তা দিচ্ছে না। এই সময়ে মেয়েটি ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী ব্যবহার করা শুরু করলো। ছয় থেকে আট সপ্তাহেই তাঁর ত্বক হয়ে উঠলো ফর্সা, উজ্জ্বল।
বান্ধবী আবার বলছে, "রফিক ভাই জানলো না, সে কী হারালো।"
এইসময়ে রফিক ভাই পেছন থেকে এসে বললেন, "আমি কিন্তু কিছুই হারাইনি।"
বিজ্ঞাপনের সারমর্ম হচ্ছে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী মাখো, ত্বক ফর্সা উজ্জ্বল করে সুন্দর হয়ে যাও। মানে, ত্বক ফর্সা না হলে তুমি সুন্দর নও। মানে, তুমি কালো হলে তুমি কুৎসিত!
আমি কথার মধ্যে প্যাচ খুঁজছি না, সেটাই বলছি যা তাঁরা দেখিয়েছেন।
আরেকটা বিজ্ঞাপন ছিল আরও হাস্যকর।
ছেলেপক্ষ্য এসেছে মেয়ে দেখতে। পছন্দ হলে বিয়ে হবে আর কি।
কন্যাদর্শনে ছেলেপক্ষ্যের মুখভঙ্গি দেখে বোঝা গেল মেয়ে পছন্দ হয়নি।
এইসময়ে মেয়ের পাশে বসা এক নারী বললেন, "এক মিনিট।"
তারপর দেখালো মেয়েটি কসকো সাবান দিয়ে গোসল করছে, এবং তারপর যখন তাঁকে আবার সাজিয়ে গুজিয়ে ফিরিয়ে আনা হলো, ছেলেপক্ষ্য কোন কথা ছাড়াই রাজি হয়ে গেল।
কথা হচ্ছে, একটি বিয়ে যদি "ফর্সা ত্বক" বা "একটি বিশেষ সাবান দিয়ে গোসল করার" উপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে সেই সম্পর্কের গভীরতা কতটুকু হবে সেটাই বরং গভীর চিন্তার বিষয়।
আমি নিজে দেখেছি অতি অতি রূপসী(ফর্সা) নারীদের স্বামীদের অসুখী থাকতে। এবং অতি কালো নারীর সাথেও স্বামী সুখে সুখে জীবন কাটিয়ে দিতে।
সংসার কেবল দৈহিক সৌন্দর্য্যের উপর নির্ভর করে এগোয় না। পারষ্পরিক বোঝাপড়া, শ্রদ্ধাবোধ, সম্মান ইত্যাদি অনেক কিছুই সংসারে মূখ্য বিষয়। নারী পুরুষের আসল সৌন্দর্য্য সেখানেই।
আজকের ঐশ্বরিয়া রাইও কালকে 'বুড়ি' হয়ে যাবে। হতে বাধ্য। মুখের চামড়া ঝুলে যাবে, সেখানে শয়ে শয়ে ভাজ পড়বে - যতই মেকাপ ব্যবহার করুক না কেন, কোনই লাভ হবেনা। তখন কী তাঁর সংসার ভেঙ্গে যাওয়া উচিৎ?
এইবারে একটি সত্য উদাহরণ দেয়া যাক।
ছোটবেলায় শীতকালে দিনরাত ক্রিকেট খেলতে গিয়ে আমার ত্বক পুড়িয়ে ফেলেছিলাম। আম্মু বলল, "আয়নায় নিজের চেহারা দেখেছিস? ছায়া পড়লে দেখাই যায় না।"
আমার মাথায় ঢুকে গেল আমি "কালো" হয়ে গেছি। এখন আমিও আয়নায় দাঁড়ালে নিজেকে "কালো" দেখি। আপু বুদ্ধি দিল, ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী ব্যবহার করলে ত্বক ফর্সা হবে।
আমি ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী গালে ঘষতে শুরু করলাম। সেই সাথে রোদে হাঁটাচলাও বন্ধ করে দিলাম। ঝড়ে বক মরলো, ফকিরেরও কেরামতি বাড়লো। হারানো গাত্রবর্ণ খানিকটা ফিরে পেলাম। মাথায় ঢুকে গেল, ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী আসলেই ত্বক ফর্সাকারী ক্রিম!
বড় হতে হতে জানতে পারলাম বেকুব শুধু আমি একাই ছিলাম না, আরও লাখখানেক আহাম্মকতো ছিলই। কারণ এইবার বাজারে এলো "ফেয়ার অ্যান্ড হ্যান্ডসাম!" আমাদের তামিম ইকবালও সেটার বিজ্ঞাপন করে ফেললেন।
আমাদের ছোটবেলায় ধারণা ছিল সুন্দর না হলে গার্লফ্রেন্ড পাওয়া যাবেনা। বাস্তবেও তাই দেখতাম। ফর্সা ফর্সা ছেলেদের দিকেই সুন্দর সুন্দর মেয়েরা ঝুঁকে পড়ছে।
বড় হয়ে আবিষ্কার করলাম আসল সৌন্দর্য্যের রহস্য। এখন মাশাল্লাহ, দশ বছর হয়ে গেছে আমাদের সম্পর্কের। এবং এজন্য না আমাকে কোন ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী ঘষতে হয়েছে, না আমার বউকে কসকো অথবা লাক্স সাবান দিয়ে গোসল করতে হয়েছে।
কথা হচ্ছে, এই সমস্ত বিজ্ঞাপন অ্যামেরিকায় করে দেখান, মামলা করে একদম মাটিতে শুয়ায় দিবে। গায়ের চামড়ার রংয়ের ভিত্তিতে সৌন্দর্য নির্ধারণ করতে এসেছো - ফাইজলামির একটা সীমা আছে!
এইসব ঐ "তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতেই" চলে, যেখানে স্বপ্নলব্ধ ঔষধ ছাড়াও একই সাথে তাবিজ কবজ, বাটি চালান, চাল পড়া, জ্বীন সাধনা ইত্যাদিও চলে। কারণ সেখানকার আপামর জনসাধারণের মানসিকতাই এখনও ডেভেলপ করেনি। শুনতে খারাপ লাগলো? প্রতিবাদ করার আগে নিজেকে বদলে দেখান।
বারাক ওবামা যেকোন দৃষ্টিকোণ থেকেই একজন সুদর্শন পুরুষ। তিনি একজন আফ্রিকান অ্যামেরিকান। এখন কেউ যদি বলে, "ফর্সা হলে তাঁকে আরও ভাল লাগতো," তাহলে অতিসত্বর তাকে মানসিক চিকিৎসা করানো উচিৎ।
বিয়ন্সে নামের এক গায়িকাকে সবাই চিনেন। তিনিও সুন্দর। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি পুরুষ তাঁর সৌন্দর্য্যের দিওয়ানা। কিন্তু কোন বাংলাদেশিকে বিয়ে করতে হলে বেচারীকে ছয় থেকে আট সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে। ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী মেখে ফর্সা হতে সেই সময়টাই লাগে কিনা!
আমাদের ফারুকী ভাই তিশাকে দিয়ে একটা চমৎকার বিজ্ঞাপন করিয়েছিলেন। তিশা যদি বালতি বালতি মেকাপ মুখে না ঘসতো, তাহলে বিজ্ঞাপনটা অবশ্যই ক্লাসিক হতো। তিশার গাত্রবর্ণও শ্যামা, এবং অবশ্যই সে কোন অংশেই কম সুন্দরী নয়। তাহলে শুধু শুধু এত মেকাপের কী প্রয়োজন ছিল?
কথা হচ্ছে, ক্যানভাসাররা, বিজ্ঞাপনওয়ালারা, অনেক আলতু ফালতু কথা বলবেন। পণ্য বিক্রি করাটাই তাঁদের মূল লক্ষ্য। আপনারা তাঁদের ফাঁদে পা দিতে যাবেন কেন? কেন ভাবতে শুরু করেন যে ফর্সা মানুষ মানেই সুন্দর, এবং কালো মানুষ, সে যতই গুণবান/বতী হোক না কেন, কুৎসিত?
বেশ কিছুদিন আগে শুনেছিলাম এক ইন্ডিয়ান লোক ইউনিলিভারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। "এক্স" বডি স্প্রের বিজ্ঞাপনে দেখানো হয়েছে এক্স গায়ে স্প্রে করলেই ঝাঁকে ঝাঁকে মেয়ে এসে ঝাপিয়ে পড়ছে।
বেচারাও 'এক্স' স্প্রে করে রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছে, লেডিস কলেজের সামনে হাঁটাহাঁটি করেছে, এমনকি শেষ পর্যন্ত কোথাও কোন রেসপন্স না পেয়ে ঘরের বুয়ার সাথেও চেষ্টা করেছে। কেউ পাত্তাও দেয়নি। এখন সে "মূল্য ফেরত" চায়।
হাসি পাচ্ছে? কাজটা কী আপনিও করছেন না?
জিলেটের প্রোডাক্ট দিয়ে দাড়ি শেভ করে মনে মনে আশা রাখেন কোন সুন্দরী এসে গালে হাত বুলাবে।
ক্লোজ আপ দিয়ে দাঁত মেজে আশা রাখেন কোন সুন্দরী ললনা একদম নিঃশ্বাস দুরত্বে এসে গল্প করবে।
আর গালে ক্রিম ঘষে মনে করেন "রফিক ভাইয়ের" মন জয় করতে পারবেন!
কেন আপা, বলতে পারেন না, "যে রফিক ভাই আমার শ্যামা বর্ণকে খাটো করে দেখে, তেমন রফিক ভাইয়ের আমার দরকার নেই!"
একবার আওয়াজ তুলে দেখেন, হাজারো রফিক এসে আপনার পায়ের নিচে নিজেদের হৃদয় রেখে দিবে। ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্য্যের কাছে দৈহিক সৌন্দর্য্য অতি তুচ্ছ।
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=মনের হিংসা দূর করো রব=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:২৯


তবুও হিংসা এসে যায় কারণে অকারণে;
পারি না সামলাতে মন আমার - ইয়া রব,
নিতে পারি না সহজ করে কিছু
মনের কিনারে ভাঙ্গে হুড়মুড় স্বার্থের কলরব।

স্বচ্ছ মনের মানুষ কী করে হই,
সহজরে করে ফেলি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদি প্রবাসীর মৃত্যুদন্ড ও রটানো গুজব

লিখেছেন মঞ্জুর চৌধুরী, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:২২

আপনি যে দেশে যাবেন, সেই দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রাখাটা আপনার দায়িত্ব।
আমেরিকায় আপনি মদ কিনতে পারবেন। কিন্তু আপনার বয়স অবশ্যই ন্যূনতম ২১ হতে হবে। ইউরোপে হয়তো এই বয়সটা ১৮।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের জেন-জি ইন্ডিয়ার ককরো...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৫২

বাংলাদেশের জেন-জি ইন্ডিয়ার ককরোচ.....

বিপ্লবের লক্ষ্য কী- পরিবর্তন, নাকি প্রদর্শন?
বাংলাদেশে জেন-জি স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছে; কিন্তু প্রশ্ন- স্বৈরাচার গেছে, স্বৈরাচারী মানসিকতা কি গেছে?
যে তরুণ প্রজন্ম গণতন্ত্র, অধিকার ও মর্যাদার দাবিতে রাজপথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

রম্য: পর্নের সেকাল একাল!

লিখেছেন গেছো দাদা, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৬

গুরুত্বপূর্ণ একটা টপিক নিয়ে অনেকদিন ধরে লিখব লিখব করছিলাম। সময় হচ্ছিল না। আজ এই গভীর রাতে মনে হলো, লিখেই ফেলি। কেন মনে হলো, সে আলাপে আর না যাই। টপিক হলো:... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশভাগ এবং ধর্ম- অধর্ম

লিখেছেন রাজীব নুর, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৪



শীতের শেষে সমস্ত গাছের পাতা ঝরে পড়ে।
তখন পাতা ছাড়া গাছ একদম রুগ্ন মনে হয়। শুকনো পাতা দিয়ে মাটির পথ ঢেকে যায়। সেই পথ দিয়ে কোনো পথিক হেটে গেলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×