somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দেশকে নিয়ে তবুও আশাবাদি

২৩ শে জানুয়ারি, ২০১৫ রাত ১:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

খালি গায়ে ধুতি পড়া গোল গোল ফ্রেমওয়ালা চশমা পরিহিত এক বিদেশফেরত ব্যারিস্টার কোন এক জনসভায় ঘোষণা দিয়েছিলেন, "আপনারা ব্রিটিশদের তৈরী পোশাক পড়বেন না, ব্রিটিশ বস্তু ব্যবহার করবেন না, ওদের স্কুলে যাবেন না, ওদের চাকরিও করবেন না। আমি কথা দিচ্ছি, এমন করলে এক বছরের মধ্যে আমরা স্বাধীনতা পেয়ে যাব।"
গান্ধীজির এই পূর্ণ অসহযোগের পেছনের উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার। যেহেতু ব্রিটিশরা ভারতে এসেছিল মূলত ব্যবসা করতে, কাজেই ওদের যদি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়, তবে ওরা ভারতকে "লস প্রজেক্ট" হিসেবে ঘোষণা করবে, এবং "দোকান বন্ধ" করে দেশে ফিরে যাবে।
অতি সরল ব্যবসায়িক নীতি। ফ্লাস্ক হাতে চা ফেরি করে বেড়ানো পিচ্চি থেকে শুরু করে মাইক্রোসফ্টের সিইও পর্যন্ত সবাই একই নীতি মেনে চলে।
উপমহাদেশের প্রথম "হরতাল" বোধয় ব্রিটিশ আমলেই হয়। যদি আমি ভুল হয়ে থাকি, কেউ সঠিক তথ্য দিলে উপকৃত হবো।
ব্রিটিশদের পর আমরা পাকিস্তানের অধীনে চলে যাই।
দেখা গেল আমাদের "পেয়ারের মুসলিম ভাইয়েরাও" আমাদের লুটেপুটে খাচ্ছেন। আমাদের সম্পদ নিয়ে নিজেদের দেশকে সাজাচ্ছেন।
ইসলামাবাদের রাস্তার পাশে ফোয়ারা তৈরী হয়েছে, করাচির বন্দর আরও সমৃদ্ধ করা হয়েছে এবং রাওয়ালপিন্ডির একদল হিংস্র জানোয়ারের পাতে তুলে দেয়া হয়েছে বড় বড় মাংসের চাকা! সবই আমাদের পাট ও চা বিক্রির টাকায়।
অথচ সারাবছর অমানুষিক পরিশ্রম করা আমার দেশের কৃষকদের গায়ের জামা খুললেই শরীরের চামড়ার উপর দিয়ে পাজরার সবকটা হাড্ডি ধমনী শিরাসহ অনায়াসে গুণে ফেলা যেত! অনাহারে, অপুষ্টিতে মৃত্যু ছিল অতি সাধারণ ঘটনা।
সমস্যাটা বুঝতে পারছেন?
এর প্রতিবাদেই হরতাল হয়েছে। এবং সেটাও যৌক্তিক হরতাল ছিল।
দেশ শাসন করছে বিদেশী সরকার, এমনিতেও যারা দেশের মানুষের টাকা নিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করছে। হরতালে আর্থিক ক্ষতি হলে তাদেরই হবে এবং তারাও এই দেশকে "লস প্রজেক্ট" ঘোষণা করে দোকান বন্ধ করে নিজের দেশে ফিরে যাবে।
যদিও ওরা ভালয় ভালয় যাবার লোক ছিল না। লাথি দিয়ে তাড়াতে হয়েছে। তবে আজকের লেখার উদ্দেশ্য সেই প্রসঙ্গ না। আজকের প্রসঙ্গ ভিন্ন।
তো একাত্তুরের পর, এই দেশে আর কোন বিদেশী সরকার ক্ষমতায় বসেনি। স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি, বিপক্ষের শক্তি, স্বৈরাচারী - যেই রাজগদিতে বসুক না কেন, এইবার হরতালে যে ক্ষতি হয়েছে, সেটা সম্পূর্ণই আমার দেশের লোকেদেরই হয়েছে। একটা মুদির দোকান, একটা চায়ের রেস্টুরেন্ট, অথবা একজন রিকশাচালকের রিকশার চাকা একদিন না ঘুরলে যে ক্ষতি হয় সেটা শুধু তাঁরাই ভাল বুঝতে পারেন। ধানমন্ডি-গুলশান-বনানীর আলিশান ফ্ল্যাটে থাকা নেতারা কতটুকুই বা জানেন তাঁদের সম্পর্কে?
কেউ কী কখনও লক্ষ্য করেছেন, নির্দিষ্ট ভাড়া থেকে এক দুইটাকা কম দিলে একজন রিকশাওয়ালা কিভাবে ক্ষেপে উঠেন? আপনি লক্ষ্য করবেন কী? বাড়তি ভাড়া চাইলেই আপনি ঠাস করে একটা চড় দিয়ে বলেন, "চিনস আমারে? চিনস?"
একজন মুদির দোকানদারের সাথে কিছু নিয়ে দামদর করতে গেলেই বুঝতে পারবেন প্রতিটা পাই পয়সা তাঁদের কাছে সাত রাজার ধনের সমান। ভাবছেন ওরা খুব কঞ্জুস? জ্বি না। এই এক দুই টাকাতেই তাঁদের সংসার চালাতে হয়। আপনার কাছে হয়তো দুই চার টাকার তেমন কোন মূল্য নেই, তাঁদের কাছে এটাই হয়তো একবেলার খাবার!
বিশ্বাস হয়না? কখনও কাউকে চায়ের কাপে বনরুটি ডুবিয়ে খেতে দেখেননি? জ্বী, ওটাই তাঁদের ফাইভ ষ্টার রেস্টুরেন্টের ডেলিশাস লাঞ্চ!
এসি গাড়িতে চড়ে বেড়ানো নেতাদের চোখে এইসব পড়েনা।
তারা একদল চামচা দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে ভারী গলায় ঘোষণা দেন, "আগামীকাল....আগামীকাল...." "হরতাল! হরতাল!!"
এবং তাদের অন্ধ সমর্থকেরা ফালাফালি শুরু করে দেন। রাজপথ দখলে নেন যেন হরতাল কার্যকর হয়। সরকারী দলের সমর্থকেরাও পুলিশের সহায়তায় রাজপথে নামেন। জ্বিনা, জনগণের চিন্তায় নয়, সেই চিন্তা তাদের কখনই আসেনা। বিরোধীদলের কর্মসূচি যেন কার্যকর না হয়, সেটাই মূল উদ্দেশ্য।
ফলাফল হয় মারামারি, ভাংচুর, জ্বালাও পোড়াও! কিছু লাশও রাস্তায় পড়ে থাকে। পুরাই হিট শো!
দুই নেত্রীই ক্ষমতায় থাকার সময়ে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন বিরোধী দলে গেলে হরতাল করবেন না। দুই নেত্রীই তাঁদের কথা রাখেননি। আমি আশাও করিনি তাঁরা রাখবেন। তাই আশাভঙ্গ হয়নি।
নিঃসন্দেহে হরতাল গণতন্ত্রের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ার। কিন্তু যেই হাতিয়ারে দেশের ক্ষতি হয়, সেই হাতিয়ারের বারবার ব্যবহার কেন? অ্যামেরিকার চেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ আর কোথায় আছে? (আমি ফেয়ার ডেমোক্রেসির কথা বলছি, ভারত-বাংলাদেশে খুব একটা পার্থক্য নেই)
এই অ্যামেরিকায় আমি গত আট বছরে একদিনও হরতাল হতে দেখিনি।
আমার চাচা তিরিশ বছর আগে এসেছেন, তিনিও দেখেননি।
তার মানে কী এদের নেতাদের কোন সমস্যা আছে? সমস্যাতো অবশ্যই আছে। এরা ব্যক্তি স্বার্থের আগে দেশের স্বার্থকে নিয়ে চিন্তা করে। এবং এখানকার জনগণ যখন দেখে কোন একজন নেতা উল্টাপাল্টা কাজ করছেন, এরে প্রতিবাদে ফুঁসে উঠে। অন্ধ সমর্থন এদেরও আছে, তবে আমাদের দেশের আহাম্মকদের চেয়ে সিগনিফিক্যান্টলি কম!
আহাম্মক বলায় কেউ কী মাইন্ড করলেন নাকি আবার?
ভাই, যদি আপনি আপনার নেত্রীর প্রেমে অন্ধ হয়ে লাগাতার অবরোধকে সমর্থন করেন, পেট্রোল বোমায় পুড়িয়ে মানুষ মারাকে সমর্থন করেন, নিজের দলের লোকের শেয়ার বাজারে জোচ্চুরিকে জায়েজ করতে উল্টা বিনিয়োগকারীদের উপর দায় চাপান অথবা হাস্যকর নির্বাচনকে "অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে" রব তুলে মিষ্টি বিতরণ করেন - তবে আপনার অতিসত্বর আই.কিউ ডেভেলপমেন্ট ক্লাস শুরু করা উচিৎ। এতে যদি একটু হলেও বুদ্ধি খুলে!
পরিস্থিতি বুঝাতে "বন্দুক" একটা চমৎকার উদাহরণ হতে পারে।
নিঃসন্দেহে বন্দুক একটি কার্যকরী অস্ত্র। আপনি আত্মরক্ষায় এর ব্যবহার করছেন, নাকি কারও সম্পদ লুটতে - সেটার উপরই ভাল মন্দ নির্ভর করছে।
তেমনি আমাদের নেতানেত্রীদেরও হরতালের ব্যবহারে সাবধান হওয়া উচিৎ। যাচ্ছেতাই ব্যবহার করলে এর ক্ষতিই হয় বেশি।
তাঁরা দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তিত্ব। তাঁদের প্রতিটা সিদ্ধান্তের উপর আমাদের জীবনের গতিপ্রকৃতি নির্ভর করে। মানুষের ক্ষতি হয় এমন সিদ্ধান্ত তাঁরা কেন নেন?
সরকারের বিরোধিতা করতে হবে? ডাক হরতাল!
হরতালকে কার্যকর করতে হবে? পোড়াও গাড়ি!
অতি দ্রুত গাড়ি পুড়াতে হবে? পেট্রোল বোমা!
পেট্রোল বোমা নিক্ষেপকারীকে থামাতে হবে? চালাও বুলেট!
ভয়েস মেইল সার্ভিস বন্ধ করতে হবে? নিষিদ্ধ করো ভাইবার, Whatsapp! এর আগে বিডিআর বিদ্রোহের সময়ে ফাঁস হওয়া অডিও ক্লিপ রোধে নিষিদ্ধ হয়েছিল ইউটিউব। একবার নিষিদ্ধ হয়েছিল ফেসবুক!
এসব সিদ্ধান্তে আলটিমেট ক্ষতি কাদের হচ্ছে? বঙ্গদেশীয় জনতার! বিদেশী সরকারের নয় যে তারা "লস প্রজেক্ট" ঘোষণা করে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরে যাবেন।
এইসব সমাধানতো ক্লাস ওয়ান টুর বাচ্চার মাথা থেকেও বেরোয়। তাহলে আপনাদের এইসব মহাগুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয়ার যুক্তি কী?
আপনারা কী একটু মাথা খাটিয়ে ভাল কোন সমাধান বের করতে পারেন না?
কিছুদিন আগে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের একটা ভিডিও ক্লিপ দেখেছিলাম।
তিনি এক সভায় মতিয়া চৌধুরীর পাশে বসেই সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রাখেন, "আপনাদের মধ্যে কারা কারা বিদ্যমান দুই প্রধাণ রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করেন, অথবা সমর্থন করেন? দেখি হাত তোলেন!"
দেখা গেল পাঁচ ভাগ মানুষও হাত তোলেননি।
চিত্রনায়ক তখন বললেন, "আমি দেশের পরিস্থিতি নিয়ে খুবই হতাস ছিলাম, কিন্তু এখন আমি ভীষণ আশাবাদী! আমার বিশ্বাস ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নয়ন হবে।"
দেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম সফল নায়কের মতন আমিও আশাবাদী।
টিভি ইন্টারনেটের যুগে দেশের মানুষ ধীরে ধীরে শিক্ষিত হচ্ছে।
শিক্ষিত মানে "অ-তে ঐ অজগর আসছে তেড়ে, আ-তে আমটি আমি খাব পেড়ে" বা ফাঁস হওয়া প্রশ্নে এ প্লাস পাওয়া শিক্ষিতের কথা বলছি না। সুশিক্ষায় শিক্ষিত লোকেদের কথা বলছি। যারা ভাল মন্দের পার্থক্য বুঝতে পারেন। এখন চুপ করে থাকলেও একটা সময়ে যারা গলায় আওয়াজ তুলতে শুরু করবেন। একটা সময়ে দেশে পরিবর্তন আসবে। আসতেই হবে।
সেই শুভদিনের অপেক্ষায়.....
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মেধা নয়, রাজনৈতিক পরিচয়ই কি আমাদের রাষ্ট্রে যোগ্যতার মাপকাঠি?

লিখেছেন raselabe, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৬:২৯

বিসিএসসহ বিভিন্ন সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পরিচয় বা ভেরিফিকেশনের কারণে প্রার্থীদের বাদ পড়ার অভিযোগ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিতে নতুন কোনো ঘটনা নয়। রাজনৈতিক দলগুলো ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে নিজেদের ছাত্রসংগঠনের কার্যক্রম চালু... ...বাকিটুকু পড়ুন

তাবলিগে গিয়ে যা শিখলাম না

লিখেছেন মুনতাসির, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:৫৯

আমি যখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ি, তখন আমার কয়েকজন বন্ধু তাবলিগ করত। তাবলিগের প্রতি আমার কখনোই আগ্রহ ছিল না। তবে ওরা নিজেরা রান্না করত, আর আমি রান্না করতে পছন্দ করি। তাই একদিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”- শুনতে চমৎকার, জনপ্রিয়ও বটে। কিন্তু কথাটি কি ধর্মীয় বিশ্বাসের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ?
আমার কাছে তা নয়। এধরণের বাণী... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদি আরবে নারীসহ দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ: প্রতিমন্ত্রী, নাকি পাপেট?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০


গত বুধবার সৌদি আরবের শরিয়া আদালত একজন নারীসহ দুই বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের শিরশ্ছেদ কার্যকর করেছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যে বিবৃতিটি দিয়েছেন, সেটা পড়ে বোঝা গেল যে, পররাষ্ট্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি ব্লগ -৭ বিনীত, অবনত বৃক্ষ

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:০৯

পথে যেতে চোখে পড়লো নুয়ে পড়া বৃক্ষের শাখাগুলো। মনে হলো স্রষ্টার কাছে সে যেন নিবেদিত প্রার্থনায় অবনত। সব অহংকার, সব আত্মগরিমা, কৃতিত্বের ভার সে ধীরে ধীরে ঝরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×