somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মানুষ কেনার উপায়

০১ লা জুলাই, ২০১৬ রাত ২:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রোজা রাখার প্রাথমিক লক্ষ্য হচ্ছে আমরা যেন ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্তের যন্ত্রনা বুঝতে পারি।
রোজার অন্যান্য স্পিরিচুয়াল ব্যাপারগুলো না হয় আপাতত আলোচনার বাইরে থাকুক, আমরা এখন স্রেফ ক্ষুধা এবং তৃষ্ণা নিয়ে আলোচনা করব।
তা গ্রীষ্মকালে রোজা রাখা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কর্মগুলোর একটা হয়ে যায়। এমনিতেই গরম, তার উপর পানি খেতে না পারায় ব্যাপারটা আরও কঠিন হয়ে উঠে।
কথা হচ্ছে এর মধ্যেও অনেকে "ইসলামের দোষ" খুঁজে বের করেন।
"ইউরোপে বাইশ ঘন্টা রোজা রাখতে হয় - এইটা কেমন নিয়ম? ইসলাম ভুয়া।"
"পৃথিবীর কোন দেশে দিনের চব্বিশ ঘন্টাই সূর্য ডুবে না, তাহলে কী চব্বিশ ঘন্টা না খেয়ে থাকবো?"
"বিজ্ঞানের যুগে সূর্য দেখে রোজা রাখার নিয়ম ভয়েড হওয়া উচিৎ।"
"একদেশে এত লম্বা রোজা, আরেক দেশে এত কম - এইটা কেমন নিয়ম?"
কিছু বলার আগে একটা উদাহরণ দিয়ে দেই - বুঝতে সুবিধা হবে।
একবার এক লোক প্রশ্ন করেছিলেন, "যদি আমরা সেহরিতে কিছু না খেতে পারি, এবং ইফতারের জন্যও কিছু না খেতে পাই - এবং এইভাবেই আমাদের কয়েকদিন চলে যায় - তাহলে কী আমাদের রোজা হবে?"
জ্বি, আফ্রিকার এক সোমালিয়ান ভাই প্রশ্নটা করেছিলেন। দুর্ভিক্ষ পীড়িত একটি দেশ। তাঁর দেশে অনিশ্চিত সময়ের জন্য তাঁরা খেতে পান না - তাঁদের অভুক্তি ঘড়ির ঘন্টা মেনে চলে না। একটি মুমূর্ষু শিশুর সামনে অপেক্ষমান শকুনের ছবিটার কথা মনে পরে? সেটা এই অঞ্চলের প্রতিদিনের দৃশ্য।
এইবার তাকাই নিজের দেশের দিকে।
কিছুদিন আগে একটা টিভি প্রতিবেদন দেখেছিলাম, এক বস্তিবাসী বৃদ্ধ-বৃদ্ধা মুড়ি এবং পানি খেয়ে ইফতার করছেন। সেহেরীতেও একই মেনু। দিনের পর দিন একই খাবার।
আপনারা জানেন বাংলাদেশতো বাংলাদেশ - খোদ আমেরিকাতেই কত শিশু একবেলা না খেয়ে দিন কাটায়? নর্থ টেক্সাস ফুড ব্যাংকের উপর একটা প্রজেক্ট করার সময়ে এ তথ্য দেখে চোখ কপালে উঠে গিয়েছিল।
এখন বলেন দেখি - পৃথিবীতে মুসলিম সংখ্যা কত?
এক থেকে দেড় বিলিয়ন।
একের পরে নয়টা শূন্য যোগ হলে গিয়ে এক বিলিয়ন হয়। নেহায়েতই কম সংখ্যা না। এই এক বিলিয়ন মানুষের অর্ধেক বা সিঁকি ভাগও যদি রোজা রেখে ক্ষুধার্তের কষ্ট বুঝতো, তাহলে এরা কিন্তু ইচ্ছা করলেই পৃথিবী থেকে ক্ষুধার্তের কষ্ট দূর করে দিতে পারতো। কেন পারে না জানেন? কারন আমরা সবাই ক্ষুধার্তের কষ্ট অনুভব না করে "কয় ঘন্টা" রোজা রাখতে হচ্ছে সেটা নিয়েই ইসলামের ফাঁক খুঁজে বেড়াই। যে কারনে রমজান মাসে আমরা খাদ্য অপচয় করি সবচেয়ে বেশি। খেতে পারবো দুইটা পেঁয়াজু, ভেজে ফেলি নয়টা। বাকি সাতটা কই যায়? ডাস্টবিনে। লাঞ্চ/ডিনার বাফে/বুফে হলেতো কথাই নাই। জন্মেও খাবার দেখিনাই এমনভাবে প্লেট উচা করে নিব। তারপরে অর্ধেকেরও বেশি খাবার ফেলে দিব।
"পয়সা দিয়ে খাচ্ছি না? কম নিব কেন?" - মানসিকতা।
অথচ আমাকে রেস্টুরেন্টে টেনে আনা রিক্সাওয়ালাই জানেনা আজকে রাতে তাঁর শিশুদের পাতে ভাত জুটবে কিনা।
কিংবা হয়তো আপনার খুবই প্রিয় কোন বন্ধু, কোন ঘনিষ্ট স্বজন, হয়তো সকালে নাস্তা খেতে পারেনা, এবং রাতেও অভুক্ত অবস্থায় ঘুমাতে যায় - সেটা কিন্তু আপনার মাথায় আসেনা।
একবার এক বিয়ে বাড়িতে দেখেছিলাম এক আংকেল রোস্টের পুরোটা না খেয়ে অর্ধেকই ফেলে দিচ্ছেন। পরে তিনি পাশের জনকে বলছিলেন, "এই খাবারগুলি রাতের বেলা ভিখিরিদের দেয়া হয়। শুধু শুধু হাড্ডি চিবুবে কেন? একটু মাংসও খাক।"
জ্বি, আমাদের দেশে মানুষের উচ্ছিষ্টগুলো কুকুর বেড়ালের পাশাপাশি ভিখিরিদেরও দেয়া হয়। বিদেশে কুকুর বেড়ালও এরচেয়ে ভাল খাদ্য খেয়ে অভ্যস্ত।
মানুষকে কেনার একটা সহজ উপায় বলে দেই।
কোন এক কঠিন গ্রীষ্মের দুপুরে আপনার রিক্সাকে কোন এক সুপার শপের পাশে দাঁড় করেন। তারপর দোকান থেকে এক বোতল ঠান্ডা কোক বা আইসক্রিম এনে বৃদ্ধ রিক্সাওয়ালাকে দিয়ে বলুন "চাচা, এইটা খেয়ে নিন - আরাম পাবেন।"
ট্রাস্ট মি, এই লোকটা আপনার কেনা গোলাম হয়ে যাবে। মাত্র দশ টাকায় একটা মানুষকে আপনি কিনে ফেলতে পারেন। মানুষের ভালবাসা কেনা এতই সস্তা।
অনেকেই বলেন, খাদ্য অপচয়ে সৌদি আরব এক নম্বর। জ্বি না ব্রাদার, এখানেও আপনারা ভুল।
একটু ইন্টারনেট ঘাটুন, দেখবেন যে খাদ্য অপচয়ে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছি আমরা - মানে মার্কিন মুলুকের লোকেরা। দ্বিতীয়তে আছে ইউরোপ। তথ্য সূত্র: ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরাম। বাঁশের কেল্লা নয়।
আমেরিকায় "প্রতিদিন" যত খাবার ফেলা হয়, সেটা দিয়ে আফ্রিকার দুর্ভিক্ষ পীড়িত দেশগুলোকে "মাসের পর মাস" খাওয়ানো সম্ভব। এইটাও গবেষণা লব্ধ পরিসংখ্যান। এবং তাও আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরই ছাত্রদের গবেষণা। আমার বানানো কোন কথা নয়।
ইউরোপেও অবস্থা একই।
ইউরোপে বিশ ঘন্টা রোজার রাখার ফল তাহলে কী হলো? আবারও বলি, কেউ রোজার "ঘন্টা" হিসাব বাদ দিয়ে ক্ষুধার্তের যন্ত্রনা বুঝার চেষ্টা করুক, তাহলেই আর এই সমস্যা থাকবেনা।
সাইড নোট হিসেবে বলে ফেলি, "কিয়াস" বলে একটা ব্যাপার আছে ইসলামে। দিনের পরিধি যদি হয় বাইশ ঘন্টা, তাহলে আমি ইফতারই বা করবো কখন, সেহেরিই বা খাব কখন, মাঝে এশা-তারাবীহ-তাহাজ্জুদই বা পড়বো কখন? কাজেই অবশ্যই আমাকে আশেপাশের কোন দেশের মোটামুটি গ্রহণযোগ্য টাইম জোন ফলো করতে হবে। এইটাই সাধারণ নিয়ম। এতে "ইসলাম ভুয়া" রব তুলার কিছু নাই।
আরেকটা সাইড নোট; কেউ যদি বলে চব্বিশ ঘন্টায় মাত্র একবার খেয়ে কেউ কিভাবে রোজা রাখে? উদাহরণ আমি নিজে। স্টুডেন্ট অবস্থায় যখন এদেশে এসেছিলাম, তখন থেকেই অভ্যাস হয়ে গেছে। ইফতারের সময়েই ভরপেট ডিনার সেরে ফেলি। সেহরির সময়ে আমার কোন ক্ষুধা পায়না। খুব বেশি হলে এক গ্লাস পানি খাই। বেশির ভাগ সময়ে তাও খাইনা। যদিও সেহরি খাওয়ার স্পষ্ট নির্দেশ আছে। না খেয়ে কোন কাজের কাজ করছি না।
যাই হোক, এইবার আমার অন্যতম প্রিয় সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উদাহরণ দেই। আপনারা কী জানেন যে তিনি কখনও কিছু খেলে একদম চেটে পুটে প্লেট সাফ করে খেতেন? জ্বি, একদম অনাহারীর মতন একটা দানাও নষ্ট করতেন না। তিনি তাঁর এই অভ্যাস নিয়েই একবার বলেছিলেন, "লোকে হাসাহাসি করলে করুক, কিন্তু আমি আমার জীবনে ক্ষুধার্তের যন্ত্রনা দেখেছি।"
তিনি তাঁর দীর্ঘ জীবনে দেখা এক দুর্ভিক্ষের স্মৃতিচারণ করছিলেন।
কথা হচ্ছে, আমরা নিজেরা বছরে নিয়মিত টানা তিরিশ দিনের জন্য মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্য এই কষ্টের মধ্য দিয়ে যাই। আমাদের কয়জনের এমন উপলব্ধি হয়?
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জুলাই, ২০১৬ রাত ২:৫১
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

যারা জানেন না তাদের জন্য! কফি এনিমা (Coffee Enema)!

লিখেছেন সাহাদাত উদরাজী, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৩

কফি এনিমা হলো মলদ্বার দিয়ে কোলন বা বৃহদন্ত্রে তরল কফি প্রবেশ করিয়ে পেট পরিষ্কার করার একটি বিকল্প পদ্ধতি। নিচে এটি শরীরে দেওয়ার সাধারণ প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে উল্লেখ করা হলোঃ

প্রয়োজনীয় উপকরণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মিলাদুন্নবী: ভালোবাসার নবী, মানবতার শ্রেষ্ঠ আদর্শ

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৮


মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মদিন বা মিলাদুন্নবী শুধু একটি ঐতিহাসিক স্মরণদিন নয়; এটি মানবতার জন্য এক মহান আদর্শের কথা স্মরণ করার উপলক্ষ। তাঁর আগমন ছিল এমন এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ একটি পরিচ্ছন্ন শৌচাগার

লিখেছেন রাজসোহান, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৮



বাড়িটা দেখতে বাড়ির মতো না, যেনো একটা ঘোষণা। দ্যাখো, আমি কে।

গেটে দুইটা সিংহ, পাথরের, মুখ হাঁ করা; সিংহ দুইটা কী পাহারা দিচ্ছে তারা নিজেরাও জানে না। ভিতরে উঠান... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাদ্রাসায় শিশুর নিরাপত্তা কোথায়?

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫০

মাদ্রাসায় শিশুর নিরাপত্তা কোথায়?
====================
একটি ১১ বছরের শিশু যার বয়স খেলাধুলা, পড়াশোনা আর স্বপ্ন দেখার। সেই শিশুকে যদি যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয় এবং তার গর্ভে একটি সন্তান জন্ম নেয়, তাহলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মক্তব চালু করলে শিশুরা ফিরে আসবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৪২


ববি হাজ্জাজ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। মুসা বিন শমসেরের ছেলে। মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে পুরো দেশ চষে বেড়াচ্ছেন। নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন, নতুন নতুন আইডিয়া দিচ্ছেন। মনে হয়,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×