somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রহসন সংগীত

০৫ ই ডিসেম্বর, ২০১৬ রাত ১০:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাসা বাড়িতে ঠিকা ঝি খাটা শেফালী বেগমের বিরুদ্ধে কারও কোন অভিযোগ নেই। তাঁর মতন সাংসারিক কাজে দক্ষ ঝি পাওয়া এই যুগে অসম্ভব একটি ব্যপার। সব কাজ অত্যন্ত নিখুঁত। সেই সাথে আরেকটি গুণ তাঁর আছে। অসম্ভব রকমের সৎ! এই মহিলাকে দিয়ে বাজার করালে বাজার থেকে ফিরে সে প্রতিটা পাই পয়সা মালিককে বুঝিয়ে দেয়। একটা টাকাও এদিক সেদিক হয়না। তবু কেউ তাঁকে বাড়িতে পাকাপাকি চাকরি দিতে সাহস পায় না। কারন মাঝে মাঝেই তাঁর মাথা এলোমেলো হয়ে যায়। পাগলকে বাড়িতে চাকরি দিবে কোন পাগলে?
তাঁর মাথা এমনিতে সুস্থ্য স্বাভাবিক। শুধু তাঁকে একটা গান শোনালেই তিনি ভীষণ খেপে উঠেন। একেবারে পাগলিনীর মতন তেড়েফুড়ে মারতে আসেন। ধমকের সাথে মুখ দিয়ে থুথু বেরোয়। আর ছুটে গালাগালি। এই দেখে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা খুব মজা পায়। হাতে তালি বাজাতে বাজাতে তাঁর সামনেই গানটা বারবার গায়।
বড়রা বাঁধা দেন না। নাগরিক শিশুদের এমনিতেই বিনোদনের বড্ড অভাব। একটা পাগল ক্ষেপিয়ে যদি মজা নিতে চায়, ক্ষতি কী?
গানটা শুনলেই শেফালী বেগম ক্ষেপে গিয়ে বলেন, "সব মিছা কথা! সব মিছা কথা! গান বন্ধ কর তোরা বান্দির পুতেরা! গান বন্ধ কর!"
বাচ্চারা দ্বিগুন উৎসাহে গেয়ে উঠে, "সব কটা জানালা খুলে দাও না!"
অবশ্যই গানের প্রতিটা কথা মিথ্যা। যে যায়, সে কখনই ফিরে আসেনা।
তাঁর স্বামীকে যখন ওরা বাস থেকে নামিয়ে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল, মানুষটা তখন কেবল একবার পিছন ফিরে বলতে পেরেছিলেন, "যাই!"
ঠিক যেমনটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ও দেশসেরা নাট্যকার মুনির চৌধুরী ছোট ভাইয়ের দিকে ফিরে শেষবারের মতন বলেছিলেন, "যাইরে ভাই!"
ওরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল শহীদুল্লাহ কায়সারকে। মিরপুরের বধ্যভূমিতে একের পর এক লাশ উল্টে উল্টেও যার স্ত্রী স্বামীর লাশ শনাক্ত করতে পারেননি।
শেফালী বেগমও গিয়েছিলেন সেসব জায়গায়। যেখানেই খবর পেয়েছেন লাশের স্তূপ আবিষ্কার হয়েছে, সেখানেই তিনি ছুটে গিয়েছেন। নিজ হাতে পঁচে যাওয়া, গলে যাওয়া লাশ হাতড়ে হাতড়ে দেখেছেন।
সেলিনা পারভিনকে তাঁর আত্মীয়রা পায়ের মোজা দেখে সনাক্ত করতে পেরেছিল। মানুষটার গলায় সদা ঝুলন্ত তাবিজ দেখে শেফালী বেগমের সনাক্ত করতে কোন অসুবিধা হবার কথা না। ন্যাংটা বাবার তাবিজ! সবধরণের অনিষ্টতা থেকে রক্ষা করার অব্যর্থ কবজ! তাঁর স্বামীকে তিনি খুঁজে পাননি।
তাঁর ছেলেকেও না।
শেফালী বেগমের ছেলে আলমগীর বাড়ি থেকে পালিয়ে যুদ্ধে গিয়েছিল। যেভাবে আরও হাজার খানেক ছেলে পালিয়েছিল। যুদ্ধের মাঝে একদিনের জন্য মায়ের সাথে দেখা করতে সেও এসেছিল। বলেছিল দলে দলে মুক্তিযোদ্ধা ঢাকা শহরে ঢুকে পড়ছে। সারা দেশ মোটামুটি স্বাধীন হয়ে গেছে, এখন কেবল ঢাকা শহরটা বাকি। তিনি বলেছিলেন তার আর যুদ্ধে যাবার দরকার নেই। বাকি কাজটা অন্যরাই করুক।
ছেলে হেসে বলেছিল, আর মাত্র কয়েকদিন! তারপরেই সে আবার মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমাবে। আবার ভাত খাওয়া শেষে হাত ধুয়ে মায়ের শাড়ির আঁচলে হাত মুছবে।
কই! এর তিনদিন পরেইতো দেশ স্বাধীন হয়েছিল। দলে দলে মানুষ রাস্তায় মিছিল বের করেছিল। ফাঁকা গুলি ফুটিয়েছিল। মিলিটারির গাড়ি যেতে দেখে থুথু ছিটিয়েছিল। ফিরে এসেছিল আসাদ, আজম, বাচ্চু। কমলাপুর বস্তির রিকশাওয়ালা ফরিদের ছেলে মুরাদ, সেও স্বগর্বে শত্রুহনন শেষে ফিরে এসেছিল। কিন্তু তাঁর আলমতো ফিরে এলো না।
বাড়ির দরজার কড়া নড়তেই তিনি ছুটে যেতেন আলম এসেছে ভেবে।
রাতের বাতাসে গাছের পাতা নড়ে উঠলে তিনি খুশি খুশি গলায় জানতে চাইতেন, "বাবা ফিরা আইয়েছিস? এত দেরী করলি তুই?"
পয়তাল্লিশবার বিজয় দিবস ফিরে এলো, আলম তবু ফিরল না।
তাঁর বাবাও না!
আর সবাই কিনা প্রতিবার একই গান গায়,
".....ওরা আসবে, চুপি চুপি,
যারা এই দেশটাকে ভালবেসে দিয়ে গেছে প্রাণ!....."
তাই গানটি শুনলেই শেফালী বেগমের মাথা খারাপ হয়ে যায়। ধমক দিয়ে মিথ্যা গান বন্ধ করতে বলেন।
ধমকের সাথে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে থুথু। আর ছোটে গালাগাল।
বাচ্চারা এতে খুব মজা পায়। তারা হাততালি বাজাতে বাজাতে গানটা গায়।
(পুনঃপ্রকাশ )
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০১৬ রাত ১০:৩৩
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

”আমার রাজনীতির রূপরেখা” -- জিয়াউর রহমান

লিখেছেন প্রামানিক, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০০


শহীদুল ইসলাম প্রামানিক
আমি তখন দৈনিক দেশ পত্রিকায় চাকরি করি। এটা আমার দ্বিতীয় চাকরি। প্রথম চাকরি নিয়েছিলাম ব্রিটিশ আমলের প্রকাশিত দৈনিক আজাদ পত্রিকায়। আজাদ পত্রিকাটি ব্রিটিশ আমলে মুসলমানের পক্ষের একমাত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

শহীদ জিয়া ২৭ মার্চের ভাষণে 'জয় বাংলা' বলেছিলেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১১





সূত্রঃ আমার রাজনীতির রূপরেখা
লেখকঃ জিয়াউর রহমান
পৃষ্ঠাঃ ১৭৭

...বাকিটুকু পড়ুন

ওরা জিডিপি আর সেমিকন্ডাক্টরে ব্যস্ত , আমরা ব্যস্ত গোরুর জিয়াফত নিয়ে ....।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩৫


গতকাল মামার ফোন এল দুবাই থেকে, রাতের বেলা। বললেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই করে জিয়াফত খাওয়ার খবর এখান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, ব্যাপার কী? আমি বললাম, মামা, ওরা গরুর মাংস... ...বাকিটুকু পড়ুন

মীর জাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঐতিহাসিক চুক্তি! যে চুক্তির জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়েছিল!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪২


আমরা পলাশী যুদ্ধের কথা জানি। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল মীরজাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার লর্ড ক্লাইভের এর সাথে সেটা সম্পর্কে খুব কমই... ...বাকিটুকু পড়ুন

যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”- শুনতে চমৎকার, জনপ্রিয়ও বটে। কিন্তু কথাটি কি ধর্মীয় বিশ্বাসের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ?
আমার কাছে তা নয়। এধরণের বাণী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×