সিনেমার নায়িকাদের, সেলিব্রেটি গায়িকাদের বা বেপর্দা স্মার্ট জেনানাদের অনেকেই এক কথায় পতিতা বলে দেয়। একটু মতের এদিক ওদিক হলো - অমনি শুরু হয়ে গেল, সে বেশ্যা, সে মাগি, সে খানকি, সে অমুক তমুক সমুক।
মানসিক বিকারগ্রস্তদের কথাতো বাদই দিলাম - দাড়িওয়ালা মুসলিম, কপালে নামাজের দাগ পরে গেছে, "গভীর" ইসলামিক জ্ঞান ধারণ করে এমন দাবিকারী যখন স্পষ্টাক্ষরে গালাগালি শব্দগুলো ব্যবহার করে - তখন তাঁর ইসলামিক জ্ঞানের গভীরতা সম্পর্কে আমার মতন নাদানের মনে প্রশ্ন উঠে।
ইসলামিক জ্ঞানের মহাসাগর না, সামান্য কুয়া পরিমান জ্ঞান যার আছে, সেও নিজের মুখ সামলে কথা বলে। আমাদের আল্লাহ হজরত মুসাকে (আঃ) (ইসলামী ধারায় - সেরা তিন নবীর একজন) ফেরাউনের (ইসলামী ধারায় - সর্বকালের সর্বনিকৃষ্ট মানব) দরবারে গিয়ে সর্বোচ্চ ভাল ব্যবহারের মাধ্যমে তাঁর বাণী প্রচার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
আমাদের রাসূল (সঃ) নিজের গায়ে মরা উটের পঁচে যাওয়া, গলে যাওয়া নাড়িভুড়ি ঢেলে দেয়া লোকটিকে, কিংবা তাঁর গায়ে শারীরিকভাবে আঘাত করা লোকদেরও "গালাগালি" করেননি।
কুরআনের ছয় হাজার ছয়শো ছেষট্টিটি আয়াত এবং সিয়াহ সিত্তার ছয়টি বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থের একটি হাদিসেও একটি গালি খুঁজে পাওয়া যায়না। সেখানে অতি ইসলামী চেতনায় চেতিত হয়ে লোকজন হরহামেশাই বিপরীত লিঙ্গকে "পতিতা শব্দের প্রতিশব্দ কে কতবেশি জানে" - সেটার দৃষ্টান্ত দেয়। সমলিঙ্গ হলেতো কথাই নাই।
"অমুকের পুৎ!" "তমুকের পোলা!"
এইবার একটা ঘটনা বলি।
আমাদের নবী (সঃ) তাঁর খুৎবা চলাকালীন সময়ে পঙ্গু লোকজনদের অগ্রাধিকার দিতেন। ওদের জন্য সামনের সারির আসন রিজার্ভড থাকতো। চমকে গেছেন? ইউরোপ-অ্যামেরিকায় যেমনটা "হ্যান্ডিক্যাপড পার্কিং" রিজার্ভড থাকে - সেরকম মনে হচ্ছে? জ্বি। মুহাম্মদ (সঃ) হুদাই সর্বকালের সর্বসাধারণের জন্য দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ নন। অমুক তমুকের মুখে কিছু শুনে আধা বুঝে বেশিরভাগই না বুঝে বোকার মতন তাঁকে নিয়ে সমালোচনার আগে তাই তাঁর সম্পর্কে পড়তে হবে, অথেন্টিক সোর্স থেকে জানতে হবে।
তো যাই হোক, একজন পঙ্গু সাহাবী সবসময়ে এই সম্মানে সম্মানিত থাকতেন যে তাঁর স্থান রাসূলুল্লাহর (সঃ) ঠিক পাশেই থাকতো।
তো একদিন নবীজি (সঃ) খুৎবা (ভাষণ) দিচ্ছেন, এবং সেই পঙ্গু সাহাবীটি আসতে দেরি করে ফেলেছিলেন। এসে দেখেন নবীকে (সঃ) ঘিরে লোকজন তাঁর কথা শুনছেন।
তিনি নিজের আসনে যাওয়ার জন্য অন্যদের ঠেলে ধাক্কিয়ে এগুতে লাগলেন।
তো এক সাহাবীর কাছে তিনি বেশ রুক্ষ স্বরে বললেন, "তুমি জায়গা দিচ্ছ না কেন? সরো এখান থেকে।"
কণ্ঠস্বরের রুক্ষতা দেখে সেই সাহাবীও চটে গেলেন। "দিমু না, কী করবা?"
তখন পঙ্গু সাহাবী বললেন, "তুমি কে?"
আরবদের সংস্কৃতি হচ্ছে, তাঁরা নিজের নামের মধ্যে নিজের বাপ দাদার নামও ঢুকিয়ে দেয়। অথবা পুত্র কন্যায় নাম। যেমন, আমার নাম কেউ জিজ্ঞেস করলে আমি যদি উত্তর দেই "আশরাফের ছেলে" অথবা "রিসালাতের বাবা" তাহলেই চলে যাবে। মূল নাম না বললেও চলবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যেমন এখন আরবে "আবু ইভানকা আল আম্রিকি" নামে ডাকে।
সাহাবীও তাঁর নাম বললেন। "অমুকের পুত্র।"
পঙ্গু সাহাবী বললেন, "আচ্ছা.....অমুকের পুত্র? তা তুমিতো অমুকেরও (সাহাবীর মায়ের নাম নিয়ে) পুত্র, তাই না?"
সাহাবীটির বাবা মা মুসলিম ছিলেন না। মায়ের অতীতে এমন কোন রেকর্ড ছিল, যাকে সভ্য সমাজ সুনজরে দেখে না। যেমন সানি লিওনির বাচ্চাকে এই একবিংশ শতাব্দীর সমাজই একদিন বলবে, "তুমি তাইলে সানি লিওনির পুত্র? আহা......!"
(ভাব দিয়েই বুঝিয়ে দিবে তোমার মায়ের অনেক "ফিল্মের" আমি দর্শক।)
তো যাই হোক, পঙ্গু সাহাবী সেই বসে থাকা সাহাবীকে এক হাত দেখে নিলেন। মায়ের নাম নিয়ে ভরা মজলিশে মজা নিলেন।
বেচারা সাহাবী, অপমানে একদম বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন।
রাসূল (সাঃ) তাঁর খুৎবা থামিয়ে দিলেন। পঙ্গু সাহাবীকে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার চারপাশে একটু নজর বুলাও, বলো আমাকে তুমি কী দেখছো?"
পঙ্গু সাহাবী চারপাশে মাথা ঘুরিয়ে বললেন, "আমি দেখছি আরব মানুষ, কালো মানুষ, সাদা মানুষ, বিভিন্ন গোত্রের মানুষ।"
রাসূল (সাঃ) বললেন, "তোমাদের মধ্যে তাঁরাই শ্রেষ্ঠ যার মধ্যে তাকওয়া (আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও ভীতি) আছে।"
মানে হচ্ছে, কারও বাপ দাদা রাজা মহারাজা, অথবা কারও বাপ দাদা ফকির মিসকিন - কেউ নিজে দেশের প্রধানমন্ত্রী, আবার কেউ নিজে এলাকার মেথর - আল্লাহর দৃষ্টিতে ম্যাটার করেনা।
কাউকে অপমান করার আগে যে চিন্তা করবে সে নিজে কী, তাঁকে আল্লাহর কাছে এজন্য জবাবদিহি করতে হবে - আল্লাহর দৃষ্টিতে সেই শ্রেষ্ঠ।
হাদিসটা খুব সহজ এবং সুন্দর।
এক পতিতা রমণীর সামান্য এক তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি খাওয়ানোর ফলে বেহেস্ত প্রাপ্তি, এবং এক চরম ধার্মিকের একটি বিড়ালকে লাথি মারার শাস্তি হিসেবে জাহান্নাম দর্শনের ঘটনাগুলো আমরা ইসলামিক ট্র্যাডিশনেই পাই। যেখানে সেই পতিতাকে আল্লাহ এক কুকুরকে পানি খাওয়ানোর জন্য মাফ করে দিতে পারেন, সেখানে তাঁর কর্ম নিয়ে প্রশ্ন তোলার ধৃষ্টতা মানুষ দেখায় কী করে? নিজেকে সে কী মনে করে? মালিকইয়াও মিদ্বিন? কেয়ামত দিবসের বিচারের মালিক?
"তাকওয়া" ব্যাপারটা যেহেতু অন্তরের গভীরের বিষয় - কাজেই সেটা চর্মচক্ষে দেখার ক্ষমতা কোন মানব সন্তানকে দেয়া হয়নাই। এবং যেহেতু সেটা দেয়া হয়নাই, কাজেই হুটহাট করে কাউকে ছোট প্রমান করতে, বা অপমান করতে গালাগালি দিয়ে বসাটা আহাম্মকি। সর্বক্ষেত্রে এটি পাপ।
"সিনেমার নায়িকারা পতিতা" - ফতোয়া দেনেওয়ালাদের জন্য আমি অ্যাঞ্জেলিনা জোলির উদাহরণ টানবো। একের পর এক কচিকাঁচা এতিম শিশু দত্তক নিয়ে বেভারলি হিলসের প্রাসাদে বড় করছেন। যেখানে আমাদের নবীজি (সঃ) নিজে এতিম ছিলেন, এবং তাঁর উম্মাতদের নির্দেশ দিয়েছেন, "এতিমের যদি সাহায্য নাও করতে পারো, তাহলেও তাঁদের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিও - তবু দুর্ব্যবহার করো না।" - সেখানে অ্যাঞ্জেলিনা পাঁচটা এতিম শিশুর ভাগ্য পরিবর্তনে সরাসরি ভূমিকা পালন করছেন। এছাড়াও সে আরও অনেক সমাজ কল্যানমুলক কাজে জড়িত।
এখন এই মহিলাটিকে "পতিতা" ডাকা লোকজন ফেসবুকে বিষ্ঠা বিসর্জন ছাড়া আর কী কাজ করে সমাজ উল্টে ফেলেছে তা জানতে পারলে খুশি হতাম।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই এপ্রিল, ২০১৭ রাত ৩:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




